Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

পাহাড়, পর্যটন, সৌন্দর্য ও বাস্তবতা ।।  মিঠুন কুমার কোচ

প্রকাশিত : জুন ১২, ২০২১, ১১:০৭

পাহাড়, পর্যটন, সৌন্দর্য ও বাস্তবতা ।।  মিঠুন কুমার কোচ

আমরা যারা পাহাড়ে বেড়াতে যাই, দু হাত ভরে পাহাড়ের সৌন্দর্য কুড়াই, সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে ফটোসেশন করি, তারপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে লাইক, লাভ রিয়েক্ট ও কমেন্ট কামাই, তারা কি পাহাড়ি সৌন্দর্যের বিপরীত দিকটা কখনো ভেবে দেখি? এক মুহূর্ত অনুভব করার চেষ্টা করি কি? আমরা কি আদৌ ভাবি যে, চূড়ান্ত চিত্তবিনোদনের স্থান হিসেবে দেখে পাহাড়কে আমরা স্রেফ বিনোদন ও পর্যটনের স্থানে পরিণত করে ফেলছি, পাহাড়ের স্বাভাবিক ও সহজাত সৌন্দর্যকে ম্লান করে ফেলছি, জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যবাহী এবং প্রবহমান প্রথাগত পাহাড়ি জীবনধারায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছি? নিজেদের অলক্ষ্যে ও অজান্তেই আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলার তথাকথিত সব বিনোদন পার্ক, পর্যটন স্পটে গিয়ে নান্দনিক সব ছবি তুলে দুর্গম পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি আদিবাসীদের সংগ্রামী জীবন ও তাদের সমস্যাগুলো আড়াল করে ফেলছি না তো? মেঘের রাজ্য নামে খ্যাত সাজেক কিংবা চন্দ্রপাহাড়ের (প্রকৃত নাম শং নাম হু) পাদদেশে তোলা আপনার, আমার সুন্দর ছবির ছায়ায় আড়ালে রয়ে যায় পাহাড়িদের দুঃখ-কষ্টে যাপন করা অধারণকৃত ফ্রেমবিহীন জীবন্ত ছবিগুলো, পর্যটকদের জৌলুস ও আনন্দের আমেজে ঢাকা পড়ে যায় পাহাড়িদের উচ্ছেদ করে গড়ে তোলা পর্যটনের নিষ্ঠুর ইতিহাস, কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কারণে বসতভিটা ও হাজার হাজার একর ফসলি জমি হারিয়ে উদ্বাস্তু ও দেশান্তরী হওয়া পাহাড়ি আদিবাসীদের চোখের জল কাপ্তাই লেকের বিস্তৃত গভীর জলে একাকার হয়ে ডুবে থাকে, আর ভেসে থাকে শুধু কাপ্তাই বাঁধের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও উন্নয়নের গল্প। এককালে কাপ্তাই বাঁধের কারণে কর্ণফুলী নদীর উপচে পড়া জলে অনেক পাহাড়ি হারিয়েছিলো তাঁদের বসতভিটা, ফসলি জমি; অন্যদিকে, এখন পানীয় জলের অভাবে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে অনেক অসহায় পাহাড়ি। কী বৈপরীত্য!
১৩ নভেম্বর, ২০২০ সালে দৈনিক ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত এক কলামের তথ্যানুযায়ী,  “দেশের পার্বত্য অঞ্চলে ২০০টি মারমা ও ম্রো পরিবারকে ভিটে ছাড়া করার ফসল হচ্ছে আজকের নীলগিরি। নীলাচলের পর্যটন রিসোর্ট উন্নয়নে ত্রিপুরা, মারমা, তঞ্চগ্যা মিলে ১০০ পরিবার বিলীন হয়েছে। মারমা ও ত্রিপুরা পাড়ার ৩০০টি পরিবার উচ্ছেদের চিহ্ন বহন করে চলেছে এই বগালেক। বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বমদের উচ্ছেদ করে গড়া হয়েছে অনিন্দ্য পর্যটন কেন্দ্র। কেওক্রাডং পাহাড়ে ৬০০ একর জায়গা দখল করে স্থাপন করা হয়েছে বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। এক সাজেক ভ্যালি সাজাতে ২০০৮ সালে সাতটি গ্রামের ৭০টি ঘর পোড়ানো হয়েছে। তারপরেও পাহাড়িদের আন্দোলন না থামায় ২০১০ সালে ৫০০ ঘরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। রেং ইয়ং ম্রো নেংচেন তার লেখায় বান্দরবনের দুরবস্থা তুলে ধরে বলেন যে, উন্নয়নের নামে পামিয়া পাড়া, আদু পাড়া, দিরি পাড়ার ছড়ার ওপর ট্রাক চালিয়ে তাদের খাবার পানি ঘোলা করা হয়েছে। পাথর শ্রমিক পাহাড়ি নারীকে ধর্ষণ করেছে। ডেবা পাড়া, ক্রামাদি পাড়া, রামরী পাড়া, সাক্ষয় পাড়া, ক্লাংতুং, কোয়াং নাইচ্য কুয়া গ্রামের যেই মানুষগুলো কোনো এক ভীষণ শীতের রাতে কাঁদতে কাঁদতে ভিটে ছেড়েছিল, তারাই নিজেদের জায়গা জমি এক কোম্পানির দখলে চলে যাবার পর সেই ভিটে মাটিতেই সস্তায় মজুরি খাটছে। যত দিন না এইসব জাতিগোষ্ঠীর ভূমির সঙ্গে তাদের আদি সম্পর্ককে স্বীকার করে না নেওয়া হচ্ছে, ততোদিন দখলের এই ত্রাস, সন্ত্রাস বেঁচে থাকবে। শুধু মরবে পাহাড় আর তার সন্তানরা।”
তাই আমি বলি কি, প্রকৃতিপ্রেমিক কিংবা ভ্রমণপিয়াসী হিসেবে আপনি পাহাড়ে যেতেই পারেন, কিন্তু আপনার পার্বত্য এলাকায় এই ভ্রমণ যেন নিছক বিনোদনকেন্দ্রিক বা ছবিসর্বস্ব না হয়, শহরের কোলাহলমুখর যান্ত্রিক জীবন থেকে ছুটি নিয়ে আপনি যখন পাহাড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে যান, একটু প্রশান্তির অনুসন্ধান করেন তখন একান্তে, একটু নিরিবিলিতে উঁচুউঁচু পাহাড়ের সৌন্দর্য ও মৌনতার আড়ালে গহীন পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসরত পিছিয়ে থাকা সুবিধাবঞ্চিত পাহাড়িদের কথাও একটু ভাবুন, তাদের যাপিত জীবনের স্থানে কল্পনায় নিজেকে প্রতিস্থাপন করে দেখুন, চোখের দেখার পাশাপাশি পাহাড়ি সংগ্রামমুখর জীবনের কথাও হৃদয়ঙ্গম করতে চেষ্টা করুন, বাহ্যিক সৌন্দর্য অবলোকন করার ফাঁকেই একটু নিভৃতে অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে গহীন অরণ্যে বসবাসরত পাহাড়ি আদিবাসীদের জীবনবৃত্ত বোঝার প্রয়াস করে দেখুন। আপনার সুন্দর ছবির পাশাপাশি পাহাড়িদের দুঃখ-কষ্টের চিত্রটাও ফুটে উঠুক আপনার ছবির এলবামে। আপনার ট্রাভেলোগের বর্ণনায় স্থান পাক পশ্চাদপদ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংগ্রামমুখর জীবনকেন্দ্রিক আপনার উপলদ্ধিজাত অভিজ্ঞতাগুলো। তবেই না আপনার পাহাড়ভ্রমণ হবে তাৎপর্যময় ও ভারসাম্যপূর্ণ।
।। মিঠুন কুমার কোচ : যুগ্ম আহ্বায়ক, বাংলাদেশ কোচ আদিবাসী ইউনিয়ন;  সহ সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম।





সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost