Thokbirim | logo

৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

পর্যটন এবং বাংলাদেশের গারো জনগোষ্ঠী ।। প্রত্যয় নাফাক

প্রকাশিত : জুন ০১, ২০২১, ১২:৩০

পর্যটন এবং বাংলাদেশের গারো জনগোষ্ঠী ।। প্রত্যয় নাফাক

বাংলাদেশে যেসকল জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় নানা নিপীড়ন এবং বৈষম্যের স্বীকার হয় তার মধ্যে অন্যতম বঞ্চিত জনগোষ্ঠী হলো গারো আদিবাসী জনগোষ্ঠী। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের হয়তো গারো জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলতে ঘুর আপত্তি থাকতেই পারে কিন্তু বাংলাদশের মত বহুজাতিক রাষ্ট্র কাঠামোতে গারোরাও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতই একক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে জাতি হিসেবে সকল বিষয় পূরণ করে। পর্যটন নিয়ে কথা বলতে গেলেই দুই রকম বিষয় আমাদের চোখের সামনে এবং চিন্তায় মগজে চলে আসে।

প্রথমত, পর্যটন বা তথাকথিত পর্যটন শিল্প এমন এক চাকচিক্য ময়, আনন্দময় মুহূর্ত বা সময়কে নির্দেশ করে যেখনে নিপীড়ন শোষণ উৎপীড়ন এসব নিয়ে আলাপ কিংবা আলোচনার কোনো সুযোগ রাখে না। অন্যদিকে একদল জনগোষ্ঠীর কাছে পর্যটন নামের সাথে জড়িয়ে আছে ভূমি হারানো, নিজেদের সংস্কৃতি অস্তিত্বকে দমন পীড়নে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া।

আমরা আজকে আলোচনা করব বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কাঠামোর পর্যটন শিল্পের ফাঁদে পড়ে কতখানি নাজেহাল অবস্থায় রয়েছে গারো জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশে সমতলে গারো অধ্যুসিত অঞ্চলগুলোতে যে পরিমাণে পর্যটনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় তৎপরতা বেড়েছে এতে আসলে বোঝা মুশকিল পর্যটকরা কি দেখতে যাবে মনোরম পরিবেশ নাকি ভিন্ন চেহারার একদল জনগোষ্ঠীর জীবন স্রোতধারা যা আজ বিপন্ন। বর্তমান সময়ে গারোদের যে সকল অঞ্চলগুলোতে পর্যটনকে কেন্দ্র করে নিপীড়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো মধুপুর। যেখানে শুধু বনকে কেন্দ্র করে যুগের পর যুগ বসবাস করে আসছে গারো জনগোষ্ঠী। যে জনগোষ্ঠী বনকে মায়ের সাথে তুলনা করে বনকে আঁকড়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে সেখানে পর্যটন শিল্প ইকো ট্রুরিজম এসবের নামে বন এবং তথাকথিত শিল্পকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে রাষ্ট্র ।

এতে শুধু পরিবেশ নয় বন এবং বন সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রাণের স্পন্দন হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। মধুপুরে বন দখল আজকে একদিনের বিষয় না বহুবার বনবিভাগ কর্তৃক বিভিন্ন পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে যার ফলে গারো জনগোষ্ঠী মাঠে নেমে এসেছে। বনকে রক্ষা করতে নিজেদের জীবন বিলীন করে দিয়েছে বনকে আঁকড়ে। সম্প্রতি কয়েক মাস ধরে গারোদের আদিধর্ম সাংসারেক ‘র শ্মশান যাকে গারোরা মাংরুদাম বলে চিনে সেই শ্মশান কয়েকটি গারো গ্রাম বনবিভাগের ইকো-ট্যুরিজম এবং আরবোরেটাম ফাঁদে কাটা পড়ছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ১৯৬২ সালে মধুপুরের শালবনটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করার পর থেকে সংকট তৈরি হয়েছে। প্রাকূতিক এই বন বনবিভাগের আন্ডারে চলে যাওয়ার পর থেকে শালগাছ কেটে বিভিন্ন বিদেশি গাছ লাগনোর অভিযোগ করে আসছে মধুপুরের গারো আদিবাসীরা যার ফলে বনকে কেন্দ্র করে যে জীবন ধারা তা বাধাগ্রস্ত হয়ে চলেছে । নানা নামে নানান উপায়ে বনবিভাগের যে পরিমাণ দৌরাত্ম বেড়েছে এর অন্যতম নির্দশন হলো এই ইকো ট্যুরিজম এবং আরবোরেটাম যার ফলে নতুন করে মধুপুরের প্রায় ১৩টি গারো গ্রাম আক্রান্ত হচ্ছে । এতে যুগযুগ ধরে বসবাস করে আসা গারো জনগোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে ।

আমার এই লেখার অন্যতম কারণ হলো এই সময়ে বাংলাদেশে যেসকল স্থানগুলোতে গারোরা এই পর্যটনের ফাঁদে নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে তা একটু পর্যালোচনা করা । শুধু মধুপুরে বন দখল করছে এমন নয়। নালিতাবাড়ি থানার বারমারী মিশন সংলগ্ন পশ্চিম আন্ধারু পাড়া গ্রামে ইকোপার্কের নাম করে আবারও গারো আদিবাসীদের ভূমি দখলের পায়তারা করছে সরকার । প্রায় চার একর পঁয়ত্রিশ শতাংশ জমির মধ্যে ১১টি গারো পরিবারের বাস এই আদিবাসী গ্রামে। যেখান থেকে গত কিছুদিন আগে এই গারো পরিবারদের গুচ্ছগ্রামে চলে যাওয়ার জন্য জোরজবরদস্তি করা হয় ।

এই গুচ্ছগ্রামটা আসলে কী? বোঝতে হলে আপনাদের যেতে হবে সম্প্রতি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট অঞ্চলের গারো গ্রামগুলোতে যেখানে সরকারি উদ্যোগে গোবরাখালিতে গারোদের গুচ্ছগ্রাম তৈরি হচ্ছে । ভুমহীন একদল গারো পরিবারগুলোকে স্থাপন করা হবে তথাকথিত খাস জমিতে । কিন্তু যারা এই মহান কাজ করছেন তাদের পক্ষে আলোচনা জরুরি ছিলো এই গারো পরিবারগুলো কীভাবে নিজের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে কীভাবে নিজেদের জমি হারাচ্ছে, কীভাবে হয়ে গেছেন ভূমিহীন। এই রাষ্ট্রীয় এক্টরগুলো আলোচনা না করলেও আমরা মিলিয়ে নিতে পারি নালিতাবাড়িতে গারোদের গুচ্ছগ্রামে চলে যেতে বাধ্য করা গারোদের জমি দখল করে আর এইদিকে বিভিন্ন জায়গায় গারো গুচ্ছগ্রাম গড়ে তোলার পায়তারা কোনদিকে নির্দশন করে । আরো সহজ করে আলোচনা করলে দেখতে পাবেন হালুয়াঘাটে যেখানে গারো গুচ্ছগ্রাম হচ্ছে তার পাশে একই গ্রামে তৈরি করা  হচ্ছে পর্যটন । খোঁজ নিলে জানা যাবে যে জায়গায় এইসব প্রকল্প করা হচ্ছে যেগুলো আসলে গারো বসতির আশেপাশে তথাকথিত মনোরঞ্জন তো দূর বরং গারো গ্রামকে কেন্দ্র করেই তৈরি হচ্ছে এসব পার্ক ।

 

শুধু এখানে থেমে আছে বললে আপনাদের ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে হবে  সিলেটের গারো আদিবাসীরা কেমন আছে সেই দিকটায় । সিলেটের তাহিরপুর উপজেলার মেঘালয় সীমানাকে কেন্দ্র করে বসবাস করা গারোরা সব থেকে করুনভাবে বসবাস করছে । চারদিক থেকে সেটেলমেন্ট হওয়া বাঙালির বসতি তৈরি হয়েছে যাদের অধিকাংশ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভুমি হারানো ছিন্নমুল বাঙালি জনগোষ্ঠী। আজকে যারা জোর-জবরদস্তি করে গারো জনগোষ্ঠীর জমি দখল এবং নারী নির্যাতনে যুক্ত । সম্প্রতি খবর মিলে ৬০’র দশকে পাহাড় পরিষ্কার করে তৈরি করা গারো মন্ডলি অর্ন্তভুক্ত মাঠ দখল করতে নামলে মুখোমুখি দাঁড়ায় গারো বাঙালি জনগোষ্ঠী । অন্যদিকে প্রথমআলোতে সাক্ষাৎকার দেওয়া গারো নারীর কথা নিশ্চয়  ভুলবার নয় ।

সিলেট, শ্রীমঙ্গল মৌলভীবাজারের এই অংশ জুড়ে গারো খাসিয়া মনিপুরিদের বসবাস । পাশে রয়েছে মনোরঞ্জন করা চা বাগান কিন্তু এই সব চা বাগানের মালিকদের জাতাকলে আজকে এই জনগোষ্ঠীর মানাষগুলো আজ কত বিপন্ন হলে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে পালাচ্ছে ।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আজকে এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে বসবাসরত আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো আজ বিপন্ন নিজেদের জীবন যাপন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে ।



পর্যটন ও উন্নয়নের নামে আদিবাসীদের ভূমি বেদখল করে উচ্ছেদ ।। দীপংকর ত্রিপুরা




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost