Thokbirim | logo

৬ই আষাঢ়, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২০শে জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

আদিবাসী নারীর স্বকীয়তার উপর পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আগ্রাসন কি বায়ো ওয়েপার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? ।। প্রত্যয় নাফাক

প্রকাশিত : মে ৩১, ২০২১, ২৩:৫০

আদিবাসী নারীর স্বকীয়তার উপর পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আগ্রাসন কি বায়ো ওয়েপার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে? ।। প্রত্যয় নাফাক

আদিবাসী নারী শব্দটি উচ্চারণ করতে গেলেই আমার বা আমাদের চোখের সামনে ভেসে আসবে একদল লড়াকু নারী যারা আর্থসামাজিক অবস্থায় পুরুষ কিংবা পুরুষতান্ত্রিকতার বিপরীতে নিজেদের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে। জুমের মাঠ থেকে শুরু করে ঢাকা মুখি অর্থনীতিতে দাপুটের সাথে জোরালো লড়াই করে চলেছে আদিবাসী নারী।

এছাড়াও আদিবাসী সমাজ বাস্তবতায় নারীর অবস্থানের দিকে তাকাতে গেলে আমরা চোখ রাখতে পারি গারো জনগোষ্ঠী বা খাসিয়া জনগোষ্ঠীর দিকে যারা চলমান পুরুষতান্ত্রিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেদের অর্থ, ভূমির মালিকানা, বংশ বৃদ্ধি সম্পূর্ণরুপে নারীর উপর কতটা নির্ভরশীল।

আলোচনায় এবার ফিরতে চাই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রের দিকে। একটি রাষ্ট্রের চরিত্র কোনমুখি টা খোঁজতে গেলে আপনাকে অবশ্যই রাষ্ট্রে নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থানের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা কিছুদিন আগে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রান্তিক নারীর প্রতি অবস্থা খোঁজতে গিয়ে কিছু পরিসংখ্যান হাতে এসে ধরা দেয় সেখানে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে দেখা যায় ২০১৭ সালে পুরো দেশে ধর্ষণের শিকার হয় ৮১৮ জন নারী , ২০১৮ সালে ৭৩২ জন এবং ২০১৯ সালে এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ১হাজার ৪১৩ জনে। এছাড়াও চলতি বছর ২০২০ সালে করোনাকলীন সময়ে গত ছয় মাসেই ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬০১ জন নারী ও শিশু এদের মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার হয় ৪৬২ জন গনধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে ১৩৪ জন। এই হলো সমগ্র বাংলাদেশে নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতা এবং একটি রাষ্ট্রের চরিত্র।

এবার আমরা আবারো ফিরতে চাই আদিবাসী অঞ্চল গুলোতে, সেখানে এই রাষ্ট্রের চরিত্র খোঁজতে মানে কোথায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে রাষ্ট্র? বিভিন্ন পত্রিকার তথ্যমতে জানা যায় গত এক মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে ধর্ষণের শিকার হয় ৮ জন আদিবাসী নারী। বান্দরবানের লামায় দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয় এক ত্রিপুরা নারী, মহালছড়িতে ধর্ষণের শিকার সময় এক মারমা স্কুল ছাত্রী, দীঘিনালায় পুলিশ কনস্টেবল কর্তৃত ষষ্ঠ শ্রেণির স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণ, বরকলে দুইজন সেটেলার কর্তৃক পাহাড়ি নারী ধর্ষণ, বলেপেয়ি আদামে ৯জন বাঙালি সেটেলার কর্তৃক ধর্ষণ এক প্রতিবন্ধী নারীকে এবং লুটপাট

এতো গেলো শুধু পাহাড়ে, সমতলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দিকে এবার একটু নজর দেয়া যাক যেখানে বহুল আলোচিত ধর্মীয় ফাদার কর্তৃক রাজশাহীতে তিনদিন গির্জায় আটকে রেখে আদিবাসী শিশুকে ধর্ষণ, দিনাজপুরে নবাবগঞ্জ উপজেলা পল্লিতে বাকপ্রতিবন্ধী আদিবাসী কিশোরী ধর্ষণ, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর উপজেলার গোগ্রাম ইউনিয়নের ইটাহারী গ্রামে আদিবাসী নারী ধর্ষণের চেষ্টা, মারধর হুমকি প্রদান,ময়মনসিংহের ফুলবাড়িতে গারো আদিবাসী নারীকে ৬ দিন ধরে আটকে রেখে ধর্ষণ,হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে সাঁওতাল কিশোরী কে দলবদ্ধ ধর্ষণ।এছাড়াও সম্প্রতি নওগাঁ জেলায় আদিবাসী বিধবা নারীর ভূমি দখল, মধুপুরের গারো নারী বাসন্তীর কলাবাগান বনবিভাগের কর্তন। মোটামুটি আমরা দেখতে পাচ্ছি রাষ্ট্রে আদিবাসী নারীদের অবস্থান।

এ থেকে তো আর রাষ্ট্রের চরিত্র উঠে আসে না রাষ্ট্রের চরিত্র উন্মোচন করতে গেলে আমাদের আর একটু নজর দিতে হবে রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের দিকে। যেখানে একটি রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভগুলোর প্রধান স্তম্ভ এই বিচার বিভাগ, তো এই বিচার বিভাগের কি অবস্থা দেখি একটু। সম্প্রতি “জনজাতিরকণ্ঠ ” পেজে লাইভ প্রচারিত প্রান্তিক নারীর প্রতি সহিংসতা কোন পথে রাষ্ট্র শীর্ষক আলোচনায় উপস্থিত আলোচক ব্লগার অ্যান্ড এক্টিভিস্ট পাইচিংমং মারমা আলোচনার এক পর্যায় বলেন, পাহাড়ে বিচারহীনতা সংস্কৃতি একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে এবং উন্নয়ন অধিকার কর্মী লেলুং খুমী বলেন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রান্তিক নারীদের আরো প্রান্তিকটায় ঠেলে দিচ্ছে।

উনারা বললেই তো আর হচ্ছে না তো আমরা ছোট কিছু উদাহরণ , নিয়ে আসতে পারি আপনাদের কাছে, আপনাদের কৃত্তকা ত্রিপুরার কথা মনে আছে? ২০১৮ সালের ২৮ জুলাই খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার নয়মাইল এলাকায় ১০ বছরের এই ত্রিপুরা শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করে এর বিচার কিন্তু হয়নি বা ব্যর্থ বলতে পারেন বা আপনারা কল্পনা চাকমার কথা বলতে পারেন, ধর্ষিতা দুই মারমা তরুনীর কথা বলতে পারেন।

এসব খুব পুরাতন আলাপ নতুন আলাপে আসি রাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কতটা ব্যর্থ টার প্রমান বরকলে এবং মহালছড়িতে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের ঘটনায় ১০ হাজার টাকা দিয়ে মিটমাটের চেষ্টা, এবং বহুল আলোচিত বলপেয়ি আদামের ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা প্রদান মানে যেখানে বিচার বিভাগের দায়িত্ব বিচার করা সেখানে বিচারবিভাগ কতটা ব্যর্থ হয়ে মিটমাট করতে টাকা প্রদান করছে।

আবার অন্যদিকে দেখুন বাসন্তী রেমার ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ বনবিভাগ, সেখানে আদিবাসী বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে আলাদাভাবে ক্ষতি পূরণের জন্য ফান্ড তৈরি করতে হয়েছে।

আলোচনায় একটু যুক্ত করতে পারি রাষ্ট্র কাঠামো পরিচালনা কারি সরকারের উন্নয়ন নামা। দেশে প্রতিটি জায়গায় বিশাল বিশাল ফ্লাইওভার দিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়ন নামাট সূচনা হলেও এই উন্নয়ন দূরবর্তী পাহাড় বা সমতলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাচ্ছে যদিও সেখানে বিচার বিভাগ পৌঁছাতে পারে না৷ পাহাড় বা সমতলের আদিবাসী সংগঠনগুলো বারবার দাবি করে এসেছে আদিবাসীদের এদেশে সমস্যা মূলত রাজনৈতিক সমস্যা ভূমির সমস্যা। আজকে আদিবাসীদের একর কে একর জমি লুট করা হচ্ছে বন পাহাড় দখল করা হচ্ছে এবং এই লুটপাট করতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে ধর্ষণের শিকার হচ্ছে আদিবাসী তরুণী নারী। কিন্তু রাষ্ট্র তার উন্নয়নে অনড়, রাষ্ট্র আদিবাসী নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে ধরিয়ে দিচ্ছে সাজেক, নীলগিরি, নীলাচল, মেঘলা, ইকোপার্ক, রিজার্ভ ফরেস্ট কিংবা এনজিওদের ভাতা।

পুরো আলোচনা থেকে আপনার মাথায় রাখতেই হবে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিচালিত হওয়া রাষ্ট্র আদিবাসী নারীদের স্বকীয়তার উপর আঘাত হানতেই আগ্রাসন মুখি হচ্ছে কিনা।

কভার প্রচ্ছদের ছবি থকবিরিম



গারো লেখক অভিধান : রেভা. ফাদার শিমন হাচ্ছা

https://www.youtube.com/watch?v=_9KvyZPYsMs




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost