Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো লোককাহিনি ।। ডম্বি ওয়ারি 

প্রকাশিত : জুলাই ১৪, ২০২১, ১১:৫৫

গারো লোককাহিনি ।। ডম্বি ওয়ারি 

সে অনেক অনেক বছর আগের কথা। রংদিক নদীর তীর ঘেঁষে এক গ্রাম ছিলো। আর জরেং এ গ্রামেরই বাসিন্দা। দিন যায় মাস যায়। একদিন জরেং ডম্বি নামে অপূর্ব রূপবতী এক যুবতীকে বিয়ে করে। ডম্বি ছিলো রেমা গোত্রের এবং তাঁর মত এমন সুন্দরী দ্বিতীয় আর কোনো নারী ছিলো না ঐ এলাকায়। সে কারণেই জরেং সব সময় গর্ব করে বলে বেড়াত তাঁর স্ত্রীর মত সুন্দরী কেহ-ই নেই।
একদিন জরেং রংদিক নদীর এক গভীর জলাধারের (ওয়ারি) তীরে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে চিৎকার করে বলছিলো, তাঁর মত ভাগ্যবান কেউ নেই, এমন সুন্দরী স্ত্রী কার আছে? আরও বলছিলো, দু সন্তান জন্ম দেওয়ার পরও ডম্বি যেন আরও বেশি যুবতী ও রূপবতী হয়েছে। এসব কথা জলাধারের গভীর পানির ভিতর থেকে মৎস্যকন্যার ছেলে (গবৎসধরফ) শুনছিলো। সে মনে মনে ভাবতে লাগল, এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল যে, সে এই সুন্দরী ডম্বিকে খুঁজে নিবে। ডম্বি কখন পানি তুলতে আসে মৎস্য যুবক জলাধারের কিনারে এসে সেই অপেক্ষায় থাকল।

সত্যি সত্যি ডম্বি পানি তুলতে আসল। সে দেখল আসলেই ডম্বি অপূর্ব ও রূপবতী। মৎস্য যুবক প্রথম দেখে ভালোবেসে ফেলল। প্রায়ই সে জলাধারের পানির ভিতর থেকে ডম্বিকে অনুসরণ করতে লাগল। একদিন ডম্বি গোসল করতে আসলে মৎস্য যুবক হঠাৎ ডম্বি’র পা ধরে পানির ভেতর টেনে নিয়ে গেল।

ডম্বির প্রথম মেয়ে সন্তান মাকে পানির ভেতর টেনে নিয়ে যাওয়া দেখেছিলো। মেয়েটি ভাবল ইচ্ছে করেই কোনো এক কারণে হয়ত তার মা পানির ভিতর ডুব দিয়ে চলে গেছে। ছোট সন্তান যখন ক্ষুধায় কান্নাকাটি করত, তখন সে ছোট বোনকে পিঠে বেঁধে ঐ জলাধারের কিনারে পাথরে দাঁড়িয়ে মা মা বলে ডাকত আর বলত মা তুমি ফিরে এসো। বোনটি কাঁদছে, তাকে তুমি দুধ খাওয়াও। ডম্বি বড় মেয়ের ডাক শুনে তাড়াতাড়ি পানির কিনারে আসল। ডম্বির পানির কিনারে আসা অনুসরণ করছিলো পানির সেই মৎস্য যুবক। সে ডম্বির পা শক্ত করে ধরে আটকিয়ে রাখল। কিন্তু ডম্বি যখন শিশুটিকে দুধ খাওয়ানোর জন্য জোর করছিলো, তখন সে ডম্বির উপরের অংশ পানির উপরে তুলে দিয়ে পা দুটো শক্ত করে ধরে রাখল। এইভাবেই ডম্বি শিশুটিকে দুধ খাওয়ালো। দুধ খাওয়ানো শেষে ডম্বি বড় মেয়েটিকে, ‘তুমি বাড়ি যাও আর ছোট বোনটিকে দেখাশোনা করো’ এই কথা বলে পানিতে ডুবে গেল।

এই ঘটনা থেকে গারোরা বিশ্বাস করে যে, পানির ভেতরে মানব জাতীকে জীবন্ত নিয়ে যায় এবং বিশেষ এক শক্তি বা ক্ষমতা আছে যা মানুষ জাতি পানির ভেতরেও বেঁচে থাকতে পারে বা শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে বাঁচতে পারে। জরেং এর সুন্দরী স্ত্রী পানির ভেতরে থেকেও বেঁচেছিলো এবং মৎস্য যুবকের সাথে বসবাস করতে লাগল। ডম্বির রূপ সৌন্দর্য গভীর পানিতেও বজায় থাকল।

জরেং বাড়ি এসে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, তোমার মা কোথায় গেছে? মেয়েটি বলল, গোসল করতে গিয়ে এখনও ফিরে নাই। ছোট বোনকে দুধ খাওয়ার পর আবারও পানিতে চলে গেছে। জরেং মেয়ের কথায় বিশ্বাস করল না। কেননা মানুষ পানির ভেতর বেঁচে থাকতে পারে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে করে না আসাতে জরেং ভাবল ডম্বি পানিতে ডুবে গেছে।

মেয়েটি পরের দিন আবার বোনকে নিয়ে সেই জলাধারে আসল আর মাকে ডেকে দুধ খাওয়ালো। জরেং মেয়েকে অনুসরণ করল। দূরে পাহাড়ের ধারে বসে লক্ষ্য করল। যখন তাঁর মেয়ে ডাকতে শুরু করল, তখন দেখল পানি নড়ছে আর কিছু একটা পানির ভিতর থেকে ভাসছে। চোখের পলকে দেখল তাঁর সুন্দরী স্ত্রী পানি থেকে উঠে এসে দুধ খাওয়াচ্ছে। আর দেখল দুধ খাওয়ানো শেষে আবারও পানির ভেতর চলে গেল। এতে জরেং ভীষণ কষ্ট পেল। কেননা সে ডম্বিকে প্রচ- ভালবাসত। পানির দিকে অপলক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকল।

পরের দিন জরেং তাঁর বিশেষ এক তলোয়ার দুই দিক ধার দিতে লাগল। স্ত্রীকে পাওযার জন্য এমন ধার দিল, তলোয়ারে ছোয়া লাগলে কোনো মশা মাছি-ই রক্ষা পাওয়ার নয়। আর বজ্রপাতের উজ্জ্বল আলোর মত তলোয়ারটি চকচক করতে লাগল। পরে জরেং মেয়েকে জলের ধারে নিয়ে গিয়ে ডাকতে বলল, আর জরেং গোপনে তলোয়ার নিয়ে লুকিয়ে থাকল। মেয়েটি বাবার কথামত ডাকতে লাগল। ডম্বি পানির ভেতর থেকে বেড়িয়ে আসল, কিন্তু আবারও সেই জলের মৎস্য যুবক তাঁর পা শক্ত করে ধরে রাখল। পরে জরেং হাটু গেড়ে স্ত্রীর হাত ধরে অন্য হাতে তলোয়ার দিয়ে পানির নিচে শত্রুকে ভয় দেখানোর জন্য ঘুরাতে লাগল। তলোয়ার ঘুরানোর ঝলকে ভয় পেয়ে ডম্বিকে ছেড়ে দিল। জরেং খুশি হয়ে আনন্দে নাচতে শুরু করল। আর খুশিতে আনন্দে জোরে জোরে চেঁচাতে লাগল। জরেং-এর ফুর্তি আনন্দ শুনতে পেয়ে মৎস্য যুবক প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল।

জরেং তাঁর স্ত্রী ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখার জন্য নদী থেকে অনেক দূরে বড় এক গাছের উপরে ঘর বাঁধল। সেই ঘরে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতে লাগল। ডম্বিকে পানি নেওয়ার বারণ করল। জরেং নিজেই নিচে গিয়ে গোসলসহ যাবতীয় সাংসারিক কাজের জন্য পানি তুলে নিয়ে আসত। সে মনে মনে ভাবল গাছের উপরের ঘরে বসবাস করাটা জলজন্তু বা শত্রু থেকে নিরাপদ।

কিন্তু ঐদিকে পানির সেই মৎস্য যুবক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ যে ডম্বিকে একদিন ফিরে আসতেই হবে। সে তাঁর কর্মচারীদের নিয়ে ডম্বিকে খুঁজতে লাগল। ডম্বিকে এই খোঁজার রাস্তাকে তাঁরা ডম্বিকে ফিরে পাওয়ার রাস্তা’ (Dombiko Am∙ani Rama) নামে নাম রাখল (বর্তমানে এই রাস্তা মেঘালয় রাজ্যে গারো পাহাড়ের আরুয়াকগিরি এবং নকখাটগিরি নামক জায়গায় দেখা যায় বলে লোকমুখে শোনা যায়)। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ডম্বির অবস্থান জেনে যায়।
নদী থেকে গাছের উপর তৈরি বোরাং পর্যন্ত ট্যানেল করার পরিকল্পনা করল । এই কাজ করতে অনেক জলজ প্রাণি যেমন প্রকা- সাংকিনি (এক ধরনের জলজ প্রাণি),ইল,অসংখ্য কাঁকড়া, জলের প্রকা- টিকটিকি, ছোট জাতের কুমির, প্রকা- বোয়াল, শিং ইত্যাদি এ কাজে অংশগ্রহণ করলো। নদীর স্রোতের সাহায্যে ট্যানেল-এর কাজ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ হলো। উপর থেকে সহজে বোঝার উপায় ছিলো না মাটির নিচে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কী ধরনের কাজ হয়েছে।
গ্রীম্মকালে সারারাত বৃষ্টি হতে লাগল। নদীতে প্রচ- পানির স্রোত ও বন্যা বয়ে যেতে লাগল। সারারাত ঝড় হাওয়াসহ বৃষ্টি হলে মৎস্য যুবক জরেংকে সর্তক করে বলে, তোমরা ডুরা পাহাড়ে চলে যাও, পাহাড় ধ্বসে ডুবে যাবে। কিন্তু জরেং বিশ্বাস করতে পারল না, কেননা নদী থেকে অনেক দূরে ছিলো তাদের অবস্থান। জরেং ও তাঁর পরিবার নিশ্চিন্তে রাতে ঘুমাতে গেল। বিপদ সন্নিকট তা জরেংয়ের ভাবনা কিংবা কল্পনাতেও আসেনি।
পরেরদিন সকালে গ্রামবাসী পিপিল গাছসহ বোরাং কিছুই দেখতে পেলো না বরং দেখল বড় একটি লেক হয়ে গেছে। বোরাংসহ পরিবারের সকলে তলিয়ে গেছে গভীর জলে। বর্তমানে এই লেকই-ই ডম্বি ওয়ারি বা ডম্বি’র জলাশয় নামে পরিচিত। বর্তমানে গারো পাহাড়ে Emangiri Government Reserve Forest নামে এই লেকটি দেখা যায়।

গল্পটি বলেছেন খালসন সাংমা রংমুথু
গ্রাম ইমাংগিরি, গারো পাহাড়, মেঘালয়

।। অনুবাদ :  সুমনা চিসিম

ছবি : চালাং রিছিল



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost