Thokbirim | logo

২রা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ১৫ই এপ্রিল, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

শালবন, আবিমা(হাবিমা) পীরেন-চলেশের লালচে মাটি- (শেষ পর্ব) ।।  নিগূঢ় ম্রং

প্রকাশিত : জানুয়ারি ০৬, ২০২১, ১৬:১১

শালবন, আবিমা(হাবিমা) পীরেন-চলেশের লালচে মাটি- (শেষ পর্ব) ।।  নিগূঢ় ম্রং

যেতে যেতে সাদুপাড়া গ্রামে গিয়ে পৌচ্ছলাম। আবার বিপত্তি! পীরেনের খিম্মা যাওয়ার রাস্তা রেখে অন্য পথে চলে গেলাম। জিজ্ঞেস করতে করতে আবার পিছন ফিরে আসছি…মান্দি গ্রাম, ঘরবাড়ি  দেখে মনটা ভরে যায়। বৈচিত্র্যময়  সংস্কৃতিমান, খিম্মার খুব কাছাকাছি পৌচ্ছলাম-জালাবাদা গ্রামে। একসময় দেখা মেললো দুপাশে বিশাল পেঁপে বাগান। বাইক থেকে নেমে রসালো পাঁকা পেঁপে গাছ  থেকে পেরে খাওয়া শুরু করলাম। তৃপ্তিসাধন, কয়েক কদম পা হেঁটে এগুচ্ছি, কাঙ্খিত সেই জায়গায় অবশেষে এসে পৌচ্ছলাম। বাঁ পাশে শালবৃক্ষ বন তার নিচেই ডান পাশে পীরেন স্নালের স্মৃতিস্তম্ভ। ২০০৪ সালের তেসোরা জানু্য়ারি শান্তিপূর্ণ এক মৌন মিছিলে বিনা প্ররোচনায় বনরক্ষক ও পুলিশে মিলে গুলিবর্ষণ করে এই স্থানে পৌচ্ছালে। ঠিক এই জায়গাতেই পীরেন শহিদ হন, গুলিবিদ্ধ হয়ে চির পঙ্গুত্ব বরণ করেন উৎপল নকরেক, অর্ধশত মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হোন।

সেই ঘটনা আমি চোখে দেখিনি, ইতিহাস কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে। অনেক শুনেছি, ঠিক এই জায়গায় এসে অনুভব করছি সেই দিন কত ভয়ঙ্কর ছিল এই জায়গা, কত আর্তনাদধ্বনি হয়েছিল চারপাশ, বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ হয়েছিল। কতটা নির্লজ্জ বেহায়াপনা রাষ্ট্রের উলঙ্গ আচরণ! একটা শান্তিপূর্ণ মৌন মিছিলে গুলিবর্ষণ! ভাবতে ভাবতে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছি। পায়ের জুতো খুলে খিম্মার জায়গায় গেলাম, চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ভাবছি লালচে মাটির এই জায়গায় রক্তে রন্জিত হয়ে আরো প্রখর লালে পরিণত হয়েছিল এই জায়গা! আমরা চারজনই এই প্রথম এই জায়গায় আসা। মনের খোরাকে কালের স্বাক্ষী হয়ে থাকা খিম্মা দেখছি, শালবৃক্ষের পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যমামা বার্তা দিচ্ছে আবিমা(হাবিমা) হারতে জানে না, লড়াই করে বাঁচতে জানে, সূর্য অস্ত যাবে নতুন সূর্যদেব নবরুপে উত্থিত হবে।

বিকেল গড়াচ্ছে অনেক ঘুরলাম, অনেক অচেনা গ্রাম দেখলাম। এবার ফেরার পালা। বাইক স্টার্ট হলো। লালচে মাটির পথ ধরে বাসায় ফিরছি। বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যা, আমি আর ৩জন সঙ্গী। যাবার পথে টেলকিতে একজন তার আত্মীয়ের বাড়ি হয়ে যাবে। কলার বাগান পেরিয়ে যাচ্ছি, এই অংশ বিশেষ লিখতে গিয়ে একটা লেখা মনে পড়ছে। প্রিয় লেখক গবেষক মধুপুর আবিমার বন্ধু গবেষক পাভেল পার্থ এক নিউজ পোর্টালে “সিমসাকবো বলসাল ব্রিংনি ব্লাকবা”  শিরোনামে এক লেখায় এইভাবে প্রকাশ করেন- সামাজিক বনায়নের নাম করে শালবন তুলে দেওয়া হয় বহিরাগত বাঙালিদের কাছে, আনারসের পর শালবন হয়ে উঠে কলার বাগান, সিনজেনটা,বায়ারক্রপ সায়েন্স, এসিআইসহ কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর বিষ হরমোনের বাণিজ্য মধুপুরে কলা চাষকে চূড়ান্ত করে। কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত এই কলার বাগানে।

গ্রামের মাঝামাঝি লম্বা উঁচু একটা টাওয়ার দেখলাম, বুঝতে বাকি থাকলো না ওটা বন প্রহরীদের, এইভাবে বন পাহারা দেয়! কটা গাছ রক্ষা করেছে? খোদ বন কর্মকর্তাদের যোগসাজেশে বন উধাও হচ্ছে দিনের পর দিন। টেলকির এক আত্মীয়ের বাসায় গেলাম সেখানে বসলাম, অনেক কথা হলো। তেজালো ঝাঁঝের চু (গারো পানীয়) কয়েক চুমুক দিচ্ছি, কথা জমছে আরো। রাত হলো গেৎচুয়া ফিরলাম, বিছানায় শুয়ে শুয়ে শিয়ালের ডাক শুনছি, সকাল হলেই বিদায় জানাবো আবিমা, এবার গন্তব্যপথ নেত্রকোণা সদরে।

সকাল হলো আমার বাইক চালক বন্ধু বাপ্পা তড়িঘড়ি করছে সে যাবে না আর নেত্রকোনাণা ঢাকায় ফিরবে, ফেরানো যাচ্ছে না। মুশকিলে পড়লাম আমি যাবো কীভাবে নেত্রকোণা! বিদায় জানালো বাপ্পা ঢাকার পথে সে। গেৎচুয়া থেকে সাথে একজনকে নিয়ে বাইক ভাড়া নিয়ে আমরা প্রস্তুত অবশেষে জন, রোজলিন, এবং নতুন আর একজন যুক্ত করলাম হিটলার এবং আমি।

গেৎচুয়া আর আবিমার অনেক আতিথিয়েটা পেলাম প্রথম সফরেই যা ভুলবার নয়। বিদায় জানানোর পালা এবার আবিমাকে, বাইক করে নেত্রকোনার গন্তব্যে -গেৎচুয়া থেকে ফিরছি ফায়ারিং রেন্জ-এর কাছে আমরা দেয়াল ঘেঁষা, অমন সময় আকাশে জঙ্গি বিমানের শব্দ, বিকট শব্দে বোম ব্লাস্ট হলো, জঙ্গি বিমান থেকে প্রশিক্ষণরত বোম ফেলে গেলো রেন্জে, আমি ভয়ে কাঁপছি ভয় পেলাম। এখানে প্রায় এমন হয় নিত্যকার ঘটনা ঢাকা বা অন্য কোথাও সামরিক ঘাঁটি থেকে বোম লোড করে নিয়ে এসে জঙ্গি বিমানগুলো বোম এখানে ফেলে দেয় প্রশিক্ষণার্থীরা। এর আগেই অনেক কথা শুনেছি, পাশের গ্রামের অনেকেই গুলিবিদ্ধ হতে হয়েছে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় কিংবা জ্বালানি হিসেবে গাছের ডালপালা কুঁড়ানোর সময়। লক্ষ্যচ্যুত ফায়ারিং রেন্জের ছোঁড়া গুলি আশে পাশের জন্য হুমকি স্বরুপ। শ্রদ্ধাভাজন মতেন্দ্র মানখির একটি কবিতা মনে পড়ছে-  কবিতার নাম ‘হস্তিদন্তের দূর্গ’-

‘আকাশ জুড়ে শকুন ওড়ে অশান্তির কালো ছায়া

মানুষ বিব্রত, শঙ্কিত

ফণা তুলে বিষধর সাপ আনাচে কানাচে।



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost