Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

করোনায় ‘লিকেজ, ইনজেকশনহীন’ গারো অর্থনীতি ও এক নৈরাশ্যবাদীর আশা ।। উন্নয়ন ডি. শিরা

প্রকাশিত : জুলাই ২৬, ২০২১, ১৩:০৫

করোনায় ‘লিকেজ, ইনজেকশনহীন’ গারো অর্থনীতি ও এক নৈরাশ্যবাদীর আশা ।। উন্নয়ন ডি. শিরা

বলা হচ্ছে ১৯৩০ সালের ভয়াবহ মহামন্দার পর বিশ্ব অর্থনীতি এই প্রথম বড় ধরনের ধ্বসের মুখোমুখি হয়েছে। এই ধ্বসের কারণ কোভিড-১৯ বা নভেল করোনা ভাইরাস। মন্দাক্রান্ত এই পরিস্থিতির স্থায়ীত্ব কতদিন থাকবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি এই চাপ কীভাবে সামলে উঠবে এই প্রশ্নের কোন সুদুত্তর আপতত কেউ দিতে পাচ্ছে না। ফলে ক্রমশ তৈরি হচ্ছে ধোয়াশা, অনিশ্চয়তা, দেখা দিচ্ছে যৌথ মানসিক অবসাদ। সামনে হাতছানি দিচ্ছে অনিশ্চিত আধাঁরী জীবন। ত্রিশের দশকে উদ্ভূত মন্দার প্রথম প্রাথমিক কারণ ছিল আর্থিক খাতের সাথে সম্পর্কিত, বিশেষ করে বিনিয়োগ সংক্রান্ত ব্যয়ের পতন। এই পতনের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি এক ঘুটঘুটে অন্ধকার খাদের দিকে ধাবিত হয়। তৎসময় বেশিরভাগ দেশ ত্রাণ কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং অনেক দেশ রাজনৈতিক বিপ্লবের সম্মুখিন হয়। ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচারী শাসনের কাছে গণতন্ত্র মুখ থুবরে পড়ে, বিশেষ করে ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নাৎসি জার্মানি। লিউফাউন্ডল্যান্ডের কর্তৃত্বের ফলে স্বেচ্ছায় গণতন্ত্র ছেড়ে দিতে হয়। এই মহামন্দার প্রভাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবধি গিয়ে ঠেকে। যেখান থেকে উতরাতে হিমশিম খেতে হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিকে। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদেরা একবিংশ শতাব্দীর মহামন্দাকে বিশ্ব অর্থনীতির পতনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ত্রিশের ভয়াল সেই যুগ এমন ছিল যেখানে জনমনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ ছিল উচ্চে, সমানে সমান। খরা, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, কৃষিজাত শিল্পের পরিবর্তনের ফলে তৃতীয় বিশে^র অনেক কৃষক তখন ঘরবাড়ি ছেড়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়। ইতিহাস তাই বলে।

যুদ্ধ, যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সাধারণ জনগণের জন্য (বিশেষ করে যাঁরা উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত) সবসময় ক্ষুধা, দারিদ্র, হতাশা, বঞ্চনা উপহার দেয়। যা ওই জনগোষ্ঠীকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে আরও নাজুক অবস্থায় ফেলে, প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকে পরিণত করে। আদিবাসী মানুষের ইতিহাস প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকে পরিণত হওয়ার ইতিহাস, তাঁরা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, বন্যা জলোচ্ছ্বাস কিংবা যুদ্ধ বিগ্রহে স্থানান্তরের ফলে আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। পিছিয়ে পড়ার এই ইতিহাস শতাব্দী প্রাচীন। পিছিয়ে থাকার মাঝেই যখন ফের পিছিয়ে পড়ার নতুন উপসর্গ, কারণ বা উছিলা এসে হাজির হয় তখন আদিবাসী মানুষ কোন মুলুকে গিয়ে নিজেদের রক্ষা করবে? আজকে পিছিয়ে থাকা আদিবাসীদের দুয়ারে এমনই আরেক কারণ সম্মুখে এসে হাজির। সেই কারণের নাম- করোনা।

মহামারি করোনাভাইরাসের ফলে চলতি বিশ্ব পুরো বিপর্যস্ত, সন্ত্রস্ত, তটস্থ। অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, খেলার জগৎ গেছে থমকে, বেড়েছে সামাজিকÑশারীরিক দূরত্ব। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ আছে। জগৎ জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে করোনা। আমাজনের গহীন জঙ্গল থেকে শুরু করে বিশ্ব মোড়লদের আখড়া হোয়াইট হাউস, ১০ নং ডাউনিং স্ট্রিট, ক্রেমলিন, এলিসি প্রাসাদ সর্বত্র করোনার একাধিপত্য। এই আধিপত্যের যূপকাষ্ঠ থেকে আদিবাসী মানুষ বাইরে নয়। বরং আদিবাসী মানুষ যেভাবে, যে হারে, যে তড়িৎ গতিতে করোনা দ্বারা প্রভাবিত, জর্জরিত, বিকারগ্রস্ত তা ত্রিশের দশকের গেট ডিপ্রেশনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

করোনার ফলে গারো আদিবাসীদের নিম্নবর্গীয় অর্থনীতির চাকা কী প্রকারে থেমে, স্থবির হয়ে গেছে সে বিষয়ে যাওয়ার আগে গারোদের জাতীয় অর্থনীতির রূপ বিন্যাসটা জানা বোঝার চেষ্টা চালানো জরুরি। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই। কাজেই গারোদের সামগ্রিক অর্থনীতির চিত্র আঁকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একজন দর্শনের ছাত্র হিসেবে করোনাকালে নিজ জাতিসত্তার হুর হুর করে ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক কাঠামোকে নিজের মতো করে বোঝার চেষ্টা করা চলতি রচনার বিষয়।

অন্যান্য আদিবাসীদের মতোই একসময় গারোদের জীবন জীবিকার মূল উৎস বা মাধ্যম ছিল অরণ্য। পাহাড়-জঙ্গল কমে যাওয়ার ফলে প্রাকৃতিক চাষ পদ্ধতি জুম, বন্য ফলমূল, পাহাড়ি সবজি, শিকার ইত্যাদি কমে যায়, সমাজ বিবর্তনের ফলে আদিম কৃষি-ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনের সাথে সাথে গারোরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি কিংবা নিতে চায়নি। ভূমির ব্যক্তি মালিকানা প্রতিষ্ঠা নিয়ে গারোদের মাঝে এক ধরনের অনীহা দেখা যায়। জমির কাগজ, দলিল, মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এসব গারোরা ভাবতেই পারেনি, এই কাগজ না করার দরুন রাষ্ট্র ব্যবস্থায় গারো অধ্যুষিত অঞ্চল (সুনির্দিষ্ট করে বললে ময়মনসিংহের আংশিক শাসন বহির্ভূত সাবেক পাঁচ থানা) অন্তর্ভূক্ত হওয়ার ফলে অনেক গারো ভূমির মালিকানা খোয়ায়। অন্যদিকে, জমির দালাল-তস্করদের প্রলোভন, ভূমিদস্যুদের ভূমি বেদখল, ক্রমাগত বহু মাত্রিক নিপীড়ন নির্যাতন অত্যাচারে গারোরা ভূমি হারাতে থাকে এবং নিজভূমে পরবাসী জীবনযাপন করে। জমিতে শ্রম দিয়ে, কাঠ সংগ্রহ, বর্গাচাষ, বন আলু খেয়ে অবশেষে কুলোতে না পেরে আশি নব্বইয়ের দশকে গারোরা শহরমুখী হতে শুরু করে। অল্প শিক্ষিত, অশিক্ষিত গারো নারীরা শহরে এসে দলে দলে গৃহকর্মী, বিউটিশিয়ানের পেশায় নিজেদের সম্পৃক্ত করে; পুরুষেরা অফিস-বাসা বাড়ির দারোয়ান, পিয়ন, গাড়ি চালকের পেশায় নিয়োজিত হয়। ঢাকার বাড্ডা, নদ্দা, জগন্নাথপুর, কালাচাঁদপুরে গড়ে তুলে গারো বসতি; গারো বাজার, আকনপাড়া, নাংরীমা গলি, লুকাস গলি, মারাক বিল্ডিং ইত্যাদি। রাজধানীতে অবস্থানরত সংখ্যাগরিষ্ঠ গারো এই অঞ্চলে বসবাস করে এবং বর্ণিত পেশার সাথে যুক্ত। পেশার বিবেচনায় এগুলো নি¤œ পর্যায়ের স্বল্প বেতনের অনিশ্চিত চাকুরি। এই চাকুরির অর্থ দিয়ে বাসা ভাড়া, ছেলেমেয়ের পড়াশুনা, খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কষ্টের। ভবিষৎ সঞ্চয় বলতে কিছু থাকে না। আবার শহুরে গারোদের একটি অংশ রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট, ধানমন্ডি অভিজাত এলাকায় বসবাস করে, তুলনামূলকভাবে তাঁরা ভালো চাকুরি করে কিন্তু সংখ্যার হিসেবে এই শ্রেণি খুব বেশি নয়। কালাচাঁদপুর, বাড্ডা, নদ্দা, জগন্নাথপুর কিংবা অন্যান্য বিভাগীয় শহরে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বিউটিশিয়ান, গৃহকর্মী, নার্স, দারোয়ান, পিয়ন ইত্যাদি পেশা থেকে আসা অর্থই গারোদের অর্থনীতির চালিকা শক্তি।

করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে যখন কার্যত লকডাউন শুরু হয় তখন অফিস, আদালত, ব্যবসা-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এই বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে গারোরা যেসব পেশার সাথে জড়িত ছিল সেগুলো অটোমেটিক্যালি বন্ধ হয়। ফলে বেতন-ভাতা না পাওয়ায় গারোদের অবস্থা পৌঁছায় এক দুর্বিষহ অবর্ণনীয় অবস্থায়। বাসা ভাড়া বকেয়া পড়ে থাকে, দেখা দেয় খাদ্য সংকট। এ এক আধুনিক অন্তরালের দুর্ভিক্ষ। অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে সংকট দুরবস্থার কথা সবাই জানে আবার কেউ জানে না! প্রথমদিকে বিভিন্ন এনজিও, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, ওয়ানগালা কমিটি ঢাকাস্থ গারোদের মাঝে খাদ্য সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসে কিন্তু সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য, এককালীন। এমন পরিস্থিতিতে আমার জানাশোনা অনেক গারো পরিবার প্রাণের ঢাকা শহর ত্যাগ করে গ্রামে চলে যায়। যাঁরা গ্রামে চলে যায় তাদের অবস্থাও শোচনীয় কেননা তাঁরা গ্রামীণ অর্থনীতির সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে না, গ্রামে কাজ নেই। ফলে আয় উপার্জনের রাস্তাও বন্ধ। করোনায় চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে মধুপুরের নিজ গ্রাম চুনিয়ায় ফেরা এমনই কয়েকজন গারো নারী রুবিনা রেমা, বিউটি মৃ, থানছি মৃ, জবা আরেং, বিউটি মৃ, জিতি পাথাং; একই উপজেলার ভুটিয়া গ্রামের- লিমা ম্র্রং, অর্পনা সাংমা, ইতি চিসিম, রূপালী চিসিম; কাকড়াগুনি গ্রামের- প্রিয়া নকরেক, শবনম চিরান, অর্চনা নকরেক তাঁরা সকলেই ঢাকার বিভিন্ন পার্লারে কর্মরত ছিলেন। করোনায় পার্লার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের চাকরি-বেতন বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকায় কুলাতে না পেরে গ্রামে এসে কলাখেতে কেউবা বোরো ধান কেটে জীবিকা নির্বাহ করে। মজুরি খুব বেশি নয় ২০০-২৫০। আগে এসি রুমে সারাদিন যে দুই হাতে কৌণিক স্প্রে ও ড্রেসার, ব্লাশন আর সফট ব্রাশে ফেসিয়াল, হেয়ার ড্রেসিং ও রিবন্ডিং ম্যাকআপে মানবীকে অপ্সরীর মতো সাজাতো সেই নরম হাতে কোদাল, কাস্তে, ছেনি নিয়ে গারো নারীরা পেটের তাড়নায় সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলে। গারো অঞ্চলে সর্বত্র এই চিত্র। বাস্তবতা এমনই নির্মম, নিষ্ঠুর। এমন শোচনীয় অবস্থায় পতিত গারোদের সামগ্রিক অর্থনীতি। এখান থেকে গারোরা নিজেদের কীভাবে উত্তরণ ঘটাবে? আসলে গারোরা কোন পর্যায়ের অর্থনৈতিক মন্দায় পতিত তা বুঝতে ‘অর্থনৈতিক মন্দা ও তা থেকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া’কে ব্যাখ্যা করতে অর্থনীতিবিদেরা যে চারটি ইংরেজি অক্ষরের ভি (ঠ), ইউ (ট), ডব্লিউ (ড), এল (খ) এর সহায়তা নেন তা উল্লেখ করে বোঝার চেষ্টা চালানোর প্রয়াস করা যেতে পারে।

উল্লেখিত চারটি ইংরেজি অক্ষরের সবচেয়ে ভালো বা আদর্শ সূচক বলে পরিগণিত অক্ষর ভি (ঠ), এতে পড়ে যাওয়া অর্থনীতি খুব দ্রুত উপরের দিকে উঠতে পারে। এই অবস্থায় অর্থনৈতিক কর্মকা- আবার আগের অবস্থায় সহজে ফিরে যায়। নেমে যাওয়া অর্থনীতি উঠিয়ে আনতে সবচেয়ে বেশি আশা জাগানিয়া অক্ষর বা সূচক ইউ (ট), এতে নেমে পড়া অর্থনীতির চাকা পুনরুদ্ধারের বিষয়টি হয়তো একটু বিস্তৃত হতে পারে, সময় লাগে কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় বেশির ভাগ ক্ষতিই কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের নতুন স্বাভাবিক অবস্থা এল (খ), এক্ষেত্রে অর্থনীতিতে দ্রুত ও বড় ধরনের পতনের পর পুনরুদ্ধার ঘটে কিন্তু অর্থনৈতিক কর্মকা- থেকে যায় কম মাত্রায়, ইংরেজি অক্ষর ‘এল’ এর মতোই। অন্যদিকে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে কঠিন পথ হল ডব্লিউ (ড), এক্ষেত্রে নেমে পড়া অর্থনীতি উঠলেও তা পুনরায় নিচে নেমে যায় ইংরেজি অক্ষর ডব্লিউ এর মতোই। এ বিষয়ে উদাহরণ হিসেবে নিউইয়র্কের গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসএন্ডপি গ্লোবাল রেটিংস এর প্রধান অর্থনীতিবিদ পল গ্রোনভাল্ডের বক্তব্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। গ্রোনভাল্ডের মতে, ‘করোনা প্রতিরোধে কোন টিকা বা চিকিৎসা আবিস্কার না হওয়া আমাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে দিয়েছে। সরকারগুলো এখন লকডাউন, বিধি-নিষেধ শিথিল করতে পারে যার ফলে অর্থনৈতিক কর্মকা- আবার শুরু হবে। তবে দ্বিতীয় দফায় করোনাভাইরাসের সংক্রমন ঘটতে শুরু করে তখন পুনরায় লকডাউন কঠোর হতে পারে যার ধাক্কা আবার গিয়ে লাগতে পারে অর্থনীতিতে।’ এই ধাক্কায় পতিত অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অত্যন্ত কঠিন। গারো আদিবাসীদের অর্থনীতিকে এল (খ) সূচকে ফেলা যায়। বিষয়টি পরিস্কার করা দরকার।

লকডাউনের ফলে চাকরি আয় উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে গারোদের অর্থনৈতিক সূচক একেবারে নিচে পড়ে গেছে অর্থনীতিকদের ‘এল’ সূচকের ন্যায়। এখন লকডাউন খুলে দেয়ায় অর্থনীতি স্বাভাবিক (নতুন নরমাল) অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে, চাকরি, ব্যবসা বাণিজ্য কিছুটা হলেও পেতে শুরু করেছে স্বাভাবিক স্থিতি, গতি। এই নতুন নরমাল অবস্থায় গারোদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ এসে হাজির হয়েছে, যেগুলোর মধ্যেÑ বকেয়া বাসা ভাড়া, অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে (ব্যাংক, ক্রেডিট কিংবা মহাজনী ঋণ/ধার) লোন, মুদি দোকান ইত্যাদির বকেয়া। নতুন নরমালে চাকুরি আগেকার মতো গতি পেলেও এর সমুদয় টাকা এসব খাতে ব্যয় হয়ে যাবে, ফলে পতিত অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে যাবে পূর্ববস্থায়, উত্তরণের কোন সমূহ সম্ভাবনা দেখা যায় না। অর্থনীতির গতি বা রেখা যে সমান্তরালে পড়ে আছে সেখানেই পড়ে থাকবে অনেকটা ইংরেজি অক্ষর ‘এল’ আকৃতির মতো। এখান থেকে বেড়িয়ে আসতে গারোদের সময় লাগবে, যদি না কোন বড় ধরনের আর্থিক কারিগরী সহায়তা না পাওয়া যায় তবে অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গারো প্রান্তিক আদিবাসীদের জন্য সরকারের আর্থিক প্রণোদনা জরুরি। সংকটকালীন মুহূর্তের সহায়তা যেটাকে অর্থনীতির পরিভাষায় বলে ইনজেকশন অর্থনীতি। গারো তথা আদিবাসীদের অর্থনীতিকে চাঙা করতে এ মুহূর্তে ইনজেকশন অর্থনীতির প্রয়াজন আছে। তাছাড়া কোন জনগোষ্ঠীর অর্থনীতিতে লিকেজ (সঞ্চয়, কর ও আমদানি) এবং ইনজেকশন (বিনিয়োগ, সরকারি ব্যয় ও রপ্তানি) দুটোরই দরকার। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই দুইয়ের ভারসাম্য জরুরি হলেও প্রান্তিক গারো আদিবাসীদের বেলায় দুটির একটিও ঠিকমতো বাস্তবায়ন করা হয়নি। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা আলাদা। পাহাড়ের আদিবাসীদের জন্য করোনাকালীন সহায়তা হিসেবে জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এসআইডি-সিএইচটি প্রকল্পের আওতায় ইউএনডিপি, ডানিডা, ইউএসএআইডি ইত্যাদির মতো বড় বড় সংস্থা করোনাকালীন সহায়তা প্রদান করছে। অন্যদিকে, গারো অধ্যুষিত অঞ্চলে উল্লেখ করার মতো কোন করোনাকালীন সহায়তা কার্যক্রম নেই, বেসরকারি সংস্থা কারিতাস সাধ্যানুযায়ী গারো পাহাড়ের আদিবাসীদের পাশে দাঁড়িয়েছে, এটি প্রশংসনীয়। এই জায়গায় সরকার প্রতিষ্ঠিত স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন (যাদের ১১টি জেলায় ৪২টি শাখা সক্রিয়) বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারতো। কিন্তু তা হয়ে উঠেনি। ভূমিকা রাখতে না পারার এই দায় টিডব্লিউএ নেতৃবৃন্দের ঘাড়ে গিয়ে বর্তায়। এই দায় তাঁরা এড়াবে কী করে!

করোনার কারণে গারোরা কেবল অর্থনৈতিকভাবেই পিছিয়ে পড়েনি, পিছিয়ে পড়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রেও। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় গারো শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই গ্রামে চলে আসে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য করোনাকালীন সময়েও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে অনলাইনের মাধ্যমে বিশেষত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বলা বাহুল্য, গারো শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগের আর্থিক অবস্থা ভালো অবস্থানে নেই, তাদের অনেকের ল্যাপটপ এমন কি স্মার্ট ফোন নেই। আমার গ্রামের এমনই এক গারো শিক্ষার্থী আনসেং দালবত। সে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। অনলাইন ক্লাস চলার দরুন তাকে স্মার্ট ফোন নিতে হয় কিন্তু বিধি বাম! তাঁর বাড়িতে এমন কি আশেপাশেও অনলাইন ক্লাশ করার মতো পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক পাওয়া না। এখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গ নাইবা পাড়লাম। অব্যাহত অনলাইন ক্লাস পরীক্ষার ফলে আদিবাসী শিক্ষার্থীরা কীভাবে পিছিয়ে পড়ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক তাদের এক গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন। ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ৭৩ শতাংশ আদিবাসী শিক্ষার্থী সংসদ টেলিভিশনে প্রচারিত নিয়মিত ক্লাশ করতে পারে না। কারণ অনুসন্ধানে বের হয়ে আসা তথ্যমতে, ‘প্রান্তিক আদিবাসী শিক্ষার্থীদের অনেকের বাড়িতে টেলিভিশন নেই, টেলিভিশন থাকলেও ডিশ কিংবা বিদুৎ নেই।’ এমন রূঢ় বাস্তবতা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের, আদিবাসী শিক্ষার্থীদের। আবার সরকারের শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, বিষয় কম করে হলেও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষা মন্ত্রীর এমন বক্তব্য আমলে নিয়ে শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট টিউটরের মাধ্যমে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে। দারিদ্র সীমার নিচে বসবাস করা আদিবাসী শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য নেই, ফলত আদিবাসী শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকার মাঝেই আরও পিছিয়ে পড়ছেন।

শিক্ষা ক্ষেত্রে পেছালে আদিবাসী সমাজ আরও কয়েক ধাপ পিছিয়ে পড়বে। পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আনতে, সহায়ক হিসেবে যে কোটা পদ্ধতি ছিল সেটিও প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সম্প্রতি বাতিল করা হয়েছে। এমন অবস্থায় আদিবাসীদের শিক্ষা, চাকুরি, ভবিষৎ অর্থনৈতিক অবস্থা কী দাঁড়াবে তা বোঝা কঠিন ব্যাপার নয়। সংকটকালীন পরিস্থিতি বিচারে পাহাড়ের অনেক ছাত্র-যুব সংগঠন শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজ উদ্যোগে বিনামূল্যে পাঠদান কর্মসূচি, বিষয়ভিত্তিক অনলাইন ক্লাশ, পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এখানে গারো শিক্ষার্থীদের জন্য, গারো ছাত্র সংগঠন গুলোর কোন কর্মসূচি দেখা যায় না।

করোনা পরবর্তী নতুন নরমাল অবস্থায় গারোদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট কেমন হবে এ প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণের চেষ্টা উপরি চালানো হয়েছে। গারোদের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া ‘এল’ সূচকে সাধিত হবে, আদর্শ সূচক ‘ভি’ কিংবা আশা জাগানিয়া ‘ইউ’ সূচকে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা আপাত দেখছি না। ব্যক্তিগতভাবে আমি ‘অর্ধেক জল ভর্তি গ্লাসকে গ্লাসটি অর্ধেক খালি’ বলা স্বভাবের মানুষ। যেটাকে আমাদের দর্শনের ভাষায় বলে নৈরাশ্যবাদী। নৈরাশ্যবাদী হলেও আমি খাঁটি নৈরাশ্যবাদী নই। আমি স্বপ্ন দেখি, আশা রাখি, গারো অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, ঘুরে দাঁড়াতেই হবে, এই ঘুরে দাঁড়ানোর মাঝে নির্ভর করছে গারোদের অস্তিত্ব ভবিষৎ। না ঘুরে, উঠে না দাঁড়িয়ে কোন উপায় নেই। সময় লাগবে, তবু ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে আদিবাসী মানুষের অংশগ্রহণ, করোনাকালীন বিশেষ প্রণোদনা বা প্যাকেজ প্রদান করা প্রয়োজন। এইসব অধিকার আদায়ে আদিবাসী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতা জরুরি।

তথ্যসূত্র-

১.      মহামন্দা, উইকিপিডিয়া।

২.      করোনা ভাইরাস: মহামারির পর বিশ্ব অর্থনীতি স্বাভাবিক হতে কতদিন লাগতে পারে? (বিবিসি বাংলা, ১৩ মে, ২০২০ইং)।

৩.     বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্ট কাউন্সিল (বিএমসিসি)।

৪.      মধুপুরে দিনমজুরি করে চলেছেন বিউটিশিয়ানরা (ইত্তেফাক, ৪ জুন ২০২০ইং)।

৫.      করোনা এবং অর্থনীতি (সমকাল, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ইং)।



লেখক পরিচিতি:

তরুণ লেখক ও সংস্কৃতিক কর্মী উন্নয়ন ডি. শিরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক।



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost