Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৫ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

মায়ের ভাষা মাতৃভাষা ।। মানুয়েল চাম্বুগং

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২১, ১০:১১

মায়ের ভাষা মাতৃভাষা ।। মানুয়েল চাম্বুগং

২০০০ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন। বাংলা ভাষাকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ট্র মধুরতম ভাষা হিসেবে চিহিৃত করেন এ প্রতিষ্ঠান। বিষয়টি বাঙালি জাতির জন্য গৌরবের ও আনন্দের। এই গৌরার্বোজন আমরা পেয়েছি আমাদের দেশের সোনার ছেলে সালাম, রফিক, বরকত ও জব্বার প্রমুখসহ আরো নাম না জানা অনেকের তাজা রক্তের বিনিময়ে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা অনেক সময়ই তাদের উৎসর্গকৃত এই রক্তের মূল্য দিতে পারছি না। আধুনিক সংস্কৃতির বেড়াজালে ও আধুনিকতার নামে নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও ভাষাকে হারাতে বসেছি। বিশেষ করে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের জীবন চিত্রে তাকালে দেখতে পাবো, আজ অনেক জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও কৃষ্টি-সংস্কৃতি বিলুপ্তির পথে। আদিবাসী ভাইবোনদের মনে আজ প্রশ্ন, বাংলা যদি এদেশের মাতৃভাষা হয় তাহলে বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসীদের মায়ের ভাষা কি তাদের কাছে মাতৃভাষা নয়? মাতৃভাষা প্রসঙ্গে লেখিকা সেলিনা হোসেন বলেন, “একজন ব্যক্তির মা যে ভাষায় কথা বলেন সেটিই তার মাতৃভাষা। আমাদের দেশে কোটি কোটি মা আছেন, যারা তাদের আঞ্চলিক ভাষা ছাড়া অন্যভাষায় কথা বলতে পারে না। তাদের সন্তানদের মাতৃভাষা, তাহলে সেই আঞ্চলিক ভাষাই, অন্য ভাষা নয়। কিন্তু এই সব সন্তানেরা কালক্রমে অন্য ভাষা আয়ত্ব করতে পারে, বাংলাদেশের একটি বিশেষ অঞ্চলের মানুষ সে অঞ্চলের ভাষায় কথা না বলে প্রমিত বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে এবং সে আঞ্চলিক ভাষা ভুলে না গেলেও প্রধানত জীবন যাপনে প্রমিত বাংলা ভাষাই ব্যবহার করতে পারে।”

লেখিকা এখানে যে জিনিসটি বলতে চেয়েছেন সেটি হলো, মায়ের কাছ থেকে সন্তান যে ভাষাটি শিখে সেটিই তার মাতৃভাষা। একজন বাঙালির মাতৃভাষা যেমন বাংলা তেমনি একজন গারোর মাতৃভাষা হচ্ছে; তার মায়ের কাছ থেকে যে ভাষাটি শিখেছে সেই গারো ভাষা। বাংলা হলো তাদের কাছে রাষ্ট্র ভাষা। যে কথাটি বলছিলাম, গারো ভাষার মতো এদেশে ৫০টিরও অধিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি আজ বিলীন হওয়ার পথে। তাদের প্রাণের ভাষা কেন হারিয়ে যাচ্ছে, খুঁজলে আমরা বিভিন্ন ধরণের সমস্যা ও কারণ দেখতে পাবো। নিন্মে প্রধান কারণগুলো উল্লেখ করছি:

      নিজের মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করা।

      পরিবারে মায়ের ভাষায় কথা না বলা।

      পারিপার্শিক প্রতিবন্ধকতা, কাজে-কর্মে, স্কুল-কলেজে মাতৃভাষা চর্চা করার পরাধীনতা।

      মাতৃভাষায় কথা বলতে লজ্জাবোধ করা।

      মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা না থাকায়।

      মিশ্র বিবাহ।

কয়েকদিন আগে এক বন্ধুকে গারো ভাষায় জিজ্ঞেস করেছিলাম, “রিপেং নাম্মে দংআমা (বন্ধু কেমন আছ?)” মিষ্টি হাসি দিয়ে সে বাংলায় বললো, এই তো বন্ধু ভাল আছি, তুমি ভাল আছো তো?” “ভাল ছিলাম কিন্তু এখন ভাল নেই।” “কেন?” “কেন আবার এই যে তোমাকে কত সুন্দর করে গারো ভাষায় জিজ্ঞেস করলাম, আর তুমি বাংলায় চট করে উত্তর দিলে। আচ্ছা দোস্ত তুমি কি গারো ভাষা বলতে পারো না?” “পারি তবে বলতে লজ্জা লাগে।” বন্ধুর মুখে মাতৃভাষায় কথা বলতে লজ্জা লাগে কথাটি শুনে নিজেও খুবই কষ্ট পেলাম। মনে মনে মহাকবি মাইকেল মধুসূধন দত্তের ভাষায় বললাম, “মাতৃভাষায় যার অধিকার নেই; সেই সব মানুষের নিজেদেরকে শিক্ষিত বলে পরিচয় দেওয়াকে আমি ঘৃণা করি।” মাতৃভাষাকে যারা অবজ্ঞা করে, তুচ্ছভাবে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম তাঁর ‘বঙ্গবাণী’ কবিতায় তাদেরকে কঠিন ভাষায় ভর্ৎসনা করেছেন:

“যে সবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী।

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।।

দেশী ভাষা বিদ্যা যার মনে না জুয়ায়।

নিজ দেশ তেয়াগী কেন বিদেশ না যায়।।

মাতা পিতামহ ক্রমে বঙ্গেত বসতি।

দেশী ভাষা উপদেশ মনে হিত অতি।।”

কবিতার এই পুংতিমালায় স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কবির সময়ও স্বদেশ ও মাতৃভাষার প্রতি অনেকেরই বিতৃষ্ণা ছিল। কবি হাকিম অনেকটা আক্ষেপ করে এই সমস্ত মানুষদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, “বঙ্গ দেশে জন্মগ্রহণ করে যাদের বঙ্গভাষার প্রতি মমত্বহীন তাদের জন্ম ও বংশ পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ হয়। স্বদেশ ও মাতৃভাষার প্রতি যাদের মমতা নেই, তাদের এদেশ ত্যাগ করাই উত্তম। পিতামাতামহের জন্ম যে দেশে হয়েছে তাদের ভাষার চেয়ে মধুর ভাষা আর কি হতে পারে!” তাই মাতাপিতার কাছ থেকে যে ভাষা পেয়েছি সেই ভাষাকে সম্মান করে চলা ও রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। কেননা মায়ের ভাষার সাহায্যেই আমরা যেকোনো বিষয়ে খুব সহজেই অন্তরোপলদ্ধি করতে পারি এবং অন্যের কাছে মনের কথা সম্পূর্ণভাবে ও সাবলীলভাবে ব্যক্ত করতে পারি। অন্য কোনো ভাষা দিয়ে যেটা সম্ভব হয়ে উঠে না। এর জন্য সবসময় সবারই মনে রাখা দরকার কোন জাতি যদি তার মাতৃভাষাকে কোনো ক্রমে হারিয়ে ফেলে তাহলে সে জাতির অস্থিত¦ বলে কিছুই থাকে না। কারণ ভাষাবিহীন কোন জাতির কৃষ্টি-সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য ঠিকে থাকা অসম্ভব। মূলত এর জন্য আমরা শুনে থাকি। জাপান, কোরিয়া, চীন, ইতালি, বেলজিয়াম ও জার্মানি প্রভৃতি দেশসমূহ আরো অনেক দেশে পড়তে গেলে বা কাজ করতে গেলে, যে যাবে তাকে অবশ্যই সে দেশের ভাষা শিখতে হবে। নইলে কেউই সেদেশে পড়তে বা কাজ করতে পারবে না। এর কারণ একটাই তারা তাদের মাতৃভাষাকে এতটাই ভালবাসে যে ইংরেজী বলতে পারলেও তারা বলে না। জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার একটা উদাহরণ দিতে চাই। অনেক দিন আগে একটা বই-এ জেনেছিলাম, বিদেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বড় কিছু আবিস্কৃত হলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণ বিদেশে গিয়ে সে সম্পর্কে জেনে আসেন এবং নিজ দেশে নিজের মাতৃভাষায় ছাত্রছাত্রীদের সে বিষয়টি শেখান। এটাই প্রমাণ করে তারা কতুটুকু নিজের মাতৃভাষাকে ভালবাসে। মাতৃভাষাকে ঠিকিয়ে রাখার জন্য বিদেশের অনেক দেশেই বিভিন্নভাবে কার্যক্রম নিয়ে থাকে। আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতেও দেখি প্রতিটি প্রদেশেই তারা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত নিজ নিজ মাতৃভাষায় ছেলেমেয়েদেরকে পড়ান। বাংলাদেশ সরকারও আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদেরকে প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত তাদের মাতৃভাষায় পড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ইতিমধ্যে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক বিদ্যালয়েল বই মুদ্রিত হয়েছে। তবে সত্য কথা হলো এখন পর্যন্ত এর তেমন আশাব্যঞ্চক ফলাফল দেখতে পাচ্ছি না। মাতৃভাষাকে ঠিকে রাখার জন্য আমরা কিছু কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি।

১. পরিবারে মাতৃভাষায় কথা বলা।

২. যেভাষায় প্রশ্ন করা হয় সেই ভাষায় উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা।

৩. নিজ নিজ মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নেওয়া ও ভালবাসা।

৪. মায়ের ভাষায গল্প, কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও উপন্যাস রচনা করা।

৫. প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা।

৬. পুণ্য উপাসনায় বা প্রার্থনানুষ্ঠান নিজস্ব ভাষায় পরিচালনা করা।

৭. নিজস্ব ভাষার বর্ণমালা ব্যবহারের পদক্ষেপ নেয়া।

৮. নিজে সচেতন হয়ে অন্যকেও সচেতন করা।

তথ্যসূত্র

১. শফি, মুহম্মদ: ভাষা আন্দোলন ঃ আগে ও পরে, বিদ্যাপ্রকাশ, বাংলাবাজার, ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ।

২. হোসেন, সেলিনা: একুশের প্রবন্ধ ২০০০, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০০ খ্রিস্টাব্দ।

৩. দৈনিক জনকণ্ঠ।

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost