Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কোভিড-১৯ এবং বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ।। জেসি নামনিকা দারু

প্রকাশিত : জুলাই ২৮, ২০২১, ১২:৩২

কোভিড-১৯ এবং বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ।। জেসি নামনিকা দারু

পটভূমি

এই প্রকাশনাটি মূলত আদিবাসী তরুণ লেখকদের প্রবন্ধের একটি সংকলন। করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি হেতু লকডাউন সময়কালীন ২০২০ খ্রিস্টাব্দের বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের সময় দিবসের মূলসুরকে (কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম) ভিত্তি করে যে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল, সেই প্রয়াসেরই ফসল এই প্রকাশনা। কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল কর্তৃক আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাটিতে মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী ছাত্র-যুবদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী মোট ১৩ জন যুবক-যুবতীদের মাঝ থেকে ৩ সদস্য (আদিবাসী) বিশিষ্ট বিচারক মণ্ডলীর দ্বারা নির্বাচিত ১০ শাণিত দর্পণ যুবক-যুবতীদের প্রবন্ধ নিয়ে করা হয়েছে এ বিশেষ প্রবন্ধ সংকলন। কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণ ও জীবন-মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে শিক্ষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতির উন্নয়ন, সচেতনতা, সক্ষমতা ও নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনসংগঠন সমূহ শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহে আবহমানকাল থেকে বসবাসরত ৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং বঞ্চনার প্রভাবে তুলনামূলক নাজুক। বৈশ্বিক মহামারি এ প্রেক্ষাপটে যেন মরার উপর খরার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুগে যুগে নানারকম বঞ্চনার শিকার হয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দরিদ্র আদিবাসীদের জীবন-জীবিকাকে চরমভাবে প্রভাবিত করেছে কোভিড-১৯ মহামারি। আদিবাসীদের প্রচলিত ভূমি ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকা পরিবর্তন হওয়ার ফলে অনেক আদিবাসী জীবিকা নির্বাহে অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে বা কর্মক্ষেত্র সমূহের উপর নির্ভরশীল, যারা এই মহামারি দ্বারা বিরূপভাবে প্রভাবিত হয়েছে। কর্মহীন হয়ে পড়া আদিবাসী নারীদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক, যাদের উপর পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল। এ আদিবাসী নারীদের অনেকেই বিউটিপার্লারে বা বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মী বা সহায়তাকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, যাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কর্মহীন, অনিশ্চিত অসহায়তায় নিপতিত হয়েছে। কোভিড-১৯ এর কারণে অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও বিভিন্নমূখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে আদিবাসীরা। আদিবাসীদের জীবনজীবিকার উপর কোভিড-১৯ মহামারির বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব বিবেচনায় রেখে জাতিসংঘ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব আদিবাসী দিবসের মূলসুর নির্বাচন করে ‘‘COVID-19 and Indigenous Peoples’ Resilience” বা “কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম”। বাংলাদেশ, তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবসীরা কোভিড-১৯ মহামারির দ্বারা কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রভাবিত তা চিহ্নিতকরণ, সমস্যাসমূহ মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের সমাবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকায় কিছুটা হতাশ যুব সমাজ নিজ নিজ এলাকায় থেকে প্রতিনিয়তই আদিবাসীদের নানারকম জীবন-যুদ্ধ ও বঞ্চনার সাক্ষী হচ্ছে। এ অনাকাঙ্খিত অবসর সময়ের যথাযথ ব্যবহার দ্বারা, ছাত্র-যুবদের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতা প্রসূত পর্যবেক্ষণ কোভিড-১৯ মহামারি ও আদিবাসী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে কালের প্রয়োজনে। সেই উপলব্ধি আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় মহামারি প্রভাবিত ৯ আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দ বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে উপলক্ষ করে কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল এর আলোক প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী যুবক-যুবতীদের জন্য প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতা ও প্রবন্ধ সংকলনের আয়োজন করার।

এ বিশেষ প্রবন্ধ সংকলনে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যুবক-যুবতীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সত্যি অনুপ্রেরনাদায়ক। ঐতিহাসিক এই মহামারী আদিবাসীদের জীবনজীবিকা, সমাজ-সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে কী প্রভাব ফেলছে, কীভাবে তারা এর মোকাবিলা করছে, এ সকল কঠিন জীবন অভিজ্ঞতার চালচিত্র কালের সাক্ষী হিসেবে উঠে এসেছে এ দশজন যুব প্রতিনিধিদের লেখনিতে। এই বিশেষ চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে এই দশ যুব দর্পনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, সুদূর প্রসারী ভাবনা, সুপারিশ ইত্যাদি আদিবাসীদের উন্নয়নে নানাভাবে কাজে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এই প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ কৃতজ্ঞতা তরুণ লেখকদের প্রতি, যাদের লেখনীতে এই প্রকাশনার সফলতা। শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি বিচারক মণ্ডলীর সদস্য মি. সৃজন রাংসা(সাংমা), মি. মতেন্দ্র মানখিন এবং মি. পরাগ রিছিল-এর প্রতি, যারা তাদের মূল্যবান সময়, শ্রম ও মেধা দিয়ে প্রবন্ধগুলো বিচার-বিশ্লেষণ ও নির্বাচন করেছেন। বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি থকবিরিম প্রকাশনী’কে যারা এই সংকলন প্রকাশে অংশীদার হয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং নির্বাচিত ১০টি প্রবন্ধ তাদের অনলাইন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার জন্য অঙ্গীকার করেছেন। প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটি এবং কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চলের সম্পৃক্ত সকল সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই আয়োজন সফলতা পেয়েছে।

সংকলনটির অনঅভিপ্রেত সকল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।  প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নির্মল, ভালোবাসাময় সবুজ পৃথিবী উপহার দিতে আমাদের সকলের দায়িত¦শীল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। 

অপূর্ব ম্র্রং

আঞ্চলিক পরিচালক, কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল।



কোভিড-১৯ এবং বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী 

জেসি নামনিকা দারু


মহামারি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী:

বিশ্বের অনেক বিজ্ঞানী এবং ভাইরোলজিস্টরা কয়েক দশক ধরে ভবিষ্যদ্বাণী করে আসছিলেন যে আমরা খুব শীঘ্রই একটি বিশ্বব্যাপী ভয়ানক মহামারি অনুভব করতে পারি যা পুরো বিশ্বের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধারাকে বিরূপভাবে ব্যাহত করবে। সেই ভবিষ্যদ্বাণীটি ২০১৯ সালে আরম্ভ হয়ে ২০২০ সালে ভয়ঙ্কর বাস্তবে রূপ নেয়। এই মহামারির কেন্দ্রে আছে একপ্রকার অতিক্ষুদ্র জৈব কণা বা অণুজীব যার আত্ম-প্রজনন ছাড়া অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি আজ সমগ্র বিশ্বজুড়ে সমাজ এবং অর্থনীতিতে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে এবং এখন পর্যন্তও ফেলেই যাচ্ছে। সারা বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীরা এমনিতেই বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন, বৈষম্য এবং অসমতার শিকার হয়ে আসছে। এছাড়াও পৃথিবীর ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা নিজেরা কোনো কিছু না করেই বিভিন্ন সময়ে অন্যদের দ্বারা সংক্রামক ব্যাধিতে সংক্রমিত হচ্ছে যার কারণে তারা বরাবরই মহামারিগুলোর নেতিবাচক ও বিরুপ প্রভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এসকল কারণে এই বছরের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের ভাষণে জাতিসংঘের সেক্রেটারি-জেনারেল আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন যে- “ইতিহাসের সর্বত্র, আদিবাসীরা অন্য কোথাও থেকে আনা রোগ দ্বারা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, যার প্রতিরোধ ক্ষমতা তাদের আদিবাসীদের ছিল না”। তিনি আরোও উল্লেখ করেন যে বিভিন্ন ধরনের অপ্রতুলতা এবং বৈষম্যের মধ্যেও আদিবাসীরা অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা ও সহনশীলতা প্রদর্শন করেছে; আদিবাসীরা তাদের ঐতিহ্যগত এবং চিরাচরিত জ্ঞান ব্যবহার করে বিভিন্ন সমাধান দিয়েছে যা শিক্ষণীয় এবং অনুকরণীয়।

বাংলাদেশের এবং এদেশের আদিবাসীরা:

১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ যার বর্তমান ১৭ কোটি জনসংখ্যার ১.৮% হল বিভিন্ন আদিবাসী। আই ডব্লিউ জি আই এর মতে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে মোট আদিবাসীদের সংখ্যা ১৫,৮৬,১৪১ (২০১১ সালের বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো মোতাবেক) কিন্তু অনেকেই দাবি করে থাকে যে এদেশে আদিবাসীদের জনসংখ্যা প্রায় ৫০ লাখে দাঁড়িয়েছে। এ সকল আদিবাসীরা ৫৪টি বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত; এদের সকলেরই রয়েছে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি। এছাড়াও তাদের শারীরিক গঠন এবং মুখের গঠন বাংলাদেশের মূল ধারার জনগোষ্ঠীদের থেকে ভিন্ন। বাংলাদেশের আদিবাসীদের বেশিরভাগ অংশ দেশের সমতলের বিভিন্ন জেলাগুলিতে বসবাস করে এবং বাকি আদিবাসীরা পার্বত্য চট্টগ্রামে (সিএইচটি) বসবাস করে। আদিবাসী শব্দটি বাংলা ভাষা-ভাষীরা, যারা বাংলাদেশের প্রধান নৃ-ভাষাতাত্ত্বিক গোষ্ঠী তারা, সাধারণত পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সমতলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীদের বোঝাতে ব্যবহার করত যদিও বর্তমানে এই শব্দটি এখন সিএইচটি-র আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোকে বোঝাতেও ব্যবহৃত হয় (পাহাড়ি অঞ্চলে থাকার কারণে তাদেরকে পূর্বে “পাহাড়ি” হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো)। এই ভিন্নতা এবং সংখ্যালঘুতা অনেক ক্ষেত্রেই আদিবাসীদের বিভিন্ন ধরনের অসমতা এবং বৈষম্যের শিকার করে তোলে। এখন পর্যন্তও এদেশের সরকার আদিবাসীদের “আদিবাসী” হিসাবে স্বীকৃতি দেয় না। ২০১১ সালে গৃহীত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর থেকে এখন বাঙালি জনগোষ্ঠীর বাইরে আদিবাসীরা আলাদা আলাদা জাতিগত পরিচয় পেয়েছে কিন্তু তা নিজস্ব জাতিগত সত্তা “আদিবাসী” হিসেবে নয়, “ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী” হিসেবে।

সমতলের আদিবাসীরা কেমন আছে এই মহামারিকালে?

সমভূমিগুলির বা সমতলের বেশিরভাগ আদিবাসী সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থান, বিশেষত উত্তর-পশ্চিম এর রাজশাহী প্রশাসনিক বিভাগগুলিতে যারা থাকে তাদের অবস্থা সাধারণত সিএইচটি-তে বসবাসকারী আদিবাসী সম্প্রদায়ের চেয়ে আরও খারাপ- এর মূল কারণ বৈরি প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং মৌলিক চাহিদা পূরণের প্রবেশদ্বার বন্ধ থাকা। বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসীদের অবস্থা সেই তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও তাদের অনেকেই এই দুর্যোগকালীন সময়ে অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসীদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে কৃষিকাজের সাথে জড়িত। বেশিরভাগ আদিবাসী কৃষিকাজে জড়িত পরিবারের নিজস্ব জমি বা রেজিস্টার্ড জমি নেই; তারা সরকারি খাস জমিতে অথবা গ্রামের অন্য বিত্তশালিদের জমিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। অনেকে আবার শহরে বিভিন্ন ধরনের খন্ডকালীন নৈমিত্তিক কাজ যেমন- বিউটি পার্লারে কাজ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ড্রাইভার, বিভিন্ন বিদেশিদের বাসায় বাবুর্চি, শিশুপালনকারিণী, আয়া প্রভৃতি কাজ, বিভিন্ন স্থানীয় ছোট কোম্পানিতে চাকরি ইত্যাদি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এসকল কাজ খন্ডকালীন হওয়ায় অনেকেই কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধা পান না।

এই মহামারিকালে সারা বিশ্ব এবং এই দেশ জুড়ে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে অনেকেই নিজেদের কাজ হারিয়েছে। খ-কালীন কাজ হবার কারণে অনেক আদিবাসী তাদের কর্মস্থল থেকে ছাটাই হয়েছেন যার ফলে পুরো পরিবার নিয়ে অথবা একা আবার তাদের গ্রামে ফিরে যেতে হয়েছে।

এমনিতেই এই মহামারিতে গ্রামে কৃষিকাজে অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে; মহামারিতে দেশের আমদানি-রপ্তানি কাজ ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে, সারা দেশে বিভিন্ন নিত্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্যের আকাশচুম্বি দাম বেড়েছে, অনেক আদিবাসী কৃষক তাদের কৃষিজ এবং অন্যান্য কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এরি মধ্যে শহর থেকে ফেরত আসা বাঙালি ও আদিবাসী জনগণ গ্রামের বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দিয়েছে।

যেহেতু গ্রামের এই সকল কৃষিকাজে নির্ভরশীল আদিবাসীরা অন্যান্য কাজে অদক্ষ, এই বাড়তি জনগণের চাপ তাদেরকে জীবন ও জীবিকায় বিরুপ প্রভাবের সৃষ্টি করেছে। এবছরের বৈরি আবহাওয়ার কারণে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে এবং এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় আমাদের আদিবাসী কৃষকদের উপর নেতিবাচক প্রভাবের সৃষ্টি করেছে।

অনেক আদিবাসী মা বাবা তাদের ছেলে মেয়েদেরকে ভালো শিক্ষা অর্জনের জন্যে শহরের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে থাকে। আবার এই সকল শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই বিভিন্ন হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে। করোনার সময় এই সকল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এতে করে যারা স্কুলে পড়ে তাদের বিদ্যালয়-সংক্রান্ত কাজ স্থগিত হয়েছে। কিন্তু যারা কলেজে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে তাদের বেশিরভাগই নিজেই নিজের খরচ বহন করে থাকে বিভিন্ন খন্ডকালীন কাজ যেমন-ছাত্র-ছাত্রী পড়ান, বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করে, ডেলিভারিম্যান ইত্যাদি।

করোনার কারণে তাদের নিজস্ব আয় এবং তাদের পরিবারের আয় কমে বা একদম শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই তাদের হোস্টেল ছেড়ে আবার গ্রামে ফেরত চলে গিয়েছে। এতে করে অনেকের ভবিশ্যত অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইন ভিত্তিক ভার্চুয়াল ক্লাস নিলেও ল্যাপটপ অথবা ভালো মোবাইল না থাকায়, গ্রামে ভালো ইন্টারনেট সুবিধা না থাকায় এবং ইন্টারনেট অনেক ব্যায়বহুল হওয়ায় অনেক আদিবাসী ছাত্রছাত্রী এ সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অনেকেই আবার অনলাইন ভিত্তিক বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফর্ম, বিভিন্ন চাকরির ফর্ম পূরণ করতে পারছে না।

অনেক আদিবাসীরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করে; যে সকল স্থান থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরিষেবা অভিগমন করা কঠিন। বাঙালিদের তুলনায়, আদিবাসীদের স্বাস্থ্যসেবা এবং স্যানিটেশন-এর প্রবেশাধিকার অনেক বাধা রয়েছে; যারা শহরে থাকে তারা অধিকাংশ সময়ে অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তার কারণে একসাথে শহরের বিভিন্ন স্বল্প আয়ের অঞ্চলে বাসা নিয়ে ঘিঞ্জি জনাকীর্ণ আবাসনগুলিতে বাস করে। এ কারণে তারা দরকারি বিভিন্ন পরিষেবা গ্রহণ করতে পারছে না।

এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা থেকে পূর্বে সহায়তা পেলেও মহামারির সময়ে সাহায্য পাচ্ছে না আদিবাসীদের অনেকেই; সেইজন্যে আদিবাসীদের অনেকেই করোনা সম্পর্কে ভাসাভাসা জানলেও সম্পূর্ণভাবে এই রোগ সম্পর্কে তারা অবগত না। এদেশের আদিবাসীরা প্রতিটি পদে পদে বিভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক প্রান্তিককরণের এবং বৈষম্যের অভিজ্ঞতা অর্জন করে; তারা জরুরি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের জনস্বাস্থ্য মূলক ঝুঁকিতে আছে। যেহেতু তাদের ক্ষেত্রে কার্যকর পর্যবেক্ষণ এবং প্রারম্ভিক সতর্কতা সিস্টেমের অভাব রয়েছে, এই মহামারি কালে তারা আরও বেশি ঝুঁকিতে আছে।

যেহেতু অনেক দেশেই লকডাউনগুলি অব্যাহত রয়েছে এবং এসকল লকডাউনের সময়সীমা অজানা, আদিবাসীরা যারা ইতিমধ্যে তাদের ঐতিহ্যবাহী জমি এবং কৃষি ভূমি হারিয়েছে তারা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হচ্ছে। তাদের প্রচলিত ভূমিভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকা নষ্ট হওয়ার সাথে সাথে প্রচুর আদিবাসীরা যারা ঐতিহ্যবাহী পেশা ও জীবিকা নির্বাহের অর্থনীতিতে বা অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কাজ করেন তারা মহামারির দ্বারা বিরূপ প্রভাব অনুভব করছে।

আদিবাসী মহিলাদের অবস্থা, যারা প্রায়শই তাদের পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করে, তাদের অবস্থা আরও মারাত্মক। কারণ তাদেরকে নিজেদের ছাড়াও সম্পূর্ণ পরিবারের দেখভালের দায়িত্ব নিতে হয় এবং এই মহামারিতে তাদের কাজের চাপ অনেক বেড়ে গিয়েছে। যেসকল আদিবাসীরা শহরে থেকে গিয়েছে তারাও কম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে না, যেহেতু চীন থেকে এই ভাইরাসের উৎপত্তি এবং অধিকাংশ আদিবাসীরা মঙ্গোলয়েড ফেসিয়াল স্ট্রাকচারের অধিকারী, চলতে ফিরতে তাদের অনেক সময়ই বিভিন্ন বিরুপ বর্ণবাদী নিন্দা ও কটাক্ষ [ঐ দেখ করোনা ভাইরাস যাচ্ছে, করোনা ভাইরাস (এবং সাথে কাশি) ইত্যাদি] শুনতে হয়েছে এবং হচ্ছে।

মুদ্রার অপর পিঠ:

অন্যদিকে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী বাড়লেও যেহেতু এই ভাইরাসটি একেবারে নতুন এবং দিনকে দিন বিবর্তিত হচ্ছে, সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে এর সংক্রমণের হার, আদিবাসীদের উপর কোন ধরনের জেনেটিক নেতিবাচক প্রভাব ইত্যাদি সম্পর্কিত সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য নেই। বিভিন্ন জনের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও কাউকে গুরুতর ভাবে প্রভাবিত করার ঘটনা শোনা যায়নি, মৃত্যু হারও অনেক কম। এই কারণে ধারণা করা যেতে পারে যে বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসীদের জীবনধারা এবং খাদ্যাভ্যাস তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে। যেহেতু এখন টেলিভিশন সহজলভ্য এবং গ্রামেও অধিকাংশ বাড়িতে টেলিভিশন রয়েছে, গ্রামের অনেকেই খবর শুনে নিজেরা নিজেরা বিভিন্ন স্থানে হাত ধোওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বাসায় কেউ আসলেই প্রথমেই সাবান দিয়ে হাত মুখ ধোওয়ার ব্যবস্থা রেখেছে।

যেসকল আদিবাসীরা তাদের খন্ডকালিন কাজ ছাড়াও নিজস্ব উদ্যোগ এবং ছোট ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেছিল তারা কিছুটা হলেও অর্থনৈতিকভাবে ভালো অবস্থায় থেকেছে। এছারাও যেসকল আদিবাসী পরিবার আগে থেকেই তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ভালভাবে করেছে তারাও অন্যদের থেকে কম নেতিবাচক প্রভাবের সম্মুখিন হয়েছে। অনেকেই অনলাইন ও ভার্চুয়াল ব্যবসা অনেক ভালভাবে গড়ে নিয়েছে, যে সকল ছাত্রছাত্রী গ্রামে চলে গিয়েছে তারা নিজে থেকে বিভিন্ন কৃষিজ পণ্য চাষ করে আবার নিজের এবং গ্রামের অন্যান্য কৃষকদের পণ্য সংগ্রহ করে তা শহরে অনলাইন দোকানে সরবরাহ এবং বিক্রি করছে।

প্রকৃতির সাথে আদিবাসীদের নিবিড় সম্পর্ক ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা, আদিবাসী প্রবীণদের জীবন ও জীবিকা সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ, নবীনদের কারিগরি দক্ষতা বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসীদেরকে আইসলেশন (বিচ্ছিন্নতা) পদ্ধতিগুলি সুষ্ঠুভাবে অনুসরণ করতে এবং প্রায়শই অবহেলিত স্থানীয় জীবিকা এবং স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় ফিরে যেতে সহায়তা করেছে।

এই সকল অভিজ্ঞতা থেকে এইটা বোঝা যাচ্ছে যে-

১।      বিভিন্ন আদিবাসীদের মধ্যে মহামারির প্রভাবগুলি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়। কিছু কিছু আদিবাসীরা যারা নিজেদেরকে সময়ের চাহিদার সাথে মানিয়ে নিতে পারে নাই তারা বেশি নেতিবাচক প্রভাবের সম্মুখিন হয়েছে আবার অনেকেই নিজেদের অভিযোজনযোগ্যতা কাজে লাগিয়ে মহামারিসৃষ্ট অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে।

২।      মহামারির প্রভাবগুলির একটি দৃশ্যমান ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যেকিছু কিছু ক্ষেত্রে লিঙ্গ ভেদে বৈষম্য বেড়েছে। কিছু এলাকাতে কিশোরীদের এবং মহামারির কারণে কর্মসংস্থান না থাকায় অপরিকল্পিত গর্ভধারণের প্রবণতা বৃদ্ধি করেছে, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে অনেক পরিবারে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পরিবারের মেয়েদের পড়াশোনা স্থায়ীভাবে বিঘিœত হতে পারে। এসকল ঘটনা যদিওবা বিভিন্ন এলাকাভেদে এবং পরিবারভেদে তারতম্য রয়েছে তথাপি লিঙ্গ সমতার দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন;

৩।     মহামারিটি কিছু ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মহামারির কারণে আদিবাসীদের প্রতি বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক বক্তৃতা, বর্ণবাদ বা হিং¯্রতার সৃষ্টি হতে পারে এবং একারণে আদিবাসীদের পক্ষে সমর্থন, শক্তিশালী নজরদারি এবং বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন।

আমাদের করণীয়:

আদিবাসীদের এখন থেকে শুধু পুঁথিগত বিদ্যার সাথে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিকাশে মনোযোগ দিতে হবে। তাদের ঐতিহ্যগত  জীবনধারাকে বুঝার চেষ্টা করতে হবে যাাতে করে তারা পুরাতন এবং নতুনের মিশেলে প্রকৃতির ক্ষতি না করে বিভিন্ন ধরনের টেকসই পদ্ধতি অবলম্বন করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না যে কোভিড-১৯ পরবর্তী জীবন আমাদের কেমন হবে; আমরা এও বলতে পারি না যে এটি বিশ্বের সর্বশেষ সার্বজনীন ধাক্কা হবে। আমরা এটিও জোরালো ভাবে বলতে পারি না যে আমরা ‘স্বাভাবিক’ কখন হব অথবা আদৌ হব কিনা, কোভিড-১৯ পূর্ববর্তী জীবনে আমরা ফিরে যেতে পারব এই লক্ষ্যও আমরা ঠিক করতে পারছি না এই মুহূর্তে। আমরা বলতে পারি না এটি আমাদের জীবদ্দশার শেষ মহামারি। আমরা যা বলতে পারি তা হল কোভিড-১৯ মহামারিটি মানুষ, প্রকৃতি এবং অর্থনীতির মধ্যে বিরাজমান জটিল আন্তঃসম্পর্ক সম্পর্কে আমাদের সকল সচেতনতা জোরদার করেছে।

আদিবাসীরা অনেক সময় ধরেই সোচ্চার ছিল টেকসই ব্যবস্থা, প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, এবং জীবনযাত্রার এমন একটি মডেল পালন করা যা কম ভোগ করা এবং বেশি করে সামাজিক ও পরিবেশগত সংহতি বজায় রাখে। আমাদের আদিবাসীদের এই বার্তাটি বিভিন্ন মহলে এবং বিশেষ ভাবে তরুণ প্রজন্মের দ্বারা প্রকাশ করা হচ্ছে।

একই সাথে, আদিবাসীরা এই মহামারি তাদের কে যে চ্যালেঞ্জগুলি প্রদর্শন করেছে তার সমাধান খুঁজতে তাদের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের ও অভিজ্ঞতার ব্যবহার করে চলেছে। এছাড়াও বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারা যে অভিযোজন ক্ষমতার প্রদর্শন করেছে তা তারা শতাব্দীকাল ধরে বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে করে এসেছে এবং করে যাচ্ছে।

এই মহামারিটি জলবায়ু পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্য হ্রাস সম্পর্কিত ভয়াবহতা তুলে ধরা ছাড়াও সারা বিশ্বের দরবারে জানান দেয় যে কাউকে বিশেষ করে কোন জনগোষ্ঠীকে পিছনে ফেলে কখনই ভালো কিছু করা যায় না।



লেখক পরিচিতি:

তরুণ লেখক জেসি নামনিকা দারু বর্তমানে ঢাকার মিরপুরে অবস্থান করছেন। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন। 



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost