Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

মান্দি সংস্কৃতিতে খ্রিস্টের জন্মোৎসব উদযাপন ।। মানুয়েল চাম্বুগং

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ২৫, ২০২০, ১৪:০১

মান্দি সংস্কৃতিতে খ্রিস্টের জন্মোৎসব উদযাপন ।। মানুয়েল চাম্বুগং

খ্রিস্টের জন্মোৎসব বড়দিন এক অভিন্ন উৎসব। বিভিন্ন কৃষ্টি সংস্কৃতির খ্রিস্টবিশ্বাসীরা একইদিনে এই মহোৎসবটি মহাসমারোহে উদ্যাপন করে থাকে। সাংসারেক ধর্ম থেকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পরমান্দিদের স্বকীয় জীবন দর্শনেও বিশ্বাসের ব্যাপক পরিবর্তন দেখা দেয় এবং তাদের জীবন সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধরণের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের উদ্ভব ঘটে। যার মধ্যে খ্রিস্টের জন্মোৎসবকে মান্দিরা আজ নিজেদের সংস্কৃতিরই একটি অংশ হিসেবে আপন করে নিয়েছে এবং অন্যান্য জাতি গোষ্ঠীর ন্যায় এ বড়দিন উৎসবকে তারা যথাযথ বিশ্বাসে, ভাবগর্ম্বীযে ও ভক্তি সহকারে পালন করে। মান্দিদের নিজস্ব সামাজিক রীতিনীতি ও কৃষ্টি সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে মূলত খ্রিস্টর জন্মতিথি পালন করা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী থেকে পৃথক দেখা যায়। মান্দিরা কিভাবে তাদের কৃষ্টি সংস্কৃতিতে খ্রিস্টের জন্মোৎসব পালন করে সেগুলোই আমি এখন আলোকপাত করতে যাচ্ছি।

খ্রিস্টের জন্মোৎসবের পূর্বপ্রস্তুতি

ডিসেম্বর মাস হলো মুক্তিদাতা যিশু খ্রিস্টের জন্মোৎসবের মাস। এমাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই মান্দিদের মধ্যে বড়দিনের আমেজ চলে আসে। যিশুর জন্মোৎসবকে অর্থপূর্ণ, আনন্দ পূর্ণ ও তাৎপর্যভাবে উদ্যাপন করার জন্য মান্দিরা নিজেদেরকে আধ্যাত্মিক ও সামাজিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে থাকে।

১। আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি

মাণ্ডলিক নিয়মানুযায়ী উপাসনা বর্ষের আগমন কাল যে দিন থেকে শুরু হয়, সেদিন থেকেই মান্দিদের বড়দিনের প্রস্তুতি শুরু হয়। খ্রিস্টিয় ভাবধারা, উপাসনার রীতিনীতিতে তারা নিজেদের প্রস্তুতি নেয়। দূরদূরান্ত গ্রাম থেকে নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতি ও শিশুরা দল বেধে স্থানীয় ধর্মপল্লিতে যায় আধ্যাত্মিক প্রস্তুতির জন্য। নির্জন ধ্যানে তারা ধ্যানপ্রার্থনা, নিজ নিজ কৃতপাপের জন্য পাপস্বীকার ও খ্রিস্টযাগে কুমিনিয়ন গ্রহণের মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে প্রস্তুতি করে নেয়। যাতে তারা শুচি-শুভ্র হৃদয়ে শিশু যিশুর জন্মতিথি পালন করতে পারে। এগুলো ছাড়াও দেখা যায় গ্রামের যুবকযুবকতিরা সম্মিলিত হয়ে আনন্দ মনে গির্জাঘর ও গোশালা সাজানো এবং ছেলেমেদের খ্রিস্টের জন্মোৎসবের গানের প্রস্তুতিগুলো সবার হৃদয়ে এক আনন্দ অনুভূতি এনে দেয়।

২। সামাজিক প্রস্তুতি

সাধ্যমতো কমবেশী সবাই নতুন কাপড়-চোপড় কেনাকেটা ও প্রয়োজনীয় ভোজ্য দ্রব্য সামগ্রীর ব্যবস্থা করে। সপ্তাহ খানেক পূর্ব হতেই বাড়ীঘর লেপা-পোছা করে ঝকঝকে তকতকে করে তোলা হয় এবং লালমাটি, চুন  রং ইত্যাদির সাহায্যে দেয়ালে দেয়ালে সুন্দর ফুল আলপনা করাগুলো শোভা পায়। বড়দিনের আনন্দকে আরো প্রাণবন্ত ও সার্থক করে তোলার জন্য যুবক-যুকতি ও বয়স্করা সামাজিক  ‘ভোজ’ ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে সুষ্ঠভাবে উদ্যাপন করার জন্য বিভিন্নজনকে বিভিন্ন দায়িত্ব দেয়া হয়। খ্রিস্টের জন্মোৎসব পালন করার পূর্বে মান্দিরা সামাজিকভাবে কিভাবে কার্যক্রম প্রস্তুতি নেয় সেগুলো নিন্মে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করছি।

২.১। ওয়াক জিল্লা (শূকর পালন): বড়দিনে যে বাড়িতে ভোজসভা হয় সেই বাড়িতে আহারের পর সামাজিকভাবে গ্রামের দশজনে মিলে পরবর্তী বছরের জন্য ভোজসভার কর্তা (পেট্রন) নির্ধারণ করে। এসময় মান্দিদের ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘চু’ চলতে থাকে। মতামতের ভিত্তিতে পেট্রন নির্ধারণের পর ‘জাকু গাত্তা’ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সদ্য নির্বাচিত পেট্রন এর বাড়িতে শূকরের পেছনের আস্ত ডান পা,খোল-ডামা-রাং-ঘন্টা বাজিয়ে কীর্তন করে নেচে নেচে তুলে দিয়ে আসা হয়  এর অর্থ হলো পরবর্তী বছরের জন্য ‘ওয়ালসেংআ’ র ভোজসভার সকল দায়িত্ব পালনের ভার এখন তার। সেই দিনথেকেই ঐদিন থেকে ঐলোকটি একটি শূকরের বাচ্চা ক্রয় করে নিজ খরচে একবছর লালন পালন করবে পরবর্তী ভোজসভার জন্য । মান্দি ঐতিহ্যে একে বলা হয় ওয়াক জিল্লা বা শূকর পালন।

২.২। হাবল খল্লা বা জ্বালানী সংগ্রহ: ওয়ালসেংআর  ভোজকর্তার  বাড়িতে ভোজসভা আয়োজনের জন্য অনেক জ্বালানীর প্রয়োজন হয়। এই জ¦ালানী সংগ্রহের বিষয়টি যেন ভোজকর্তার কাঁধে এককভাবে বোঝা হয়ে না যায়, সে জন্য গ্রামের সবাই মিলে একটি নির্দিষ্ট দিনে বনে গিয়ে জ্বালানী সংগ্রহ করাকে বলা হয় হাবল খল্লা। তবে এলাকাবেদে এর ভিন্ন হতে পারে। মহিলারা সাধারণত একাজটি করে থাকে। একটি দিন ধার্য করে গ্রামের মহিলাগণ মাথায় ঐত্যিবাহী ঝুড়ি (মান্দি ভাষায় যা থরা নামে পরিচিত) নিয়ে বনে গিয়ে জ্বালানী সংগ্রহ করে আনে। ঐদিন ‘ভোজকর্তার বাড়িতে ছোটখাটো একটি ভোজের আয়োজন করা হয় এবং কাজটা মান্দিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপভোগ করে; যা মান্দি সমাজের একতা, সংহতিতে সুদৃঢ করে তোলে।

২.৩। চান্দা দি’ইয়া (চাদা সংগ্রহ): উপাসনালয়ের সাজ-সজ্জা, পুরনো খোল, ডামা, রাং-সহ অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র মেরামত কিংবা নতুন বাদ্যযন্ত্র ক্রয়, খেলধূলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও আনুষাঙ্গিক বিভিন্ন কাজে ব্যয় করার জন্য গ্রামের যুবক যুবকতিরা প্রতিটি পরিবারে গিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ ধার্য করে চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। এধরনের প্রস্তুতিমূলক কাজ যুবক-যুবকতিরা মূল অনুষ্ঠানের দুই মাস আগে থেকেই করে থাকে।

২.৪। পুরা বা গিন্দি সোউয়া (চাল গুড়া প্রস্তুতি): বড়দিনে পিঠা বানিয়ে খাওয়ার জন্য বিন্নি ও আটপ চালের গুরা ভাঙ্গানোর উদ্দেশ্যে মান্দি মেয়েরা দলবেদে সারিবদ্ধ করে হেটে যাওয়ার দৃশ্যগুলো বড়দিনের আনন্দবার্তা এনে দেয়। কোনো কোনো গ্রামে দেখা যায় পুরা সোউয়ার কাজে মহিলাদের স্বতঃস্ফূর্ততা। বিন্নি বা আটপ চাল কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে তারা সমবেত হয়ে ঢেকিতে গুড়া করে। তখন তাদের মাঝে হয় কথামালার আদান প্রদান, ভাব-বিনিময়। আনেক হাসি, আনন্দ, গল্প, এবং গানে গানে চাল গুড়ার কাজ কখন শেষ হয় বোঝাই যায় ন। এই কাজেও দেখা যায় পরস্পরকে সাহায্য সহযোগিতা করার মনোভাব।

২.৫। ‘চু’ সং আ (ঐতিহ্যবাহী পানীয় প্রস্তুতকরণ): মান্দিদের যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠান ‘চু’ছাড়া কল্পনাই করা যায় না। মান্দিদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য পানীয় এই ‘চু’। খ্রিস্টের জন্মোৎসবের প্রায় একমাস আগে থেকে এই ‘চু’ বা মদ তৈরি করা হয় । সাধারণত পরিবারের মহিলারাই একাজটি করে থাকে। আর্থিক সামর্থ অনুযায়ী প্রায় সব পরিবারেই ‘চু’প্রস্তুত করা হয়। যাদের পরিবার স্বচ্ছল, তারা এক থেকে দু মণ চালের পানীয় তৈরি করে রাখে। স্বচ্ছল পরিবারগুলোতে আরো দেখা যায় জান্তি পাকিয়ার প্রচলন অর্থাৎ বিশাল বড় জারে বা হাড়িতে দেড় কি দু’মণের ভাত বসিয়ে তার মাঝখানে বাঁশের তৈরি বিশেষ ধরণের একটি চুঙ্গি, স্থাপন করে রাখে। পরবর্তীতে গেঁজে উঠলে সেই চুঙ্গিতে ভাতের রসগুলি চুইয়ে চুইয়ে জমা হয়। সেই জমাকৃত রসই হলো ‘চু বিচ্ছি’। এই ঐতিহ্যবাহী খাঁটি নির্যাস ‘চু’ দিয়েই  বাড়িতে আগত সম্মানিত অতিথিদের সেবা করা হয়।

২.৬। কীর্তন অনুশীন: যিশু খ্রিস্টের জন্মোৎসবের রাত্রে মান্দিদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণীয় দিক হলো ওয়ালসেংআ বা নিশিজাগরণ। ঐদিন সারারাত কীর্তন গেয়ে যুবক-যুবতি, কিশোর-কিশোরীরা আনন্দ উপভোগ করে। এই ওয়ালসেংআ’কে কেন্দ্র করে গ্রামে চলে মাসব্যাপী কীর্তন অনুশীলন। বাংলা-মান্দি উভয়ভাষাতেই তারা কীর্তন শিখে থাকে। কীর্তন শেখার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যেও নাচ-গান অনুশীলন করে যুবক-যুবকতীরা।

৩। খ্রিস্টের জন্মোৎসবের মূল অনুষ্ঠানসমূহ

অনেক প্রস্তুতির পর আসে মূল উদ্যাপনের মুহুর্ত। খ্রিস্টের জন্মোৎসবে মান্দিরা তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে মূলত ৪ ভাবে পালন করে থাকে। নিন্মে সেগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করছি।

ক. ২৪ শে ডিসেম্বর: এই রাত্রীতে সবার মুখশ্রীতে একটি নির্মল আনন্দের আভায় পূর্ণ হয়ে উঠে। মধ্যরাতের খ্রিস্টযাগের মধ্য দিয়ে বড়দিনের আনন্দের বার্তা প্রত্যেকের হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ে। একে অপরের সাথে বড়দিনের শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের পর গির্জার প্রাঙ্গণে ডামা, খোল, রাং, করতাল, ঘণ্টা, আদুরো প্রভৃতি যোগে গ্রামের যুবক-যুবতি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শিশুদের নাচ ও গানের সুরের মুর্চ্ছনায় মধ্যরাত্রের আকাশ, বাতাস ভারী হয়ে উঠে। কোনো কোনো এলাকায় এ রাত্রীতেই মান্দিরা সারা রাত কীর্তন গেয়ে ওয়ালসেংআ বা নিশি জাগরণ করে থাকে। আবার কোনো কোনো গ্রামে মধ্যরাতের খ্রিস্টযাগের পর আয়োজন করা হয় কীর্তন প্রতিযোগিতা এবং এ প্রতিযোগিতায় যারা বিজয়ী হন তাদেরকে পুরস্কারের ভূষিত করা হয়।

খ. ২৫ শে ডিসেম্বর: এদিনে কমবেশি সবাই নতুন জামা-কাপড় পড়ে গির্জায় যায়। নিজস্ব সাধ্যমতো শিশু যিশুকে উপহার প্রদান ও শিশু যিশুর আর্শীবাদ গ্রহণ করে। খ্রিস্টযাগের পর সবার মধ্যে আনন্দের ভাব ফুটে উঠে; সবাই একে-অপরকে বড়দিনের শুভেচ্ছা জানায়। কনিষ্ঠরা এসময় বড়দের পদধূলি গ্রহণের মধ্য দিয়ে জৈষ্ঠদের নিকট থেকে আশীর্বাদ নেয় তারপর সারাদিনব্যাপী চলতে থাকে বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, লটারি ড্র  ও মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক আয়োজন। এরপরই আসে সেই রাত্রি যে রাত্রির জন্য মান্দিরা সারাবছর অপেক্ষায় থাকে, যা মান্দি সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্যমণ্ডলিতে, অপরিহার্য অংশ, সেটা হল ‘ওয়ালসেংআ’।

গ. ওয়ালসেংআ (নিশিজাগরণ): ওয়ালসেংআ এর আবিধানিক অর্থে ‘ওয়াল’মানে হলো রাত্রি আর ‘সেংআ মানে হলো জেগে থাকা, সজাগ থাকা। অর্থাৎ ‘ওয়ালসেংআ’মানে রাত্রি জাগরণ। ওয়ালসেংআ রীতি মান্দি সংস্কৃতিতে কখন এসেছে কারোও এর সঠিক তথ্য বা ইতিহাস জানা নেই। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেশস্বাধীন হবার পর ওয়ালসেংআ’র ব্যাপক প্রচলন ও জনিপ্রিয়তা লাভ করে। ওয়ালসেংআ’র রাত্রিতে গ্রামের যুবক-যুবতি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা প্রায় সবাই অংশগ্রহণ করে। সারা রাত কীর্তন নাচ-গান ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘চু’ পানের মাধ্যমে রাতটি তারা আনন্দমুখর করে রাখে। ডামা, খোল, রাং, করতাল, ঘণ্টা, আদুরো বাজিয়ে নারী-পুরুষ সবাইনিজস্ব ভাষায় গেয়ে উঠে, “খাদংজাচিম চিঙাদে জাংগি থাংপানা, ইন্দিবা গিওেলনি খাসা-আ আনচিং পিলাকনা —-ছিল না মোদের প্রাণে কোনো আশা, প্রভুর করুণা জাগিয়েছে হৃদে ভরসা।”তাদের মধ্যে যখন সংকীর্তন আরো জমে উঠলে তারা আরো এই মান্দি সংকীর্তনটি গেয়ে উঠে, “ও …সংনি মা-পারাং মাইকো দাকজক নাসিমাং, চাসং গিচ্ছাম রেআংজক, চাসং গিত্তাল রেবাজক— পাড়ার মা-বাবারা কি করছো তোমরা? পুরোনো যুগ চলেগেছে নতুন যুগ এসেছে।” এভাবে তারা একটারপ পর একটা পর মান্দি-বাংলা দুটি ভাষাতেইসংকীর্তন করে করে গ্রামে প্রত্যেকটি বাড়িতে যায়। প্রথম বা দ্বিতীয় দফায় কীর্তন গাওয়া শেষ হলে পরিবারের কর্তা বা কর্তৃক, কীর্তন দলের প্রতি সন্তুষ্ঠ হয়ে কৃতজ্ঞতার্থে ও আনন্দ মনে কীর্তন দলের জন্য তাদের নিজস্ব তৈরি বিভিন্ন ধরণের পিঠা ও চা পরিবেশন করে। পানাহার শেষে আরেক দফা কীর্তন তুলে নাচতে নাচতে তারা অন্য পরিবারে যায়। এভাবে সারারাত জেগে থেকে ভোরের দিকে অবশেষে ভোজকর্তার বাড়িতে গিয়ে উঠবে। সেখানেই ভোরের কীর্তন গেয়ে ‘ওয়ালসোআ’র আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্তি টানে। ‘ওয়ালসেংআ’ বা নিশিজাগরণের বিশেষ খ্রিস্টীয় তাৎপর্য রয়েছে। খ্রিস্টীয় আদর্শ ও ভাবধারায় বড়দিনের ওয়ালসেংআ আরও গভীর অর্থ বহন করে। মুক্তিদাতা, তথা স্বয়ং ঈশ্বরের দেহধারণ মানবজাতির জন্য এক মহা আনন্দের বার্তা। খ্রিস্টের জন্মবারতা যেমন করে সেই রাত্রে রাখালদের কাছে ঘোষিত হয়েছিল, আর রাখালগণ আনন্দের শুভবার্তা পেয়ে ঈশ্বরের বন্দনা করেছিলেন তদ্রুপ মান্দিরাও মুক্তিদাতার আগমনে আনন্দিত হয়ে সারা রাত কীর্তন গেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে ঈশ্বরের গৌরব মহিমা।

ঘ. প্রীতিভোজ: কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “প্রতিদিন মানুষ ক্ষুদ্র, দীন, একাকি …. কিন্তু উৎসবের দিনে মানুষ বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মানুষের সঙ্গে একত্র হইয়া বৃহৎ, সেদিন সে সমস্ত মনুষ্যত্বের শক্তি অনুভব করে।” খ্রিস্টবিশ্বাসীদের সবচেয়ে বড় উৎসব এই বড়দিনের দিনে মান্দিরা ভোজকর্তার বাড়িতে একত্রিত হয়ে আনন্দউৎসব করে প্রীতিভোজ খেয়ে থাকে। ভোরের কীর্তন শেষ হবার পর পরই পুরুষেরা প্রীতিভোজের জন্য নির্ধারিত শূকর জবাই করে রান্নার জন্য প্রস্তুত করে। আর অপরদিকে মহিলাও বিভিন্ন চুলোয় ছোট ছোট হাড়িতে ভাত, ডাল রান্না করে থাকে। সকাল ১০-১১ টার মধ্যে রান্না বান্না শেষ করে স্নানের জন্য সবাই বাড়িতে যায় । তারপর ১২ টা কি সাড়ে ১২টার দিকে ভোজকর্তার বাড়িতে কিছু প্রার্থনানুষ্ঠানের পর সবাই একসাথে প্রীতিভোজ গ্রহণ করে। উল্লেখ্য যে, যারা ২৪শে ডিসেম্বর ওয়ালসেংআ করে তারা ২৫শে ডিসেম্বর প্রীতিভোজ করে আর যারা ২৫শে ডিসেম্বর ওয়ালসেংআ করে তারা ২৬ শে ডিসেম্বর সামাজিকভাবে প্রীতিভোজ করে থাকে। মান্দিদের এই সামাজিক প্রীতিভোজের জন্য ভোজকর্তাকে বেশি চিন্তা করতে হয় না। কারণ গ্রামের সবাই এভোজ অনুষ্ঠানে নিজের সাধ্যমতো সাহায্য করে। নিজের সামর্থ অুযায়ী কেউ কেউ হাঁস-মুরগি-খাসি নিয়ে আসে। খালি হাতে কেউ আসে না। কোনো কিছু নিয়ে আসতে না পারলেও সবাই নিজের খাওয়ার চাল, পিঁয়াজ, মরিজ, লবণ নিয়ে আসে।

ঙ. জা’খু গাত্তা বা জা’সি গাত্তা অনুষ্ঠান: গ্রামের সবার খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে বিকেলের দিকে বয়স্করা সমবেতভাবে আলাপ আলোচনা করে পরবর্তী বছরের জন্য ‘ওয়ালসেংআ’র কর্তা বা ভোজনুষ্ঠানের কর্তা নির্বাচন করা হয়। এসময় পানাহারের আসর চলে। ওয়ালসেংআ’র কর্তা নির্বাচিত করা হলে, শূকরের পেছনের একটি আস্ত জা’সি বা জা’খু (শূকরের পা) নিয়ে কীর্তন করে নাচতে নাচতে সকলেই নবনির্বাচিত কর্তার বাড়িতে উপস্থিত হয়। নবনির্বাচিত কর্তার বাড়িতে সবাই পৌঁচ্ছলে বাড়ির উঠানে আরো কয়েকটা কীর্তন করে নেচে গেয়ে রান্নাঘরে শূকরের পা’টা রেখে আসে। তারপর সবকিছুর জন্য যিশুখ্রিস্টকে ধন্যবাদ ও আগামীবছরের জন্য আর্শীবাদ মঙ্গল প্রার্থনা করা হয়। যাতে এবছরের মতো আগামী বছরেও সুষ্ঠ ও সুন্দরভাবে প্রভু যিশুর জন্মোৎসব উদ্যাপন করতে পারে। এরপর গৃহকর্তা চা, পান, পিঠা, বিড়ি ও চু প্রভৃতির মাধ্যমে সবাইকে আপ্যায়ন করে। এভাবেই বড়দিনের আনন্দের সমাপ্তী ঘটে।।

সহায়ক গ্রন্থসমূহ

১-আরেং, বাঁধন, মান্দি কৃষ্টি-সংস্কৃতি সমস্যা ও সম্ভাবনা; ৩৯ বাংলা বাজার, ঢাকা, ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ।

২- কস্তা, দিলীপ এস্, অভিন্ন উৎসব, ভিন্ন কৃষ্টিতে উদযাপন: বড়দিন, ভাওয়াল, সাওঁতাল ও মান্দি; রমনা দর্পণ, সেন্ট যোসেফ ইন্টারমিডিয়েট সেমিনারী, ১নং কাকরাইল সড়ক, ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ।

৩-চিসিম, সঞ্জয়, মান্দি সংস্কৃতিতে বড়দিন উৎসব; ঢাকা আচিক কালচারাল একাডেমী, চিসিম, সঞ্জয় ইগ্নাসিউস (সম্পা.)গুপিপাড়া, উত্তর বাড্ডা, ঢাকা, ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।

৪-রহমান বাবু ও রেমা প্রতিভা (সম্পা.) গারো সমাজ ও সংস্কৃতি; গতিধারা ঢাকা, ২০০৯ খ্রিস্টাব্দ।

কভার ছবি সংগৃহীত



ম্রো আদিবাসীদের নিজেদের জমিতেই থাকতে দিন ।। মানুয়েল চাম্বুগং 

https://www.facebook.com/100101444697668/videos/213456456823577

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost