Thokbirim | logo

২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১২ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আজ আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বর্ষাবাসের শুরু

প্রকাশিত : জুলাই ২৩, ২০২১, ১৬:৩৬

আজ আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বর্ষাবাসের শুরু

আজ শুক্রবার (২৩ জুলাই২০২১) থেকে আগামি ৩ মাসের জন্য শুরু হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওয়াছু লাব্রেই বা বর্ষাবাসের দিন। আজ শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা। বৌদ্ধদের অন্যতম এক পবিত্রতম দিন ও তিথি। এ শুভ তিথিতে সবাইকে জানাই মৈত্রীময় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আজ থেকে বিশ্বের বৌদ্ধদের ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত শুরু হল। এ তিন মাস বৌদ্ধ ভিক্ষু ও গৃহীরা তাদের আত্মসংযম, বিদ্যা ও ধ্যানচর্চা এবং উপোসথব্রতের মাধ্যমে আত্মদর্শন ও আত্মোপলব্ধির শিক্ষা গ্রহণ করেন। আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের অন্যতম সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গৌতম বুদ্ধ যেমন নিজ প্রচেষ্টায় জীবনের পূর্ণতা সাধন করে মহাবোধি বা আলোকপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং জগজ্জ্যোতি বুদ্ধত্বপ্রাপ্ত হন তেমনিভাবে পূর্ণ চন্দ্রের মতো নিজের জীবনকে ঋদ্ধ করাই প্রতিটি বৌদ্ধের প্রচেষ্টা। আষাঢ়ী পূর্ণিমা’র অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বৌদ্ধরা এই প্রচেষ্টার প্রতি তাদের অঙ্গীকার নবায়ন করে থাকে। শুধু সাধারণ বৌদ্ধ নয়, ভিক্ষুদের জন্যও আষাঢ়ী পূর্ণিমা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বৌদ্ধরা এদিনটিকে সচরাচর শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা হিসেবে অভিহিত করে থাকে। পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করেই যা গৌতম বুদ্ধের জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বর্ণিত আছে: এক আষাঢ়ে পূর্ণিমায় গৌতম বুদ্ধ সিদ্ধার্থরূপে মাতৃগর্ভে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন। বর্ণিত আছে কপিলাবস্তু নগরে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা সাড়ম্বরে উদযাপিত হতো। এক আষাঢ়ী পূর্ণিমায় রাজা শুদ্ধোধনের মহিষী রাণী মহামায়া উপোমথ ব্রত গ্রহণ করলেন। সে রাত্রে রাণী মহামায়া স্বপ্নমগ্না হয়ে দেখলেন যে চার দিক থেকে পাল দেবগণ এসে পালঙ্কসহ তাকে নিয়ে গেল হিমালয়ের পর্বতোপরি এক সমতল ভূমির ওপর। সেখানে মহামায়াকে সুউচ্চ এক মহাশাল বৃক্ষতলে রেখে দেবগণ সশ্রদ্ধ ভঙ্গিমায় এক পাশে অবস্থান দাঁড়িয়ে পড়ল। অত:পর দেবগণের মহিষীরা এসে মায়াদেবীকে হিমালয়ের মানস সরোবরে স্নান করিয়ে দিব্য বসন-ভূষণ ও মাল্যগন্ধে সাজিয়ে দিলেন। অনতিদূরে একটি শুভ্র রজতপর্বতে ছিল একটি সুবর্ণ প্রাসাদ। চারিদিক থেকে পাল দেবগণ মহারাজা পুনঃপালঙ্কসহ দেবীকে সেই প্রাসাদে নিয়ে গিয়ে দিব্যশয্যায় শুইয়ে দিল। তখন অদূরবর্তী সুবর্ণ পর্বত থেকে এক শ্বেতহসত্মী নেমে এসে উত্তরদিক থেকে অগ্রসর হয়ে রজতপর্বতে আরোহণ করলেন। রজত শুভ্রশু একটি শ্বেতপদ্মের রূপ পরিগ্রহ করে কবীবর মহাক্রোষ্ণনাদে সুবর্ণ প্রাসাদে প্রবেশ করলেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনবার মাতৃশয্যা প্রদক্ষিণপূর্বক মায়ের শরীরের দক্ষিণ পার্শ্বভেদ করে মাতৃজঠরে প্রবেশ করলেন। পর দিন প্রত্যুষে রাণী মহামায়া রাজা শুদ্ধোধনকে স্বপ্ন বৃত্তান্ত অবহিত করলেন। কালবিলম্ব না-করে রাজা শুদ্ধোধনকে চৌষট্টিজন জ্যোতির্বিদ এনে স্বপ্নের ফল জানতে চাইলেন। তারা বললেন, “মহারাজ চিন্তা করবেন না, আপনার মহিষী সন্তানসম্ভবা। তিনি এমন এক পুত্ররত্ন লাভ করবেন যার ফলে বসুন্ধরা ধন্য হবে। আষাঢ় মাসের আরেক পূর্ণিমা রাতে মাত্র ২৯ বৎসর বয়সে তিনি স্ত্রী-পুত্র-রাজ্য সব মায়া ছেড়ে গৃহত্যাগ করেন। গয়ার বোধিদ্রুম মূলে একাধারে ছয় বছর কঠোর তপস্যার পর পরম জ্ঞান “মহাবোধি” লাভ করেন। নবলব্ধ ধর্ম প্রকাশের উদ্দেশ্যে তিনি আরেক আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে সারানাথের ঈষিপত্তন মৃগদাবে আগমন করেন। বুদ্ধ এক আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে ঈষিপত্তন মৃগদাবে সেই পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদেরকে প্রথম ধর্মদেশনা “ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র” দেশনা করলেন। কৌণ্ডণ্য, বপ্প, ভদ্দীয়, মহানাম ও অশ্বজিত্—এ পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের কাছে তার নবলব্ধ সদ্ধর্মকে প্রকাশ করেন। পরে আরো এক পূর্ণিমা তিথিতে তিনি মাতৃদেবীকে সদ্ধর্ম দেশনার জন্য তাবৎিংস স্বর্গে গমন করেন। অনুরূপ পূর্ণিমার তিথিতেই বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ ত্রৈমাসিক বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান গ্রহণ করে। ভিক্ষুদের অন্যতম বাৎসরিক আচার বর্ষাবাস শুরু হয় আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে; শেষ হয় আশ্বিনী পূর্ণিমাতে। বর্ষাকালে সিক্ত বসনে এদিক-ওদিক ঘোরা-ফেরা করা, বস্ত্র তুলে চলা-ফেরা করা মানায় না বিধায় যেখানে-সেখানে ভিক্ষুদের বাস না করে গৌতম বুদ্ধ বর্ষাবাস গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন বৌদ্ধ বিনয় মতে যে ভিক্ষু বর্ষাবাস যাপন করেন তিনিই কঠিন চীবর লাভের যোগ্য হন। বর্ষাবাস যাপন ব্যতিরেকে চীবর লাভ করা যায় না। যে বিহারের ভিক্ষু বর্ষাবাস যাপন করবে না, সেই বিহারে কঠিন চীবর দানানুষ্ঠানও করা যাবে না। বর্ষাবাসের জন্য ভিক্ষুরা সংঘারাম, বিহার ও সাধনাকেন্দ্র বেছে নেয়। তাই বৌদ্ধদের কাছে এ পূর্নিমা আসে জীবনের পূর্ণতা সাধনের জন্য। এ পূর্নিমায় বুদ্ধের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ১.প্রতিসন্ধি গ্রহণ — দেবরাজগনের প্রার্থনায় নির্বানের আলোতে অজ্ঞান অন্ধকার দূরীভূত করার জন্য বোধিসত্ত্ব মায়াদেবীর জঠরে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে। ২.সংসার ত্যাগ — চারি নিমিত্ত দর্শনের পর সকল দুঃখ থেকে মুক্তির জন্য, সত্য অন্বেষণে রাজ সিংহাসন,পিতা – মাতা, স্ত্রী – পুত্র সংসার ত্যাগ করেন এই পবিত্র পূর্ণিমাতে। ৩.নির্বাণ পথ প্রদর্শন — বুদ্ধত্ব লাভের পর সারনাথে পঞ্চ বর্গীয় শিষ্য এবং অগনিত ব্রক্ষ্ম-দেবতাকে ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্রে মাধ্যমে সর্বপ্রথম নির্বানধর্ম, মুক্তির ধর্ম, সত্য ধর্ম দেশনা করেন। ৪.মনুষ্য, দেব, ব্রক্ষার ধর্মচক্ষু লাভ —- বুদ্ধের বানী শ্রবনে ১৮ কোটি দেব -ব্রক্ষা এবং কোন্ডঞ্ঞ ধর্মচক্ষু লাভ করেন আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে। ৫.যমক ঋদ্ধি প্রদর্শন— শ্রাবস্তীর নগরে গন্ডম্ব বৃক্ষমূলে প্রতিহার্য ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে। ৬.মাতৃ দেবীকে রক্ষা করার জন্য স্বর্গে গমন —- সপ্তম বর্ষাবাসে মাতা মহামায়াদেবীকে ধর্মদেশনা করার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিবসে। ৭.বর্ষাব্রত অধিষ্ঠান — ভিক্ষু সংঘের তিন মাসের বর্ষাবাস শুরু এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিবসে। এই আষাঢ়ী পূর্ণিমার মাহাত্ম্য ব্যাপক কারণ এই পূন্যময় তিথিতে তথাগত বুদ্ধের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী ওতপ্রতভাবে জড়িত। এই তাৎপর্যময় স্মৃতি বিজড়িত পূন্যময় তিথিকে স্মরণ করে আগামী ৩ মাস দানময়, শীলময়, ভাবনাময় জীবনের জন্য অধিষ্ঠান করতে এ দিনটি পালন করে থাকে । এই আত্মসংযম যেন জগতের মঙ্গল ও নির্বাণ লাভের কামনা করা হয়ে থাকে। আগামি ৩ মাস পরে বর্ষাবাসের দিন শেষ হয়ে আবার আগের মতই ফিরে আসবে। জগতের সকল প্রাণী সুখী ও মঙ্গলময় হোক!

।। আদিত্য ত্রিপুরা



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x