Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আদিবাসী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণনের সুযোগ-সীমাবদ্ধতা-সতর্কতা এবং সম্ভাবনা ।। চম্পা বর্মণ

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২১, ১১:৫৪

আদিবাসী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণনের সুযোগ-সীমাবদ্ধতা-সতর্কতা এবং সম্ভাবনা ।। চম্পা বর্মণ

বৃহত্তর ময়মনসিংহে গারো, হাজং, কোচ, বানাই, হদি, ডালু ও বর্মণ আদিবাসীদের বসবাস। জীবিকা নির্বাহের জন্য পেশা হিসেবে উদ্যোক্তা হয়ে উঠা বা ব্যবসার সাথে পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার ইতিহাস আদিবাসীদের দীর্ঘ নয়। জাতিগত বৈশিষ্ট্য, ধ্যান ধারণা ও যাপিত জীবনের ধরণ তাদেরকে ব্যবসায়ী হতে আগ্রহী করে তুলেনি কখনো। তবে সামাজিক ও গৃহস্থালী প্রয়োজন মেটানোর জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক উদ্যোক্তা নিজেদের মধ্যে বরাবরই ছিল তা তাদের ইতিহাসে লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে কৃষি সংস্কৃতি ও সামাজিক- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বাঁশ, বেত, কাঠ এবং তাঁত পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহারই সমধিক। স্বভাবগতভাবে আদিবাসী পরিবারগুলো নিজেরাই নিজেদের ব্যবহার্য্য দ্রব্যাদির অধিকাংশ প্রকৃতির উপকরণে তৈরি করে আসছে আদি থেকে। বিশেষভাবে গারো ,হাজং ও কোচ নারীগণ নিজেরাই নিজেদের পোশাক নিজেদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশের তাঁতে বয়ন করত।


ব্যবসার সাথে যুক্ত না হলেও বিনিময় বিপণন ছিল, ক্রয় বিক্রয় ব্যবস্থা ছিল এ অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যেও। শ্রী কেদারনাথ মজুমদার প্রণীত ‘ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ’ গ্রন্থে পাওয়া যায় সুসং রাজা রাজসিংহের শাসনামলে সেখানকার স্বাধীনচেতা পার্বত্য আদিবাসী গারো, কোচদের বিদ্রোহ দমন ও বশে আনার জন্য একটি হাট সৃষ্টি করে তাদের সাথে আপোষ বন্দোবস্ত করেন, সে সময়ে এ অঞ্চলে আদিবাসীদের মধ্যে গারো, হাজং ও কোচদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য ছিল। উক্ত গ্রন্থে লেখা আছে “বৎছরে ৭/৮দিন ইহারা আসিয়া ক্রয় বিক্রয় করিয়া জীবন নির্বাহের উপযোগী জিনিস সংগ্রহ করিয়া লইয়া যায়।” উল্লেখ আছে পার্বত্য প্রজারা এক জাতীয় বিশেষ কার্পাস তুলা, হস্তিদন্ত, হরিণ কস্তুরী প্রভৃতি বিনিময়ার্থ নিয়ে আসত ও তৎবিনিময়ে লবণ ও অন্যান্য কিছু দ্রব্য যা তারা তৈরি করতে পারে না তা ক্রয় করে নিয়ে যেত। কথিত আছে উক্ত কার্পাস তুলা দিয়ে সেকালের মসলীন শাড়ির বিশেষ তন্তু তৈরি হতো। ফলে শাসকদের লোলুপ দৃষ্টিতে পড়ে এক সময়ে সেই কার্পাস তুলার চাষ ও বিপণন মালিকানা আদিবাসীদের হাতছাড়া হয়ে যায়। সময়ের চাহিদা পূরণে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন নামে অনেক ডিজিটাল হাট বসেছে এবং আরো বসবে। কিন্তু এই হাটগুলো কাউকে বশে আনার বন্দোবস্ত করার জন্য নয়, বরং স্বাধীনভাবেই বশ্যতা স্বীকার করে কেনাবেচায় যুক্ত হচ্ছেন উদ্যোক্তাগণ। বর্তমানে এই ডিজিটাল হাট ব্যতিত পণ্য বিপণন নিজ গন্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়া অনেকটাই সম্ভব নয় বলে নিজেরাই বশিভূত হয়ে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছি আমরা। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী উদ্যোক্তা তথা ব্যবসায়ীদের পণ্য বিপণন ব্যবস্থা সম্পর্কে আমার পর্যবেক্ষণ এবং যৎসামান্য অভিজ্ঞতায় পটভুমিসহ বিপণন সুযোগ, সীমাবদ্ধতা, সতর্কতা এবং কিছু সম্ভাবনা নিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসী উদ্যোক্তা এবং সম্ভাব্য উদ্যোক্তাদের জন্যকিছু লেখার চেষ্টা করছি।


ক্যাথলিক মিশনারি ফাদার ইউজিন ই. হোমরিক সিএসসি কর্তৃক ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে জলছত্র ক্যাথলিক মিশনে এবং পরে পীরগাছা ক্যাথলিক মিশনে সেবামূলক তাঁতকেন্দ্র পরিচালনার মাধ্যমে উৎপাদিত তাঁত পণ্য আদিবাসী তাঁতপণ্য রুপে স্থানীয়ভাবেই বিপণন হতো। এর বহু আগে রাণীখং ক্যাথলিক মিশনে বিদেশি মিশনারি ফাদারগণ যখন গারো অঞ্চলে তাদের মিশন কাজ শুরু করেন তার অব্যহতি পরে রাণীখং ক্যাথলিক মিশনে বিদেশি ফাদারগণ একটি বয়ন স্কুল স্থাপন করেন। সেই তাঁতকেন্দ্র থেকে উৎপাদিত তাঁতপণ্যও স্থানীয়ভাবে বিক্রি হতো। পরবর্তীতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সংকটের কারণে তা বিরিশিরি ব্যাপ্টিস্ট মিশনের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।
জাতিসংঘ ঘোষিত নারী দশকে ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে বেইজিং ঘোষণার পর দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলোর নারী ক্ষমতায়ন ও আর্থিক স্বনির্ভতা কার্যক্রমের জোয়ারের সামান্য ছোয়া লাগে আদিবাসী নারী ও যুবা শ্রেণির মধ্যে। বৃহত্তর ময়মনসিংহে মূলত ওয়ার্ল্ডভিশন বাংলাদেশ, কারিতাস বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চল ও অন্যান্য কিছু বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আয়মূলক প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির পর আদিবাসী নারীরাও কিছু সংখ্যক যুক্ত হতে থাকে। উদ্দেশ্য পরিবারে বাড়তি আয় যোগ করা। এ সকল ব্যবসা গ্রাম বা পাড়া ভিত্তিকই গড়ে উঠেছে এবং স্থানীয় সরবরাহে স্থানীয় চাহিদা মেটানোই মূল লক্ষ্য। বেসরকারি সংস্থাগুলোর কম্পিউটার প্রশিক্ষণ পেয়ে কিছু কিছু যুবক কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে স্কুল কলেজের কম্পিউটার ভিত্তিক সেবা দিতে শুরু করেছে এলাকায়। উল্লেখ্য সে সময় থেকেই মধুপুরে কৃষি উদ্যোক্তা ও ব্যবসা সম্প্রসারণ নতুন জাগরণ সৃষ্টি করে। মূলত: এই শ্রেণির পণ্য বিপণন মহাজন বা মধ্যসত্ত্ব ভিত্তিক হয়েছে, সরাসরি কৃষি উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী বিপণন স্থানে যুক্ত হতে পারেনি বা যুক্ত হওয়া সম্ভব হয়নি


নব্বই এর দশকে বেইজিং ঘোষণা পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে সরকারিভাবে প্রতিটি উপজেলায় মহিলা মার্কেট নামে একটি বিপণন কেন্দ্র তৈরি হয় যেখানে আদিবাসী নারী উদ্যোক্তগণকেই দোকান রবাদ্দ নিতে দেখা গেছে। পরে জয়িতা মার্কেট নামে এটির পরিসর বৃদ্ধি হয়েছে, নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যাও বেড়েছে। প্রকৃত পক্ষে উদ্যোক্তার সংজ্ঞা বিবেচনায় পূর্ণাঙ্গ উদ্যোক্তা না হলেও বিশেষ কোন উদ্যোগ গ্রহণ করে পরিবর্তনের পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বলে আমি তাদেরকে উদ্যোক্তা আখ্যায়িত করতেই পছন্দ করি। আদিবাসী পুরুষদের মধ্যেও ব্যবসার সাথে যুক্ত হবার সংখ্যা বেড়েছে, ব্যবসায়িক পণ্য নির্বাচনেও বহুমাত্রিকতা লক্ষণীয়। তবে এসকলই উপজেলা বা নির্দ্দিষ্ট এলাকা ভিত্তিক বিপণন। এলাকাভিত্তিক পণ্য বিপণন কেন্দ্র ব্যতিত এসকল পণ্য বিপণণের কোন বৃহৎ কেন্দ্র বা প্ল্যাটফর্ম মূলত ছিল না। আচকিপাড়া তাঁতের আদিবাসী কাপড়ে তৈরি কিছু ব্যাগ জাতীয় পণ্য ঢাকায় আড়ং এবং প্রবর্তনায় দিতে দেখেছি। তাছাড়া আদিবাসী ঐতিহ্যে তৈরি বাঁশ,বেত, কাঠ ও মৃৎ পণ্যের মৌসুম ও উৎসব ভিত্তিক বিপণন লক্ষ্য করা যায়।


যতদুর মনে পড়ে ১৯৯৬- ৯৭ খ্রিষ্টাব্দে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আদিবাসী নারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং দৃঢ়তা নিয়ে ‘ট্রাইবাল ক্রাফ্ট’ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে ঊদ্যোক্তা হিসাবে সামনে আসেন মিজ মিলন চিসিম। এরই মধ্যে বিউটি পার্লার ভিত্তিক দক্ষ গারো বিউটিশিয়ানদের মধ্যে বেশ সংখ্যক বিউটিশিয়ান নিজস্ব বিউটি পার্লার প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিউটিশিয়ান শিল্প ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসাবে নিজেদের প্রকাশ করতে শুরু করেন। এতে অনেক মেয়েদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়।

মধুপুরের গারো আদিবাসী পুরুষ উদ্যোক্তাদের মধ্যে মি. বাবলু নকরেক, মি. সালভেনুস চিসিম এবং মি. নিত্যেস নকরেক ঢাকা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত শোরুমগুলোতে তাঁদের বাঁশবেতের পণ্য, ট্রেডিশনাল মৃৎপাত্র ভিন্ন ধারায় তৈরি করে সরবরাহ করতেন। এ সকল নামিদামি শোরুম তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বিপণন কেন্দ্র হিসেবে স্থায়ী হয়নি। উদ্যোক্তা হিসাবে নয় তারা অনেকটাই বিবেচিত হয়েছেন পণ্য তৈরির শ্রমিক হিসেবে, সরবরাহক হিসেবে। আশার কথা সাম্প্রতিক সময়ে বাঁশ বেতের পণ্য তৈরিকারী উদ্যোক্তাগণ স্থানীয় বিপণন নেটওয়ার্ক কিছুটা হলেও যুক্ত হয়েছেন। উল্লেখ্য হাতে গণা কিছু ব্যক্তি একটু বৃহৎ পরিসরে ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়েছেন নব্বই দশকে কিন্তু এসকল ব্যবসায়ী ব্যক্তি, তাদের ব্যবসার ধরণ এবং তাদের পণ্য বিপণন সম্পর্কে সকলের কাছে সচেতনভাবে তেমন দৃশ্যমান হয়নি।
আমি যখন ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতীতে কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চলের সমন্বিত নারী উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত ছিলাম তখন ঝিনাইগাতীর রাংটিয়া এবং গান্ধীগাঁও কোচ গ্রামে কোচ আদিবাসী নারীদের জন্যকারিতাস দুটি তাঁতকেন্দ্র চালু করে। সেটি পরিচালনা ও তত্ত্বাবধানে ছিলাম আমি এবং আমার বান্ধবী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে চারুকলা পড়ুয়া প্রয়াত মিনতি চিসিম। সেই তাঁতকেন্দ্রের উৎপাদিত তাঁতপণ্য বিপণন হত ময়মনসিংহ কারিতাস অফিস থেকে মিনতির তত্ত্বাবধানে, এটি ছিল কারিতাস নেটওয়ার্ক ভিত্তিক বিপণন ব্যবস্থা। অল্প সময়ের মধ্যে সেসময়ের আঞ্চলিক পরিচালক মি. আলবার্ট মানখিন বর্তমান কারিতাস আঞ্চলিক অফিসের গেইট সংলগ্ন ‘ওয়ানগালা’ শোরুমটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেন যেন কারিতাস কর্মএলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আদিবাসী উদ্যোক্তা তথা কারিতাস উপকারভোগীর তৈরি বিভিন্ন পণ্য বাজার জাত হতে পারে। আমি দীর্ঘ সময় ঝিনাইগাতী স্বমন্বিত মহিলা উন্নয়ন কর্মসূচির( পরবর্তীতে জেন্ডার ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট) নারী উদ্যোক্তাদের তৈরি পণ্য এই ওয়ানগালায়সরবরাহ করেছি।
কারিতাস ময়মনসিংহেরতৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক শ্রদ্ধেয় মি. আলবার্ট মানখিন এবং তাঁর সহধর্মীনি মিজ মিলন চিসিমের সাহচার্য্য এবং কর্ম-অনুপ্রেরণায় ২০০০ খ্রিস্টাব্দে মিজ স্বপ্না আরেং এর সাথে যৌথভাবে ব্যবসা আরম্ভ করি, সেটি পূর্ণাঙ্গ উদ্যোক্তা রূপে যাত্রা শুরু তা বলা যাবে না। তবে সেসময়ে বানিজ্যমেলায় পণ্য বিপণন করে কিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করি যা একেবারেই ফেলনা নয়। দীর্ঘ বিরতির পর আবার ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে আনুষ্ঠানিক এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুনির্দিষ্টা লক্ষ্য সামনে নিয়ে উদ্যোক্তা রূপে প্রকাশিত হতে সেেচষ্ট হই এবং আজও সংগ্রামে লিপ্ত আছি। আমার সংগৃহিত ও উৎপাদিত পণ্যসমূহের বিপণন ব্যবস্থায় প্রথমত: নিজস্ব প্রদর্শনী ও বিপণন কেন্দ্রের মাধ্যমে স্থানীয় ক্রেতা, দেশের বিভিন্ন স্থানের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কের বন্ধু শুভাকাঙ্খী, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও রংপুরের কিছু শোরুম, ময়মনসিংহ ও বগুড়া ক্যান্টনমেন্টের শোরুম এবংবিদেশি ভিজিটরগণই যুক্ত ছিল।


বিগত দুই তিন বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিভিন্ন পরিসরে আদিবাসী যুবাশ্রেণি উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন। যথেষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় বিশ^বিদ্যালয় পড়ুয়া বা পাশ করা আদিবাসী যুবা শ্রেণির মধ্যে; তারা সময় নষ্ট না করে কিছু একটা করার চেষ্টা করছে। এটি নিঃসন্দেহে শুভ লক্ষণ এবং ইতিবাচক প্রবণতা বলা যায়। করোনা মহামারির নেতিবাচক প্রভাব একদিকে, অন্যদিকে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রাণপন চেষ্টা সেটি ইতিবাচক ফল নিশ্চয়ই বয়ে আনবে একদিন। সাম্প্রতিক সময়ে আদিবাসীদের মধ্যে নতুন উদ্যোক্তা সহ সকল শ্রেণির উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণনে ডিজিটাল মার্কেটিং নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া আবশ্যিক এবং জরুরি। নিজ গন্ডির বাইরে চারিদিকেবিভিন্ন নামে বিপণন নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠছে। উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী হিসেবে যেহেতু আমরা সকলেই স্বাধীন সেহেতু আমরা স্বাধীনভাবেই আমরা আমাদের পণ্য বিপণন করব এটাই স্বাভাবিক। তথাপি আমি মনে করি যে আমরা আদিবাসী উদ্যোক্তাগণ এই মাঠে নবাগত, অভিজ্ঞতা কম এবং স্বল্প পুঁজি যা বহু কষ্টে সঞ্চিত বা ঋন হিসাবে প্রাপ্ত। স্বল্প মুলধনে উদ্যোগ শুরু করেছি এবং চালিয়ে যাচ্ছি। সেক্ষেত্রে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের স্থায়ীত্ব ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তাবিবেচনায় সচেতনভাবেই কিছু বিষয় নজরে নেয়া দরকার বলে মনে করি। যেমন:
১। ব্যবসা ভিত্তিক অনলাইন বা অফ লাইন যেকোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে স্থায়ী সদস্যপদ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রদত্ত শর্তাবলী অনুযায়ী স্থায়ী সদস্য পদ প্রাপ্তিতে বৈধ আইনগত বিধিমালা স্পষ্ট কিনা তা ভালভাবে জেনে নেয়া।
২। উল্লেখিত সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে নিবন্ধিত সদস্যের অংশীদারিত্ব মালিকানার সুরক্ষা বলয় কতটুকু এবং কীভাবে তা সুরক্ষিত হবে তা জানা।
৩। প্রতিষ্ঠাতা কর্তৃপক্ষের সাথে নিবন্ধিত সদস্যের পারষ্পরিক অধিকার ও ন্যায্যতা সুরক্ষার বিধিমালা স্পষ্ট কিনা।
৪। প্ল্যাটফর্মটিতে পারষ্পরিক ব্যবসা সংক্রান্ত ইতিবাচক স্বার্থ বিদ্যমান আছে কিনা। নাকি শুধুমাত্র এক পাক্ষিক পণ্য বিপণনের স্থান সেটি জানা।
৫। উদ্যোক্তার তৈরি নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য কিভাবে বিপণন হবে অর্থাৎ পণ্যটির ব্র্যান্ডের স্বকীয়তা রক্ষা হবে কিনা। ( উদ্যোক্তা যদি শুধুমাত্র সরবরাহক হতে চান এক্ষেত্রে বিষয়টি শিথিলযোগ্য হতে পারে)।বিক্রেতার পক্ষ থেকে ঐহিত্যবাহী কোন পণ্যেরস্বত্ব ও স্বকীয়তা যথার্থভাবে প্রকাশ করা। ক্রেতা যেহেতু তার কেনা পন্য ব্যবহারে স্বাধীন সেহেতু পণ্যের উৎস ও পরিচিত প্রসারের বিষয়টি বিক্রেতার / উদ্যোক্তার সামাজিক দায়িত্ব পালন করার মধ্যে পড়ে।
৬। প্ল্যাটফর্মটি পরিচালনার ক্ষেত্রে নিবন্ধিত সদস্য ভবিষ্যতে পরিচালনা বোর্ডে থাকার অধিকার বিধিমালায় সংরক্ষিত আছে কিনা।
৭। সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোগত প্রতিষ্ঠানে সামাজিক দায়বদ্ধতা পালনের বিষয়টি যার যার প্রতিষ্ঠানের বিধিমালা অনুসারে সেটির স্বনির্ভরতা ও সক্ষমতা অনুযায়ী অবশ্য পালনীয়। সেটি পালনে বিধিমালা যথেষ্ট স্পষ্ট থাকা আবশ্যক যেন যে কোন সময় উদ্যোগ গ্রহনে বিধিমালা বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।
বাণিজ্য ভিত্তিক কাঠামোগত প্রতিষ্ঠানে অংশীদারিত্ব মালিকানা এবং সমবায়ী অধিকার, সামাজিক দায়দায়িত্ব সংযুক্ত থাকে বলে নিবন্ধিত স্থায়ী সদস্যগণ জেনে বা না জেনেও সকল অধিকার ভোগ করেন, পালন করেন এবং সংরক্ষণ করেন। এসকল নিশ্চিত করে থাকেন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ।


বৃহত্তর ময়মনসিংহে উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে বহুবিধ সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিগত দুই দশকেরকাজের প্রেক্ষিতে কিছু সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।উক্ত সম্ভাবাবনা ও সক্ষমতার বিকাশ ঘটালে, বিপণন ব্যবস্থাপনা তৈরি করলে উপকৃত হবে এ অঞ্চলের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা। এ ক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে আত্মকর্মসংস্থান, পেশাগতভাবে তৈরি হবে জীবিকা নির্বাহের নতুন সম্ভাবনা। যুবা শ্রেণির বেকারত্বের হাহাকার বন্ধ না হলেও তাদের আশা জাগাবে এই ক্ষেত্রে বিচরণের।বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসী উদ্যোক্তাদের বিপণন ব্যবস্থায় কিছু সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করছি।
প্রথমত: প্রতিটি জয়ীতা মার্কেট ভিত্তিক আদিবাসী উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করে একটি বিপণন প্ল্যাটফর্ম( অনলাইন অফ লাইন দুটোই) এবং নেতৃত্ব তৈরি করা যেখানে গ্রামভিত্তিক আদিবাসী উদ্যোক্তাগণ তাদের পণ্য বিপণন করতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত: বৃহত্তর ময়মনসিংহের প্রাণকেন্দ্র ময়মনসিংহ শহরে কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালিত ‘ওয়ানগালা’ শোরুমটি আদিবাসী উদ্যোক্তাদের পণ্য বিপণনের উপযোগী ব্যবস্থাপণা বিধিমালা প্রণয়ন করে তা উন্মূক্ত করা ও পরিচালনা করা।
তৃতীয়ত: বিভিন্ন জেলা শহরে ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাদের মধ্যে যাদের শোরুম আছে এবং বিপণন ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় আগ্রহী সেসকল কিছু কেন্দ্র তৈরি করা যেখানে আদিবাসী উদ্যোক্তাগণ পণ্য বিপণন করতে পারবেন।
চতুর্থ: বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে যেমন আদিবাসী দিবস, নারীদিবস, মানবাধিকার দিবস, মা দিবস, পরিবেশ দিবস এবং অন্যান্য দিবস পালনের ক্ষেত্রে গতানুগতিক কর্মসূচির বাইরে আদিবাসী উদ্যোক্তা বা ব্যবসা ক্ষেত্রে অবদান রাখা ব্যক্তিদের সম্মাননা প্রদান করা এবং সচেতনভাবে যুক্ত করা।এতে তাদের নিজেদের আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হবে, মর্যাদা উন্নীত হবে, নিজ জাতিগোষ্ঠী ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিচিত হবে এবং অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে।
পঞ্চমত: নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্র ও সক্ষমতা অনুযায়ী সমমনা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে সমঝোতা তৈরি করে নিজের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং পারষ্পরিক নেটওয়ার্ক রক্ষা করা এবং তার গতিশীলতা বৃদ্ধি করা।


সাম্প্রতিক সময়ের সমস্যা, চাহিদা ও সম্ভাবনা বিবেচনায় সংগঠিত এবং পরিকল্পিত বিপণন ব্যবস্থাপনা বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসী উদ্যোক্তাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক তো বটেই সাংগঠনিক ও নীতিমালা, সামাজিক নিরাপত্তা, ঐক্যবদ্ধতা এবং তথ্য প্রযুক্তিগত পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি।

ছবি : ব্লুবিবন



চম্পা বর্মণ : উদ্যোক্তা
প্রতিষ্ঠাতা: ব্লুবিবন ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ
ভাটিকাশর পাদ্রীমিশন রোড, ময়মনসিংহ



 

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost