Thokbirim | logo

১০ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

একজন ভালো মনের মানুষ ব্রাদার গিয়োম ।।  কিউবার্ট রেমা

প্রকাশিত : এপ্রিল ১৭, ২০২১, ২২:১৮

একজন ভালো মনের মানুষ ব্রাদার গিয়োম ।।  কিউবার্ট রেমা

কত অজানারে জানাইলে তুমি,

কত ঘরে দিলে ঠাঁই-

দূরকে করিলে নিকট বন্ধু,

পরকে করিলে ভাই (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)।

ছোট-বড়, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, যুবক-যুবতী এবং সকল পেশার মানুষের কাছে যিনি পরিচিত, শ্রদ্ধাভাজন, যিনি অনেকের শিক্ষক বা অনেকের গুরু, যার কাছে অনেক মানুষ ঋনি অথবা চিরকৃতজ্ঞ, যিনি অনেক গরিব দুঃখিদের আশার নাম অথবা পথ শিশুদের আশ্রয় তিনি হলেন-নেদারল্যান্ডের রাজা কর্তৃক ভূষিত “অ্যাওয়ার্ড অব দ্যা কিং” মানবতার একজন জ্বলন্ত প্রমাণ, আর তিনি কেউ নন, তিনি হলেন আমাদের সবার প্রিয় ব্রাদার গিয়োম। আমি ময়মনসিংহ তেইজে ব্রাদার্স হাউসে আসি ২০১৮-সালে আর তখন থেকেই আমার ব্রাদার গিউমের সাথে পরিচয়। ব্রাদার গিউমের সাথে পরিচয় মাত্র আড়াই বছরের, তবে এই আড়াই বছরে ব্রাদার গিউমের বিষয়ে যা দেখেছি, যা শুনেছি এবং যা বুঝেছি তা সম্পূর্ণ লিখতে পারলে আমার মনে হয় একটা উপন্যাসের চেয়ে কম হবে না।

ময়মনসিংহ তেইজি ব্রাদার্স হাউসে থাকার সুযোগ পাওয়ার আগেই আমি ব্রাদার গিউমের নাম শুনেছি, তবে উনাকে দেখার সুযোগ তখনও হয়ে উঠেনি। ব্রাদার গিউম বলতেই আমার চোখে ভেসে উঠতো যে, তিনি হয়ত সুন্দর দামি পোশাক আর দামি জুতা পরিধান করে থাকবেন। কারণ, আমি ছোটবেলা থেকেই বিদেশি অনেক ডোনাদের দেখেছিলাম আর তারা অনেক দামি পোশাক পরতেন। তবে ময়মনসিংহ তেইজে ব্রাদার্স হাউসে আসার প্রথম দিনিই একজন বৃদ্ধ (তবে বেশ শক্তিশালী ছিল), খুবই সাধারণ পোশাক পরিহিত ও পুরাতন জুতা পরিহিত লোকের সঙ্গে দেখা হল। আমি তখন কাউকে চিনতাম না। আমাকে দেখে সেই লোকটি আমার কাছে এগিয়ে এলেন এবং পরিচয় দিলেন যে,“ তিনি ব্রাদার গিউম”। আমি এটা শুনে খুবই আশ্চর্য হয়েছিলাম কারণ আমি যা ভেবেছিলাম সেই সবই মিথ্যা প্রমাণিত করে আমার সাথে বন্ধুর মত মেলামেশা করতে লাগল। আমি তখনই বুঝতে পেরেছিলাম যে,  ব্রাদার গিউম সাধারণের মাঝেও অসাধারণ ও অনেকের মাঝে অনন্য। আর এই অনন্য গুণাবলির জন্যই আজও তিনি সকলের কাছে এত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র।

ব্রাদার গিউম গাছ-পালা অনেক পছন্দ করেন আর এজন্য তিনি একটি সুন্দর বাগান তৈরি করেছেন। বাগানের গাছ-পালা তিনি নিজ সন্তানদের মতই ভালোবাসেন ও যত্ন করেন। তার কোন গাছ বা গাছের চারা নষ্ট করা আর উনার কোমল মনে সুঁচের আঘাত করার শামিল। তিনি শুধু যে, গাছ-পালাই ভালোবাসেন তা নয়; বরং সৃষ্টির সকল জীবকেই তিনি ভালোবাসেন। আমাদের বাগানে অনেক মশা আছে, একদিন ব্রাদার গিউমের সাথে উনার বাগানে কাজ করছিলাম।

তখন আমি মশা মারছি আর ব্রাদার গিউমের কাছে অভিযোগ করে বলছিলাম, “ব্রাদার! আমাদের বাগান থেকে সকল মশা মেরে ফেলা উচিত”। তখন ব্রাদার গিউম আমাকে বললেন, “ মশাদেরও প্রাণ আছে, তাদেরও এখানে থাকার অধিকার আছে”। তুমার রক্ত খেয়ে তারা তুমাকে আর্শিবাদ করবে। এজন্যই হয়ত উনাকে শত মশা কামড়ালেও মশাগুলোকে তিনি প্রাণে মেরে ফেলেন না, বরং সুন্দর করে শুধু তাড়িয়ে দেন। এছাড়াও তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে ভালোবাসেন। তাইতো তিনি বাচ্চাদের কোলে নিয়ে তাদের আদর করেন, শত বিরক্ত করার পরও তাদের বকা দেন না বরং তাদের বুঝিয়ে বা কিছু সান্ত¡না দিয়ে তাদের বিদায় করেন। তিনি  গরিব ও পথ শিশুদের জন্য স্টেশন ক্লাব, জিপসি ক্লাব ও পড়াশুনার জন্য স্কুল পরিচালনা করেন। এছাড়াও তাদের খাবার, পোশাক ও খেলনাও সরবরাহ করে থাকেন। অন্যদিকে যুবক-যুবতীদের জন্য তিনি সেমিনার আয়োজন করেন ও গরীব শিক্ষার্থীদের জন্য সাহায্য সহযোগীতাও করে থাকেন। এছাড়াও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য বয়ষ্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের জন্য ছোট তারা ক্লাব পরিচালনা, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য দাদু ক্লাব ও গরিব, অসহায় ও অবহেলিত মানুষদের চিকিৎসার জন্য সাহায্য করে থাকেন।

আবার অন্যদিকে, মিস. হলি দিও-এর সহযোগীতায় তিনি জেলখানায় পরিদর্শন করেন ও সেখানে গিয়ে কয়েদীদের কথা শুনেন এবং তাদের জন্য প্রার্থনা করেন। সেখানে অনেক কারাবন্দি আছেন যারা বিনা অপরাধে বা বিনা বিচারে দীর্ঘ দিন কারাগারে আছেন। তাদের মুক্তির জন্যও তিনি কাজ করেছিলেন ও করে যাচ্ছেন এবং অনেককে মুক্তও করেছেন।

ব্রাদার গিউম দুটি বিষয় খুবই অপছন্দ করেন আর সেটি হল: “ পারব না বলা আর অপচয় করা”।

ব্রাদার গিউমের নাম আমার কাছে একটি প্রেরণার নাম। কারণ, তিনি প্রতিটা কাজ আমাদের প্রেরণা দ্বারাই করিয়েছেন। যার মধ্যে ব্যবস্থাপনার একটি আদর্শ গুণটি পরিলক্ষিত হয়। তিনি সচরাচর সব কিছুই ভুলে যান; কাকে কত টাকা ধার দিয়েছেন, কাকে সাহায্য করেছেন ইত্যাদি। হয়তবা তিনি যে মানুষদের বিভিন্নভাবে সাহায্য করছেন; তিনি নিজেই তা জানেন না। এই কাজ দ¦ারা আমি বাইবেলের যিশু খ্রিষ্টের একটি বাণী স্বরণ করছি; যিশু বলেছেন,“ তুমি যখন অভাবী লোকদের কিছু দান কর, তখন তোমার ডান হাত কী করছে সেটা যেন তোমার বাম হাত জানতে না পারে”(মথি ৬:৩)। এছাড়াও তিনি আদিবাসীদের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরেন, তাদের সাথে একাত্ম হয়ে তাদের সংস্কৃতির সাথে নিজেকে মিলিয়ে নিয়েছেন। আদিবাসীদের তাদের সংস্কৃতি রক্ষায়ও তিনি প্রচুর পরিশ্রম করছেন। হারিয়ে যাওয়া আদিবাসীদের জিনিসগুলো তিনি সংরক্ষণ করেন ও নতুন আদিবাসী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দিচ্ছেন। এছাড়াও তিনি আদিবাসীদের অনেক গান সংরক্ষণ করছেন আর তার মধ্যে অনেক গানও রপ্ত করে ফেলেছেন।

শুধু আদিবাসীদের গ্রামেই গিয়েছেন তা নয়; তার বিচরণ সর্বত্র। এছাড়াও তিনি সকল ধর্মের অনুষ্ঠান যেমন:-“ওয়াজ মহ্ফিল, বিভিন্ন পূজা, ইস্তেমা” ইত্যাদিতে যোগদানও করেছেন।

ব্রাদার গিউমের একটি কথা আমার আজও মনে আছে। একবার ব্রাদার গিউমকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, ব্রাদার ভবিষ্যতে আমার কী হওয়া উচিত? ব্রাদার তখন আমাকে বললেন,“ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী ইত্যাদি সকলেই হতে পারে এবং হয়। কিন্তু তুমার যা হওয়া উচিত সেটি হল:- একজন ভালো ও ভালো মনের মানুষ।’ আজও সেই কথা আমার খুব মনে পড়ে।

ব্রাদার যে শুধু ভালো মনের মানুষ, দয়ালু বা অনেক ধৈর্যশীল সেটি নয়; ব্রাদার গিউম রসিকও বটে। আমি এবং ব্রাদার গিউম পার্কে গেলাম চায়ের দোকানে। চা খাওয়ার পর হঠাৎই একজন খুব সুস্থ ভিক্ষুক আমাদের সামনে দাঁড়লো এবং ভিক্ষা চাইছে। তখন ব্রাদার গিউম মানি ব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিলেন আর ঐ ভিক্ষুকের সাথে মজা করে বললেন,“ ভিক্ষা একটা লাভজনক পেশা; যেখানে বিনিয়োগ করতে হয় না আর যা পাওয়া যায় সবই লাভ”। সেই কথা শুনে যারা আমাদের পাশে বসে ছিল তারাও হাসলো আর ভিক্ষুকও মনে হয় হাসি চেপে রাখতে পারলেন না তা সেও হেসে ফেললো।

যাই হোক,ব্রাদার গিউমের মত এমন ধৈর্যশীল, ভালো মনের মানুষ, এমন বন্ধু বা এমন রসিক মানুষ আর কাউকে পাব না। ব্রাদার গিউম শুধু একজনই হবে। তবে, তার মত এমন উদার মনের মানুষ হওয়ার জন্য আমারও চেষ্টা করতে পারি। তার আদর্শগুলো আমরাও আয়ত্ম করার জন্য চেষ্টা করতে পারি। তাই ব্রাদার গিউমের ৭৫তম-জন্ম বার্ষিকীতে ব্রাদার গিউমকে জানাই আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে প্রাণঢালা অভিন্দন। সর্বশক্তিমার পিতা ঈশ^রের কাছে প্রার্থনা করি, ব্রাদার গিউমকে যেন দীর্ঘায়ু দান করেন। তিনি যেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থ থাকতে পারেন।



কিউবার্ট রেমা :  তেইজে ব্রাদার্স হাউস, ময়মনসিংহ



ফাল্গুনী স্কু’র দুটি কবিতা

ব্রাদার গিয়োমের সাথে যত মধুর স্মৃতি ।। রঞ্জিত রুগা

৭৫-এ পা রাখলেন ব্রাদার গিয়োম

https://www.youtube.com/watch?v=kkyELkNSAgo




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost