Thokbirim | logo

১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৭শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

“নয়ন সম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই ” ।। পংকজ ম্রং

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ০৯, ২০২০, ২৩:৪১

“নয়ন সম্মুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই ” ।। পংকজ ম্রং

এখনো মাঝে মাঝে মনে হয় তিনি তার বারান্দায় জোরে জোরে কথা বলছেন, সকালের নাস্তা রেডি করে তার ছোট নাতিকে ডাকছেন, স্বাধীন নাস্তা রেডি খাইতে আসো, মনি মা ( তার স্ত্রী)  নাস্তা খাও ঔষধ খেতে হবে, আরো কত স্মৃতি তিনি রেখে গেছেন!  না, তিনি বাস্তবে নয় এখন তিনি আমাদের মনের ক্যানভাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন স্মৃতি হয়ে।

যার কথা বলছিলাম তিনি মুক্তাগাছা থানার নালিখালী গ্রামের বিশিষ্ট সমাজ সেবক, মন্ডলীর সেবক  প্রয়াত বিশ্বরাজ ম্রং। সম্পর্কে তিনি আমার জেঠা শ্বশুর। গ্রামের এবং মন্ডলীর কাজে যাকে সবার আগে পাওয়া যেত তিনি আজ পরলোকগত। মানুষের জন্য বিনা পয়সায় কাজ করার প্রবল আগ্রহ ছিল তার। তাই তিনি নিরলসভাবে নিঃস্বার্থে গ্রামের জন্য মৃত্যু অবধি কাজ করে গেছেন। গ্রাম তো বটেই মধুপর অঞ্চলে গারোদের সামাজিক অনুষ্ঠানে খবর পেলে তিনি ছুটে যেতেন। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধের সময় যে শপথ যাজক তাকে  করিয়েছেন তিনি তা মৃত্যু অবধি পালন করে গেছেন  তার অসুস্থ স্ত্রীকে সেবা করার মধ্য দিয়ে।

আমরা তাকে হারিয়েছি গত ৫/১১/২০খ্রিঃ শুক্রবার দিবাগত রাত আনুমানিক ১:৩০ টার দিকে।  এত কম সময়ে হঠাৎ করে তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যাবেন  আজও আমি এবং আমরা  বিশ্বাস করতে পারি না। কিন্তু এটাই সত্য যে, তিনি আজ নেই। কিন্তু তিনি আমাদের হৃদয় মন্ডিরে বেঁচে আছেন।

“নয়ন সম্মুখে তুমি নাই

নয়নের মাঝখানে নিয়েছো যে ঠাইঁ।”

যে রাতে তিনি মারা যান সেদিন তিনি আমাদের মতই সুস্থ স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপন, কথা বার্তা বলে গেছেন। সকাল বেলা তিনি নিজের ক্ষেতের ধান শুকিয়েছেন, স্ত্রীর সাথে তার দুই মেয়ের ছোট বেলার স্মৃতি গুলো স্মরণ করেছেন।  আমি সেদিন আমার দুই মেয়ের জন্য একই কালারের জামা কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম, সেটা দেখিয়ে তিনি বলছিলেন,  মুক্তা মমতাও ছোট বেলায় নতুন জামার জন্য দুই বোন মিলে ঝগড়া করতো, একই কালার জামা পড়তে চাইতো। হয়তো সেদিন সেগুলো তিনি তার স্ত্রীকে আবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে গেলেন। ঘূর্ণাক্ষরেও হয়ত জানা ছিল না তিনি অকালে ঐ রাতেই মৃত লোকের দেশে পাড়ি দিবেন।

সেদিন তিনি সকাল ১০ টার দিকে জলছত্র গিয়েছেন  অন্যদের সাথে এ্যাডভোকেট দীনেস দারুর ভাগ্নীর জন্য বিয়ের কথাবার্তা বলতে মুরুব্বি হিসেবে। সারাদিন সেখানে অবস্থান করে খাওয়া দাওয়া করেছেন,সবার সাথে কথা বলেছেন। ফিরে এসে নিজের স্ত্রীর খোঁজ নিয়েছেন,  দুপুরে সে ওষুধ ঠিক মত খেয়েছে কি না ইত্যাদি।

রাত ১০ টার দিকে তিনি নিজের বিছানায় ঘুমাতে যান। ঘুমানোর আগে তার স্ত্রীকে সর্বশেষ নিজে ঔষধ খাইয়েছেন।

ঐ রাতে আমি ৯ঃ৩০ টার দিকে ঘুমিয়ে পড়ি। পৌনে একটার দিকে আমার স্ত্রী আমাকে জাগিয়ে তোলে বলে যে, তার ফাজং ( জেঠা)  ফ্লোরে পড়ে গেছেন, আমি যাতে তাড়াতাড়ি সেখানে যাই তাকে  উঠাতে। আমি বিছানা থেকে উঠেই দৌঁড় দিলাম তার ঘরের দিকে। গিয়ে দেখি সে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। আমরা কয়েকজন মিলে তাকে উঠিয়ে বিছানায় রাখলাম। ভাবলাম হয়তো স্ত্রোক করেছেন। বুকে চাপ দিলাম, তার স্ত্রী, বড় মেয়ে হাতে পায়ে তেল মালিশ দিতে লাগলো। ময়মনসিংহে সাজিতা মাসিকে ফোন দিলাম, মাসি বললেন মেডিকেলে নিয়ে আসো তাড়াতাড়ি। আমি আমার শ্বশুর শ্বাশুড়িকে তাদের ঘরে গিয়ে জাগালাম। তারা এলো।  ইতিমধ্যে তার জামাই বলরাম ম্রং সিএনজি আনতে গিয়েছিল।  সিএনজি এলো। এরইমধ্যে গ্রামের অনেকেই জড়ো হয়ে গিয়েছিল। সিএনজিতে উঠানোর আগে উজ্জ্বলা মাসি বলল- পংকজ তুমি একবার হাতের পালস্ ( জাকমাচ্চি)  দেখ। আমি দেখলাম তার পালস্ আর চলছে না। তবে আমি নিজে এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ না তাই শুধু আমার শ্বশুরকে বলে গেলাম- মেন্টালি স্ট্রং হও মামার হাতের পালস্ চলছে না।  তারপরও আমরা মেডিকেলে নেবো।

সিএনজিতে আমরা চার’জন, তার বড় মেয়ে মুক্তা’ মাথার দিকে কোলে ধরলেন,ওয়ালসেং মাঝখানে এবং আমি মামার দু’ পা আমার কোলে রাখলাম। মুক্তা’ দি শোকে কাঁদছিল। আমি অবিরত প্রভুর প্রার্থনা আর দূতের বন্দনা বলে যাচ্ছিলাম। হয়তো যদি বেঁচে ফেরে প্রার্থনার জোরে!

যাবার আগেই বলরাম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মুক্তাগাছা সরকারি হসপিতালে জরুরি বিভাগে দেখাবে। রাত প্রায় ২ঃ৩০ টার দিকে অামরা হসপিতালে পৌঁছি।জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত নার্স ডাক্তার এলেন।  তারা তার হাতের পালস্ দেখলেন, চোখ দেখলেন।

দেখার পরই বলে দিলেন – তিনি মারা গেছেন। বিশ্বাসই হচ্ছিল না  কথাটা তাদের কাছ থেকে শুনে। কারণ ভাবছিলাম হয়ত আমার তার হাতের পালস্ দেখাটা ভুলও হতে পারে! তারপরও এটাই সেদিন সত্য ছিল। মুক্তা’দি শোকে বিলাপ করছিল,  কি বলব সান্ত্বনার ভাষা ছিল না। নিজেকে শক্ত করে আমি আমার শ্বশুরমশায় মাইকেল ম্রং কে জানালাম – মামা আর নেই, মারা গেছেন।

মৃত মামার ছোট মেয়ে মমতা’দি কাজ করেন কক্সবাজার টেকনাফে রোহিঙ্গা প্রজেক্টে ওয়ার্ল্ডভিশনে। তাকে তার জামাই বলরাম আগেই বলে দিয়েছিল – তার বাবা ভীষন অসুস্থ কাল ভোরেই যাতে কক্সবাজার থেকে বিমানে করে সে ঢাকা আসে এবং ঢাকা থেকে রিজার্ভ গাড়িতে। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির যুগে ফেসবুকে অনেকেই মৃত্যুসংবাদ’টা প্রচার করে ফেলে। মমতা’দির দূরের জার্নির কথা চিন্তা করে মৃত্যুর নিউজটা তাকে জানাতে চাচ্ছিল না সে। বার বার ফোনে সে বলছিল- ফেসবুকে ভুল খবর দিয়েছে, চিন্তা করিস না, মামা ঘুমিয়ে আছে। বলরামের কন্ঠটা তখন থেমে যাচ্ছিল চাপা কান্নায়৷ এটা দেখে নিজের ভেতরে  ধুকড়ে ধুকড়ে কান্না আসছিল কিন্তু সামলে নিই। আর ভাবছিলাম সত্যটা জেনেই যাবে মমতা’দি।

ডেডবডি নিয়ে যখন পৌঁছি তখন প্রায় ভোর চার’টা বাজে। নিজে এবং আরোও কয়েক’জন মিলে ডেডবডিটা সাবান দিয়ে গোসল করালাম। এরপর সাদা কাপড় দিয়ে শরীর ঢেকে দিলাম। বিশ্বাসের ভিত্তি আমাদের মা মারীয়া, তাই তার দুই হাতের আঙুলে জড়িয়ে দিলাম মায়ের জপমালা।

গ্রামের অনেক যুবক তখন উপস্থিত। তারা মৃত ব্যক্তির জন্য জপমালা প্রার্থনা করলো,  অনেক কাজ করলো, উঠানে প্যান্ডেল রেডি করলো অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য। সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল তাদের এগিয়ে আসা, সাহায্য করা।

ভোর হলে পর আমি নিজে বিশেষভাবে এবং কয়েকজন মিলে প্রস্তাব দিলাম গ্রামের দিদিমনি চম্পা রেমার কাছে যে, মন্ডলী এবং সমাজের জন্য যে ব্যক্তিটা সারা জীবন খেটেছে তার জন্য পবিত্র খ্রিষ্টযাগ দিলে ভাল হয়। পীরগাছার পাল পুরোহিত শ্রদ্ধেয় ফাদার লরেন্স নিজেও এই কথা উপলব্ধি করছিলেন, তাই তিনি খ্রিষ্টযাগ দিতে  রাজি হয়েছিলেন।

মমতা’দি বিমান টিকেট ঠিক সময়ে পেয়েছিলেন। তিনি বাড়ি এসে পৌঁছলেন আড়াই’টায়। তার কান্নায় চারদিকের পরিবেশ, আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার খ্রিষ্টযাগে ফাদার তার উপদেশে বললেন – মৃত্যু জীবনের শেষ নয় অনন্ত জীবনে প্রবেশ মাত্র। যে ব্যক্তি সারাদিন কর্মব্যস্ত জীবন কাটিয়েছেন তিনি রাতেই ঈশ্বরের ডাকে সাড়া দিলেন। তবে তিনি খ্রিষ্টিয় আদর্শ জীবন যাপন করে গেছেন, গ্রামের এবং মন্ডলীর কাজে তিনি অনেক সাহায্য করেছেন। এখান থেকে আমাদের সবার জন্য শিক্ষা,  ঈশ্বর কখন কাকে ডাক দেয় আমরা কেউ জানি না।

সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণে আমার শ্বশুর অস্রুসিক্ত নয়নে বলেন – বড় ভাই হয়ে ছোট ভাইয়ের লাশ বহন করতে হচ্ছে। সত্যি এটা আমার জন্য অনেক মর্মান্তিক। তার যে শূন্যটা আজ আমাদের মাঝে তা হয়ত আমরা কেউ  পূরণ করতে পারব না।

সেদিন অনেক মানুষ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে চোখের জলে শেষ বিদায় জানালো তাকে। কাউকে কোনভাবে কষ্ট না দিয়ে, রোগে শোকে আক্রান্ত না হয়ে মারা যায়নি সে বটে, কিন্তু তার এই হঠাৎ মৃত্যু পরিবারের জন্য,সমাজের জন্য অনেক বোঝার যা বহন করা খুবই কঠিন।

আমি নিজে আরো বেশি তার শূন্যটা অনুভব করলাম পরদিন সকাল বেলা।  খুব সকালে উঠে তিনি পরিবারের জন্য খাবার প্রস্তুত করতেন, হাড়ি পাতিল, থালা বাসনের টুং টাং শব্দ করতেন।  এখন আর সেটা হয়তো শুনতে পাব না।

ওপারে ভাল থাকো তুমি!



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost