Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কোভিড-১৯ এবং আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম ।। বাশরী জাম্বিল

প্রকাশিত : জুলাই ৩০, ২০২১, ১১:২৯

কোভিড-১৯ এবং আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম ।। বাশরী জাম্বিল

পটভূমি

এই প্রকাশনাটি মূলত আদিবাসী তরুণ লেখকদের প্রবন্ধের একটি সংকলন। করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি হেতু লকডাউন সময়কালীন ২০২০ খ্রিস্টাব্দের বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের সময় দিবসের মূলসুরকে (কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম) ভিত্তি করে যে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল, সেই প্রয়াসেরই ফসল এই প্রকাশনা। কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল কর্তৃক আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাটিতে মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী ছাত্র-যুবদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী মোট ১৩ জন যুবক-যুবতীদের মাঝ থেকে ৩ সদস্য (আদিবাসী) বিশিষ্ট বিচারক মণ্ডলীর দ্বারা নির্বাচিত ১০ শাণিত দর্পণ যুবক-যুবতীদের প্রবন্ধ নিয়ে করা হয়েছে এ বিশেষ প্রবন্ধ সংকলন। কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণ ও জীবন-মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে শিক্ষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতির উন্নয়ন, সচেতনতা, সক্ষমতা ও নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনসংগঠন সমূহ শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহে আবহমানকাল থেকে বসবাসরত ৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং বঞ্চনার প্রভাবে তুলনামূলক নাজুক। বৈশ্বিক মহামারি এ প্রেক্ষাপটে যেন মরার উপর খরার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুগে যুগে নানারকম বঞ্চনার শিকার হয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দরিদ্র আদিবাসীদের জীবন-জীবিকাকে চরমভাবে প্রভাবিত করেছে কোভিড-১৯ মহামারি। আদিবাসীদের প্রচলিত ভূমি ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকা পরিবর্তন হওয়ার ফলে অনেক আদিবাসী জীবিকা নির্বাহে অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে বা কর্মক্ষেত্র সমূহের উপর নির্ভরশীল, যারা এই মহামারি দ্বারা বিরূপভাবে প্রভাবিত হয়েছে। কর্মহীন হয়ে পড়া আদিবাসী নারীদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক, যাদের উপর পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল। এ আদিবাসী নারীদের অনেকেই বিউটিপার্লারে বা বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মী বা সহায়তাকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, যাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কর্মহীন, অনিশ্চিত অসহায়তায় নিপতিত হয়েছে। কোভিড-১৯ এর কারণে অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও বিভিন্নমূখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে আদিবাসীরা। আদিবাসীদের জীবনজীবিকার উপর কোভিড-১৯ মহামারির বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব বিবেচনায় রেখে জাতিসংঘ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব আদিবাসী দিবসের মূলসুর নির্বাচন করে ‘‘COVID-19 and Indigenous Peoples’ Resilience” বা “কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম”। বাংলাদেশ, তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবসীরা কোভিড-১৯ মহামারির দ্বারা কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রভাবিত তা চিহ্নিতকরণ, সমস্যাসমূহ মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের সমাবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকায় কিছুটা হতাশ যুব সমাজ নিজ নিজ এলাকায় থেকে প্রতিনিয়তই আদিবাসীদের নানারকম জীবন-যুদ্ধ ও বঞ্চনার সাক্ষী হচ্ছে। এ অনাকাঙ্খিত অবসর সময়ের যথাযথ ব্যবহার দ্বারা, ছাত্র-যুবদের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতা প্রসূত পর্যবেক্ষণ কোভিড-১৯ মহামারি ও আদিবাসী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে কালের প্রয়োজনে। সেই উপলব্ধি আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় মহামারি প্রভাবিত ৯ আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দ বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে উপলক্ষ করে কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল এর আলোক প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী যুবক-যুবতীদের জন্য প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতা ও প্রবন্ধ সংকলনের আয়োজন করার।

এ বিশেষ প্রবন্ধ সংকলনে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যুবক-যুবতীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সত্যি অনুপ্রেরনাদায়ক। ঐতিহাসিক এই মহামারী আদিবাসীদের জীবনজীবিকা, সমাজ-সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে কী প্রভাব ফেলছে, কীভাবে তারা এর মোকাবিলা করছে, এ সকল কঠিন জীবন অভিজ্ঞতার চালচিত্র কালের সাক্ষী হিসেবে উঠে এসেছে এ দশজন যুব প্রতিনিধিদের লেখনিতে। এই বিশেষ চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে এই দশ যুব দর্পনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, সুদূর প্রসারী ভাবনা, সুপারিশ ইত্যাদি আদিবাসীদের উন্নয়নে নানাভাবে কাজে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এই প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ কৃতজ্ঞতা তরুণ লেখকদের প্রতি, যাদের লেখনীতে এই প্রকাশনার সফলতা। শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি বিচারক মণ্ডলীর সদস্য মি. সৃজন রাংসা(সাংমা), মি. মতেন্দ্র মানখিন এবং মি. পরাগ রিছিল-এর প্রতি, যারা তাদের মূল্যবান সময়, শ্রম ও মেধা দিয়ে প্রবন্ধগুলো বিচার-বিশ্লেষণ ও নির্বাচন করেছেন। বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি থকবিরিম প্রকাশনী’কে যারা এই সংকলন প্রকাশে অংশীদার হয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং নির্বাচিত ১০টি প্রবন্ধ তাদের অনলাইন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার জন্য অঙ্গীকার করেছেন। প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটি এবং কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চলের সম্পৃক্ত সকল সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই আয়োজন সফলতা পেয়েছে।

সংকলনটির অনঅভিপ্রেত সকল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।  প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নির্মল, ভালোবাসাময় সবুজ পৃথিবী উপহার দিতে আমাদের সকলের দায়িত¦শীল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। 

অপূর্ব ম্র্রং

আঞ্চলিক পরিচালক, কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল।



কোভিড-১৯ এবং আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম

বাশরী জাম্বিল

We shall overcome

we shall overcome

we shall overcome

someday…

হ্যাঁ আমরা করবো জয়, এই মূলমন্ত্রটিকে ধরে রেখেই আমরা আদিবাসী জনগোষ্ঠী জীবন পথ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে চলেছি। নতুন দিগন্তের সূর্য দেখার প্রত্যাশায় আমরা সবাই। আমরা সকলই কোভিড-১৯ প্রতিরোধে প্রস্তুত এবং দৃঢ় বিশ্বাস আমরা কোভিড-১৯ কে জয় করবই।

কোভিড-১৯ আসলে কী?

কোভিড-১৯ এটি এক ধরনের ভাইরাস। যাকে আমরা করোনা ভাইরাস বলে থাকি। করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল মূলত চীনের উহান প্রদেশ থেকে। করোনা ভাইরাসের লক্ষণ হল প্রথমত গা মেজমেজ করতে থাকে, তারপর ধীরে ধীরে শরীর এবং গলা ব্যথা শুরু হয়। এরপর প্রচ- জ্বর হয়। এগোলো নির্ভর করে ভাইরাসটি শরীরে কতটুকু সংক্রমিত হয়েছে তার উপর। সর্বপ্রথম ১৯৬০ সালে ভাইরাসটি আবিস্কার করা হয় তবে এই ভাইরাসটি কীভবে উৎপন্ন হয় তা জানা সম্ভব হয়নি। করোনা ভাইরাসের আকৃতি সূর্যের মত গোল এবং সাথে চারপাশে কাটাযুক্ত। এই ভাইরাসটির সূত্রপাত ঘটে বাঁদুড় ও সাপের মধ্য দিয়ে। আমরা সকলই জানি এসব বন্যপ্রাণি চীনাদের অত্যন্ত প্রিয় খাদ্যের তালিকার মধ্যে পড়ে। পৃথিবীর মধ্যে চীনাদের মধ্যেই এই সব বন্যপ্রাণি খাওয়ার প্রবনতা বেশি। এই রোগটি সর্বপ্রথম চীনেই শনাক্ত হয়। এই ভাইরাসটির প্রতিকার নেই কিন্তু প্রতিরোধ আছে।

কোভিড এর শেষ কোথায়:

কোভিড-১৯ যে পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে তাতে আদৌ এর সমাপ্তি কোথায় তা বলা খুবই মুশকিল। তবে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে রাশিয়াতে করোনা ভাইরাসটির টিকা আবিষ্কার করা হয়েছে এবং এর হিউম্যান ট্রায়াল সফলভাবে শেষ করে তা জনগণের জন্য ব্যবহার করার জন্য অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাডিমির পুতিন নিজেই ১১ই আগস্ট, ২০২০ তারিখে এই সংবাদটি দেন এবং তার মেয়ের শরীরেই সর্বপ্রথম এই ভাইরাসটির টিকা প্রয়োগ করা হয় এই পর্যন্ত ৮ লাখ ৯১ হাজার মৃত্যুর হার প্রায় ৪ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়েছে Sorce: Google 8 Sept,২০২০)। রাশিয়ায় অনুমোদন পাওয়া টিকাটির নাম ‘স্পুটনিক-৫’। টিকাটি উদ্ভাবন করেছে রুশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান গামালিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট। তবে এখনও তা বাংলাদেশে পৌঁছায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং রিসার্চ ইনস্টিটিউটগুলোর কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কোভিড এর পরিণাম:

কোভিড-১৯ ভাইরাসটি এমন একটি ভাইরাস যা মানবদেহে প্রবেশ করে ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। মানবদেহে ভাইরাসটি ১৪ দিন বা তার চিয়ে বেশি দিনও সুপ্ত এবং স্থায়ী থাকতে পারে। কোভিড-১৯ এর লক্ষণগুলো হলো, গা মেজমেজ করা, প্রচন্ড জ্বর সহ গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা হওয়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট হওয়া। তবে কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধক আজও আবিষ্কার না হলেও আমরা প্রতিরোধের মাধ্যমে জয় করতে পারছি। আজ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত। এই পর্যন্ত ৮ লাখ ৯৬ হাজার মৃত্যুর হার প্রায় ৪ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়েছে এবং সুস্থ্য হয়েছেন ১, ৯৫, ৯১, ৩৪০ জন Sorce: Google 8 Sept, ২০২০)। তাই কোভিড-১৯ এর পরিণাম যে কেবল মৃত্যু তা নয় সচেতন এবং কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চললেই আমরা এই মৃত্যুকে জয় করতে পারবো। তবে যাদের বয়স ষাটোর্ধ এবং শ্বাস কষ্টের সমস্যা তাদের ৯০% মৃত্যু নিশ্চিত। তাই আমরা বলতে পারি কোভিড-১৯ এর পরিণাম কেবল মৃত্যু নয়, সচেতন থাকলে এই রোগটিকে প্রতিরোধ করা যায়।

কোভিড-১৯ এর পূর্বকার আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম :

কোভিড-১৯ এর পূর্বকার জীবনযাপন ছিল সংগ্রামময়। আমরা আদিবাসী বলে সব সময় আমাদের অবহেলিত হতে হয়েছে। যেমন: কোন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গেলে, আমাদের গারোদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক দকমান্দা দকশাড়ি পড়ে গেলে প্রথমেই আমাদের পোশাক নিয়ে সমালোচনা করা হবে এবং কোনওভাবে চাকরি পাওয়া গেলেও উপহাসের পাত্র হয়ে থাকতে হবে সবার কাছে। অর্থাৎ কোনও ভাবেই এই সব পোশাক মেনে নেওয়া হয় না, এছাড়াও আদিবাসী খাদ্য তথা শুটকিসহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রীসমূহের কারণে বিদ্রƒপের শিকার হতে হয় এবং আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে হেয় চোখে দেখা হয়। তাহলে পর্যবেক্ষণ করা যায় আমরা আদিবাসীরা কর্মক্ষেত্রে সবসময় অবহেলিত এবং লাঞ্চিত। অফিসের সময়টায় মায়ের ফোন আসলে মাতৃভাষায় মায়ের সাথে কথা বলা যাবে না এমন নিয়ম কোথাও নেই। কিন্তু মাতৃভাষায় মায়ের সাথে কথা বলায় অনেক সময় সবার কাছে ঠাট্টা ও উপহাসের পাত্র হতে হয়। আদিবাসীদের উন্নয়নের জন্য সরকার আদিবাসীদের চাকরি ও পড়াশোনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কোটা দিয়েছিল। কিন্তু সেই কোটায় চাকরি বা পড়াশোনা করার সুযোগ হলেও সব সময় কোটায় চাকরি বা পড়াশোনার সুযোগের পাওয়ার জন্য তুচ্ছতাচ্ছিলের স্বীকার হতে হয়। বর্তমানে আবার আদিবাসীদের কোটা বাতিল করা হয়েছে। অনেক লড়াই আর ত্যাগের পর আমরা বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করাতে পারছি। শুধু একটা দিনই আমরা আদিবাসী বলে পরিচয় দিয়ে রাস্তায় বেরোতে পারি। সবাই মন খুলে বলতে পারি আমরা আদিবাসী। উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে গেলেও যোগ্যতা থাকা সত্বেও সেই পদে চাকরি পাওয়া অনেকটাই কঠিন হয়ে যায় আদিবাসী হওয়ার কারণে। আদিবাসীদের গায়ের রং এবং বাংলা ভাষা বলার ধরনটাও যেন অন্যদের উপহাসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও আদিবাসী নারী এবং পুরুষদের প্রায় সব সময় হাসি তামাশার পাত্র হতে হয়। প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের চলতে হয় এমন অবহেলায় ও লাঞ্ছনায়। আদিবাসীদের পাশে এসে দাড়ানোর যেন কেউ নেই। অনেক যুগ আগে আদিবাসীদের একমাত্র পেশা ছিল জুম চাষ এবং আদিবাসীরা এটিতেই অভ্যস্থ ছিল। বেশির ভাগ পরিবারই চলত এই জুম চাষের মধ্য দিয়ে। এক কথায় যাকে বলে, দিন আনে দিন খায়। যুগ পাল্টাচ্ছে আর আর তার সাথে পাল্টচ্ছে আদিবাসীদের জীবনযাত্রাও। বিশ্বায়নের এ যুগে আদিবাসীদেরও আধুনিকায়ন হচ্ছে। অর্থাৎ আদিবাসীরাও যুগের সাথে নিজেদেরক মানিয়ে নিচ্ছে। বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠান এর অবদানে আদিবাসীরাও আজ যেন সমান ভাবে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম:

আদিবাসী জনগোষ্ঠী কোভিড-১৯ মহামারির পূর্বেও অবহেলিত এবং লাঞ্ছিত ছিল এবং কোভিড-১৯ মহামারিতেও পূর্বের মত সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। মহামারির কারণে সারা বিশ্বের অসংখ্য মানুষ চাকরি হারিয়েছে। ঠিক তেমনি আদিবাসী চাকুরিজীবিরাও অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। জীবন সংগ্রাম যেন আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে অনেকের জীবনে। আদিবাসীদের শতকরা ৭০ শতাংশই কৃষিকাজের সাথে জড়িত। কোভিড-১৯ মহামারি এবং ২০২০ সালের বন্যা যেন আদিবাসীদের সাধারণ জীবনযাপনে অনেকটাই ক্ষতি সাধন করছে। বন্যার কারণে এ বছরে অনেকেই তাদের কষ্টার্জিত নতুন ধান তাদের ঘরে তুলে আনতে পারেনি। বন্যার কারণে ডুবে গেছে ফসলের ক্ষেত আর ভেসে গেছে পুকুর ভরা মাছ। আর যেটুকু অবশিষ্ট ফসল ছিল তাও বিক্রি করতে না পারার কারণে হতে হচ্ছে সর্বশান্ত। অসৎ দূর্নীতিবাজদের দূর্নীতির কারণেও সরকারি সাহায্য হতেও আদিবাসীরা যেন বঞ্চিত। যেসব বেসরকারি সাহ্য্যা পৌচ্ছায় তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক জায়গাতেই আদিবাসীদের পড়তে হয়েছে খাদ্যের অভাবজনিত সমস্যায়। (সূত্র:IWGIA: A Rapid Assessment Report The impact of COVID-19 on Indigenous and tribal people in Bangladesh. Written on 10 August ২০২০)। কোভিড-১৯ তথা করোনা আদিবাসীদের সামগ্রিক জীবন যেন আজ দুর্বিষহ ও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। বাইরে কোথাও কাজ করতে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকাকালীন অন্যের বাড়ি দিনমজুর থেকে, ঢাকায় বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থেকে এবং মেয়েরা বিউটি পার্লারের মাধ্যমে আয় রোজগার করে আদিবাসীরা জীবিকা নির্বাহ করতো করোনা পূর্ববর্তী সময়ে। এখন কোভিড-১৯ এর কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, বাজার, কর্মস্থল, গার্মেন্টস পার্লার সবকিছু বন্ধ। ফলে আদিবাসী ভাই বোনেরা বেকার জীবন কাটাচ্ছে। যারা ঢাকায় থাকতেন তারা বাড়ি ভাড়ার টাকা জোগার করতে না পেরে গ্রামে চলে যাচ্ছেন। বাড়ি গিয়ে কৃষিজমিতে বাগান করে যতটুকু আয় করা যায় তারই চেষ্টা করছেন অনেকে। সেখানে বাঁচার জন্য শেষ সম্বল টুকুও যেন বন্যার জন্য শেষ হয়ে যাচ্ছে। আদিবাসীদের জীবন একদমই দুর্বিষহ করে দিয়েছে। এছাড়াও টাকার অভাবে অনেক দরিদ্র আদিবাসীগণ চিকিৎসা করাতেও যেতে পারছে না। একদিকে করোনার প্রকোপ, আরেকদিকে টাকা পয়সার অভাবে মেীলিক চাহিদা পূরণের অসর্মথতা যেন আদিবাসীদের মানসিকভাবে দুর্বল ও নিঃস্ব করে দিয়েছে। উদাহারণ স্বরূপ- নেত্রকোণা জেলার কলমান্দা থানার নাজিরপুর ইউনিয়নের পূর্ণমুখী সাংমা (৪২) করোনাকালীন সময়ে চিকিৎসার অভাবে গর্ভ যন্ত্রনায় ভুগতে থাকেন। তার বাড়িতে স্বামীর অনুপস্থিতি এবং অভাবের তাড়নায় হাসপাতলে পর্যন্ত যেতে পারেননি তিনি। কারণ হাঁসপাতালে ভর্তি হতেও তো অগ্রিম টাকা প্রদান করতে হয় আর সে সামর্থও তার যে নেই। গ্রামের কিছু সদয় অভিজ্ঞ মহিলা দ্বারা তার সন্তান জন্মদান করানো হয়। তার নিজ বাড়িতেই তার সন্তান জন্ম নিল। হাসপাতাল থেকে তার দূরত্ব প্রায় ৪০-১০০ কিলোমিটার। অনেকের জন্য সেখানে যাওয়াটাই খুবই কঠিন। এই বছরে কিছুদিন আগে মাত্র ৯ আগস্ট অর্থাৎ বিশ্ব আদিবাসী দিবসের দিনটি অতিবাহিত হল কিন্তু কোভিড-১৯ এর জন্য আমরা আমাদের সেই বিশেষ দিনটি পর্যন্ত পালন করতে পারলাম না। কারণ কোভিড-১৯ এর জন্য সমস্ত জনসমাগম, অনুষ্ঠান পালনে বাধানিষেধ জারি করা হয়েছে। আদিবাসীদের এমনিতেই সারা বছর বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের সন্মুখীন হতে হয়। তার মাঝে কারোনায় যেন আরও নতুন চ্যালেঞ্জ যুক্ত হল আদিবাসীদের জীবনে। করোনা যেন আজও আদিবাসীদের আরও ভয়াবহ সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আদিবাসীরা অনেক আগে থেকেই ভূমি সমস্যাসহ অনেক সমস্যা নিয়ে বসবাস করছে। যাদের এই ভূমি সমস্যা নিয়ে কাজ করার কথা (এএলআরডি) তারাও সার্বিকভাবে এখনও কাজ করছে না। অপূর্ণতা বা না পাওয়ার বিষয়গুলো যেন আদিবাসীদের নিত্য দিনের সঙ্গী। তবে হে আদিবাসী দিবস যে শুধু একদিনই পালনীয় এবং শুধু একদিনই স্মরণীয় এমন নয়। আমাদের আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে। আমরা সঞ্জীব দ্রং এর মত বলতে পারি যে “রাষ্ট্রকে হতে হবে ইনক্লুসিভ, কেউ অধিকার ও উন্নয়ন ধারা থেকে বাদ পড়বে না।” এবারের আদিবাসী দিবস ২০২০ ছিল জাতিসংঘ ঘোষিত ২৬ তম আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত ২৬ তম দিবস আদিবাসী দিবস। জতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯৪ সালের রেজুলেশন ৪৯/২১৪ গ্রহণ করে ৯ আগস্টকে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ হিসেবে ঘোষনা করে এবং দিবসটি পালনের জন্য সদস্য রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায়। পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন জাতিসত্তার নাগরিক পেছনে রেখে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সংস্কৃতির মন্ত্রণালয়ের গেজেট মার্চ (২০১৯) ৫০টি জাতিসত্তার উল্লেখ রয়েছে। পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীগণ অতি প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থান করে বিধায় তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা অবস্থা নাজুক; বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসব অঞ্চলে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অতিব জরুরি। দরিদ্র ও প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা টাকার অভাবে অকালেই ঝরে পড়ছে। এখনও আদিবাসীদের জন্য খসড়া আদিবাসী আইনটি পাশ করা হয়নি। যদি হয় তবে আদিবাসীরা খুবই উপকৃত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সমতল বা অন্যান্য এলাকায় যারা বাস করেন তাদের সনাতনী ভূমি ব্যবস্থায় কোন হস্তক্ষেপ নেই আর তাদের এ অধিকার খর্ব করে নেওয়া হচ্ছে। রির্জাভ ফরেস্ট, উন্নয়ন প্রকল্পের স্থাপনা, ট্যুরিজম- বিভিন্নভাবে তাদের ভূমি নিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আদিবাসীরা যে জমিগুলো হারিয়েছে আদৌ তা ফিরে পাওয়ার কোন বিধিবিধান নেই অ তারা একখন্ড জমিতে তাদের বসতভিটা তৈরি করে এক ঘরে গাদাগাদি করে বসবাস করছে।

একটা অভিজ্ঞতা:

সম্প্রতি নেত্রকোণা জেলার কলমাকন্দা উপজেলার নলছাপ্রা গ্রামে অনেক আদিবাসী ভাই-বোনের বসবাস। আর তাদের মধ্যে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সংখ্যাটিই বেশি। উচ্চবিত্ত নেই বললেই চলে। তাদের মধ্যে ৭০ ভাগ মানুষই কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। দিন মজুর আর বিভিন্ন ধরনের কাজের মাধ্যমেই তারা দিন যাপন করে। সমতলের গারো জাতিসত্তার অনেক নারী পার্লার, দোকানের বিক্রয়কর্মী ও গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে থাকে। কাজের দরুণ অনেক পরিবারের স্বামী-স্ত্রী একসাথে বসবাস করতে পারে না। আর তাদের সন্তান তাদের দাদা-দাদীর সাথে থাকে। আর করোনার এই পরিস্থিতিতে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আর হোস্টেল এ থাকতে না দেওয়ায় আমিও গ্রামে চলে এলাম। গিয়ে দেখলাম পূর্বে যারা ঢাকায় বসবাস করতেন তারা সবাই গ্রামে। কেউ নিজের ক্ষুদ্র জমিতে বাগানের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আবার কেউ কেউ ঘরে বসে সেলাই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। দিন আনে দিন খায় এমন অবস্থার শিকার অধিকাংশ মানুষ। অপুষ্টিতে ভুগছে অনেক শিশু। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত তারা জীবন সংগ্রামে লড়াই করে যাচ্ছেন। করোনা কতটুকু দীর্ঘাঘু হতে পারে তা আমরা কেউই জানি না। পাহাড় ও সমতলে যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আছে, তাদের যদি প্রণোদনার আওতায় না আনা হয় তাহলে ভবিষ্যতে তাদের টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে যাবে। তাদের স্বাস্থ্য সুবিধা নেই বললেই চলে। সবারই স্বাস্থ্য সেবার প্রয়োজন রয়েছে। দরিদ্র পরিবারে রেশনটাও যেন ঠিকমত পৌছে না এবং সেসব রেশনটাও যেন অপ্রতুল। রেশন শেষ হয়ে গেলে খাবার সংগ্রহ করতে বের হতেই হয়। অসংখ্য আদিবাসী নারী ও পুরুষ এমন কর্মহীন জীবনযাপন করছেন। সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষদের মধ্যে করোনায় আক্রান্তের হার কম, কিন্তু এখন করোনার থেকে যেন বেকারত্বের সমস্যায় যেন প্রধান সমস্যা। সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রের প্রধান মৌলিক দায়িত্ব হলো অনগ্রসর জনগণকে তাদের শোষণ থেকে মুক্ত করা। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে অনেক সমস্যার সমাধান হযে যায়। প্রধানমন্ত্রীর সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি সম্পাদনের সময় ধরেই নেওয়া হয় যে চুক্তিটি বাস্তবায়িত হবেই। কিন্তু কালের পরিক্রমায় এসে এ পর্যন্ত সেই চুক্তি আর বাস্তবায়িত হয়নি। আদিবাসীদের প্রতি আর্থসামাজিক বিভাজন যে কতটুকু প্রকট এবং কতটুকু বিস্তৃত এই করোনাকালে তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখনও অধিকাংশ এলাকায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেই। কোভিড-১৯ একটি পরিস্থিতি মাত্র, তার আগে থেকেই আদিবাসী জনগণ কাঠামোগত বৈষ্যমের শিকার। আমরা যে কথাগুলো বলে আসছি সেটা করোনাকালেও বলতে হবে আর স্বাভাবিক সময়েও বলতে হবে। ২০২১ সালে স্বাধীনতার ৫০ বছর পালন করা হয়। বিগত ৫০ বছরের হিসাব করলেও দেখা যাবে আমাদের অধিকাংশ আদিবাসীদের জমি দখল হয়ে গেছে অনেকাংশে। সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে শতকরা ৮ শতাংশের হাতে কেবল কিছু জমি আছে আর বাকিরা ভূমিহীন এবং খাস জমি নিয়ে আজও বেঁচে আছে। আমরা শহরমুখী ছিলাম না; ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে অনেকে শহরে কাজ করছেন। শহরে কাজ করেন এমন ১৫ থেকে ২০ হাজার ছেলে মেয়ে করোনাকালীন সময়ে চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে এসেছেন। এখন তারা বেকার জীবনযাপন করছেন। তারা কৃষিকাজ করতে পারেন কিন্তু এখন জমির অভাব এবং বন্যার কারণে চাষাবাদেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরকারি রেশনও ঘরে পৌছে না এমন পরিবারদের কাছে। অন্যদিকে বিধবা ভাতাসহ বিবিধ ভাতাগুলোও আদিবাসী পরিবারের সদস্যরা ঠিকভাবে পান না। জীবন যেন ধীরে ধীরে দুর্বিষহ হয়ে যাচ্ছে। আমরাও বাংলাদেশের নাগরিক এবং সরকারকে যাবতীয় কর দিয়ে বসবাস করছি কিন্তু সরকারের সহায়তা পাওয়া যেন আমাদের কাছে দুষ্প্রাপ্য বস্তু। করোনার এ সংকটকালিন সময়ে মহামারিতে এদেশের ভূমিহীন প্রান্তিক কৃষকেরা সার্বিক ক্ষতির সন্মুখীন হয়েছেন। সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। আদিবাসীরাও কি সেই জনগণের মধ্যে পড়ে না? অবশ্যই আদিবাসীরাও এদেশেরই নাগরিক। সরকার আদিবাসীদের শুধুই আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর ৯ আগস্টে আমাদের নেতা-নেতৃবর্গ আমাদের বিভিন্ন পুনঃ পুনঃ একই আশ্বাস দিয়ে যান বছরের পর বছর। করোনা মহামারির সাথে আমাদের দীর্ঘদিন লড়াই করতে হবে। আদিবাসীরাও প্রণোদনা পেতে পারেন, তা দয়া-দাক্ষিণ্য নয়, এটা তাদের অধিকার। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার ৫০ বছরে পাহাড়ি ও সমতলের সব প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যের যেন পরিবর্তন হয় সেই আশাবাদ ব্যক্ত করছে প্রত্যেক আদিবাসী ভাই-বোন। চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করেই আমাদের সংবিধান। সমাজটা হবে সমতাভিত্তিক। পার্লামেন্টে ‘আদিবাসী অধিকার আইন’ প্রস্তাবিত হয়েছে কিন্তু সেই আলোর মুখ আজও দেখা গেলো না। সরকার কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য ২০০ টাকা ফি নির্ধারণ করেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে খরচ পড়ে ৫০০ টাকার মত। প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের কাছে এটিই যেন বহনযোগ্য নয়।

আদিবাসীদের জীবনধারার চিত্র:

বেশির ভাগ আদিবাসীরা সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বসবাস করে থাকে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা, শেরপুরের নালিতাবাড়ি, টাঙ্গালের মধুপুরসহ নেত্রকোণা জেলা এবং রাজশাহী বিভাগের দিনাজপুর, রংপুর, ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে বেশিরভাগ সমতলের আদিবাসীরা বসবাস করে থাকে। সমতলের এসব আদিবাসীদের জীবনধারা অতি সাধারণ। সমতলের অধিকাংশ আদিবাসীরা অধিকাংশই ভূমিহীন। তাদের কিছু বর্ণনা নিম্নে দেওয় হলো-

কাজকর্ম:

আদিবাসীদের প্রধান পেশা কৃষি। তারা কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবনযাপন করে। বর্তমানে মেয়ে ছেলে সবাই বিভিন্ন কাজের সাথে সম্পৃক্ত। বর্তমানে ঢাকায় এসে মেয়েরা পার্লারে এবং বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তাদের তখন গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে হচ্ছে কাজের জন্য।

আদিবাসীদের জীবন সংগ্রামে কোভিড-১৯ এর প্রভাব:

কোভিড-১৯ মহামারিতে সারা বিশ্বে অসংখ্য লোক আক্রান্ত হয়েছেন। সারা বিশ্বের জনজীবনেই এই ভাইরাসটি নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে। আদিবাসীদের জীবনেও এ ভাইরাসটি প্রভাব বিস্তার করেছে যেমন-

১.      কর্মসংস্থানে প্রভাব: কোভিড-১৯ মহামারির কারণে যারা শহরে কাজ করতেন, এমন ১৫ থেকে ২০ হাজার লোক এখন গ্রামে চলে এসেছে। সবাই তারা এখন সাময়িক বেকারত্বে জীবনযাপন করছে। কৃষিখাতেও যতটুকু আশা ছিল তাও যেন শেষ হয়ে গেল বন্যার কারণে। এমন অবস্থায় তিনবেলার জায়গায় তারা দুবেলার খাবারও জুটাতে পারছে না। কোভিড-১৯ আদিবাসীদের জীবন নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে।

২.       পরিবারের উপর প্রভাব: আদিবাসীরা যারা পার্বত্য এলাকা এবং সমতলবাসী তাদের অধিকাংশ পরিবারই দরিদ্র। তাদের অবস্থা অনেকটাই দিন আনে দিন খাওয়া মানুষদের মতো তাদের অনেকেই জুম চাষের উপর নির্ভর করে থাকেন। আবার অনেকে অন্যের ঘরে কাজ করেন এবং কাঠুরে হিসেবেও কাজ করে থাকেন। বর্তমানে করোনার এই প্রার্দুভাবের কারণে তারা তাদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে পারছে না এবং সমস্ত রকমের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এমনকি বহিরাগতদের প্রবেশ নিষেধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যা যেন আরও বেড়ে গেল। ফলে যাতায়াত এবং মেলামেশায় বিধি-নিষেধ থাকায় তাদের অনেক সময় অভুক্ত থাকতে হচ্ছে। ফলে খাদ্য সমস্যার কারণে শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে ও অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাবে দরিদ্র পরিবারের অবস্থা যেন আরও নাজুক হয়ে পড়েছে।

৩.      যাতায়াতের উপর প্রভাব: করোনা সংকটের কারণে যাতায়াত ব্যবস্থাতেও নানাবিধ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে করোনা মহামারির কারণে সরকার থেকে ত্রাণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু ১৫ কেজি চালের মধ্যে প্রত্যেক দরিদ্র পরিবারকে দেওয়া হচ্ছে ২ কেজি চাল। এই দুই কেজি চালের জন্য অনেকেই প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে সাহায্য পাওয়ার আশায় ছুটে আসছেন। বর্তমানকালে জনসমাগম একদম নিষেধ বলে যাতায়াতের পথেও বিঘœ ঘটেছে। সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অবশ্য পরে সীমিত আাকারে চালু রাখার পর আবার আগের মত চালু করা হয়েছে।

যুবসমাজের করণীয়:

আমরা কেউই জানি না কতদিন আমাদের এই করোনা ভাইরাসের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। তবে যতদিন না করোনা অর্থাৎ কোভিড-১৯ বিদায় না হচ্ছে ততদিন আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে এবং থাকতে হবে সচেতন ও নিয়ম মেনে চলতে হবে। কোভিড-১৯ এর প্রতিকার নেই তবে প্রতিরোধ আছে।

আমাদের আদিবাসীরা করোনা সংকটে নানাভাবে লড়াই করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে যুব সমাজের কিন্তু অবশ্যই দায়িত্ব ও কর্তব্য থাকতে পারে। সেগুলো হল-

১.      প্রতিরোধের প্রচেষ্টা : যেহেতু করোনা ভাইরাসের ঔষধ আবিস্কার হয়নি সেহেতু আমাদের অত্যন্ত সাবধান থাকতে হবে। সেই জন্য আমাদের সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকেতে হবে। এছাড়াও-

ক)     বাইরে থেকে আসার পর ভালোভাবে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোওয়া নিশ্চিত করতে হবে।

খ)      প্রতিদিন গোসল করতে হবে।

গ)      ময়লা জামা কাপড় কেচে ফেলতে হবে। পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা

ঘ)      ময়লা হাত দিয়ে চোখ, মুখে হাত দেওয়া যাবে না।

ঙ)      কিছুক্ষণ পর পর সাবান দিয়ে বা সেনিটাইজার দিয়ে হাত ধোওয়া।

চ)      গরম পানি খেতে হবে।

ছ)      বাসস্থান পরিষ্কার-পরিছন্ন রাখা।

জ)     বাইরে বের হলে মাস্ক পরতে হবে।

এসব নিয়ম মেনে চললে আমরা এই রোগটিকে প্রতিরোধ করতে পারব।

২.       সচেতনতা: আমরা নিজেও সচেতন হব এবং অন্যদেরকে কোভিড-১৯ সর্ম্পকে সচেতন করে তুলবো। শুধু নিজের সচেতন হলেই চলবে না। প্রত্যেক মানুষকেই সচেতন হতে হবে। তাই সচেতনটা বৃদ্ধি করতে আমরা মাইকিং করতে পরি। এছাড়াও পোস্টার, সাইনবোর্ড লাগিয়ে আমরা সবাইকে সচেতন করতে পারি।

“আমরা করব জয়

আমরা করব জয়

আরা করব জয় একদিন।

বুকের গভীরে আছে প্রত্যয়

আমরা করব জয় নিশ্চয়।

করোনার ভয়, আর নয়

সচেতনতায় মোরা করব জয়।”

আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ করোনা ভাইরাসের পরিণতি সর্ম্পকে অজ্ঞ। তাই আমাদের তাদেরকে সচেতন করার জন্য যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

আমরা কেউ অকালে মরতে চাই না। আমরা প্রত্যেকেই সুস্থ্য-সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই। সুতরাং আমাদের সবার উচিত সবাই করোনা ভাইরাসের পরিণতি সর্ম্পকে সচেতন করা এবং অন্যদেরকে এই আপদকালীন সময়ে সহযোগীতা করা।

উপসংহার:

২০২০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এই পর্যন্ত ৮ লাখ ৯৬ হাজার মৃত্যুর হার প্রায় ৪ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়েছে এবং সুস্থ হয়েছেন ১,৯৫,৯১,৩৪০ জন Sorce: Google 8 Sept,  ২০২০)। রাশিয়ার ভ্যাকসিনটি আসলে কতটুকু কার্যকর তা বলা মুশকিল। আমরা আদিবাসীরা অনেক আগে থেকেই নানা সমস্যার জর্জরিত। মহামারি করোনার সময়টাতেও আমরা আদিবাসীরা অনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হচ্ছি। সবাই আশাবাদী করোনা ভাইরাস খুব শীঘ্রই চলে যাবে। আর সবাই ফিরে পাবে তাদের আগের জীবনযাত্রার দিনগুলো। পরিশেষে বলতে চাই, দৃঢ় মনোবল চিত্তে আমাদের সবাইকে বলতে হবে-

“আমরা করব জয়

আমরা করব জয়

আমরা করব জয় একদিন।”



লেখক পরিচিতি

নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা থানাধীন নলচাপাড়া গ্রামের তরুণ লেখক বাশরী জাম্বিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পড়ালেখা করছেন।



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost