Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ব্রাদার গিউম আপনাকে অভিনন্দন, অজস্র স্যালুট ।। মানুয়েল চাম্বুগং

প্রকাশিত : নভেম্বর ০৩, ২০২০, ২১:১৪

ব্রাদার গিউম আপনাকে অভিনন্দন, অজস্র স্যালুট ।। মানুয়েল চাম্বুগং

যেদিন নেদারল্যান্ডের রাজার পক্ষ থেকে ব্রাদার গিউম “অ্যাওয়ার্ড অব দ্যা কিং” সম্মাননা পেয়েছেন সেদিন থেকেই ব্রাদারের বিষয়ে দুএকটি লাইন লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু লিখতে সাহস পাচ্ছিলাম না। ভয় করছিলাম এই জন্যেই যে উনার বিষয়ে লিখতে গিয়ে যদি ভুল তত্ত্ব দিয়ে বসি কিংবা তাঁর জীবনের কিছু অংশ যদি বাদ পরে যায়। তারপরও মনের মানুষটা বারবার বলছিল, তুমি কিছু লিখ ব্রাদারের বিষয়ে, কিছু লিখ। সেই মনের তাগিদেই সাহসের সাথে থকবিরিম, ইউ সি এ নিউস ও মিক্রাবো সংগঠনের সদস্য মিস্ রুমা থিগিদী -এদের কাছ থেকে যে তথ্য পেয়েছি সেগুলোর আঙ্গিকে ব্রাদারের বিষয়ে কিছু লেখার প্রয়াস চালাছি।

পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ আছে যাদের একটুখানি সান্ধ্যি ও ভালবাসা পেতে সবাই চায়। ব্রাদার গিউমও সেই ধরনের একজন মহান মানুষ। ছোটবড় সবাই নির্দ্বিধায় ব্রাদারের সাথে একাকার হয়ে মিশতে পারে। তাঁর অমলিন উজ্জল হাসিমাখা মুখ, কথা বলার ধরন, সবার সাথে সুন্দর ব্যবহার, সেবা কর্মগুলো সত্যিই সবার মন জয় করে নিয়েছে। তাই তো তিনি সর্বস্তরের মানুষের ধারে ধারে গিয়ে কাজ করতে পেরেছেন। নিজের জীবনের মহামূল্যবান ৪০ বছর ব্যয় করে বাংলাদেশে পথশিশু, প্রতিবন্ধী, আদিবাসী ভাইবোনদের সেবা করে যাচ্ছেন। একই সাথে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ ও আন্তঃমাণ্ডলিক মিলন ভাতৃসমাজ গড়ে তুলতে নিরলসভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন। তাঁর এই মহান মানব সেবার জন্যই মূলত নেদারল্যান্ডের রাজার “অ্যাওয়ার্ড অব দ্যা কিং” সম্মাননা তিনি পেয়েছেন। নেদারল্যান্ডের রাজা উলিয়াম আলেক্জান্দার গত ২৭ এপ্রিল ‘কিংস অব ডে’ উপলক্ষ্যে এ পুরস্কার ঘোষণা দিয়েছিলেন। করোনা ভাইরাসের কারণে দেরিতে বিগত ৯ অক্টোবর পুরানো ঢাকার আরমেনিয়া চার্চে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত মি. হ্যারি ও তাঁর স্ত্রী আকিয় ওকামা ব্রাদার গিউমকে এই অ্যাওয়ার্ডসহ নেদারল্যান্ডের রাজার ব্যাচ পরিয়ে স্মারক চিহৃ দিয়ে সম্মাননা প্রদান করেন।

আসলে ভাবতে অবাক লাগে, যেখানে সারা বিশ্বের মানুষ আজ ভোগবাদে আসক্ত, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদে নিজেদের নিয়ে অতি ব্যস্ত সেখানে ব্রাদার গিউম নিজের সকল মায়ামোহ, সুখশান্তি, আনন্দ ত্যাগ করে মানব সেবায় নিজেকে নিযুক্ত করেছেন। যার জন্য তিনি আজ এ সম্মাননা পেয়েছেন। ব্রাদার আপনার এই সম্মান-মহিমার জন্য আপনাকে জানাই অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সর্বমানব জাতির পক্ষ থেকে দেই অজস্রবার স্যালুট। আপনার এই গৌরব ও মহিমা সত্যিই আমাদেরকে মুগ্ধ করেছে। আমরাও অনুপ্রাণিত হয়েছি অন্যের তরে নিজেকে বিলিয়ে দিতে।

সম্মাননা পাওয়ার দিনে ব্রাদারের অনুভূতি

“আমি আজ অনেক আনন্দিত ও অভিভূত যে নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত আমাকে এই পুরস্কার দেওয়ার জন্য মনোনিত করেছেন। এখানে আমার পরিচিত কিছু লোকজন আছে, তাদের প্রতি আমি খুবই কৃতজ্ঞ। কারণ উনারাই আমাকে এই সম্মাননা দেওয়ার জন্য নেদারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের কাছে অবগতি করেছেন।”

তিনি আরো বলেন, “আমি অনেক খুশি যে, এখানকার আন্তঃধর্মীয় ও আন্তঃমাণ্ডলিক মানুষের মধ্যে শান্তির সম্পৃতির ইতিবাচক দিকটা অতীতের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।”

“বিভিন্ন খ্রিস্টমণ্ডলীগুলোর সম্মিলন আগের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।  আমি বলবো এটি আমাদের অগ্রগতির চিহৃ। অন্যদিকে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এখনও প্রাথমিক ধাপেই রয়েছে। তাই আমি মনে করি আমাদের প্রত্যেকেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু ও বুদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভাইবোনদের সঙ্গে একসাথে কাজ করা। কারণ আপনি যদি সবধর্মের মানুষদের নিয়ে একত্রে কাজ করেন, তাহলে দেখবেন একসময় ধীরে ধীরে এই বন্ধেজ খুলে যাবে। সুতরাং সংলাপ করার চেয়ে সবাই মিলে একসাথে কাজ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয় বলে আমি মনে করি।”

“বাংলাদেশে এখনো দেখা যায় যারা গরিব দুঃখী সংখ্যালঘু আদিবাসী ও ধর্মাবলম্বীরা অনেক সমস্যায় জরজরিত ও অত্যাচার-নিপীড়নের ভুক্তভোগী।”

“বাংলাদেশ ধীর গতিতে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হলেও এদেশে এখনও অনেক গরিব লোক আছে। গরিব বলতে শুধু তারা আর্থিক সংকটেই পড়ে তা নয়, তারা তাদের জীবনে কখনো ন্যায্যতাও পায় না।”

“জেলখানায় যারা শাস্তি ভোগ করছে আমরা তাদের জন্যেও কাছ করছি। জেলখানায় কারাভোগী অনেকেই জেল থেকে মুক্ত হতে আমরা সাহায্য করেছি এবং এখনও যারা জেল থেকে বের হতে পারছে না, যাতে তারা ন্যায্য বিচার পায় এর জন্যেও আমরা কাজ করছি।”

“বাংলাদেশ কৃষ্টিসংস্কৃতির দিক দিয়ে অনেক সমৃদ্ধশালী একটি দেশ। এদেশের শিক্ষিত জ্ঞানী-গুণীরা লোকেরা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ভিন্নতার সৌন্দর্যকে শ্রদ্ধার সাথে মেনে নেয়। এটা সত্যিই একটি ভাল দিক। তবে কষ্টের কথা হলো অনেক মানুষ আছে যারা এদেশের কৃষ্টি-সংস্কৃতির বৈচিত্রতাকে গ্রহণ করতে পারে না। ”

“বাঙালি জনগোষ্ঠী ছাড়াও সুন্দরতর এদেশে অনেক আদিবাসী ভাইবোনেরা আছে, যাদের সংখ্যা বেশি নেই। দেখা যায় এই আদিবাসী ভাই-বোনেরা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করে। তাদের জীবন ধারণগুলো অনেক কঠিন। প্রায়ই শোনা যায় তাদেরকে হারাতে হয় নিজেদের জায়গা জমিগুলো। তাই এক্ষেত্রে আমি মনে করি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদেরকে সবসময় অনেক শক্তিমনোবল নিয়ে জীবনযাপন করতে হবে। আমি সবসময়ই তাদেরকে বলি তোমরা সকল পরিস্থিতিতে সংগ্রামী মনমানসিকতা নিয়ে খাপখাইয়ে চলতে চেষ্টা কর, কখনো এটি হারিয়ো না এবং কখনো এদেশকে ছেড়ে চলে যেও না, কারণ বাংলাদেশ তোমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতির বৈচিত্রতা দরকার।”

ব্রাদারের জন্ম ও কর্মজীবন

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ১৫ এপ্রিল নেদারল্যান্ডে ব্রাদার গিউম জন্মগ্রহণ করেন। ব্রাদারের পুরো নাম হচ্ছে ব্রাদার গিল্লউম ডে উল্ফ। তবে সবার কাছে তিনি ব্রাদার গিউম নামে পরিচিত। তাঁর বয়স এখন ৭৪ বছর। ব্রাদার গিউম মানবসেবায় নিজেকে নিবেদিত করার মানসে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে তিনি তেইজে ব্রাদার সঙ্গে যোগ দেন। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এসেই তিনি চট্টগ্রামে একজন মিশনারি হিসেবে কাজ শুরু করেন। ৫ বছর সেখানে গরিব, দুঃখী, অসহায়, লাঞ্চিত, বঞ্চিত ভাইবোনদের সেবা দিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তিনি ঢাকায় দীর্ঘ ৬ বছর কাজ করেন। এখানেও তিনি একই সেবা দিয়েছেন। ঢাকায় কাজ করার সময় তাঁর উল্লেখ যোগ্য অবদান ছিল গারো ভাইবোনদের জন্য গারো নকমান্দি স্থাপন। যে নকমান্দি কমিউনিটি সেন্টারে অতীতে গারোদের একমাত্র আশ্রয়স্থল ছিল। গারোরা কোনো বিপদে আপদে পড়লে এই নকমান্দির সাহায্য নিতো। চাকরির সন্ধানে গারোরা  ঢাকায় এসে কোথাও থাকার আবাসস্থল খোঁজে না পেলে এই নকমান্দিতেই রাত্রি যাপন করতো। বর্তমানে দেখি গারো নকমান্দি একই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

ময়মনসিংহ শহরে ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাদার পদার্পন করেন। এখন পর্যন্ত তিনি এখানেই কর্মরত আছেন। তবে ময়মনসিংহে থেকেও তিনি আরো বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য সেবারতরে নিজেকে সঁপে দিয়ে যাচ্ছেন। এখানে তাঁর উল্লেখযোগ্য সেবাকাজ হলো- বিভিন্ন জায়গায় স্কুল স্থাপন করেছেন, পথশিশুদের জন্য হোস্টেল তৈরি, বৃত্তির ব্যবস্থা, প্রতিবন্ধী সেন্টার স্থাপন, জেলহাজতে যারা কষ্টভোগ করছে তাদের সুখদুঃখের কথা শুনেন ও জেল থেকে মুক্তির জন্য কাজ করে চলেছেন , শান্তি সম্পৃতির মিলন সমাজ গড়ার জন্য আন্তঃধর্মীয় সংলাপ সংলাপ কমিশন গঠন করেছেন।

আগামী পর্বে সমাপ্ত।



মুখ ও দাঁতের যত্নে প্রথম যে ৩টি কাজ আপনাকে করতেই হবে ।। মার্ক প্রত্যয় রেমা

মুখ ও দাঁত নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ।। ডা. মার্ক প্রত্যয় রেমা

ব্যথাকে নয় রোগকে ভালো করুন ।।  ডেন্টাল সার্জন মার্ক প্রত্যয় রেমা

বাবা’রা কেমন হয়? ভাবি… ।। পরাগ রিছিল

ওয়ানগালার তাৎপর্য ও গুরুত্ব || রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক

ওয়ানগালার ইতিহাস ।। রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক

দওক্রো সুআ রওয়া বা ঘুঘু পাখির নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

বাসন্তী রেমার নতুন জীবনের সূচনা, তৈরি হচ্ছে দোকান ও পাঠাগার

শুভ বিজয়া দশমী ।। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হল দুর্গাপূজা

নভেম্বরে নতুন গান ‘সালনি থেং’সুয়ে’ নিয়ে আসছে গারো ব্যান্ড দল-ব্লিডিং ফর সার্ভাইভাল

https://www.facebook.com/thokbirim/videos/782974379102661/

https://www.facebook.com/thokbirim/videos/782974379102661/

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost