Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

 আত্মকথা।। হিমালয় কন্যা কাঠমুন্ডুতে কয়েকদিন  ।। ফাদার শিমন হাচ্ছা

প্রকাশিত : নভেম্বর ৩০, ২০২০, ১৩:৪৮

 আত্মকথা।। হিমালয় কন্যা কাঠমুন্ডুতে কয়েকদিন  ।। ফাদার শিমন হাচ্ছা

হঠাৎ করেই গত ২১শে জুন নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডু উপত্যকায় যাকে “হিমালয়ের কন্যা” বলা হয়, সেখানে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশ বিমানে ঠিক ১:১৫মি. ঢাকা জিয়া ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না বিধায় কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। উড়োজাহাজে বসে চিন্তা করছিলাম… কোথায় থাকব, কোথায় গিয়ে উঠব। ভাবলাম এভাবে আসাটা বোধহয় ঠিক হয়নি। যা হোক, সৃষ্টি কর্তার উপর ভরসা রেখে চুপচাপ বসে আছি আর ভাবছি জানালার পাশে সিট পড়ায়, নিচে সাদা মেঘ (যেন চলন্ত কাঁশফুল) নদী-নালা, খাল-বিল, পাহাড়-পবর্ত-পিপঁড়ের ন্যায় ঘর-বাড়ি সেই অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করছিলাম। হঠাৎ করে ককপিট থেকে নারী কণ্ঠে যাত্রীদের সর্তক করে দিচ্ছে যে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই নেপালের আন্তর্জাতিক ত্রি-ভুবন বিমান বন্দরে বিমানটি অবতরণ করতে যাচ্ছে। দুশচিন্তা বেড়ে গেল-অচেনা-অজানা পরিবেশ-প্রথমবারের মত এখানে আসা-না জানি কোন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হয়। ২:২০মি. ছুই ছুই করছে, প্লেনের ঝাকুনিতে বুঝতে পারলাম-আমরা নেপালের মাটিতে আছি। প্লেন থেকে নেমেই ইমিগ্রেসন কাউন্টরে গেলাম। যারা পূর্ব থেকে ভিসা নিয়ে যায়, তাদের জন্য একটা কাউন্টার, আর যারা নিয়ে যায়নি তাদের জন্য আরেকটা। যেহেতু আমি বাংলাদেশ থেকে ভিসা নিয়ে গিয়েছিলাম, সোজা ইমিগ্রেসন কাউন্টারে গিয়ে আনুসঙ্গিক কাজ ছেড়ে গ্রিন চ্যানেল হয়ে বাইরে চলে এলাম। বাইরে তো চলে এলাম, এবার যাব কোথায়? দেখতে পেলাম বিমান বন্দরে বের হওয়ার পথে “Hotel Association of Nepal”লেখা সাইন বোর্ডটি।

এগিয়ে গেলাম সেখানে, সেখান থেকেই তিন দিনের থামেল (Tamel)  এলাকায় (Blue Ocean Hotel) রুম ভাড়া নিলাম। বিমান বন্দরে যেখান থেকেই হোটেলে রুম ভাড়া নিলাম তারাই হোটেল পর্যন্ত যাবার টেক্সি ভাড়া পরিশোধ করল। হোটেলে যখন গিয়ে পৌঁছলাম তখন বেলা ৩:১৫ মি.। এ ((Blue Ocean Hotel)) এ তিন দিনে  ৩০৫ নাম্বার রুমের বাসিন্দা আমি। রুম বয়কে বিদায় দিয়ে ঝাড়া এক ঘণ্টা বিশ্রম নিয়ে নিচে অভ্যর্থনা কক্ষে নেমে এলাম। হোটেল ম্যানেজার মি. বাসুর কাছ থেকে কাঠমুন্ড সম্বন্ধে একটা ধারণা নিয়ে নিলাম। তিনি আমাকে পরামর্শ দিলেন যেহেতু আমি মাত্র তিন দিনের জন্য এসেছি, পর্যটনের বাস দিয়ে ঘুরলে কাঠমুন্ডুর আশে পাশের দর্শনীয় স্থানগুলোর সম্পূর্ণ দেখা হবে না, কিন্তু প্রাইভেট টেক্সি দিয়ে ঘুরলে অনেক স্থান দেখা হবে, যদিও খরচ পড়বে একটু বেশি। প্রাইভেট টেক্সি দিয়ে ঘুরতে রাজি হলাম কারণ আমার হাতে বেশি সময় ছিল না।

কথা অনুসারে ২২শে জুন সকাল ৮:০০টায় আমার রুমের ইন্টারকম টেলিফোনটা বেজে উঠল। আমি রুমে ছিলাম না। ইতোমধ্যে আমি নাস্তা ছেড়ে রেস্টুরেন্ট বয় মি. সুজান থাপার সাথে গল্প করছিলাম। গল্পের মাঝেই মি. থাপার হাতের টেলিফোনটা বেজে উঠল, সুজান আমাকে জানালো আমি যাতে তাড়াতাঢ়ি প্রস্তুত হয়ে নিচে নেমে যাই, গাড়ির ড্রাইভার-কাম-গাইড মি. টাইসন বান্ডারি আমার জন্যে অপেক্ষা করছে। টাইসন বান্ডারি লেখাপড়া জানে না কিন্তু বিদেশি ট্যুরিস্টদের সাথে চলতে চলতে ভাল ইংলিশ বলতে পারে। তার পাশের সিটে আমি গিয়ে বসলাম তাতে সে খুবই খুশি হয়েছে।

মি. টাইসন প্রথমে আমাকে নিয়ে গেলো হনুমানডকা মন্দিরে (দরবা প্রাঙ্গণ) এখানে অতি প্রাচীন মন্দির সাথে রাজদরবার। এ রাজদরবারেই এবং মন্দিরের সম্মুখে নেপালি রাজার রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠান হতো। এ হনুমানডকায় Temple of Kumari (কুমারী ঘর) অবস্থিত। নেপালি হিন্দু অনুসারীরা বিশ্বাস করে এখানে জীবন্ত দেবী এখনো আছে।

কাঠমুন্ড শহর থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে সম্ভুনাথ বৌদ্ধ আশ্রম। ২০০ বছরের পুরনো আশ্রম। অপূর্ব পরিবেশ-চারদিকে পাইন গাছ দ্বারা পরিবেষ্টিত। সব ধর্মের তীর্থস্থান এটা।

পশুপতিনাথ মন্দির। শিবের নামে উৎসর্গ করা হয়েছে। এখানে একটা বড় শিবের মূর্তি আছে। কথিত আছে একদল কৃষক মাঠে কাজ করার সময় একটি শিবের মূর্তি তারা আবিস্কার করে। সেই মূর্তিটাকে সযত্নে রেখে রাজাকে সংবাদ দেয়-রাজা সংবাদ পেয়ে সেখানে গেলেন, রাজা মূর্তির কাছে পৌঁছার আগেই অসংখ্য সাপ রাজার পথ রোধ করে। ফলে রাজা সেখানে পৌঁছতে পারেননি এবং এখন পর্যন্ত কোন নেপালি রাজা যেতে পারেননি।

সকাল ১০:০০টা নাগাদ পাঠান দরবার চত্বরে প্রবেশ করলাম। আকর্ষণীয় রাজ প্রাসাদ রয়েছে। রাজপ্রাসাদে প্রবেশের জন্য বেশ কয়েকটি ফটক আছে। তার পাশেই হলো কৃষ্ণ মন্দির। এ মন্দিরটিকে নির্মাণ করা হয়েছিল সতের শতকের দিকে সম্পূর্ণ পাথর দিয়ে।

ভক্তাপুর দরবার চত্বর-বিচিত্র স্থাপত্যের নিদর্শন এ দরবারে দেখা যায়। এখানে রয়েছে রাজা ভুপন্দ্রি মান্নার মূর্তি। ৫৫টি জানালা বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদ রয়েছে। এ রাজপ্রসাদে ৫৫ জন রানি বাস করতেন। পাশেই আর একটি মন্দির আছে এরটিক (rotic) ভাস্কর্যে সাজানো। অনেকে মনে করে যৌবনদীপ্ত রাজারই প্রতীক।

জাওয়াখেলা নামক স্থানে একটি চিড়িয়াখানা আছে। হিমালয়ের নানা প্রজাতির পশু-পাখি দেখা যায়। ভেতরে সুন্দর একটি পুকুর  রয়েছে। সম্ভুনাথ মন্দিরের পাশেই জাতীয় যাদুঘর দেখার মত জিনিস হলো ১৪ হাজারের মত বিভিন্ন জাতের প্রজাতি, মাছ, আর পাখি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে এবং অতি প্রাচীন ফসিল দেখতে পাওয়া যায়।

ভওশপুর থেকে দশ কিলোমিটার পূর্বে সৌন্দের্য্যরে রানি নগর কোটের অবস্থান। সেখানে পৌঁছা মাত্র জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলমের গান। “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড়  ঘুমায় ঐ” গানটি মনে পড়ে গেল।

আকাশ আর নজর কাড়া সবুজ পাহাড় একাকার হয়ে মিশে গেছে, মিশে গেছে পাহাড়-পাহাড়ে। আর সাদা মেঘের খণ্ডগুলো স্নেহের পরশ ভুলিয়ে যাচ্ছে ডালে ডালে, পাতায় পাতায়। সাদা মেঘের ভেলা-সবুজ পাহাড়ের চূড়া যখন আবৃত করে রাখে, তখন মনে হয় যৌবনদীপ্ত অভিনেতাকে সাদা পরচুলা দিয়ে সাজিয়ে আশীতিপর বৃদ্ধ বানিয়ে অভিনয় করানো, অভিনয় শেষ হলে সেই যৌবনদীপ্ত যুবক, সে তো যুবকই। তাই মেঘের ভেলা সরে যায়, তখন সবুজ বনানী চির সবুজ চির সতেজ।

সবুজ সতেজ লীলাভূমি এ নগরকোট প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে মেঘের সাথে ভালবাসার লুকোচুরি খেলে যাচ্ছে। প্রকৃতি তাদের সাথে প্রতারণা করে না। তাই তাদের মাঝে নেই সংঘাত নেই দ্বন্দ্ব। গাড়ি থেকে নেমেই এক খণ্ড মেঘ আমার শরীর ছুঁয়ে স্বাগতম জানিয়ে চলে গেল। পাহাড়ে উঠার পূর্ব মুহূর্তে ৩২ডি.সে. তীব্র উষ্ণতা অনুভব করেছিলাম নগরকোটের সবোর্চ্চ চূড়ায় ৯ডি.সে. শীতল হাওয়া সেই উষ্ণতাকে ম্লান করে দিয়েছে। এ চূড়া থেকে সূর্যদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায় এবং ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে আর প্রকৃতি যদি বিমুখ না হয় তাহলে সেখান থেকে হিমালয়ের চূড়া দেখা যায়।

কাঠমুন্ড ও আশে পাশে উপশহরের প্রকৃতির সৌন্দর্য আমাকে বিমোহিত করেছিল, করেছিল অসম্ভব আকর্ষণ। সৃষ্টি কর্তার অকৃত্রিম দান যেন এখানে ঢেলে দিয়েছে। অকৃপণ প্রকৃতি ও মানুষের মনোবৃদ্ধি মনে হয় যেন একাকার হয়ে আছে, তাই তো তারা কত উদার কত মুক্ত। সেই জন্য রেস্টুরেন্ট বয় সুসান থাপা, ড্রাইভার কাম গাইড টাইসন বান্ডারি, সেবিকা গঙ্গা হোমাগাই ও জ্ঞানো গুরুং ক্ষণিকের পরিচয়ে আমার মত অচেনা অ-আত্মীয় কত আপন করে নিতে পেরেছে। আসার মুহূর্তে বার বার আমন্ত্রণ জানিয়েছে যেন আমি আবার নেপালে আসি। তাদের আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করার দুঃসাহস আমার সে সময় হয়নি…শুধুই বলেছি “তোমাদের কথা আমার মনে থাকবে।”




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost