Thokbirim | logo

৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

পর্যটন ও উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল করে উচ্ছেদ ।। দীপংকর ত্রিপুরা

প্রকাশিত : জুন ০১, ২০২১, ০৯:২৫

পর্যটন ও উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল করে উচ্ছেদ ।। দীপংকর ত্রিপুরা

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ এবং বহুজাতির দেশ। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালির বাইরেও ১৪ টি ভাষাভাষীর জাতি গোষ্ঠীর ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছে।
কিন্তু এই স্বাধীন দেশে ক্ষুদ্র জাতিসত্তারা কি সত্যি স্বাধীনভাবে আছে? আজকে যদি আমরা বর্তমান প্রেক্ষাপটটা যদি দেখি তাহলে উচ্ছেদ ও বিতারিত ছাড়া কোনোকিছু দেখতে পাবো না। ধরা যাক আদিবাসীদের কথা। আদিবাসীরা এই দেশে আদিকাল থেকে বসবাস করছে। কিন্তু রাষ্ট্র তাদেরকে নানাভাবে হেয় করে বৈষম্য আচরণ করছে। একবার উপজাতি, একবার আদিবাসী বলছে। আর এখন বলছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। আমরা যদি সংখ্যায় কম বলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হই তাহলে সংখ্যা গরিষ্ঠ বাঙালি বৃহৎ নৃগোষ্ঠী নয় কি? আর অন্যদিকে বাংলাদেশের বসবাসরত সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাদের পঞ্চদশ সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয় দেওয়া হয়েছিল। তা কখনো একজন স্বয়ং সম্পূর্ণ জাতির প্রতি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ একজন মানুষের পরিচয় হয় তার ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য, পোশাকে ও জাতির পরিচয় উপর ভিত্তি করে। কিন্তু এ স্বাধীন রাষ্ট্র তা অস্বীকার করছে।
এ যে বিষয়টা প্রতিটি স্তরে স্তরে রাষ্ট্র আদিবাসীদের যেভাবে বৈষম্য আচরণ করছে তা কোনো সভ্য দেশে কাম্য নয়।
অন্যদিকে রাষ্ট্র এদেশের আদিবাসীদের জায়গায় পর্যটন ও উন্নয়নের নামে যেভাবে প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের ভূমি বেদখল করছে তা যদি বন্ধ করতে না পারি তাহলে আগামিতে এদেশের আদিবাসীদের অস্তিত্ব টিকে থাকবে কিনা সন্দেহ জাগে।

পর্যটন ও উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় বহু প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতাসীনরা জায়গা জমি বেদখল করে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে। এবং এসব কিছু করার জন্য রাষ্ট্রীয় উগ্র জাতীয়তাবাদ দুর্দান্তভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষেত্রে ‘বাঙালি- মুসলমান ‘ এ জাতীয়তাবাদ খুব কার্যকর। পাহাড়িদের দ্বারা বাঙালি মুসলমানরা আক্রান্ত হতে পারে এমন ভয় ধরিয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে জায়গায় জায়গায় সামরিকায়ন করার পক্ষে সমর্থন আদায় করে। তারপর সরকারের কাছে আকুতি মিনুতি করে হলেও পাহাড়িদের জায়গায় পর্যটন গড়ে তুলবে এবং সেখনে নিরাপত্তার অজুহাতে সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করে তোলছে। তারপর সেখানে পর্যটকরা ঘুরতে যাবে কিন্তু পর্যটকরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে না দেখে আশেপাশের স্থানীয় আদিবাসীদের “দর্শনীয় ” উপাদান হিসেবে নজরে নিয়ে ছবি তোলে বিভিন্ন অনলাইনে ছড়িয়ে দিচ্ছে। এবং অনেক সময় দেখা গেছে যে, পর্যটকদের কর্তৃক সেখানকার আদিবাসী নারীরা বিভিন্নভাবে হেনস্তা ও শ্লীলতার শিকার হচ্ছে। তাহলে রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও পর্যটন কি আমাদের ভাগ্যে পরিবর্তন ঘটেছে নাকি উচ্ছেদ ও অনিরাপদের ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে।
রাঙামাটি সাজেক একসময় ত্রিপুরা ও লুসাই জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। তাদের জীবনযাপন খুব সাদাসিধে জীবনযাত্রায় পাড় হতো। জুম চাষে নির্ভর হতো তাদের জীবনমান। কিন্তু এখন সে সুযোগটুকুও কেড়ে নিয়েছে রাষ্ট্রীয় মিলিটারি বাহিনী। তাদের কাজ রাষ্ট্রকে বাহ্যিক শত্রু থেকে দেশকে রক্ষা করা কিন্তু ইদানিং তারা পর্যটন ব্যবসায় নেমে পড়েছে আর তাদের নজরে পার্বত্য চট্টগ্রাম। সে সাজেক এখন বড় বড় রিসোর্ট, হোটেল- মোটেলে ভরে গেছে। উচ্ছেদ হয়ে গেছে সেখানকার আদিবাসীরা।

কয়েকমাস আগে আমরা দেখেছি বান্দরবান চিম্বুক পাহাড়ে ম্রোদের ভুমি বেদখল করে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে এমন প্রকল্প হাতে নিয়েছে যে, পর্যটকদের এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ঘুরার জন্য বিশেষ এক ধরনের ক্যাবল কার ব্যবহারের সুবিধা থাকবে, সুইমিংপুলসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক সুবিধা থাকবে। অর্থাৎ এটিই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও ব্যয়বহুল অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।

পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় এসব আয়োজন থাকলেও স্থানীয় ম্রোদের জন্য আশংকা আর ভয় ছাড়া কিছুই নেই। ম্রোদের আশংকা হচ্ছে এই জায়গায় পর্যটন হলে তাদের প্রায় ১ হাজার একরের অধিক ভূমি বেদখল হয়ে উচ্ছেদ হতে হবে পাঁচটি গ্রামের মানুষ । উদ্বাস্ত হবে দশ হাজার জুম চাষি পরিবারের। জীবনমান ভাটা পড়বে। অথচ এসব করা হচ্ছে পর্যটকদের জন্য। এসব উন্নয়ন নামে করা হচ্ছে পর্যটন। কিন্তু আমরা তো এসব পর্যটনের নামে উন্নয়ন প্রয়োজন করেনি। আমরা যেখানে স্কুল, কলেজের অভাবে আমাদের ছেলে মেয়েদের পড়া লেখা করাতে পারছিনা, হাসপাতাল এর অভাবে চিকিৎসা নিতে পারছি সেখানে পর্যটনের আশা খুবই হতাশা করে তোলে। রাষ্ট্র যদি দেশের আদিবাসীদের উন্নয়ন চায় তাহলে প্রতিটি গ্রামে গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাসপাতাল করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু রাষ্ট্র তা না করে আদিবাসীদের জায়গা বেদখল করে উন্নয়নের নামে পর্যটন গড়ে তোলে এবং স্থানীয় আদিবাসীদের উচ্ছেদ করছে।

রাষ্ট্র কি ম্রো আদিবাসীদের কান্না শুনতে পায় না? শুনতে পায় না সাজেক নীলগিরর কান্না?

ইদানিং আবার দেখতে পাচ্ছি খাগড়াছড়ি গুইমারার জালিয়া পাড়া থেকে মহালছড়ি রোডে নতুন পাকা রাস্তা করা হয়েছে। আর সে জায়গায় নাকি একশত পরিবার বহিরাগত মুসলিম বাঙ্গালি পরিবারকে সেটেল করা হবে। এবং সেখানে তাদের নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। তার পাশাপাশি সেখানে রিসোর্ট করা হবে পর্যটন গড়ে তোলা হবে। তারপর সেখাকার ত্রিপুরা আবার উচ্ছেদ হতে হবে এমন ভয়ের কথা এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।

পাহাড়ের মানুষের অধিকার নিয়ে যারা রাজনীতি করেন বিভিন্ন গ্রুপের নেতারা তারা অনেক হিসাব নিয়ে এ পর্যটন ও ভূমি বেদখল বিষয়ে লিখালিখি করেছে, প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র তাতেও কোনো টনক নড়েনি। তারপরও যদি আমরা এভাবে চুপ করে বসে থাকি তাহলে ভবিষ্যতে আরো অন্ধকার পরিস্থিতি মুখোমুখি হতে হবে। তাই এখন থেকে আমাদেরকে নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। যেখানে আদিবাসীদের জায়গা দখল করে উন্নয়নের নামে পর্যটন গড়ে তোলবে সে পর্যটন বা উন্নয়নকে আমরা প্রত্যাখান করতে হবে এবং বর্জন করতে হবে। প্রতিরোধ গড়ে তোলতে হবে। আমরা এটাও জানিয়ে দিতে হবে যে আমরাও পর্যটন দেখতে চাই, উন্নয়নের অংশীদার হতে চাই, কিন্তু তা সবার জন্য সহায়ক হতে হবে। কারোর ক্ষতি করে কোনো উন্নয়ন আমরা চাই না তা রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষকে পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিতে হবে। আমরা কোনো উন্নয়ন বিরোধী নয়। দেশের উন্নয়ন রোল মডেলে আমরাও অংশীদার হতে চাই। কিন্তু দয়া করে আমাদের উচ্ছেদ করে উন্নয়ন নয়।

ঠিক একইভাবে পাহাড়ে যেভাবে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে উন্নয়নের তকমা লাগানো হচ্ছে সমতলেও তার ব্যতিক্রম নয়।

কিছুদিন আগে জানা গেছে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর টেলকীতে আদিবাসীদের ভূমি ও কবরস্থানের উপর ইকো-ট্যুরিজম উন্নয়নের নামে গাছ কেটে গেস্ট হাউজ ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণের প্রকল্প হাতে নিয়েছে বন বিভাগ। আর তারই প্রতিবাদে মধুপুরের বিক্ষুব্ধ আদিবাসী জনতার সমাবেশ করতে দেখা গেছে। ভাবা যায় শশ্মানের মতো একটা পবিত্র স্থানকে পর্যন্ত তারা ছাড় দেয় না। মুসলমানদের যেমন কবর স্থান পবিত্র তেমনি আমাদের শশ্মানও একটা পবিত্র স্থান। যেখানে মৃত্যুর পর সবাই সেখানে সমাধিত হতে হয়। তাই ঐ জায়গাটিই সবসময় সুরক্ষিত করে সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু আদিবাসীদের শশ্মান বলে সেটাও আজ বেদখলের পথে। তাহলে আমরা কোন সভ্য পথে বাস করছি। যেখানে আমাদের দাঁড়িয়ে থাকার মতো ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার পর সমাধিত মাটিও কেড়ে নিতে চাইছে। আর যখন এসব বিষয়ে প্রতিবাদ প্রতিরোধ গড়ে তুলি তখন উল্টো প্রতিবাদীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে আমরা কি রাষ্ট্রের কাছে অভিযোগ করার সুযোগ পাবো না নাকি আদিবাসীদের এদেশে স্বাধীন ভাবে বসবাসের সুযোগ নেই?
আমি আগেও বলেছি এখনও বলছি দেশের যে উন্নয়নের রোল মডেল হচ্ছে আমরাও তার অংশীদর হতে চাই। কিন্তু তা কারোর ক্ষতি করে নয়। একটি দেশ উন্নতি হতে হলে সেদেশের কোন একটা জাতিকে পেছনে ফেলে উন্নতি হতে পারবে না। উন্নতি হতে হলে দেশের সকল জাতির একই তরীতে এগিয়ে যেতে হবে। তাই রাষ্ট্রের কাছে আমার আহ্বান দেশকে এগিয়ে নিতে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক উন্নয়নে করুন। তাদের শিক্ষা সাংস্কৃতিক উন্নয়ন করুন পর্যটন নয়। দুর্গম এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হাসপাতাল নিশ্চিত করুন। তাতে দেশ ও দেশের সব জনগোষ্ঠী একস্রোতে এগিয়ে যাবে।
অবশেষে বলবো পর্যটনের ও উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল বন্ধ করুন। একই সাথে দেশের সকল জাতিসত্তার মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost