Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম ।। সালনাম জাম্বিল

প্রকাশিত : আগস্ট ০৩, ২০২১, ১১:২৯

কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম ।। সালনাম জাম্বিল

পটভূমি

এই প্রকাশনাটি মূলত আদিবাসী তরুণ লেখকদের প্রবন্ধের একটি সংকলন। করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি হেতু লকডাউন সময়কালীন ২০২০ খ্রিস্টাব্দের বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের সময় দিবসের মূলসুরকে (কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম) ভিত্তি করে যে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল, সেই প্রয়াসেরই ফসল এই প্রকাশনা। কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল কর্তৃক আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাটিতে মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী ছাত্র-যুবদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী মোট ১৩ জন যুবক-যুবতীদের মাঝ থেকে ৩ সদস্য (আদিবাসী) বিশিষ্ট বিচারক মণ্ডলীর দ্বারা নির্বাচিত ১০ শাণিত দর্পণ যুবক-যুবতীদের প্রবন্ধ নিয়ে করা হয়েছে এ বিশেষ প্রবন্ধ সংকলন। কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণ ও জীবন-মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে শিক্ষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতির উন্নয়ন, সচেতনতা, সক্ষমতা ও নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনসংগঠন সমূহ শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহে আবহমানকাল থেকে বসবাসরত ৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং বঞ্চনার প্রভাবে তুলনামূলক নাজুক। বৈশ্বিক মহামারি এ প্রেক্ষাপটে যেন মরার উপর খরার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুগে যুগে নানারকম বঞ্চনার শিকার হয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দরিদ্র আদিবাসীদের জীবন-জীবিকাকে চরমভাবে প্রভাবিত করেছে কোভিড-১৯ মহামারি। আদিবাসীদের প্রচলিত ভূমি ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকা পরিবর্তন হওয়ার ফলে অনেক আদিবাসী জীবিকা নির্বাহে অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে বা কর্মক্ষেত্র সমূহের উপর নির্ভরশীল, যারা এই মহামারি দ্বারা বিরূপভাবে প্রভাবিত হয়েছে। কর্মহীন হয়ে পড়া আদিবাসী নারীদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক, যাদের উপর পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল। এ আদিবাসী নারীদের অনেকেই বিউটিপার্লারে বা বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মী বা সহায়তাকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, যাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কর্মহীন, অনিশ্চিত অসহায়তায় নিপতিত হয়েছে। কোভিড-১৯ এর কারণে অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও বিভিন্নমূখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে আদিবাসীরা। আদিবাসীদের জীবনজীবিকার উপর কোভিড-১৯ মহামারির বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব বিবেচনায় রেখে জাতিসংঘ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব আদিবাসী দিবসের মূলসুর নির্বাচন করে ‘‘COVID-19 and Indigenous Peoples’ Resilience” বা “কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম”। বাংলাদেশ, তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবসীরা কোভিড-১৯ মহামারির দ্বারা কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রভাবিত তা চিহ্নিতকরণ, সমস্যাসমূহ মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের সমাবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকায় কিছুটা হতাশ যুব সমাজ নিজ নিজ এলাকায় থেকে প্রতিনিয়তই আদিবাসীদের নানারকম জীবন-যুদ্ধ ও বঞ্চনার সাক্ষী হচ্ছে। এ অনাকাঙ্খিত অবসর সময়ের যথাযথ ব্যবহার দ্বারা, ছাত্র-যুবদের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতা প্রসূত পর্যবেক্ষণ কোভিড-১৯ মহামারি ও আদিবাসী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে কালের প্রয়োজনে। সেই উপলব্ধি আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় মহামারি প্রভাবিত ৯ আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দ বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে উপলক্ষ করে কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল এর আলোক প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী যুবক-যুবতীদের জন্য প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতা ও প্রবন্ধ সংকলনের আয়োজন করার।

এ বিশেষ প্রবন্ধ সংকলনে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যুবক-যুবতীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সত্যি অনুপ্রেরনাদায়ক। ঐতিহাসিক এই মহামারী আদিবাসীদের জীবনজীবিকা, সমাজ-সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে কী প্রভাব ফেলছে, কীভাবে তারা এর মোকাবিলা করছে, এ সকল কঠিন জীবন অভিজ্ঞতার চালচিত্র কালের সাক্ষী হিসেবে উঠে এসেছে এ দশজন যুব প্রতিনিধিদের লেখনিতে। এই বিশেষ চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে এই দশ যুব দর্পনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, সুদূর প্রসারী ভাবনা, সুপারিশ ইত্যাদি আদিবাসীদের উন্নয়নে নানাভাবে কাজে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এই প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ কৃতজ্ঞতা তরুণ লেখকদের প্রতি, যাদের লেখনীতে এই প্রকাশনার সফলতা। শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি বিচারক মণ্ডলীর সদস্য মি. সৃজন রাংসা(সাংমা), মি. মতেন্দ্র মানখিন এবং মি. পরাগ রিছিল-এর প্রতি, যারা তাদের মূল্যবান সময়, শ্রম ও মেধা দিয়ে প্রবন্ধগুলো বিচার-বিশ্লেষণ ও নির্বাচন করেছেন। বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি থকবিরিম প্রকাশনী’কে যারা এই সংকলন প্রকাশে অংশীদার হয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং নির্বাচিত ১০টি প্রবন্ধ তাদের অনলাইন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার জন্য অঙ্গীকার করেছেন। প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটি এবং কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চলের সম্পৃক্ত সকল সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই আয়োজন সফলতা পেয়েছে।

সংকলনটির অনঅভিপ্রেত সকল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।  প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নির্মল, ভালোবাসাময় সবুজ পৃথিবী উপহার দিতে আমাদের সকলের দায়িত¦শীল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। 

অপূর্ব ম্র্রং

আঞ্চলিক পরিচালক, কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল।



কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম

সালনাম জাম্বিল

কোভিড-১৯ অর্থ্যাৎ করোনা ভাইরাস এমন একটি রোগ যার ভয়াবহতায় সারাবিশ্ব যেন স্থবির হযে পড়েছে। COVID-19-এর পুরো অর্থ হচ্ছে CO=CORONA, VI=VIRUS, D=DISEASE, 19=2019 অর্থাৎ Corona Virus Disease-19| আর ভাইরাসটির পুরো নাম SARS-COV-2 (Severe Acute Respiratory Syndrome Corona Virus 2)| International Committee on Taxonomy of Virus নামক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক এই রোগটির নামকরণ করা হয়। রোগটি সর্বপ্রথম লন্ডনের সেন্ট থমাস হসপিতালের লেবরেটরিতে June Almeida I David Tyrrel কর্তৃক প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৬৪ সালে। রোগটি স্তন্যপায়ী পশু-পাখিদের মধ্যে শনাক্ত হয়। (সূত্র: উইকিপিডিয়া, বিবিসি নিউজ)। পরবর্তীতে চীনের উহানে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে রোগটি ভয়াবহ আকারে বিস্তার লাভ করে। ধারণা করা হয় যে চীনাদের খাদ্যাভ্যাসের দরুণ চীনারা এই রোগে আক্রান্ত হয়। আর ধীরে ধীরে তা সারা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৩০শে জানুয়ারি বিশ্বের জনগণের স্বাস্থ্যের বিষয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করে। অতঃপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১১ই মার্চ রোগটিকে মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে বিশ্বের ২১৬টি দেশের মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। আমাদের এই দেশেও ৮ই মার্চ ২০২০ সালে প্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্ত এক রোগী শনাক্ত হয়। আমেরিকার জন হপকিন্স ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড মেডিসিন এর তথ্য মতে এখন পর্যন্ত বিশ্বের ২ কোটি ৯০ লাখ ৮ হাজার ৪৯৭ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন এবং কোভিড-১৯ সারা বিশ্বে মৃত্যু হয়েছে ৯ লাখ ২৪ হাজার ১২৭ জনের। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। আক্রান্তের দিক থেকে এরপরে ভারত যদিও মৃত্যুর তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ব্রাজিল। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের তালিকায় বাংলাদেশ রয়েছে ১৫ নাম্বারে। (সূত্র: বিবিসি বাংলা ১৪ই সেপ্টেম্বর ২০২০)।

উন্নয়নের জোয়ারে বাংলাদেশ যখন দুর্বার গতিতে ছুটে চলছিল সেই সময়টাতেই যেন উন্নয়নের জোয়ারে ভাটা পড়ল করোনার কারণে। আমরা আদিবাসী এবং আমরা আমাদের আদিবাসী হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমাদের এই দেশে আদিবাসী হয়ে জন্মানো মানেই হল কঠিন চ্যালেঞ্জের সন্মুখীন হওয়া। বোধ-জ্ঞান হবার পরেই যেন আমরা আদিবাসীরা বৈষম্য, অত্যাচার, অনাচার এবং আদিবাসী হওয়ায় উপহাসের পাত্র হওয়ার খারাপ দিকগুলো উপলব্ধি করতে পারি। বিশাল এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে আদিবাসীদের সংখ্যা মাত্র ২ লাখ যা মূল জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ। চেহারা, খাদ্যাভ্যাস জীবনযাত্রার কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হওয়ায় আমাদের পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনায়। আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতিটাও আমাদের দেওয়া হয় না। আমাদের দেওয়া হয়েছে নৃ-গোষ্ঠীর ও উপজাতি নামক উপাধি। শোষণের বেড়াজালে আমরা যেন শোষিতই থেকে গেলাম।

কোভিড-১৯ অর্থাৎ করোনা ভাইরাস বিশ্বে এক আতঙ্ক সৃষ্টিকারী রোগের নাম। বাংলাদেশে এই রোগটি ৮ই মার্চ প্রথম শনাক্ত হয়। এরপর রোগী শনাক্ত হবার সংখ্যা যেন দিন দিন বাড়তেই থাকে। এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে লকডাউনের সময়টাও। এই লকডাউনের দরুণ বিশ্বে ব্যবসা বাণিজ্য প্রায় থমকে গিয়েছিল যার ফলসরূপ বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক ধস নামতে শুরু করে। বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবের কারণে স্কুল, কলেজ এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। গার্মেন্টস, রেমিটেন্সসহ বাংলাদেশের আয়ের প্রধান খাতগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। বিধায় অর্থনীতিতে ব্যাপক ধ্বস নামে এবং শেয়ার বাজারে দরের ব্যাপক পতন ঘটে। চাকরি হারায় হাজারো মানুষ।

এদের মধ্যে অনেক আদিবাসীরাও আছে। পিতৃ-পুরুষদের জায়গা জমি হারিয়ে আদিবাসীরা এখন শহরমুখী। করোনার সময়ে এসব শহরমুখী মানুষের আয়ের রাস্তাগুলোও যেন বন্ধ হয়েছে করোনার লকডাউনের কারণে। রোগের বিস্তার রোধে মেলামেশা, যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞাসহ বিবিধ বাধানিষেধ আরোপ করার কারণে সমস্ত রকমের আয়ের পথগুলোও হয়েছে আরোও সঙ্কুচিত। অধিকাংশ আদিবাসী নারীরা পার্লারে বিউটিশিয়ান হিসেবে ও বিক্রয়কর্মী হিসিবে কাজ করে থাকেন। আর অন্যদিকে বাকি সংখ্যক আদিবাসী পুরুষ ও নারী অফিসে কাজ করে থাকেন। করোনার সময়টায় বিউটিশিয়ানদের কর্মস্থলসহ প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সকল কর্মস্থল বন্ধ ছিল। ফলে আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়। কর্মজীবি আদিবাসী নারী পুরুষদের পড়তে হয় কর্মী ছাটাইসহ অর্ধেক বেতন পাওয়ার মত নানান সমস্যায়। আবার কেউবা পেয়েছেন অর্ধেকেরও কম বেতন। বিধায় কর্মজীবী আদিবাসী নারী পুরুষদের বাড়িভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা ও বিভিন্ন আনুষাঙ্গিক খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। জীবনযাত্রার খরচ যোগাতে না পেরে অনেকজনকেই আবার ফিরে আসতে হয়েছে নিজ গ্রামে।

বিউটিশিয়ানরা কর্মীছাটাইয়ের মধ্যে চাকরি খুইয়ে গ্রামে ফিরে হয়েছেন কৃষি জমির দিনমজুর যা সত্যিই করুণ পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবিকেই তুলে ধরে। এক বিউটিশিয়ান কর্মী ছাটাইয়ের শিকার হয়ে বেকারত্বের অভিশাপে দিন কাটাচ্ছেন। (থকবিরিম.কম: করোনা কেড়েছে বিউটিশিয়ানের স্বপ্ন ৩০ শে জুলাই ২০২০)

সমস্ত রকমের ব্যবসা বাণিজ্য, কেনা-বেচা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধুপুরের আদিবাসী কৃষকদেরও পড়তে হয়েছে বিরম্বনায়। বাগানে ফল পাকা শুরু করলেও ক্রেতা না থাকায় বাগানেই যেন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তাদের কষ্টের সোনার ফসল।

এছাড়াও বেশিরভাগ আদিবাসীরা প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ। যাদের বেশির ভাগেরই খাদ্যের অভাব জনিত সমস্যা বিদ্যমান। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ কার্যক্রমের ত্রাণসমূহও কতিপয় দুর্নীতিবাজদের কারণে আদিবাসীদের কাছে পৌঁছায় না। আর যাও পৌঁছায় তা প্রয়োজনের তুলনায় শুধু অপ্রতুলই নয় তা নিতান্তই নগণ্যও বটে। বেসরকারি যেসব ত্রাণ পৌছায় তাও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনের তুলনায় খুবুই স্বল্প পরিমাণের। এছাড়াও উন্নয়নের নামে ভূমি উচ্ছেদ, দখলদারি করোনার সময়টাতেও বন্ধ হয়নি। বনবিভাগ কর্তৃক ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, মধুপুরের পেগামারী গ্রামের বাসন্তি রেমার ৪০ শতাংশ আবাদি জমির কলা গাছ কেটে ফেলাও নিপীড়নের এক জ্বলন্ত উদাহারণ (থকবিরিম.কম: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০)। একদিকে খাদ্য সংকট আর অন্যদিকে অন্যায় অত্যাচার যেন বেড়েই চলছে। আদিবাসীদের গ্রামগুলোতে খাদ্যের সংকট সত্যিই খুবই প্রকট তা আরো স্পষ্ট হয় বিডি নিউজ ২৪-এর ১৮ই এপ্রিল ২০২০ সালের প্রকাশিত আদিবাসী গ্রামগুলোতে খাদ্য সংকট নিয়ে লেখা এক প্রতিবেদনে।

এছাড়াও চীনাদের সাথে চেহারার ও খাদ্যাভ্যাসের কিছুটা মিল থাকার করণেও অর্থ্যাৎ চেহারা মঙ্গলয়েড হবার কারণেও আদিবাসীদের করোনা ভাইরাসের সম্ভাব্য বাহক ভাবা হচ্ছে। (সূত্র: প্রথম আলো: করোনাকালে আদিবাসী দিবস ও জীবন নামক প্রতিবেদন, প্রকাশ ৯ আগস্ট ২০২০)। যা সত্যিই বিবেককে নাড়িয়ে দেবার মত এক প্রতিবেদন। শুধু চেহারায় মিল থাকার জন্যও এদেশে আদিবাসীদেরকে করোনার বাহক মনে করা যে কতটা যুক্তিযুক্ত সেই বিষয়টা ভাবার মত মানসিকতা হয়ত আজও আমাদের দেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অনেকেরই হয়নি যা সত্যিই দুঃখজনক।

এছাড়াও সমতলে ৭৮% আদিবাসী দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। আদিবাসীরা সহজে কারো কাছে সহায়তা নিতে চায় না। তাই আদিবাসীদের মধ্যে ভিক্ষাবৃত্তি তুলনামূলক কম বা দেখা যায় না বললেই চলে।

এবার আসি শিক্ষার ক্ষেত্রে। করোনা চলাকালীন সময়ে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আদিবাসী ছেলে-মেয়েরা যেন শিক্ষার মূল স্রোত থেকে ছিটকে গেছে। করোনাকলীন সময়ে তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে ক্লাস নেওয়া হলেও অনেক আদিবাসী সেই ক্লাসে অংশগ্রহণ করতে পারেনি শুধু প্রযুক্তির অভাবে বা দরিদ্রতার কারণে। আবার মুষ্টিমেয় যেসব আদিবাসী ছেলে মেয়ে প্রযুক্তির সেই সুযোগটি পেয়েছে তারাও শিক্ষাক্ষেত্রে সময় ব্যয় না করে গেম খেলাসহ ভিডিও দেখার মত ত্রিমাত্রিক দুনিয়ায় সময়ের অপচয় করেই দিন যাপন করছে। আবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী শিক্ষার্থীরা পড়েছে ভীষণ বিপাকে। সময় মত তাদের পরীক্ষা না হওয়ায় তারা ভয়ানক মানসিক সমস্যাসহ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। করোনার প্রাদূর্ভাবের কারণে আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের ভবিষ্যত যেন হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তিতে আদিবাসীরা আজও পশ্চাৎপদ। আর এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। চিকিৎসা নিতে যেতে হয় বহুদূরে আর রাস্তাঘাটও যেন মরার উপর খরার ঘাঁ-এর মত। পরিবহন বা যোগাযোগ ব্যবস্থার এমন বেহাল অবস্থায় রোগী চিকিৎসা সেবা নেবার আগেই পটল তুলতে শুরু করে। শুধু করোনার আতঙ্কের কারণে ডাক্তারও তার প্রধান কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছেন। অবশ্য পর্যাপ্ত পিপিই না থাকাও এর প্রধান কারণবলে অনেকে যুক্তি দেখিয়েছেন। এর দু একটি উদাহারণ হলো: নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা থানার নাজিরপুর ইউনিয়নের মনিকা জম্বিল শুধু করোনা পজিটিভ সন্দেহে ডাক্তারের চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান। ডাক্তারের পা ধরেও ডাক্তারকে আনা যায়নি তার চিকিৎসা করানোর জন্য। ডাক্তার তখন দেখিয়েছেন হাজারো অজুহাত। প্রায় ৫-৬ ঘন্টা কষ্টে কাতরাতে কাতরাতে রোগী শেষ নিঃশাষ ত্যাগ করেন। আর ধোবাউড়ার ধাইরপাড়া গ্রামের এক শক্তপোক্ত বৃদ্ধাও চিকিৎসার অভাবে মারা যান। শুধু করোনা চলাকালীন সময়ে এমন অসংখ্য রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন যা সত্যিই মেনে নেওয়ার মত নয়। এছাড়াও সমস্ত রকমের যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে অনেকের আত্মীয়স্বজন মারা গেলেও শেষ বারের মত দেখতে পায়নি তাদের প্রিয়জনের প্রিয় মুখ। যা সত্যিই বেদনাদায়ক।

আমরা আদিবাসীরা অনেক আগে থেকেই অত্যাচারিত ও নিপীড়িত এবং শোষিত। আমাদের এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। এক্ষেত্রে শিক্ষিত আদিবাসী সমাজকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে। আদিবাসী যুব সমাজকে মূখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। নিজেদের মধ্যে সকল প্রকার হিংসা-প্রতিহিংসা ত্যাগ করে আমাদের এক হতে হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আজ করোনা ভাইরাসের প্রাদূর্ভাবের সময়ে অনেক সংস্থা ও আদিবাসী ছাত্র দলগুলো সার্বিকভাবে ছুটে এসেছে আদিবাসীদের সাহায্য করবার জন্য। কিন্তু এই দুঃসময়ে সবচেয়ে দরকার ছিল আমাদের আদিবাসী সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার। ভবিষ্যতে এমন সমস্যা হতে পারে বা এ থেকেও আরও বড় কোনও সমস্যার আবির্ভাব ঘটতে পারে। কিন্তু আমাদের থাকতে হবে সদা প্রস্তুত। সকলকে মানব সেবায় উৎসাহিত করতে পারলেই আমরা এমন সমস্যার মোকাবেলা করতে পারবো। সমাজ ও মানব সেবায় ত্যাগী না হলে সেখানে উন্নয়ন সাধিত হয় না। এ জন্যে আমদের প্রচুর ত্যাগস্বীকার করতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে। আমাদের মধ্যে শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়ে মানব সেবার জন্য আত্মোৎসর্গ করার মনোভাব তৈরি করা গেলেই আমরা যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলা করতে পারবো।



লেখক পরিচিতি :

তরুণ লেখক সালনাম জাম্বিল নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা থানার নলছাপড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost