Thokbirim | logo

২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

জাত্যাভিমান, আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবং গারো ও খাসিয়া জনগোষ্ঠী  ।।  মিঠুন কুমার কোচ

প্রকাশিত : মার্চ ০৮, ২০২১, ১৬:০৭

জাত্যাভিমান, আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবং গারো ও খাসিয়া জনগোষ্ঠী  ।।  মিঠুন কুমার কোচ

মনে পড়ে ছোটবেলায় বাচ্চাদের কাছে শোনা “গারো গারো এগারো, জাইত্যা ধরো পাগারো”, “গারো গারো এগারো, বুট জুতা মারো।” বর্ণবাদ নিয়ে যখন কোন কথা শুনি, বর্ণবাদ বিষয়ক সংবাদ দেখি তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শৈশবে শোনা এই ছড়াগুলোই আমার মনে পড়ে যায়। আমি গারো সম্প্রদায়ের নই, কিন্তু আমাদের পার্শ্ববর্তী কিছু গ্রামে গারো সম্প্রদায়ের বাস থাকার কারণে আর চেহারায় মঙ্গোলীয় নৃ-গোষ্ঠির ধাঁচ থাকার কারণে এলাকায় ছোট ছোট বাচ্চারা ধরেই নিত আমরা কোচরাও হয়ত গারো সম্প্রদায়ের। তাই আমাদের কোচদের দেখলেও তারা উল্লিখিত কদর্য ছড়াগুলো আওড়াতো। বলাই বাহুল্য, গারো না হলেও এমন শ্রুতিকটু ছড়া বা ছন্দ ভালো লাগার কথা না মোটেই, গারো সম্প্রদায়ের মানুষদের তো নয়ই। আমাদের ভালো তো লাগতোই না, বরং এসব শুনতে শুনতেই আমরা ছোটবেলা থেকেই উপলব্ধি করতে শুরু করি, আমরা আসলে বাঙালি বলতে যাদের বোঝায় তাদের থেকে কিছুটা  আলাদা। আমাদের চেহারা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্ম অনেক কিছুই ওদের থেকে আলাদা। খুব ছোটবেলা থেকেই আমাদের অনেকেরই এমন অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বড় হয়ে ওঠা। এখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ভাবি, ওরা তো ছোট ছিল, তাই ওরা জানতো না বর্ণবাদ কী? ওরা জানতো না এগুলো আদৌ ভালো নাকি খারাপ। ওরা ওবুঝ ছিল বলে সেটা হয়তো বর্ণবাদ বা জাতিভেদের ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। অন্যদিকে, বড়দের মধ্যেও যারা নিরক্ষর, উগ্র ধর্মান্ধ ও জাত্যাভিমানী তাদের কথাও না হয় ক্ষেত্রবিশেষে উপেক্ষা করা যায়। কিন্তু উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যেও যখন বর্ণবাদ ও অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি অবজ্ঞা ও উপহাসের চূড়ান্ত হীন প্রকাশ দেখি তখন সত্যিই খুব হতাশ লাগে। কিছুদিনের ব্যবধানে ঘটা দুটি ঘটনার আলোকে  আমি বিষয়টা তুলে ধরার প্রয়াস করছি।

ঘটনা -১

বেশ কিছুদিন আগে গারো সম্প্রদায়ের এক দম্পতির বিয়ের কিছু ছবি প্রকাশিত হয়েছিলো যেখানে দেখা গেছে, গারো সম্প্রদায়ের সদ্য বিবাহিত এক বর গারো রীতি অনুযায়ী জামাই হিসেবে কনের বাড়িতে বাস করতে যাচ্ছে। বিদায়ের মুহূর্তে মা-বাবা, পরিবার ছেড়ে চলে যাওয়ার দুঃখে সেই বর কাঁদছিলেন, যা দেখতে তথাকথিত সভ্য সমাজ মোটেই অভ্যস্ত নয়। বরং এই দৃশ্য দেখে অনেককেই স্থুল হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠতে দেখা গেছে। কিন্তু সেই বরের কান্নার ঐ  দৃশ্য আমার মধ্যে কিছু ভাবান্তর ঘটিয়েছে। কারণ সচরাচর আমরা কনেকে দেখি মা-বাবার বাড়ি ছেড়ে শ্বশুর বাড়িতে যেতে এবং মেয়েদের কান্নার দৃশ্য দেখেই আমরা অভ্যস্ত আর এটাই যেন চিরায়ত দৃশ্য। শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের একাংশ কাটানো বাড়ি, বাবা-মা,  ভাই বোন ছেড়ে অন্যের বাড়িতে যাওয়ার কষ্টটা আমরা কিছুটা হলেও বুঝতে পারি। কিন্তু ছেলেরা যখন একইভাবে নিজের শৈশব, কৈশোর যৌবন কাটানো বাড়ি ছেড়ে, প্রিয় বাবা-মা, ভাই বোন, জন্মস্থান  ছেড়ে অন্যের বাড়িতে বাকি জীবন কাটাতে যায়, তখন শুধু ছেলে বলেই কি তাদের সেই কষ্ট থাকতে নেই? জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে নিজেরা যখন নিজের বাড়ি ছেড়ে, মা-বাবাকে রেখে কোথাও যাই তখন যেহেতু কষ্ট অনুভূত হয়, সেক্ষেত্রে নিজের বাড়ি ছেড়ে বাকি জীবন অন্যের বাড়ি কাটাতে গেলে সেই কষ্ট কেন অনেকগুণ বেশি হবে না! স্যালুট জানাই, সেই সমস্ত গারো যুবকদের যারা শুধু গারো সমাজের ঐতিহ্য, প্রথার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে জামাই হিসেবে শ্বশুর বাড়িতে বাস করতে যান।

ঘটনা- ২

 খুব বেশিদিন হয়নি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে একটি ঘটনা বেশ ভাইরাল হয়েছিলো- যেখানে দেখা গেছে, প্রতিযোগিতামূলক চাকরির পরীক্ষায় গারো ও খাসিয়া এই দুটি মাতৃতান্ত্রিক আদিবাসী সম্প্রদায়ের নাম সহজে মনে রাখার কৌশল হিসেবে গারোদের ‘গরু’ ও খাসিয়াদের ‘খাসি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। স্রেফ চাকরির পরীক্ষায় মনে রাখার জন্যে দুটি  সম্প্রদায়কে এভাবে ‘গরু’ ও ‘খাসি’ বলা কতটা হীন মানসিকতার পরিচয় তা এই তথাকথিত সভ্য সমাজের অনেকগুলো “উচ্চশিক্ষিত সভ্য মানুষগুলো” বুঝতেই পারেনি। বরং ‘গরু’ ও ‘খাসি’ বলে হাসি-তামাশা করতে দেখা গেছে প্রজাতন্ত্রের চাকরিপ্রত্যাশী অনেককেই – যা সত্যিই হতাশাব্যঞ্জক। দেশের একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে প্রজাতন্ত্রের চাকরিলাভের বাহানায় অক্ষর ও তথ্যজ্ঞানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পারলেও মানবিকমূল্যবোধসম্পন্ন, সহনশীল ও সংবেদনশীল নাগরিক  হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছি, অন্তত বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা তারই প্রতিফলন দেখতে পাই।

অনেক ধর্ম, সম্প্রদায় ও সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায়, অন্তত বাংলাদেশের অভ্যন্তরে গারো ও খাসিয়া সম্প্রদায়ের মানুষদেরকেই এই দাবি করাটা সবচেয়ে বেশি মানায় বলে মনে হয় সঙ্গত কারণেই। কারণ, সম্পত্তির অধিকার, চলাফেরার স্বাধীনতা, মায়ের পরিচয়ে পরিচয় প্রদানের রীতি, মেয়েদের পরিবর্তে ছেলেদের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার রীতি, নারী ক্ষমতায়ন- নারীদের এমন সম্মান কয়টা সমাজে রয়েছে? আমাদের কোচ জাতির সমাজে মায়ের পরিচয়ে পরিচিতি দানের রীতি আছে বলে  আমরা বলি, কোচেরা মাতৃসূত্রীয়। তবে,  সম্পত্তির নিরঙ্কুশ অধিকার, নিজগৃহে কন্যাসন্তানের আজীবন থাকার অধিকার, মায়ের পরিচয়ে পরিচিতি দানের অধিকার- এমন গৌরবের অংশীদার গারো ও খাসিয়া বাদে এই দেশে কে বা কারা আছে? মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সুফল বা ইতিবাচক দিক নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশেষত গারো সমাজ নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখেছি যে- গারো সমাজে যৌতুক প্রথার প্রচলন একেবারেই  নেই। অথচ পত্রিকার পাতা, টিভি ও অনলাইন পোর্টালের খবরগুলোতে আমরা প্রতিদিন মূলধারার জনগোষ্ঠিদের মাঝে যৌতুকের জন্যে প্রভূত নির্যাতন, নিপীড়ন এমনকি খুনের মত সংবাদও দেখতে পাই! গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে নারী নির্যাতনের হারও প্রায় শুন্যের কোটায়। মেয়ের হাতে সম্পত্তির অধিকার থাকে বলে বাবা-মায়েরাও সন্তানকে লেখাপড়া করাতে অনেক আন্তরিক থাকেন যা নারী শিক্ষার জন্যেও একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়।

জীবিকা অর্জনের ক্ষেত্রেও তুলনামূলক অনেক স্বাধীনতা ভোগ করেন গারো নারীরা, তাই স্বভাবতই অন্যান্য আদিবাসী নারী এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে মূলধারার জনগোষ্ঠীর নারীদের চেয়েও গারো নারীদের অনেক বেশি আত্মনির্ভরশীল ও স্বাবলম্বী হতে দেখা যায়। খাসিয়া সম্প্রদায়ের মেয়েদের ক্ষেত্রেও উল্লিখিত কথাগুলো প্রযোজ্য। এই উত্তরাধুনিক যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা ও সভ্যতার চূড়ান্ত উৎকর্ষের সময়েও যেখানে নারী দিবসের মাধ্যমে নারীদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্যে লড়াই সংগ্রাম করতে হচ্ছে, সেখানে গারো ও খাসিয়া জনগোষ্ঠী নারীদের অধিকার, মর্যাদা প্রদান ও নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছে অনেক আগে থেকেই। তাই আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীদের অধিকার, মর্যাদা দান  ও নারী ক্ষমতায়নের জন্যে যদি কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীকে সাধুবাদ জানাতে হয় তাহলে আমি নির্দ্বিধায় গারো ও খাসিয়া সম্প্রদায়কেই তা জানাবো।



মিঠুন কুমার কোচ

আহ্বায়ক কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম ও যুগ্ম আহ্বায়ক,  বাংলাদেশ কোচ আদিবাসী ইউনিয়ন।




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost