Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৫ই মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

লাকিংমে চাকমার ন্যায়বিচার চেয়ে AIPP ও IWGIA সংগঠন দুটির বিবৃতি

প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৮, ২০২১, ০০:১৭

লাকিংমে চাকমার ন্যায়বিচার চেয়ে AIPP ও IWGIA সংগঠন দুটির বিবৃতি

১৬ জানুয়ারি ২০২১ এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপল্স প্যাক্ট (AIPP) ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কগ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (IWGIA) নামে দুটি সংগঠন তাদের স্ব স্ব ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, লাকিংমে চাকমা নামে ১৪ বছরের একটি আদিবাসী কিশোরী বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় অ-আদিবাসী বাঙালি দ্বারা অপহরণ, ইসলাম ধর্মে জোরপূর্বক ধর্মান্তর, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে।

ঘটনার বিবরণে এ দু’টি সংগঠন জানিয়েছে, কক্সবাজার জেলার শিলখালি চাকমা পাড়ার নিজ বাড়ি থেকে সপ্তম শ্রেণি পড়ুয়া লাকিংমে চাকমা ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি অপহৃত হয় এবং সেদিন তার বয়স ছিল ১৪ বছর ১০ মাস। সেদিন বাঙালি মুসলিম যুবক আতাউল্লাহর নেতৃত্বে ৫জন অপহরণকারী দল লাকিংমেকে বাড়িতে একা থাকা অবস্থায় অপহরণ করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। সেসময় লাকিংমের মা ও বড়বোন পান বরজে কাজ করতে এবং তার বাবা সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়েছিল। লাকিংমের ছোট ভাইসহ আরো কয়েকজন শিশু তখন উঠানে খেলছিল এবং তারা লাকিংমেকে জোর করে ধরে নিতে দেখেছিল। এছাড়াও প্রতিবেশি অনেকেই লাকিংমের বাসা থেকে বিকেলে কান্নার আওয়াজসহ লাকিংমের বাড়ির দিক থেকে একটি সিএনজি-অটো বের হয়ে যেতে দেখেছে।

বিবৃতি আরো বলা হয়েছে, অপহরণের পর কক্সবাজারের বিভিন্ন জায়গায় আতাউল্লাহ লাকিংমে কে লুকিয়ে রাখে তারপর ১১ জানুয়ারি তাকে কুমিল্লায় নিয়ে যায় যেখানে ১৮ বছর প্রমাণের মিথ্যে জন্মসনদ বানিয়ে লাকিংমেকে জোর করে আতাউল্লাহর সাথে বিয়ে পড়ানো হয় এবং তাকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়।

অপহরণের ১১ মাস ৬ দিন পর, গত ৯ ডিসেম্বর ২০২০, পুলিশ লাকিংমের বাবাকে ফোনকরে কক্সবাজার হাসপাতালের মর্গে তার মেয়েকে খুঁজে নিতে বলে। আতাউল্লার মা অভিযোগ করে বলে লাকিংমে বিষপান করে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু  ঢাকার একটি নাগরিক কমিটি দল গত ২৭-২৯ ডিসেম্বর এই ঘটনাটি তদন্ত করে এসে প্রেস কনফারেন্সে বলে লাকিংমে আত্মহত্যা করেছে নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তারা বলেন, আত্মহত্যা প্ররোচনার অসংখ্য প্রমাণ তারা পেয়েছেন এবং সেগুলো জানিয়ে এসেছেন তদন্তকারীদের। অপহরণের পর লাকিংমের ওপর অনেক অত্যাচার জুলুম করা হয়েছে। পরিবার ও সমাজ এরপর তাকে আবার গ্রহণ করবে কীনা এই ভয়টিও হয়তো তার মাঝে বড় কাজ করছিল।

৯ ডিসেম্বর হাসপাতাল মর্গে লাকিংমের বাবা তার মেয়ের লাশ চিনতে পারলেও তার কাছে লাশটি হস্তান্তর করা হয়নি। কারণ একই সঙ্গে মেয়েটির কথিত স্বামী আতাউল্লাহও এই লাশটির দাবিদার ছিল। এই সমস্যাটি সমাধান করতে অনেক সময় লেগেছিল। ফলে, ৯ ডিসেম্বর ২০২০ থেকে ৪ জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত এই ২৬ দিন লাকিংমের লাশ কক্সবাজার মর্গে পড়ে থাকে। ৩ জানুয়ারি আদালতের মাধ্যমে লাকিংমের বয়সের বিষয়টি সুরাহা হয় যে, লাকিংমে এখনও নাবালিকা এবং প্রচলিত আইনে তার বিয়ের বয়স হয়নি বলে আদালতে প্রমাণ হয়, তারপর ৪ জানুয়ারি লাকিংমের লাশ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। লাকিংমে মারা যাবার ১৩দিন পূর্বে সে একটি মেয়ে শিশুকে জন্ম দিয়েছিল।

ঘটনায় ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন প্রকাশ করে সংগঠন দু’টি জানিয়েছে, অপহরণের পর লাকিংমের বাবা টেকনাফ থানায় গিয়েছিল মামলা করতে কিন্তু সে সময়ের টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ এ মামলা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় এবং একটি সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করে যেতে বলে। লাকিংমের বাবা সে অনুসারে থানায় একটি জিডি করেছিল কিন্তু প্রশাসন তার কোন ব্যবস্থা নেয়নি। থানায় মামলা করতে না পেরে অবশেষে ২৭ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে লাকিংমের বাবা কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। আদালত থেকে দায়িত্ব পেয়ে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) একটি মনগড়া প্রতিবেদন জমা দেয়। পুলিশ প্রশাসন সেসময় মামলা গ্রহণ করলে এবং পিবিআই সেসময় তদন্তে অবহেলা না করলে লাকিংমেকে ফেরত পাওয়া যেত। যাই হোক, কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে গত ১৫ ডিসেম্বর র‌্যাব-১৫ কে আবারো তদন্তের দায়িত্ব দেয়। এখন র‌্যাব-১৫ এই মামলাটি দেখছে। র‌্যাবের তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত ৩ জানুয়ারি লাকিংমের বাবাকে লাশ হস্তান্তরের নির্দেশ দেন এবং ৪ জানুয়ারি লাশটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। লাকিংমের ওপর এতো বড় নৃশংসতায় এখনও একজনকেও ধরা হয়নি বলে উদ্বিগ্ন প্রকাশ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, লাকিংমের গ্রামে বাঙালি বসতি আস্তে আস্তে বৃদ্ধির ফলে সেখানে আদিবাসীরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়েছে যেমনটি পার্বত্য চট্টগ্রামে সেটেলার বাঙ্গালিরা প্রবেশের পর সেখানে আদিবাসীদের সংখ্যা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ছে। লাকিংমের অপহরণকারীরা তাদেরই স্থানীয় বাঙালি প্রতিবেশি এবং পুলিশ তাদেরকেই প্রশ্রয় দিয়ে আসছিল, এজন্য এ ঘটনায় সে এলাকার আদিবাসীরা এখন ভয়ের মধ্যে রয়েছে। লাকিংমের জন্য সুবিচার হওয়া উচিত এবং দুর্বৃত্তদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংগঠনদ্বয়। এ ঘটনায়- অপহরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ ও আত্মহত্যার প্ররোচনা বা হত্যার মতো পাঁচটি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কোন রাষ্ট্র এ ধরণের অপরাধকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপল্স প্যাক্ট ও ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কগ্রুপ ফর ইন্ডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স নামে দু’টি সংগঠন ।

সংগঠন দু’টি উল্লেখ করেছে, এটি একটিমাত্র ঘটনা নয়, এরকম আরো অনেক মানবাধিকার লঙ্ঘণের মতো ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে চলেছে। বাংলাদেশে গত বছর (২০২০ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আদিবাসী নারীদের প্রতি সহিংসতামূলক মোট ৫৪টি ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে ৩৫টি ঘটনা সমতলে এবং ১৯টি ঘটনা ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে। এর মধ্যে ১৮ জন ধর্ষণের শিকার এবং ১৪ জন আদিবাসী নারীর প্রতি ধর্ষণেরচষ্টা, ৩ জন গণধর্ষণের শিকার, ৫জন শারীরিক নির্যাতনের শিকার, ৪ জন হত্যার শিকার এবং ২ জন আদিবাসী নারীর ভূমি দখল করা হয়েছে। বাংলাদেশে আদিবাসী নারীদের অবস্থা খুবই ভয়াবহ পর্যায়ে, রাষ্ট্রকে অবশ্যই এ বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

সংগঠন দুটি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান করেছে-

১. অনতিবিলম্বে লাকিংমের অপহরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, বাল্যবিবাহ, ধর্ষণ ও আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা হত্যার সাথে যুক্ত সকল অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

২. এই ঘটনার সাথে যুক্ত সকল অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. লাকিংমের মৃত্যুর কারণ নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করতে হবে এবং তার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।

৪. ঘটনার প্রথমে পিবিআই ও প্রশাসন যে অবহেলা করেছে তার জন্য বিভাগীয় তদন্ত গ্রহণ করতে হবে।

৫. সনদ জালিয়াতি এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক একটি মেয়ের জোরপূর্বক ধর্মান্তর ও বিয়েতে বাধ্য করার দায়ে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৬. লাকিংমের শিশুর নিরাপত্তা এবং যথাযথ ভরণপোষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. লাকিংমের পরিবারের নিরাপত্তা এবং যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

৮. বাংলাদেশে আদিবাসী নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা ও সহিংসতার সুষ্ঠু বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৯. সিডো (CEDAW) সনদের সুপারিশ অনুযায়ী আদিবাসী নারীদের প্রতি সহিসংসতা ও তাদের জমি দখল সংক্রান্ত ঘটনাগুলির কার্যকর তদন্ত গ্রহণ করে দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

।।  থকবিরিম প্রতিনিধি

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost