Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গাজনী কিংবা সাজেক রক্ষা পাবে কি কালো থাবা থেকে? ।। শাওন রিছিল

প্রকাশিত : নভেম্বর ০৯, ২০২০, ০৬:৫১

গাজনী কিংবা সাজেক রক্ষা পাবে কি কালো থাবা থেকে? ।। শাওন রিছিল

এক সময় সাইকেল করে এলাকা চষে ফেলেছিলাম। হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ি, ধোবাউড়া এর আশেপাশের গ্রাম মেলা ঘুরেছি। এমনও হয়েছে সাইকেল নিয়ে চলে গেছি বিরিশিরি। যত টানা প্রকৃতির সৌন্দর্য্য দেখা তার চেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল বিয়ে বাড়িতে সারারাত কীর্তন আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখার লোভ।

তেমনি, ২০০২ অথবা ২০০৩ সাল, শীতকাল। কোন এক বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে, গাজনী পিকনিক স্পটে গিয়েছিলাম বেড়াতে। পর্যটকের মেলা ভিড়। বিভিন্ন জায়গা থেকে গাজনী এসেছে পিকনিক করতে। হই হুল্লোড় লেগেই আছে। অবকাশ কেন্দ্রের ভেতরই একটা মিনি চিড়িয়াখানা, তার পাশেই গারো বাড়ি! অবকাশ কেন্দ্রের ভেতর গারো বাড়ি!! একে, ওকে জিজ্ঞেস করে যতটুকু জানতে পারলাম তা হল, গাজনী অবকাশ কেন্দ্র শুরু করতে যখন ভূমি লিজ নেয়া হয়েছিল তার মাঝে এই গারো পরিবারের বসত-ভিটাও লিজ নেয়ার কথা ছিল। কিন্ত বসত-ভিটার মালিক গারো নাকি বিশাল রকমের ত্যাঁদড় টাইপ লোক। কোনভাবেই বাপ দাদার ভিটে মাটি ছাড়তে চায় নাই। হারতে চায় নাই নিজের কাছে, মাথা নত করে নাই গাজনী অবকাশ কেন্দ্রের হর্তাকর্তার কাছে।

সেই দিন, পিকনিকে আসা শিক্ষিত পর্যটকরা মিনি চিড়িয়াখানায় বানর দেখার পাশাপাশি উঠান ঝাড়ু দেয়া গারো মেয়েও দেখে নিচ্ছিল। ছুড়ে দিচ্ছিল দু একটা বাজে কথাও। তারপর আমার কখনই আর গাজনী অবকাশের সৌন্দর্য্য দেখার লোভ জাগেনি। লোভ জাগে না মধুটিলা দেখার।

সাজেক!!

গাজনীতে সেই অভিজ্ঞতা হবার পর সাজেক দেখার ইচ্ছে জাগেনি। বার, বার সুযোগ পেয়েও যাওয়া হয় নাই সাজেক। আমি জানি সেখানে গেলেও হয়ত অভিজ্ঞতাটা গাজনীর মতই হবে। অথবা এর চেয়েও ভয়াবহ কোন এক ঘটনার সামনা সামনি হব। যে সাজেক আজ আত্মবিনোদনের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার, সেই সাজেকে এক সময় চাকমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গা আদিবাসীর বাসস্থান অথবা জুমের জমি ছিল। মাথা গুঁজার ঠাঁই ছিল, স্বপ্ন দেখার নিরাপদ আশ্রয় ছিল। ছোট, ছোট ছেলে, মেয়ের দৌড় দেয়ার বিশাল উঠান ছিল। পর্যটন শিল্পের নাম করে গড়ে তোলা হল সাজেক, তাড়িয়ে দেয়া হল ভূমি পুত্রদের। ভূমিও কেঁদেছে নিশ্চয় পুত্রহারা হয়ে।

বান্দরবান পার্বত্য জেলার ম্রো আদিবাসী জনগোষ্ঠী। কানে গুজা লাল জবা অথবা কোন এক নাম না জানা বনফুল, খালি গা কিংবা গায়ে নীল জামা, সহজ সরল মানুষ। আমার চোখে এই ভাবেই ভেসে উঠে ম্রো আদিবাসীর অবয়ব।

এবার, পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটাতে বান্দরবান পার্বত্য জেলার চিম্বুক পাহাড়ে নীলগিরিতে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের জন্য ম্রো জনগোষ্ঠীর ভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে। যুগ, যুগ ধরে যে ভূমিতে ম্রো জনগোষ্ঠী লালন করে আসছিল জীবন, হাসি, কান্না, সুখ, দুঃখ, শোক সেই ভূমি দখল হচ্ছে আপনার আমার চোখের সামনে।

ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রতীবাদে কাজ হবে না। আড়ালে আছে কালো, শক্ত হাত। ম্রোদের ভূমিতে, ম্রোদের বসত-ভিটায় গড়ে উঠবে পাঁচ তারকা হোটেল। আজ থেকে বহু দিনপর পর্যটকের আনাগোনায় মুখরিত হবে আজকের ম্রো পাড়া, ম্রোদের ভিটা। শুধু হারিয়ে যাবে ম্রোদের  চিহ্ন। শুকিয়ে যাবে ম্রোদের চোখের জল।

আমি এখনই শুনতে পাচ্ছি ম্রোরা ভিটে ছাড়ছে কেঁদে, কেঁদে। আমি এখনই দেখতে পাচ্ছি মাথায় মস্ত বড় বোঝা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ম্রো নারী তার সামনে হাঁটছে উদোম গায়ে তার সন্তান।



 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost