Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সংগ্রামী চেতনার দীপ্তমান ছিলেন রত্নেশ্বর চন্দ্র সিং ।। সনজিৎ কুমার সিংহ

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ২১, ২০২১, ১০:২৪

সংগ্রামী চেতনার দীপ্তমান ছিলেন রত্নেশ্বর চন্দ্র সিং ।। সনজিৎ কুমার সিংহ

তিনি একজন অতিসাধারণ মতোই জীবন যাপন করতেন। যেন একদম সাদাসিধে একজন হাস্য উজ্জ্বল মানুষ। কখনও আদিখ্যেতা কিংবা অহংকার মনোবৃত্তি পোষণ করেননি। এই সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে গেছেন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন নীরবে নিভৃতে। তিনি শোষিত ও নিপীড়িত মানুষকে একতাবদ্ধ করে সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন অতিবাহিত করার পরও তিনি সংগ্রাম আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। আদিবাসী পরিচয়হীনতা তাঁকে পীড়িত করত। আদিবাসীদের জন্য লড়াই করেছেন এবং লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি ছিলেন নিপীড়িত আদিবাসী মানুষের নেতা। তাঁর যুক্তিগুলো ছিল তীক্ষ্ণ। বেঁচে থাকার জন্য তিনি অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন। তিনি শুধু রাউতিয়া সিং জন্য নয়, সব আদিবাসীর কথা ভেবেছেন। প্রকৃতপক্ষেই তিনি মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। রত্নেশ্বর চন্দ্র সিং ১৯৮০ সালে ১৩ মার্চের তারিখে সিরাজগঞ্জ জেলা তাড়াশ উপজেলার মাধাইনগর গ্রামের আদিবাসী পরিবারের জন্ম গ্রহণ করেন। শৈশব থেকে একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি নিমগাছী হাই স্কুল থেকে স্টার মার্ক নিয়ে পাশ করেন, পরে উচ্চ মাধ্যমিক তাড়াশ ডিগ্রি কলেজ হতে পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে ছিলেন।

কিন্ত তৎকালিন বিএনপি সরকারের আমলে মাধাইনগর ইউনিয়নের জোড় পুকুর পাড়ায় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করেন গুচ্ছ গ্রাম দেবার পরিকল্পনা করে। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে আসেন । আদিবাসীদের উচ্ছেদ রোধের  জন্য সকলকে সুসংগঠিত করেন। পরবর্তীতে অনেক  লড়াই আন্দোলন করে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিলো তার নেতৃত্বে। প্রতিটি প্রান্তিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য আমৃত্য পর্যন্ত লড়াই করে গেছেন। কখনো  নিজের চিন্তা করেন নাই, ফলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করা সম্ভব হয় নাই। এভাবে তিনি নেতৃত্বের বিকশিত করে আদিবাসীদের প্রাণের নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা আদিবাসীদের জন্য দিকনির্দেশক আলোকবর্তিকা। তাঁর  কর্মযজ্ঞ মাধ্যম দিয়ে অসহায় মানুষের মনিকোঠায় জাগায় করে নিয়েছিল। গত দুই যুগের বেশি সময় ধরে তার নেতৃত্বে সামাজিক কুসংস্কার, বৈষম্য নির্যাতন ও নানা সমস্যা দূর করা সম্ভব হয়েছিল।

তিনি জেলা আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব পালন করছিলেন। সভাপতি  উপজেলা মানব ধর্ম প্রচার সংঘে ও মাধাইনগর দ্বি-মূখী উচ্চ বিদ্যালয়ের  দায়িত্ব পালন করছিলেন। এছাড়া আরও অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি শুধু আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করেন নাই। সকলের জন্য কাজ করেছিলেন। তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তিনি শিক্ষানুরাগী ছিলেন ও ধর্মের প্রতি আনুগত্য ছিলেন। এমনকি ভাল গান গাইতে পারতেন। আমার সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ হতো,সব সময় তার ভাবনা চেতনার কথাগুলো শেয়ার করতেন। তিনি বলতেন এ-ই সমাজ কবে অর্থনৈতিক মুক্তি, শিক্ষার মুক্তি, বৈষম্য ও নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে। একটি কথা বুকে সাহস নিয়ে বলতেন, সনজিৎ আমি যদি বেঁচে নাও থাকি তবু একটা সময় পরিবর্তন আসবে। তার এ-ই আত্নবিশ্বাসী আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা দেয়। তার মৃত্যর পর থেকে আমি ভালো ভাবে ঘুমাতে পারি না। আমি মাঝে মধ্যে স্বপ্নে দেখি আর নানা কথা বলে। আমি যত কাছে হতে দেখেছি, তিনি সব সময় লোভ লালসা ঊর্ধ্বে ছিলেন। তার মধ্যে কখনো অর্থের লোভ ছিলো না। তার সমস্যার কথা কখন বলতেন না, চাপা স্বভাবের একজন মানুষ ছিলেন। তিনি যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন আমার সঙ্গে আরো বেশি অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। প্রতিনিয়ত হাসপাতালে যাওয়া খোঁজখবর নেওয়া  এগুলো সব কিছু  আমি করতাম। আমার মন খারাপ বা চিন্তিত দেখলে, তখন আমাকে কাছে ডেকে বলতেন তুই চিন্তা করিস না, আমি সুস্থ হয়ে যাব। এ কথা শুনে অবাক হয়ে যেতাম, তিনি নিজে কখনো মনোবল হারাননি। বগুড়া শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি চিকিৎসা নিতেন। তার দেহের মধ্যে নানা রোগে বাসা বেঁধে ছিলো। প্রথমে পিত্তথলিতে পাথর,  এ-র পরে জন্ডিস ও লিভারে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে পড়েন। দীর্ঘ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছিলেন।  বগুড়া থেকে নিয়ে আসি বাড়িতে, ঢাকা নিয়ে যাবো উন্নত চিকিৎসার জন্য সিধান্ত হলো। তাঁকে নিয়ে সকাল বাহির হলাম ঢাকা উদ্দেশ্য কিন্ত মাঝে সিদ্ধান্ত হলো খাজা ইউনুস মেডিকেল কলেজ এনায়েতপুর নেই, কিন্তু সেখানে ভর্তি নেয় না। সন্ধ্যা আবার বাড়ি নিয়ে আসি। রাত ২ টার দিকে ঢাকা উদ্দেশ্যে রওনা দেব, সব ধরনের যোগাযোগ করা হয়েছিলো।মৃত্যুর আগে আমাকে বার বার বলতেন সনজিৎ আমার কি হবে, আমি কখন ঢাকা যাবো। আমি বলতাম দাদা আমরা রাতে ঢাকা যাবো। কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম সময় যতই চলে যাচ্ছে তার দেহটা নিশতেজ হয়ে যাচ্ছে।আমি নিরবে দুচোখ দিয়ে অশ্রু পড়েছে মনে মনে ভাবতাম আর মনে হয় আমার দাদাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না। তারপরে বাংলার আকাশ কালো মেঘে  ঢাকা পড়ে ছিল। সেদিন রাতে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হারিয়ে গেলো।

আজ লিখতে বসে দুচোখ দিয়ে অঝোরে অশ্রু পড়ছে। বুকের মধ্য কষ্টের পাহাড় নিয়ে পথ চলছি। একা একা পথ চলতে হয়ছে। আর কে তার মতো করে পথ দেখাবে কে বা উপদেশ দিবে। আজ আপনার আদর্শ ও চেতনাকে বুকে লালন করে পথ চলছি। তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে অকালে মারা যান। আমরা হারিয়েছি একজন খাঁটি আদিবাসী বান্ধব নেতা। আমাদের কাছে বটবৃক্ষ ছিলেন তিনি। এ-ই সমাজ বিনির্মাণে পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি সংগ্রামী চেতনার দীপ্তমান ছিলেন। একজন রত্মেশ্বর একদিনে তৈরি হয়নি। তাঁর সামগ্রিক জীবনটাই তো একটি ইতিহাস। তাঁর ত্যাগের মহিমা আগামী প্রজন্মের জন্য উদাহরণ হয়ে থাকবে। তিনি চেতনায়  জীবিত হয়ে থাকবেন অনন্তকাল। আজ তাঁর প্রথম প্রয়াণ  (২১।০৯।২০২০)দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করি।



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost