Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আত্মকথা ।। অনুভবে প্রমোদ মানকিন এম. পি ।। ফাদার শিমন হাচ্ছা

প্রকাশিত : নভেম্বর ০২, ২০২০, ১১:২১

আত্মকথা ।। অনুভবে প্রমোদ মানকিন এম. পি ।। ফাদার শিমন হাচ্ছা

তখনও ভোর পাঁচটা বাজতে ১৫ মিনিট বাকি। সবেমাত্র ঘুম থেকে উঠে হাত মুখ ধুয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। হঠাৎ আমার মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল। অবাক হলাম এ কাক ডাকা ভোরে কে ফোন করলো! ভাবলাম এ নিশ্চয় কোনো জরুরি সংবাদ, হাতে মোবাইলটি নিয়ে কল লিস্টে দেখলাম “বুলবুল মানখিন”, জিজ্ঞেস করতেই উত্তর এলো “বাবা দংজাজক।” সাত সকালে এমন সংবাদের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজনকে ম্যাসেজ পাঠালাম “আমাদের প্রিয় গারো নেতা অ্যাড. প্রমাদ মানকিন এম.পি সমাজ কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আর নেই, তার আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করো এবং তার পরিবার পরিজনদের প্রার্থনায় স্মরণ করো। সোজা গির্জা ঘরে গিয়ে ৬:৩০মিনিটে খ্রিস্টযাগে তার আত্মার স্মরণে প্রার্থনা করলাম। গির্জায় উপস্থিত ঢাকুয়া ধর্মপল্লির খ্রিস্টভক্তদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এলো। এ সংবাদটি শুনে তারাও নির্বাক স্তব্ধ!

প্রমোদ মানকিন এম.পি গারোসহ সমগ্র আদিবাসীদের একটি ইতিহাস। বাংলাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে একজন গারো/মান্দি চার চারবার নির্বাচিত সাংসদ দু দুবার মন্ত্রী, এটা নিশ্চয় আমাদের গারো আদিবাসীদের জন্য একটা গর্বের বিষয়। সারা বাংলাদেশের ইতিহাসে গারোদের স্থান করে দিয়েছেন এ প্রমোদ মানকিন। রাজনীতি বিমূখ আদিবাসীদের রাজনীতি মুখী করে তুলেছেন তিনি। তাকে অনুসরণ করে আদিবাসী এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে অনেক চেয়ারম্যান, মেম্বার প্রার্থী হয়েছেন এবং অনেক স্থানে নির্বাচনে জিতে বাংলাদেশের সক্রিয় রাজনীতিতে আসার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। বর্তমান বাস্তবতা নিরিখে অবশ্যই মূল জনস্রোতে ও জাতীয় রাজনীতিতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণে প্রমোদ মানকিনের বিশেষ অনুপ্রেরণা ও অবদান।

প্রমোদ মানকিন আদিবাসীদের একতার প্রতীক। দীর্ঘ ১৯৭৭-২০১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি পরবর্তীতে চেয়ারম্যান হিসেবে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। টি.ডব্লিউ. এ প্রথম দিকে শুধু গারো, হাজং, কোচ, বানাই নিয়েই এ এসোসিয়েশনের যাত্রা হলেও পরবর্তীকালে ক্ষত্রীয়, বর্মন আরো অন্যান্য আদিবাসীদের সম্পৃক্ত করা হয়। তার সময়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ছাড়াও ঢাকা, সিলেটের আদিবাসীদের এ সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রমোদ মানকিনের একক নেতৃত্ব জাতীয় পর্যায়ে (সরকারি) স্বীকৃতি লাভ করে এবং আদিবাসীদের মাতৃ সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। তিনি টি.ডব্লিউ. এ- কে নিজ সন্তানের মতো ভালবেসে লালন পালন করেছেন। এ দীর্ঘ পথ যাত্রায় তার অবদান অনেক। আর এ সংগঠনে সকল আদিবাসীদের একত্রে আনার পেছনে তার যে স্বপ্ন তাহলো সকল পর্যায়ে সকল সময়ে যে অবস্থায় হোক আদিবাসীরা এক থাকুক। তার এ স্বপ্ন বা আকাঙ্খা বর্তমান সময়ে যারা নেতৃত্ব দেবেন তার জন্ম দেয়া সকল আদিবাসী এই টি, ডব্লিউ. এ ছায়াতলে একত্রে কাজ করুক এই আমাদের প্রত্যাশা।

প্রমোদ মানকিন আদিবাসীদের অভিভাবক। তিনি সকল আদিবাসীদের আপন করে নিয়েছিলেন। অভিভাবক হিসেবে আদিবাসীদের সামাজিক পারিবারিক এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থাকতে চেষ্টা করতেন। তার সরব উপস্থিতি আদিবাসী জনগনের মাঝে দেখতে পেতাম একটি বাড়তি আনন্দ। বিপদ আপদ হলে তার কাছে ছুটে যেত, তাকে অবহিত করত এবং তিনিও চেষ্টা করতেন সেই সমস্ত বিপদগ্রস্ত মানুষদের সহায়তা দিতে এবং সাহায্যের হাত বাড়াতেন। সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর এবং তার মন্ত্রীত্ব লাভের পর আদিবাসী জনগোষ্ঠী কতভাবে যে লাভবান হয়েছে যারা তার কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছে তারাই উপলদ্ধি করতে পারবেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন অভিভাবক ছিলেন যিনি সুখে দুঃখে আনন্দে তার সন্তানদের সহযাত্রী ছিলেন। তার অকাল মৃত্যুতে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে; তা এখনই অনুভব করতে পারছি।

প্রমোদ মানকিন সহজ-সরল, বিনম্র ব্যক্তি ছিলেন। এ সরলতা ও নম্রতা অনেক অনেক মানুষের অন্তর স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছে। গুরুজন বা বয়োজষ্ঠদের জনসমক্ষে পা ছুঁয়ে প্রণাম করা এ বিরল কাজটি তিনি সর্বদায় করতেন। ছোটদের বুকে নিয়ে আদর স্নেহ দিতেন। তিনি চার চারবার সাংসদ এবং দু দুবার মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু তিনি সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশ প্রশাসনের দায়িত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিকে কোন সময় মন্ত্রী হিসাবে আদেশের সুরে কথা বলেননি, বরং অনুরোধের সুরে কথা বলেছেন। সেই জন্য তিনি জাতীয় ও স্থানীয় পযার্য়ে সরকারি/বেসরকারি কর্মকর্তাগণ তাকে ভালবাসত। তার এ সরল মনার জন্য রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দসহ আপামর জনগণ তার কাছে সহজে পৌছতে পারতেন এবং মনের কথা বলতে পারতেন। এভাবে তিনি সকলের মন জয় করতে পেরেছেন।

প্রমোদ মানকিন প্রকৃত একজন ভাল উপাসক ছিলেন, ছিলেন একনিষ্ঠ ঈশ্বর ভক্ত মানুষ। একজন রাজনীতিবিদ, সরকারের উচ্চ পর্যায়ে ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে কর্মব্যস্ততার মাঝেও নিয়মিত রবিবাসরীয় খ্রিস্টযাগ, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে অংশগ্রহণ করতে তিনি নিজেই সুযোগ নিতেন। তার ঈশ্বরবোধ ও ধর্মীয়বোধ তাকে সৎ জীবন-যাপন করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। এ খ্রিস্টীয় মূল্যবোধের চেতনা থেকেই ধনী, গরিব, হত দরিদ্র ও সকল স্তরের জনগণকে সেবা করেছেন। তাই তিনি সকল মানুষের হৃদয় জয় করতে সক্ষম হয়েছেন।

আদিবাসীদের এ কিংবদন্তি নেতার চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে, তবে তিনি আমাদের অন্তর থেকে হারিয়ে যাবেন না, তিনি থাকবেন-আমাদের চিন্তনে, মননে ও অনুভবে। তিনি আমাদের আলোকবর্তিকা, আমাদের অনুপ্রেরণা।

কভার ছবি ব্লেজিং ব্লেজ চিরান



বাবা’রা কেমন হয়? ভাবি… ।। পরাগ রিছিল

ওয়ানগালার তাৎপর্য ও গুরুত্ব || রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক

ওয়ানগালার ইতিহাস ।। রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক

দওক্রো সুআ রওয়া বা ঘুঘু পাখির নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

বাসন্তী রেমার নতুন জীবনের সূচনা, তৈরি হচ্ছে দোকান ও পাঠাগার

শুভ বিজয়া দশমী ।। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হল দুর্গাপূজা

নভেম্বরে নতুন গান ‘সালনি থেং’সুয়ে’ নিয়ে আসছে গারো ব্যান্ড দল-ব্লিডিং ফর সার্ভাইভাল




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost