Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রামে বহুমুখী সমস্যার উদ্ভব ও উত্তরণে সম্ভাব্য করণীয়সমূহ ।। মিঠুন কুমার কোচ

প্রকাশিত : জুলাই ২৭, ২০২১, ২৩:০১

কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রামে বহুমুখী সমস্যার উদ্ভব ও উত্তরণে সম্ভাব্য করণীয়সমূহ ।। মিঠুন কুমার কোচ

পটভূমি

এই প্রকাশনাটি মূলত আদিবাসী তরুণ লেখকদের প্রবন্ধের একটি সংকলন। করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারি হেতু লকডাউন সময়কালীন ২০২০ খ্রিস্টাব্দের বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের সময় দিবসের মূলসুরকে (কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম) ভিত্তি করে যে প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল, সেই প্রয়াসেরই ফসল এই প্রকাশনা। কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল কর্তৃক আয়োজিত এই প্রতিযোগিতাটিতে মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী ছাত্র-যুবদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছিল। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী মোট ১৩ জন যুবক-যুবতীদের মাঝ থেকে ৩ সদস্য (আদিবাসী) বিশিষ্ট বিচারক মণ্ডলীর দ্বারা নির্বাচিত ১০ শাণিত দর্পণ যুবক-যুবতীদের প্রবন্ধ নিয়ে করা হয়েছে এ বিশেষ প্রবন্ধ সংকলন। কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণ ও জীবন-মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে শিক্ষা, কৃষ্টি-সংস্কৃতির উন্নয়ন, সচেতনতা, সক্ষমতা ও নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনসংগঠন সমূহ শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহে আবহমানকাল থেকে বসবাসরত ৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক অবস্থা বিভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং বঞ্চনার প্রভাবে তুলনামূলক নাজুক। বৈশ্বিক মহামারি এ প্রেক্ষাপটে যেন মরার উপর খরার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুগে যুগে নানারকম বঞ্চনার শিকার হয়ে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দরিদ্র আদিবাসীদের জীবন-জীবিকাকে চরমভাবে প্রভাবিত করেছে কোভিড-১৯ মহামারি। আদিবাসীদের প্রচলিত ভূমি ভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকা পরিবর্তন হওয়ার ফলে অনেক আদিবাসী জীবিকা নির্বাহে অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে বা কর্মক্ষেত্র সমূহের উপর নির্ভরশীল, যারা এই মহামারি দ্বারা বিরূপভাবে প্রভাবিত হয়েছে। কর্মহীন হয়ে পড়া আদিবাসী নারীদের অবস্থা সবচেয়ে বেশি নাজুক, যাদের উপর পুরো পরিবার নির্ভরশীল ছিল। এ আদিবাসী নারীদের অনেকেই বিউটিপার্লারে বা বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে গৃহকর্মী বা সহায়তাকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, যাদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ কর্মহীন, অনিশ্চিত অসহায়তায় নিপতিত হয়েছে। কোভিড-১৯ এর কারণে অর্থনৈতিক সমস্যা ছাড়াও বিভিন্নমূখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে আদিবাসীরা। আদিবাসীদের জীবনজীবিকার উপর কোভিড-১৯ মহামারির বহুমাত্রিক বিরূপ প্রভাব বিবেচনায় রেখে জাতিসংঘ ২০২০ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব আদিবাসী দিবসের মূলসুর নির্বাচন করে ‘‘COVID-19 and Indigenous Peoples’ Resilience” বা “কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবনজীবিকার সংগ্রাম”। বাংলাদেশ, তথা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবসীরা কোভিড-১৯ মহামারির দ্বারা কতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রভাবিত তা চিহ্নিতকরণ, সমস্যাসমূহ মোকাবিলার ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের সমাবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বন্ধ থাকায় কিছুটা হতাশ যুব সমাজ নিজ নিজ এলাকায় থেকে প্রতিনিয়তই আদিবাসীদের নানারকম জীবন-যুদ্ধ ও বঞ্চনার সাক্ষী হচ্ছে। এ অনাকাঙ্খিত অবসর সময়ের যথাযথ ব্যবহার দ্বারা, ছাত্র-যুবদের স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীলতা প্রসূত পর্যবেক্ষণ কোভিড-১৯ মহামারি ও আদিবাসী জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে কালের প্রয়োজনে। সেই উপলব্ধি আমাদের অনুপ্রেরণা দেয় মহামারি প্রভাবিত ৯ আগস্ট ২০২০ খ্রিস্টাব্দ বিশ্ব আদিবাসী দিবসকে উপলক্ষ করে কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল এর আলোক প্রকল্পের ব্যবস্থাপনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আদিবাসী যুবক-যুবতীদের জন্য প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতা ও প্রবন্ধ সংকলনের আয়োজন করার।

এ বিশেষ প্রবন্ধ সংকলনে বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যুবক-যুবতীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সত্যি অনুপ্রেরনাদায়ক। ঐতিহাসিক এই মহামারী আদিবাসীদের জীবনজীবিকা, সমাজ-সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদিতে কী প্রভাব ফেলছে, কীভাবে তারা এর মোকাবিলা করছে, এ সকল কঠিন জীবন অভিজ্ঞতার চালচিত্র কালের সাক্ষী হিসেবে উঠে এসেছে এ দশজন যুব প্রতিনিধিদের লেখনিতে। এই বিশেষ চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে এই দশ যুব দর্পনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি, সুদূর প্রসারী ভাবনা, সুপারিশ ইত্যাদি আদিবাসীদের উন্নয়নে নানাভাবে কাজে আসবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

এই প্রকাশনার কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বিশেষ কৃতজ্ঞতা তরুণ লেখকদের প্রতি, যাদের লেখনীতে এই প্রকাশনার সফলতা। শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি বিচারক মণ্ডলীর সদস্য মি. সৃজন রাংসা(সাংমা), মি. মতেন্দ্র মানখিন এবং মি. পরাগ রিছিল-এর প্রতি, যারা তাদের মূল্যবান সময়, শ্রম ও মেধা দিয়ে প্রবন্ধগুলো বিচার-বিশ্লেষণ ও নির্বাচন করেছেন। বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি থকবিরিম প্রকাশনী’কে যারা এই সংকলন প্রকাশে অংশীদার হয়ে সহযোগিতা করেছেন এবং নির্বাচিত ১০টি প্রবন্ধ তাদের অনলাইন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করার জন্য অঙ্গীকার করেছেন। প্রতিযোগিতার আয়োজক কমিটি এবং কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চলের সম্পৃক্ত সকল সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই আয়োজন সফলতা পেয়েছে।

সংকলনটির অনঅভিপ্রেত সকল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানাচ্ছি।  প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, নির্মল, ভালোবাসাময় সবুজ পৃথিবী উপহার দিতে আমাদের সকলের দায়িত¦শীল প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক। 

অপূর্ব ম্র্রং

আঞ্চলিক পরিচালক, কারিতাস ময়মনসিংহ অঞ্চল।



কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রামে বহুমুখী সমস্যার উদ্ভব ও উত্তরণে সম্ভাব্য করণীয়সমূহ

মিঠুন কুমার কোচ

কোভিড-১৯ মহামারি গোটা বিশ্বে এক অভাবনীয় পরিবর্তন সূচিত করেছে এবং নিঃসন্দেহে একবিংশ শতাব্দীতে একটি সুদূরপ্রসারী প্রভাব রাখতে চলেছে। বিজ্ঞানের চমকপ্রদ অগ্রগতি আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বদৌলতে বিশ্ব যখন এগিয়ে যাচ্ছিল দুর্বার গতিতে, ঠিক তখনি কোভিড-১৯ নামক এক ভাইরাসের অশুভ আবির্ভাব, তারপর মানবসভ্যতা চমকে উঠে থমকে যাওয়া। সম্মুখে ধাবমান, অবিরাম ছুটে চলা মানব সভ্যতার লাগাম টেনে ধরল এই নভেল করোনা ভাইরাস। আর তাতে স্থবির হয়ে গেল মানুষের জীবন-জীবিকা, অকস্মাৎ ওলট-পালট ঘটে গেল কোটি কোটি মানুষের জীবনে। আমূল পরিবর্তন ঘটতে শুরু করল পৃথিবীর পরিবেশ ও মানুষের জীবন-যাপন পদ্ধতিতে, যার শুরুটা হয়েছিল সুদূর চীনে, তবে এর শেষ কোথায় তা এখনো কেউ জানে না। আদিবাসীরাও যেহেতু পৃথিবী নামক এই অভিন্ন গ্রহেরই বাসিন্দা, অতএব তারাও করোনার করালগ্রাস থেকে মুক্ত থাকে কী করে? তবে কোভিড-১৯ বাংলাদেশের আদিবাসীদের ঠিক জীবনহানিতে নয়, জীবিকায় বেশি ক্ষতিসাধন করেছে বলে দৃশ্যমান। প্রকৃতির সাথে আদিবাসীদের জন্মান্তরের নিবিড় ও প্রগাঢ় সম্পর্ক, স্বাস্থ্যকর জীবন-যাপন পদ্ধতি এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধে নানাধরনের কার্যকর ঐতিহ্যবাহী প্রথার কারণে কোভিড-১৯ এর ভয়াল থাবা তাদের জীবনহানি খুব বেশি ঘটাতে পারেনি। কিন্তু জীবিকার বিষয়টি গোটা বিশ্ব বা দেশের অর্থনীতির সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত বিধায় তারাও এর নেতিবাচক বলয় থেকে দূরে থাকতে পারেনি।

আদিবাসীদের জীবনে করোনার সার্বিক প্রভাব :

আদিবাসীদের জীবনে করোনার প্রভাব কতটুকু? এককথায় এর উত্তর দেওয়া কঠিন, সমীচীনও নয়; কারণ আদিবাসীদের জীবনে কোভিড-১৯ এর প্রভাব বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী। আদিবাসীদের ক্ষেত্রে প্রথমে কোভিড-১৯ এর ইতিবাচক কিছু ব্যাপারে দৃষ্টিপাত করা যাক সঙ্গত কারণেই।

কোভিড-১৯ মহামারিতে আদিবাসীদের স্বল্প মৃত্যুহার :

কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে খুব কম সংখ্যক আদিবাসী মৃত্যুবরণ করেছে বলে জানা যায়, আর আদিবাসীদের মধ্যে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ার হারও খুব কম যা আদিবাসীদের জীবন-যাপন পদ্ধতির স্বাস্থ্যকর ও কার্যকর দিককেই নির্দেশ করে। চলতি বছর গত ১১ই মে বিরোদ নিকোলাস চিরান নামে প্রথম এক প্রবাসী গারো আদিবাসী কোভিড-১৯ পজেটিভ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন (সূত্র: ডিসি নিউজ) কোভিড-১৯ এর উপসর্গ নিয়ে কিছু আদিবাসী মারা গেলেও ঠিক কতজন মারা গেছেন সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যায়নি, তবে সংখ্যাটি খুব বেশি হবে না। বৃহত্তর ময়মনসিংহে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে কোভিড-১৯ এ গোষ্ঠী সংক্রমণের কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। শেরপুর জেলায় বর্তমানে বসবাসরত কোচ আদিবাসীদের কারোরই কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়নি এখন পর্যন্ত। শুধু তাই নয়, সমতল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের কোন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যেই আশঙ্কাজনক হারে কোভিড-১৯ গোষ্ঠি সংক্রমণ ঘটেনি। আদিবাসীদের ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ কম ঘটার পেছনে কোন অলৌকিক কারণ নেই, তবে রয়েছে জীবনাচরণ ও লৌকিকতায় ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্য যা তাদের মহামারি ও সংক্রামক ব্যাধি থেকে রাখে অনেকটাই নিরাপদ।

মহামারি সামালে আদিবাসী প্রথা :

বাংলাদেশের বিভিন্ন আদিবাসীরা কীভাবে মহামারি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সেগুলো উঠে আসছে। লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ ‘কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা’ শীর্ষক শিরোনামে আদিবাসীদের মহামারি প্রতিরোধের তেমনি কিছু প্রথা পদ্ধতি থকবিরিম নিউজ পত্রিকায় তুলে ধরেছেন। প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় নিয়ে তা উল্লেখ করা হলো-

“মহামারি সামালে তিনটি বিষয় মেনে চলার বিধান রাখাইনদের ভেতর আদি থেকেই চল ছিল। লকডাউন-সঙ্গনিরোধ-সাময়িক বিচ্ছিন্নতা বিষয়ক স্বাস্থ্যবিধি পালন, বিশেষ খাদ্যাভাস এবং সামাজিক কৃত্য-রীতি আয়োজন। অসুখ ও মহামারি থেকে বাঁচতে রাখাইনরা সামাজিকভাবে ‘চোয়াইসেন মা এম্প্যা’ পূজা আয়োজন করেন। এ সময় পাড়ায় মানুষের প্রবেশ ও যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে পাড়ায় প্রতিটি বাড়ি কার্পাস তুলোর সূতা দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় এবং পূজার মঙ্গল পানি ছিটিয়ে পরিচ্ছন্ন করা হয়। এভাবে মহামারি সামাল দিতে রাখাইনরা ‘প্রারাই এরা’ বিধির মাধ্যমে মহামারি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুদিনের জন্য পাড়া বন্ধ করে দেন। কঠিন অসুখ ও মহামারিতে কেউ মারা গেলে বা গ্রামের বাইরে কেউ মারা গেলে রাখাইনদের ভেতর সেই মৃত ব্যক্তির সৎকারে কঠিন সামাজিক বিধি পালিত হয়।

প্রতিটি রাখাইন পাড়ায় দু ধরনের ত্যান্সায় বা শ্মশান থাকে। এনঙ্গাদু ত্যান্সায় বা অতিথি শশ্মান এবং রওয়া ত্যান্সায় বা পাড়ার শ্মশান। রোগের সংক্রমণ ও মহামারিতে মৃতদের সৎকার থেকেই এই বিশেষ স্থাপনার চল হয়েছে। কোনো ব্যক্তি যদি পাড়া বা গ্রামের বাইরে মারা যান তবে মৃতদেহকে গ্রামের বাইরে শ্মশান বা বিহার থেকে নিরাপদ দূরত্বে তৈরি অস্থায়ী ঘরে সৎকারের আগ পর্যন্ত রাখা হয়। শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মৃতদেহকে ‘এনঙ্গাদু ত্যান্সায়’ শ্মশানে সৎকার করা হয়। মৃতের ব্যবহৃত বস্ত্র, কাপড় ও তার স্পর্শে আসা সকলকিছু পুড়িয়ে ফেলা হয়।

গ্রামের বাইরে বা রোগের সংক্রমণে মৃতদের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের ঘরে ফেরার আগে গ্রামের বাইরের পুকুরে ভালো করে স্নান করতে হয়। ঘরের সামনে হলুদ মেশানো পানি এবং আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়। হলুদ-পানিতে হাত-পা ধুয়ে এবং আগুনে সেঁকে তারপর ঘরে প্রবেশ করতে হয়।” তথ্যসূত্র: গবেষক পাভেল পার্থ, কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা (প্রকাশ-১২ই আগস্ট, ২০২০, থকবিরিম.কম)।

প্রায় সকল আদিবাসী সমাজেই এরকম সঙ্গনিরোধ বা লকডাউন প্রথা রয়েছে মহামারি প্রতিরোধের জন্যে। কোচ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও রোগব্যাধি থেকে দূরে থাকতে নানা ধরনের প্রথা অনুসরণ করা হয়। কোন বাড়িতে কেউ কোন রোগে মারা গেলে মৃত ব্যক্তির দেহ আলাদা স্থানে রাখা হয়। শ্মশানে মৃতদেহ অগ্নিতে দাহ করা হয়, সাথে মৃত ব্যক্তির ব্যবহৃত সমস্ত পোশাক ও দ্রব্যাদি চিতার আগুনে সাথে সাথে পুড়িয়ে ফেলা হয়। শবদাহ করার কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তিগণ স্নান করার আগে ঘরে প্রবেশ করতে পারেন না, খাওয়া-দাওয়াও করতে পারেন না। কারো সংস্পর্শেও যান না, স্নান করার আগ পর্যন্ত। এতে সেই ব্যক্তি ও আশেপাশের সকলেই মৃত ব্যক্তি থেকে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়া থেকে নিরাপদ থাকেন। সাধারণভাবে কেউ ঘরের বাইরে কোথাও গেলে ফিরে আসার পর হাত, মুখ ভালোভাবে ধুয়ে গৃহে প্রবেশ করেন। বাড়িতে কোন অতিথি আসলেও প্রথমে তাদের হাত-পা ধোয়ার জন্যে জল, সাবান দেওয়া হয় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হবার জন্যে। বিয়ের সময় বর-কনে ও অতিথি এলে তাদের বিয়ে বাড়িতে ঢোকার আগে হাত-পা ধুয়ে পরিষ্কার করতে হয়। কোচদের ঘর-বাড়িও সর্বদা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে দেখা যায়। এইসব প্রথাগুলো শুধু কোভিড-১৯ নয়, যে কোন সংক্রামক রোগব্যাধি থেকে কোচদের দূরে থাকতে সহায়ক ভূমিকা রাখে বলা যায়।

আদিবাসীদের ভাষায় মহামারি :

প্রাচীনকাল থেকেই আদিবাসীদের নানা রকম দুর্যোগ, মহামারি ও রোগব্যাধির মুখোমুখি হতে হয়েছে। সেই সূত্রে তাদের নিজস্ব ভাষায় মহামারির আলাদা নাম থাকাটাই স্বাভাবিক। আদিবাসীদের ভাষায় মহামারির বিভিন্ন নামগুলো একনজর দেখে নেওয়া যাক-

‘কোনো ভাষায় কোনো শব্দের চল সেই ঘটনার ঐতিহাসিকতা জানান দেয়। করোনাকালে আমরা বাংলায় ‘মহামারি ও অতিমারী’ শব্দগুলোই বেশি শুনেছি। আদিবাসী ভাষাগুলোতেও মহামারি পরিস্থিতিকে বোঝানোর জন্য শব্দ-প্রত্যয় আছে। মান্দি-গারোদের আচিক ভাষায় মহামারি মানে ‘সিগ্রেমা’। কোচ ভাষায় ‘মালাংনি’, খুমি ভাষায় ‘কাংহয়’, ম্রো ভাষায় ‘হয়’, লেঙ্গাম ভাষায় ‘ঙিয়াপখ্লাম, পাংখোয়া ভাষায় ‘রি-পুই’, সাঁওতালি ভাষায় ‘মারাংনাস’, খাসি ও জৈন্তিয়া ভাষায় ‘ইয়াপখ্লাম’, জৈন্তিয়া কড়া ভাষায় ‘দুরদশা’, রবিদাস ভাষায় ‘আকাল গিরালবা’, বম ভাষায় ‘পুলপি’, খিয়াং ভাষায় ‘লগা’, লুসাই ভাষায় ‘হৃ পুই’, পাহাড়িয়া ভাষায় ‘তালহৗরি’ মীতৈ মণিপুরি ভাষায় ‘লাইচ্যৎ’, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় ‘মুর্কি’। এইসব শব্দব্যঞ্জনা কী প্রমাণ করে? জানান দেয় এসকল ভাষাভাষীরা বিগত মহামারি পরিস্থিতিগুলো সামাল দিয়েছেন। তাহলে তাদের নিশ্চয়ই কিছু অভিজ্ঞতা আর বেঁচে থাকবার নিজস্ব কৌশল আছে। কিন্তু করোনা মহামারির শুরু থেকে আমরা সেসবের কি হদিশ করেছি? মর্যাদা বা স্বীকৃতি দিয়েছি? আমরা কেবল তাকিয়ে আছি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আর নানাবিধ বহুজাতিক কোম্পানির দিকে।’ তথ্যসূত্র : লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা (প্রকাশ-১২ ই আগস্ট, ২০২০, থকবিরিম.কম)।

মহামারি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে আদিবাসীরা কিছু বিষয় মেনে চলে। লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থের লেখায় সেগুলোই উঠে এসেছে।

মহামারির বিরুদ্ধে তিন শক্তি-

মহামারি সামালের ক্ষেত্রে আদিবাসী স্বাস্থ্যবিদ্যা তিনটি বিষয়কেই আদিকাল থেকে মান্য করেছে। ১. পরিবার ও পাড়ার সকলে মিলে লকডাউন, বিচ্ছিন্নতা ও সঙ্গনিরোধের নিয়মপালন, ২. বিশেষ কৃত্য ও প্রার্থনা এবং ৩. খাদ্যাভাস ও লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা। বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহরে যখন মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না তখন আদিবাসী গ্রামগুলো কিন্তু এসব বিধি মানছে। তথ্যসূত্র: লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা (প্রকাশ-১২ ই আগস্ট, ২০২০, থকবিরিম.কম)।

আদিবাসী ভাষাসমূহে লকডাউন :

প্রায় প্রত্যেক আদিবাসীদের মধ্যেই মহামারি ও রোগবালাই সামাল দিতে একসময় নিজস্ব পদ্ধতিতে লকডাউন প্রথা অনুসরণ করার কথা জানা যায়। কোভিড-১৯ মহামারিতে যার প্রয়োগ দেখা গেছে বিভিন্ন আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। তাদের নিজস্ব ভাষায় লকডাউন শব্দের উপস্থিতি সেটাই প্রমাণ করে। বিভিন্ন ভাষায় গ্রামবন্ধের (লকডাউন) নাম তথ্যসূত্রসহ উল্লেখ করা হলো-

‘হামারি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে ঘর, পাড়া, রাস্তা, গ্রাম বন্ধ করে দেয়া, সাময়িক বিচ্ছিন্নতা, কোথাও দূরে কিছুদিন চলে যাওয়া, সঙ্গনিরোধ এসব আদিবাসী সমাজের বেশ প্রাচীন পদ্ধতি। লকডাউনের মাধ্যমে গ্রামবন্ধ করাকে বমরা বলে ‘প্লেংখাম’। মান্দিরা ‘সঙ দেংচেংআ’, কোচেরা ‘চিংয়ে হারিকু খাই চিয়ে আ’, খুমিরা ’আভাং আখো’, পাংখোয়ারা ‘খোয়া খার’, চাকমারা ‘আদাম বন গরানা’, ম্রোরা ‘খাং কোয়া’, লেঙামরা ‘খাং চোনং বাই ঙিয়াপখ্লাম’, ত্রিপুরারা ‘কামি নি লামা মুথুকজাক’, সাঁওতালরা ‘আতো কুলুপ’, খাসিরা ‘খাং কারদেপ ছোনং বাহ ইয়াপখ্লা’, কড়ারা ‘বাধ দেয়া’, রবিদাসরা ‘উঘর না যায় পড়ি’, লালেংরা ‘গাওরাখলা আবইল্যা বনসোয়ে’, খিয়াংরা ‘হেনেই’, লুসাইরা ‘খুয়া যারহ’, জৈন্তিয়ারা ‘খাং সোনং’, তঞ্চংগ্যারা ‘পাড়া বন করা’, ওঁরাওরা ‘গাও বাইন্ধ লিবে’, মীতৈ মণিপুরীরা ‘খুন চংনদবা’, মারমারা ‘রোয়া খাং’, কডারা ‘টলা বন্ধ’, কোলরা ‘মাতো টল’ এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীরা বলে ‘গরে ত না নিকুলানি’।’ (তথ্যসূত্র: কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা, গবেষক পাভেল পার্থ, থকবিরিম.কম ১২ই আগস্ট, ২০২০)। নিজস্ব পদ্ধতিতে লকডাউন ও সঙ্গনিরোধ প্রথাগুলোর কার্যকারিতা অতীতেও কাজে লেগেছে, এখনও কাজে লাগছে, তবে বর্তমানে এই প্রথাগুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে পার্থক্যটা এখানেই।

আদিবাসীদের জীবন-জীবিকায় কোভিড-১৯ এর প্রভাব :

কোভিড-১৯ আদিবাসীদের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে যারা শহরে বাস করত তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাবটা বেশি পড়েছে কারণ শহরে যে আদিবাসীরা বাস করে, তাদের অধিকাংশই গার্মেন্টস শিল্প বা বিউটি পার্লারের উপর নির্ভরশীল, যেগুলো কোভিড-১৯ এর কারণে অচলাবস্থায় পতিত হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এই দুই খাতের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের ক্ষেত্রে। গার্মেন্টস শিল্প ও বিউটি পার্লার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এইসব শিল্পের কর্মীদের বেতনও বন্ধ হয়ে যায়। আর বেতন বন্ধ হয়ে গেলে খাদ্যসামগ্রী ক্রয়, বাসাভাড়া, গ্যাসবিল, বিদ্যুৎবিল দিয়ে স্বল্প আয়ের আদিবাসীদের পক্ষে ঢাকা শহরে টিকে থাকা অসম্ভব বিধায় শহরে অভ্যস্ত ও নির্ভরশীল অনেকেই গ্রামে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। যাদের কিছু সঞ্চয় ছিল, সেই সঞ্চয় ভেঙে কিছুদিন শহরে টিকে থাকতে পেরেছিলো, কিন্তু পরবর্তীতে সঞ্চয় ফুরালেই বাধ্য হয়েছে নিজ নিজ এলাকায় চলে আসতে। এদিক থেকে গ্রামে যেসব আদিবাসীরা বাস করে তারা তুলনামূলক কম খারাপ অবস্থার মধ্যে ছিল। প্রথমত, বাসা ভাড়া দেওয়ার ঝামেলা নেই; দ্বিতীয়ত, নিজ জমির উৎপাদিত খাদ্য থাকার জন্যে। তবে, যারা ভূমিহীন এবং দিনমজুর তাদের অবস্থা ছিল শোচনীয় ও দুর্বিষহ। ২৭ আগস্ট, ২০২০, ডেইলি স্টার পত্রিকায় এক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে আইপিডিএস এর জরিপে উঠে এসেছে- সমতলের প্রায় ৬২ শতাংশ আদিবাসীর চরম দারিদ্রসীমায় অবনমন ঘটেছে।

২৯ জুলাই ২০২০ তারিখে ‘মানুষের জন্যে ফাউন্ডেশন’ (এমজেএফ) “প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ করোনাকালে দেয়া সরকারের প্রণোদনা সহায়তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত” শিরোনামে একটি প্রেস রিলিজ প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ করোনাকালে সরকারের দেয়া প্রণোদনা সহায়তা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়েছেন ও তিন পার্বত্য জেলাসহ সমতলের আদিবাসীদের মাত্র ২৫ শতাংশ পরিবার এই সহায়তা পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলা ও সমতলের আদিবাসীদের মাত্র ৪১০০টি উপকারভোগী পরিবার সরকারি সুবিধা পেয়েছেন, যা শতকরা ২৫ শতাংশ। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফের) সহযোগী সংগঠনগুলো তাদের প্রকল্প এলাকা থেকে এই তথ্য দিয়েছেন বলেও প্রেস রিলিজটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই সরকার ও অন্যান্য সংস্থাগুলোকে আদিবাসী এলাকায় খাদ্য ও ত্রাণসহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরো তৎপর হতে হবে।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনে ভিন্নতা :

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এবার ২০২০ সালে আদিবাসী দিবস উদযাপনেও প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে। প্রতিবছর শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্যভাবে আদিবাসী দিবস পালন করলেও এবার ঘরোয়াভাবে অনলাইনে ভার্চুয়াল আদিবাসী দিবস পালন করতে হয়েছে।

কোভিড-১৯ মহামারির কিছু শিক্ষণীয় দিক ও বাস্তবতা :

কোভিড-১৯ যেমন আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে ও করে যাচ্ছে তেমনি কিছু শিক্ষণীয় বার্তাও দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোভিড-১৯ এর মত বিশ্বব্যাপী দুর্যোগে গ্রামের তুলনায় শহুরে অর্থনীতি ও জীবিকার ওপর নির্ভরশীলতা কতটা ভঙ্গুর তা দেখিয়ে দিয়েছে। যারা বছরের পর বছর শহরে কাটিয়ে দিয়েছে যে কোন পরিস্থিতিতে তারাও এবার বাধ্য হয়েছে গ্রামমুখী হয়ে শেকড়ে ফিরে আসতে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতায় যে অরণ্য, তপোবন তথা স্নিগ্ধ, সহজ, সরল, নিরুপদ্রব গ্রামীণ জীবন ফিরে পাবার বাসনা ব্যক্ত করেছিলেন, ঠিক সেই আকুতিরই যেন বাস্তব প্রতিফলন ঘটিয়েছে এই নভেল করোনা ভাইরাস। কবিগুরুর ‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতার একাংশ :

“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,

লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর

হে নব সভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,

দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি,

গ্লানিহীন দিনগুলি, সেই সন্ধ্যাস্নান, …”

শহুরে জীবনের আটপৌরে, কোলাহলমুখর, ব্যস্ততম রুটিন মাফিক জীবনে যারা অভ্যস্ত ছিলেন কোভিড-১৯ যেন কবিগুরুর এই আকুতিতে শহরবাসী আদিবাসীদের সেই অরণ্য ও তপোবনস্বরূপ গ্রামীণ জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে।

আমরা যতই শহুরে জীবনে অভ্যস্ত হই না কেন, নাগরিক জীবনের সাথে নিজেদের যতই মানিয়ে নিই না কেন, শহরকে যতই আপন ভাবি না কেন, আমাদের আদিবাসীদের শেকড় যে গ্রামেই প্রোথিত, আমাদের সর্বশেষ অবলম্বন ও আশ্রয় যে গ্রামই সেটাই যেন নভেল করোনা ভাইরাস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। ঠিক যেন ঘুড়ির মত, যেখানেই ওড়ো, নাটাই তার গ্রামেই। তাছাড়া, শত দুর্যোগ আর অভাবেও গ্রামে থাকে মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই, আর দু’মুঠো অন্নের সংস্থান।

শিল্পনির্ভর অর্থনীতিতে অর্থ মিললেও মানুষের উদরপূর্তির জন্যে যে খাদ্যের প্রয়োজন তার যোগান তো আসে সেই কৃষিখাত থেকে, আরো স্পষ্ট করে বললে গ্রাম থেকেই। এদিক থেকে বলা যায়, শিল্পখাত ছাড়া কৃষিখাত চলতে পারে, কিন্তু কৃষিখাত ছাড়া বাকি সব কিছুই অচল। অতএব, শহরে ঘাঁটি গাড়লেও, আমরা আদিবাসীরা যেন গ্রামের সাথে বন্ধন ছিন্ন না করি, শহরে থিতু হলেও শহরনির্ভর অর্থনীতিতে যেন পুরোপুরি নির্ভরশীলনা হয়ে পড়ি। অন্তত দুঃসময়ের জন্যে হলেও নিজের খাদ্যের যোগানের ব্যাপারে যেন স্বনির্ভর হই, তাতে খাদ্য যোগান ও মূল্যের ক্ষেত্রেও চাপ কমবে। লকডাউনের কারণে যখন শহরে কাজের অভাবে আদিবাসী ও অন্যান্যরা বেকার হয়ে একে একে গ্রামে আসতে শুরু করেছে তখনও গ্রাম এলাকায় কিছু কিছু মৌসুমি কাজ সহজলভ্য ছিল, সব কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও কৃষিকাজ তথা খাদ্য উৎপাদন বন্ধ থাকেনি, বন্ধ রাখা যেতোও না কারণ খাদ্য উৎপাদনের কোন বিকল্প নেই। কৃষি অর্থনীতি কতটা টেকসই ও খাদ্য নিরাপত্তা কতটা অপরিহার্য তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কোভিড-১৯ দুর্যোগকালে তারাই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উতরে গেছে যারা ভবিষ্যতের অনাগত দিনের কথা ভেবে অর্থ সঞ্চয় করেছে, পাশাপাশি খাদ্যের যোগান পেতে কৃষিকাজেও নিজেদের কোন না কোনভাবে সম্পৃক্ত রেখেছে। নভেল করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে যখন সবকিছু অচল, উপার্জনের পথ যখন রুদ্ধ, তখন অন্তত নিজের সঞ্চয়ের টাকা দিয়ে দিনাতিপাত করতে পেরেছে অর্থ সঞ্চয়ীরা। অর্থাৎ, এই শিক্ষাটা নিতে হবে যে, বর্তমান জীবনযাত্রা যত কঠিনই হোক, ভবিষ্যৎ দুর্যোগ, মহামারি তথা দুঃসময়ের কথা ভেবে কিছু না কিছু অর্থ সঞ্চয় করতেই হবে অন্ততপক্ষে নিজেদের বেঁচে থাকার স্বার্থেই।

আদিবাসী সমাজের বিভিন্ন প্রথা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বারোপ :

আমাদের আদিবাসীদের সমাজে প্রচলিত, বিলুপ্তির পথে থাকা অনেক প্রথাকে আমরা যেন অবহেলা ও উপেক্ষা না করি। বরং তা ধরে রেখে নিজেদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমুন্নত রাখতে চেষ্টা করতে হবে। আদিবাসী সমাজে প্রচলিত প্রাচীন গ্রামবন্ধ (লকডাউন), সঙ্গনিরোধ (কোয়ারেন্টাইন) প্রথাগুলো বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উন্নতির সময়েও কতোটা কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত তা তো নভেল করোনা ভাইরাসই দেখিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ প্রাচীন মানেই সবকিছু সেকেলে নয়, আদিম প্রথা মানেই তা কুসংস্কারসর্বস্ব নয়।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা :

কোভিড-১৯ মহামারির বিস্তার থেকে নিস্তার পেতে যে সব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা বলা হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে সাবান, হ্যান্ডওয়াশ বা হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোওয়া, মাস্ক ব্যবহার করা, পরিচ্ছন্ন থাকা শুধু কোভিড-১৯ থেকে দূরে থাকার জন্যে নয়, যেকোন সংক্রামক ব্যাধি থেকে দূরে থাকতে মেনে চলা জরুরি। উল্লিখিত স্বাস্থ্যবিধিগুলো আমরা যদি অভ্যাসে পরিণত করে তা দৈনন্দিন জীবনে অব্যাহত রাখতে পারি তবে অনেক সংক্রামক রোগবালাই থেকে আমরা দূরে থাকতে পারবো।

পাশাপাশি আমাদের আদিবাসীদের ধূমপানের অভ্যাস থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা উচিৎ, কারণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ধূমপায়ীদের কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি। আর ধূমপানের অন্যান্য ক্ষতিকর দিক তো আছেই।

কোভিড-১৯ যেহেতু এখনো বিদ্যমান আছে এবং এই নভেল করোনা ভাইরাসটির প্রতিষেধক যেহেতু অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয়নি, আমাদের আদিবাসীদের নভেল করোনা ভাইরাস স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, সাবান পানি দিয়ে হাত ধৌত করা, মাস্ক পরিধান করা আপাতত আমরা যেন দৈনন্দিন জীবনের একটা অপরিহার্য অংশে পরিণত করি নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার স্বার্থেই।

আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও করণীয় :

নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বের প্রায় সকল দেশের শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় ছেদ পড়েছে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে অনেকদিন থেকেই। তবে এতে আমাদের আদিবাসী শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন কারণে। দুর্গম পার্বত্য এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করার কারণে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ ভার্চুয়াল বা অনলাইন ক্লাস সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, ফলে পিছিয়ে থাকা আদিবাসী শিক্ষার্থীরা আরো পিছিয়ে পড়ছে। অনলাইনে ক্লাস করতে গেলে প্রয়োজন স্মার্টফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট- যা বেশিরভাগ আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সামর্থ্য ও আওতার বাইরে। স্মার্টফোনের ব্যবস্থা করা গেলেও প্রতিটা অনলাইন ক্লাস করতে গেলে প্রচুর ইন্টারনেট ডাটার প্রয়োজন পড়ে। এই করোনার প্রাদুর্ভাবে যখন অধিকাংশ আদিবাসী পরিবারের অন্নসংস্থান করা নিয়েই কোণঠাসা অবস্থা সেখানে প্রতিটা অনলাইন ক্লাসের জন্যে এত ইন্টারনেট ডাটা ক্রয় করা তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে অত্যন্ত দুরূহ। আদিবাসী পরিবারগুলোর বেশিরভাগ অবস্থান প্রত্যন্ত ও দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে হওয়াতে মোবাইল নেটওয়ার্ক পেতেই বেগ পেতে হয়, সেখানে অনলাইন ক্লাস করতে গেলে ইন্টারনেটের শ্লথগতি বা বিভ্রাটের কারণে পাঠ্যক্রমের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে বঞ্চিত হওয়াটা আরেকটি সমস্যা। অনেক শিক্ষার্থী স্মার্টফোন না থাকা ও ইন্টারনেট সুবিধা সহজলভ্য না হওয়ার কারণে অনলাইন ক্লাসে যোগদান করতে না পেরে শিক্ষা বিরতি বা সেমিস্টার ড্রপ দিতে বাধ্য হচ্ছে। এই সমস্যাগুলো সমাধানের জন্যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারকে দ্রুত এগিয়ে আসতে হবে ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনার চাপ নেই বিধায় তাদের হাতে এখন অখ- অবসর। তাই পিতামাতা ও অভিভাবকদের লক্ষ্য রাখতে হবে শিক্ষার্থীরা যেন অযথা সময় নষ্ট না করে। স্মার্টফোনের প্রতি শিশু বা শিক্ষার্থীরা যেন মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকে না পড়ে সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিভিন্ন ধরনের বই কিনে দিতে পারেন ও বইপড়ায় উৎসাহিত করতে পারেন। সন্তানদের পরবর্তী জীবনে কাজে লাগবে এমন সব বিষয়ে শিক্ষাদান করে তাদের ব্যস্ত রাখতে পারেন।

আর যারা শিক্ষার্থী, তাদের বসে থাকার কোন সুযোগ নেই বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতার সময়ে। তাছাড়া, কোভিড-১৯ এর কারণে সৃষ্ট বহুমুখী চাপে শরীর ও মনে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা অটুট রাখার জন্যে নিজেকে ইতিবাচক কাজে ব্যস্ত রাখার বিকল্প নেই। আর সেটা হতে পারে বইপড়া, ভালো মানের সিনেমা দেখা, খেলাধুলা করা, রান্না, বাগান করা প্রভৃতি। ইতিপূর্বে একাডেমিক পড়াশোনার চাপে যারা অন্যান্য বই পড়তে পারেনি, ইতিবাচকভাবে দেখতে গেলে নভেল করোনা ভাইরাস তাদের জন্যে বই পড়ার সেই চমৎকার সুযোগটা করে দিয়েছে। বর্তমানে বই পড়ার বাড়তি সুবিধাটা হলো- আপনি ঘরে থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজেকে, পরিবার ও সমাজকে নিরাপদে রাখতে পারছেন আর অন্যদিকে বই পড়ে চিত্তবিনোদন ও জ্ঞানের পরিধি বাড়ানোর সুযোগ তো থাকছেই। অনেক প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বিনামূল্যে নানা ধরনের অনলাইন কোর্স করার সুযোগ দিয়ে থাকে, ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে ঘরে বসেই এই অনলাইন কোর্সগুলো করে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে যা শিক্ষাজীবন বা ভবিষ্যৎ পেশাগত জীবনে কোন না কোন কাজে আসবে। শিক্ষার্থীরা নিরর্থক ঘরে বসে না থেকে নিজ বাড়ির আশেপাশে ফাঁকা জায়গায় বিভিন্ন ধরনের ফলজ, ভেষজ ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী বৃক্ষের চারা রোপন পারে, তাতে যেমন পরিবেশটা ভালো থাকবে, তেমনি মন ও শরীরও থাকবে চাঙা। ভবিষ্যতে এই রোপন করা গাছের চারা থেকেই যোগান আসবে নানা ধরনের সুস্বাদু ও পুষ্টিকর ফল এবং মূল্যবান ভেষজ ঔষধ ও দরকারী কাঠের।

আর শিক্ষার্থীদের শরীর ও মনের সুস্থতা বজায় রাখতে নিয়মিত শরীর চর্চা ও খেলাধুলা করা উচিৎ এই সময়টাতে। তাছাড়া নভেল করোনা ভাইরাস আমাদের নিভৃতে অনেক কিছু নিয়ে ভাবার সময় ও সুযোগ করে দিচ্ছে। সেই ভাবনা থেকে উঠে আসতে পারে অনেক সৃজনশীল আইডিয়া। নিজেকে ব্যস্ত ও চাপমুক্ত রাখতে শিক্ষার্থীরা লেখালেখির কাজও করতে পারে। নিজের সুপ্ত প্রতিভাগুলো বিকাশের জন্যে নিজের এমন একান্ত অখন্ড অবসর ভবিষ্যতে নাও আসতে পারে, সেটা মাথায় রেখে নিজের প্রতিভা কিংবা দক্ষতার জায়গাগুলোতে আরো উন্নতির জন্যে আত্মনিয়োগ করা যেতে পারে। আদিবাসীদের সমস্যা ও সেগুলো সমাধানে করণীয় বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে পারে শিক্ষার্থীরা। দুস্থ ও অসহায় মানুষের সাহায্যার্থে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থী নিজেকে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে নিয়োজিত করেছেন এই করোনাক্রান্তিকালে যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। অনেক আদিবাসী তরুণ ও শিক্ষার্থীদের করোনাকালীন সময়ে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে, পরবর্তীতে কোন দুর্যোগে বা মহামারি দেখা দিলে তাদের এই অভিজ্ঞতাগুলো কাজে আসবে।

প্রকৃতি, বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ :

আমাদের আদিবাসীদের বন, বন্যপ্রাণি ও প্রকৃতি রক্ষায় আরো যত্নবান হতে হবে যেহেতু বন ও প্রকৃতিই আমাদের শেষ আশ্রয়। পাহাড় ও বনাঞ্চল ধ্বংস হয়ে গেলে আদিবাসীদের অস্তিত্ব, পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্যও ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বন্যপ্রাণি রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের আদিবাসীদের আরো তৎপর হতে হবে, বন্যপ্রাণি শিকার ও ভক্ষণের ক্ষেত্রেও আমাদের সংযম অবলম্বন করতে হবে। কারণ, উহানের বন্যপ্রাণির বাজার থেকেই কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। তাছাড়া, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার জন্যেও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ অপরিহার্য বলে বাস্তুবিজ্ঞানীরা মত প্রকাশ করেন।

বন্যা যেমন প্রচন্ড ক্ষতিসাধন ঘটিয়েও উর্বর পলিমাটি বয়ে নিয়ে আসে; ময়লা, আবর্জনা, পঙ্কিলতা ধুয়ে নিয়ে যায়, কোভিড-১৯ ব্যাধিও অপূরণীয় সব ক্ষতিসাধনের পরেও কিছু ইতিবাচকতা নিয়ে এসেছে। এই ভাইরাস আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, রোগব্যাধির ক্ষেত্রে ধনী-গরিব সবাই সমান, অঢেল ধন-সম্পত্তি অনেক ক্ষেত্রেই কোন কাজে আসে না। মানুষের সীমাবদ্ধতার জায়গাগুলোও কোভিড-১৯ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। অতিক্ষুদ্র করোনা ভাইরাসের কাছেও আধুনিক সভ্যতার মানুষ কত অসহায় তাও বুঝিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আদিবাসীদের জীবনাচরণ, প্রকৃতিনির্ভর জীবিকা, প্রাচীন প্রথাভিত্তিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কারণে এখনও তাদের মধ্যে করোনা ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। তাই বলে নভেল করোনা ভাইরাসকে কোনমতেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও অবহেলা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে নিমেষেই। পাশাপাশি, আমাদের আদিবাসীদের মহামারি ও রোগব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের প্রাচীন প্রথাগুলো বাঁচিয়ে রাখতে হবে, যেগুলো বিলুপ্তির পথে রয়েছে সেগুলো পুনরুজ্জীবিত করতে হবে, প্রচার করতে হবে জনস্বার্থে। আদিবাসীদের রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণের ঐতিহ্যবাহী প্রথার উপযোগিতা, প্রাসঙ্গিকতা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করতে হবে, সবাইকে সচেতন করতে হবে, গর্বের সাথে জনসমক্ষে তুলে ধরতে হবে আদিবাসীদের জীবনাচরণ ও রোগব্যাধি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের লৌকিক প্রথা পদ্ধতিগুলো। এতে শুধু আমাদের আদিবাসীদের বর্তমান ও পরবর্তী প্রজন্ম নয়, পুরো মানবজাতি উপকৃত হতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের জীবনযাত্রা ও মনোজগতে যেন চিরস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে না পারে, বরং আমরা যেন এটার সাথে ভিন্নভাবে মানিয়ে নিতে সচেষ্ট হই, তাহলেই হয়তো বলা যাবে- করোনা ভাইরাস আমাদেরকে একেবারে নিঃস্ব, নিষ্ক্রিয় করতে পারেনি, পরাজিত করতে পারেনি, বরং লড়াই করে কোভিড-১৯ মহামারি থেকে অনেক ইতিবাচকতা আমরা খুঁজে নিয়েছি, কাজে লাগিয়েছি।



লেখক পরিচিতি :

মিঠুন কুমার কোচ লেখাপড়া করেছেন ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ। যুগ্ম আহ্বায়ক, বাংলাদেশ কোচ আদিবাসী ইউনিয়ন সহ-সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম।



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost