Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ওয়ানগালার সেকাল ও একাল ।। মানুয়েল চাম্বুগং

প্রকাশিত : অক্টোবর ২৮, ২০২০, ১৬:৫৯

ওয়ানগালার সেকাল ও একাল ।। মানুয়েল চাম্বুগং

ওয়ানগালা গারোদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই উৎসব পালিত হয় মান্দি ঐতিহ্যক কৃষি বর্ষের সমাপনী মাস “জাবিলসি” মাসে। এ মাস অক্টোবরের অর্ধেক থেকে নভেম্বরের অর্ধেক পর্যন্ত গণনা হয়। গারোরা ওয়ানগালা উৎযাপন করে থাকে মূলত যিনি ফলস দেন, রক্ষা করেন, স্বাস্থ্য দেন ও আর্শীবাদ করেন তাঁকে ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতা ও পুজা-অর্চনা দেয়ার জন্য এবং নতুন বছরের জন্য মঙ্গল কামনায়। অতীতদের ওয়ানগালানুষ্ঠানে গারোরা যেভাবে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন, পূজা-অর্চনা ও আর্শীবাদ যাচনা করতো এগুলো সত্যিই গারোদের একটি আধ্যাত্মিক ভাল দিক লক্ষ্য করা যায়। কেননা তারা মনে করতেন যিনি দিয়েছেন তাঁকে (মিসি সালজং দেবতাকে) যদি সর্বপ্রথম না দেয়া হয়; তাহলে অমঙ্গল হবে। আর এটি আমরা জানতে পারি ওয়ানগালার শব্দের অর্থের মধ্যে। ওয়ানা মানে পাতা, গালা-মানে ঢালা বা ফেলা। এখানে আসল অর্থ হলো ওয়ানা মানে নৈবেদ্য; গালা মানে উৎসর্গ। আমরা এভাবে বলতে পারি আন-আ, চিন’ আ ও গালা, এ তিনে মিলে ওয়ানগালা।

ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে রাং ও দামা বাজানো হচ্ছে

ওয়ানগালার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

ওয়ানগালার দিনে গারোরা যে সকল তারা বিগত বছরে আর্শীবাদ পেয়েছে তার আনন্দ প্রকাশের জন্য তারা আমোদ-প্রমোদ, ভোজন-পান, বাদ্য-বাজনা ও নাচ-গান সারাদিন ব্যাপী করে থাকে। তবে ওয়ানগালা পালনের আসল উদ্দেশ্য হলো যিনি জমিতে উর্বরতা প্রদান করেন, ফসল উৎপাদনে সাহায্য করেন অথবা সারাবছর মুখের আহার যুগিয়ে থাকেন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, পূজাঅর্চনা করা ও আর্শীবাদ কামনা করা।

ওয়ানগালা যেভাবে শুরু হয়েছিল

অতি প্রাচীনকালে মানুষ জাতি বন-আলু, কচু, গাছের ফল-মূল লতাপাতা খেয়ে জীবন ধারণ করতো। ধান, ভুট্টা, কচু, আলু ইত্যাদি শস্য মানুষের নিকট অজ্ঞাত ছিল। এরূপ বন-আলু, কচু, ফলমূল ভোজী জগতে একটি লোকের নাম ছিল আ’নি আপিলপ চিনি গালাপা। একদিন সে থলেতে করে খাবার আলু নিয়ে নোংরা পোশাক ও ময়লা যুক্ত শরীরে বাজারে যাচ্ছিলেন। একসময় হাঁটতে হাঁটতে সে শুনতে পান কয়েক লোকের কণ্ঠস্বর। আ’নি আপিলপা চিনি গালাপও পিছনে ফিরে দেখলেন পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিহিতা ৫জন সুপুরুষ তার পিছু পিছু আসছে। সে ভয়ে লজ্জায় পথের পাশে মস্ত বড় এক পাথরের আড়ালে নিজেকে লুকায়। কিন্তু সে মিসি আপিলগা সালজং গালাপার নজর এড়াতে পারলেন না।

মিসি আপিলগা সালজং গালাপার ঐ স্থানে এসো পৌঁছলে তাকে গোপন স্থান থেকে বেড়িয়ে আসতে বললেন। সে লজ্জায় ও ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বেড়িয়ে আসলে তিনি বললেন তাঁর নাম আনি আপিলপা চিনি গালাপা। নামে নামে মিল দেখে মিসি আপিলপা সালজং গালাপা তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপনের জন্য প্রস্তাব করলেন। সভয়ে ও সলজ্জে আনি আপিলপা চিনি গালাপা তাতে রাজী হন। পরে তাঁরা নিজেদের নিয়ে আসা খাবার খেতে পথের পাশের এক বৃহৎ দংক্রের গাছের তলে বসলেন। তখন মিসি আপিলপা সালজং গালাপা দেখলেন যে, তাঁর বন্ধু বন আলু খাচ্ছেন তা দেখে তার খুব করুণা হলো। তিনি তাকে নিজের ভাত ও সুস্বাদু মাছ-মাংসের তরকারি খেতে দিলেন। আর জানতে চাইলেন, তিনি জুম চাষ করেন কিনা; জুম খেতে ধানের বীজ বপন করেন কিনা, উত্তরে আনি আপিলপা চিনি গালাপা জানালেন যে, তিনি জুম চাষ করেন কিন্তু ধান কি তা তিনি দেখেন নাই; তাই ধানের চাষও তিনি করেন না।

মিসি আপিলপা সালজং গালাপা করুণাবিষ্ট হয়ে বললেন, আমি বাজার থেকে ফিরে গিয়ে তোমাকে ধানের বীজ পাঠাবো। তুমি জুম চাষ করে জুম খেতে ধান বুনবে। আর যখন ধান পাকবে ও ঘরে তুলবে তখন আমাকে স্মরণ করবে, ভুলে যাবে না আমি তোমাকে ধানের বীজ দিয়েছি। আনি আপিলপা চিনি গালাপা মিসি সালজং গালাপার পাঠানো ধানের বীজ পেয়ে তার কথামতো জুম চাষ করে সেখানে ধানের বীজ বপন করলেন। একসময় বীজের অঙ্কুরোদম হলো, বেড়ে উঠলো ও ভাল ফলন হলো। আনি আপিলপা চিনি গালাপা মনের আনন্দে কৃতজ্ঞতায় মংরে পর্বতের (মন্দর পর্বত) চেন্দেন শিখরে মিসি আপিলপা সালজং গালাপার উদ্দেশ্যে নতুন শস্য, নতুন মদিরা ও ধূপ দিয়ে উৎসর্গ করলেন। এভাবে মংরে পবর্তে প্রথম ওয়ানগালা অনুষ্ঠিত হলো।

বাংলাদেশে ওয়ানগালার ক্রমবিকাশ

তৎকালীন ঢাকার মহামান্য আর্চবিশপ মাইকেল রোজারিওর অনুমোদনে মান্দি উপাসনা সাব কমিশনের উদ্দ্যোগে খ্রিস্ট রাজার পর্বে ওয়ানগাল উৎসব সর্বপ্রথম বাংলাদেশে ওয়ানগালা উৎযাপন করা হয় ১৯৭৮ সালের অক্টোবর মাসে বিড়ইডাকুনি ধর্মপল্লিতে। যা পরে ময়মনসিংসহ অঞ্চলের ক্যাথলিক ধর্মপল্লিতে খ্রিস্টরাজার পর্বে ওয়ানগাল আয়োজন করার জন্য প্রভাবিত করে। ১৯৯৪ সালে ঢাকা শহরে বসবাসরত সকল খ্রিস্টমণ্ডলীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ওয়ানগালার আয়োজন করে তেঁজগাও বটমূলীতে। তখন নকমা ছিলেন ফাদার কামিলুস রেমা। যিনি বনানী পবিত্র আত্মা উচ্চ সেমিনারিতে অধ্যাপনা করতেন। উদ্যাপন কমিটিতে আহবায়ক ছিলেন ফাদার কামেলুস রেমা এবং সচিব মি: নিপুন সাংমা। ওয়ানগালা উৎযাপন করার জন্য অনেকেই বিভিন্নভাবে সাহায্য করে ছিলেন। বিশেষ করে তেইজে ব্রাদারদের অবদান ছিল অপ্রশংসনীয়। সেই ওয়ানগালায় বিশেষ উল্লেখ্য ছিল আচকিপাড়া থেকে শুকরের মাংস এনে ২০০০ এর উপরে লোকদের ভোজনের ব্যবস্থা, ওস্তাদ এনে নাচ গান প্র্যাকটিস, শ্যাম্বাসিয়ার ব্যবস্থা, প্রচুর অতিথির আগমন ও স্মরণিকা প্রকাশ ইত্যাদি। এভাবে ওয়ানগালা করতে গিয়ে দেখা গেল অনেক ব্যয় বহুল, শ্রম ও সময়ের প্রয়োজন হয়।

যার কারণে ১৯৯৫ সালে ঢাকায় কোনো ওয়ানগালা করা হয়নি। ১৯৯৬ সালে ফারাকা ও TWA মহানগরী শাখার যৌথ উদ্যোগে ব্যতিক্রমধর্মী ওয়ানগালার আয়োজন করে। ঐ ওয়ানগালার জন্য কোন চাঁদা সংগ্রহ করা হয় নি এবং অতিথি রাখা হয় নি। প্রবেশ মূল্য ও স্টল ভাড়া দিয়ে যাবতীয় খরচ মিটানো হয়; এমনকি হালুয়াঘাট থেকে নিমন্ত্রিত একটি সাংস্কৃতিক দলের খরচও বহন করা হয়। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ ইন্ডিজেনাস ইয়ুথ এসোসিয়েশনের উদ্যোগে “আদিবাসী মিলন মেলার আয়োজন” করায়, সেই সময় কোন ওয়ানগালা পার্বন করা হয়নি।

১৯৯৮ সালে নকমান্দির উদ্যোগে ওয়ানগালার আয়োজন করা হয়। ওয়ানগালা উৎযাপন কমিটিতে ছিলেন আহবায়ক ডিকন তপন মারাক, সদস্য সচিব মি: রঞ্জিত রুগা। বিশেষ উল্লেখ্য ছিল এই ওয়ানগালার ধারাবাহিকভাবে করার জন্য নকমা প্রথার প্রবর্তন করেন। যাতে নকমা প্রতিবছর ওয়ানগালা করার জন্য উদ্যোগ নিতে পারেন। ১৯৯৯ সালের জন্য নকমা নির্বাচন করা হয় ডিকন তপন মারাককে। ২০০০ সালের জন্য নকমা ছিলেন মি: সুজিত আরেং। ২০০১ সালে নকমা ছিলেন পা: অরুন চাম্বুগং। এরপর থেকে প্রতিবছরই ঢাকায় এবং বিভিন্ন জায়গায় ওয়ানগালা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

গারো অঞ্চলে খ্রিস্টান আগমন

গারো অঞ্চলে খ্রিস্টরাজার পর্ব

মান্দি ওয়ানগালা সংস্কৃতিতে খ্রিস্টরাজার পর্ব

“যে সমস্ত বিষয় মণ্ডলীর কল্যাণের সাথে তথা ইহজগতে জনসমাজের কল্যাণের সাথে জড়িত অর্থ্যাৎ যে সমস্ত বিষয় সবসময় সকল স্থানে নিরাপথে সংরক্ষণ ও সকল প্রকার ক্ষতি থেকে রক্ষা করা ও আবশ্যক তাদের মধ্যে সবচেয় গুরুত্বপূর্ণ হলো এই যে, খ্রিষ্টমণ্ডলী কাজের সেই স্বাধীনতা উপভোগ করে যা মানুষের পরিত্রাণের সাধনে মন্ডলীর দায়িত্বের জন্য প্রয়োজন।” দ্বিতীয় ভাটিকান মহাসভার কর্তৃক অনোমেদিত এই ১৩নং দলিলটি সারা বিশ্বের খ্রিস্টমণ্ডলীতে এক বৈপ্লবিক পরির্বতন আনে। এই মহাসভার পর সবাই যার যার ভাষায় কৃষ্টি সংস্কৃতিতে খ্রিস্টীয় উপাসনায় স্বাধীনতা লাভ করে। যা আমরা মান্দিদের সেই ঐতিহ্যগত ওয়ানগালা সংস্কৃতিতেও পরির্বতন দেখতে পাই। তৎখকালীন ঢাকার মহাধর্ম প্রদেশের মহামান্য র্আবিশপ মাইকেল রোজারিওর অনুমোদনে মান্দি উপাসনা সাব কমিশনের উদ্যোগে মান্দি উপাসনা সাব কমিশনের উদ্দ্যোগে মান্দি ওয়ানগালা সংস্কৃতিতে খ্রিস্টরাজার এই মহাপর্ব সর্বপ্রথম উদ্যাপিত হয় ১৯৭৮ সালে। গারোদের এই ওয়ানগালা মহোৎসবে খ্রিস্টরাজার পর্বে অর্ন্তভূক্ত করা হয় মূলত ঐশ্য সত্য ও মন্ডলীর ঐতিহ্যক সংস্কৃতির চর্চা ও শিক্ষার তাগিদে।

এই ঐশ্ব সত্য হলো যিশু খ্রিস্টই পরমেশ্বের অভিষিক্ত, এ বিশ্ব ব্রহ্মণ্ডের সকল সৃষ্টির একমাত্র ত্রাণকর্তা ও রাজাধিরাজ। যিশুর যে রাজা আমরা এটি জানতে পায় যিশুর মুখেই। পিলাত যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তাহলে তুমি কি রাজা?” যিশু তখন বলেছিলেন, “আপনি নিজেই তো বলছেন, আমি রাজা! সত্যের স্বপক্ষে যেন সাক্ষ দিতে পারি, এর জন্যেই অমি জন্মেছি এর জন্যেই এই জগতে এসেছি। সত্যের মানুষ যারা তারা প্রত্যেকেই আমার কথা শোনে।” আর এই সত্য যিশু খ্রিস্টকে জানার পরই আমরা মান্দি ওয়ানগালা সংস্কৃতিতে খ্রিস্টরাজার পর্বে মিসি সালজং দেবতার পরিবর্তে রাজার রাজা যিশু খ্রিস্ট তার সমস্ত উপকারের প্রতিদানে ধন্যবাদ স্তুতি পূজাঅর্চনা নিবেদন করি। কেননা যিশুই হলেন স্বর্গ মর্তের প্রভু, সকল সৃষ্টির সৃষ্টিকর্তা। অন্যদিকে আমরা যদি দেখি সালজং আসলে কে? সালজং হচ্ছে একজন সূর্য দেবতা। যিনি ভূমির উর্বরতার দেন, পৃথিবীকে শস্য-শ্যামলা করে তোলেন। তার নির্দেশেই বৃষ্টি বর্ষিত হয়। আমরা যখন খ্রিস্টান হয়ে আমাদের আসল দেবতাকে চিনলাম তখন আমরা আমাদের সেই সালজং দেবতাকে বাদ দিয়ে রাজাধিরাজ প্রভু যিশু খ্রিস্টকে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম। যিনি সূর্য্যদেবতা সালজং এর চেয়েও মহান। তিনিই তো এজগতের সকল গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহ, আকাশমন্ডল সৃষ্টি করেছেন। তাই খ্রিস্টান হিসেবে ঈশ্বরের পুত্র যিশুকে ছাড়া কাউকে রাজা করে ওয়ানগালা করা উচিত নয়। ওয়ানগালা নন-খ্রিষ্টীয়ান গারোদের প্রধান বার্ষিক উৎসব। এই উৎসব কৃষির সঙ্গে সর্ম্পকযুক্ত, ধমীয় বিশ্বাসের সঙ্গেও এটা সর্ম্পকযুক্ত। বর্ষা বিদায়ের পর শীতের আগমনের আগে বর্ষার ফসল তোলার সেপ্টেম্বর মাসের শেষার্ধ হতে অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধের মধ্যে প্রাচীন গারো বর্ষ পঞ্জিকার অষ্টম মাস আঃনিজাতে বাংলার শরৎকালে এ ওয়ানগালা উৎসব উদযাপিত হয়

ওয়ানগালা নন-খ্রিষ্টীয়ান গারোদের প্রধান বার্ষিক উৎসব। এই উৎসব কৃষির সঙ্গে সর্ম্পকযুক্ত, ধমীয় বিশ্বাসের সঙ্গেও এটা সর্ম্পকযুক্ত। বর্ষা বিদায়ের পর শীতের আগমনের আগে বর্ষার ফসল তোলার সেপ্টেম্বর মাসের শেষার্ধ হতে অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধের মধ্যে প্রাচীন গারো বর্ষ পঞ্জিকার অষ্টম মাস আঃনিজাতে বাংলার শরৎকালে এ ওয়ানগালা উৎসব উদযাপিত হয়

ওয়ানগালার সেকাল

 গ্রামের সবাই যখন খেতের খাদ্যশস্য সব ঘরে তোলার কাজ শেষ করে তখন নকমা গ্রামবাসীদের ডেকে এনে ভোজের আপ্যায়ন করেন এবং ওয়ানগালার দিন তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন। তারিখ ঘোষণার পর তাদের মধ্যে প্রস্তুতির সাড়া পড়ে যায়। ধনী গরীব সবাই মদ প্রস্তুত করে: হাট-বাজার করে গরু, শূকর, মোরগ, বাসন কোসন প্রভৃতি কিনে। পরিবার পরিজনের জন্য কাপড়-চোপড় কিনে। গ্রামের ঘাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে। অতিথি আসবে বলে তারা আগেই ব্যবস্থা করে ফেলে। ওয়ানগালার পূর্ব দিন তারা কোথায় যায় না, কোন কাজ করে না, দিনটি পবিত্র বলে তারা মান্য করে। বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠানে তারা নকমার বাড়িতে অনুষ্ঠান হওয়ার পর নকমার বাড়িতেই ওয়ানগালার সমাপ্তি করে। ওয়ানগালা পাঁচটি প্রধান ধাপ থাকে। যথা- প্রথম দিনে রুগালা, দ্বিতীয় দিনে সাসাৎসওয়া, ওয়ান্তি-থকআ ও গুরে ওয়াতা এবং তৃতীয় দিনে দামা গগাতা অনুষ্ঠান করা হয়।

রুগালা

আখিং নকমার বাড়িতে রুগাল অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ওয়ানগালা প্রথম দিন শুরু হয়। রুগালা উৎযাপন করা হয় সাধারণত জুম খেতের ধান কাটার পর ১৫ কার্তিক। এ অনুষ্ঠানের প্রথমেই নক-গাত্তা বা ঘরে ওঠা অনুষ্ঠান করা হয়। আখিং নকমার গৃহে সকলে সমবেত হয় এবং দামা নকগাত্তার মাধ্যমে বা দামা গৃহে তোলার মাধমে বা দামা তোলার মাধ্যমে শুরু হয়। এক সময় খামাল বা পুরোহিত ভান্ডার দেবী (রক্ষিমেমা দানিমা) ও গৃহ দেবতার পূজা দিয়ে  আ-হা-হুয়া উল্লস ধবনির মাধ্যমে রুঘালা উদ্বোধন করেন। পরে আখিং নকমার ঘরের এক কোনায় সাজানো নতুন শস্য, শাকসবজি, কৃষি যন্ত্রপাতি ও বাদ্য যন্ত্রগুলোর উপর নতুন মদ বা চু-বিচ্ছি ঢেলে আ-হা-হুয়া করে সালজং দেবতার উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য উৎসর্গ করেন। পরে পর্যায়ক্রমে গ্রামের সবার বাড়িতে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। ওয়ানগালায় সমবেত সকল পুরুষেরা তখন আনষ্ঠানিকভাবে দামা হাতে নেয়। সমতালে তারা বাজানো শুরু করে । বাজনার শব্দ শোনে প্রতিটি গারো নারী পুরুষের মাঝে শিহরণ জাগে।

ওয়ানগালা শুরুতে খামাল উচ্চ স্বরে সুর করতে করতে অনেকগুলো মন্ত্র উচ্চারণ করেন।নিম্ন খামালের কয়েকটি উচ্চারিত মন্ত্রগুলো দেয়া হলো:

ফয় সাঃ. উয় গ্নি, ফয় গিতাম, ফয় ব্রি, ফয় বংঅ, ফয় দক্

ফয় সিন্নি, ফঢ চেৎ, ফয় স্কু, ফয় চিখিং

ফয় সা:, । আ:…

বাগিপ্পাখো, অনগিপ্পাখো, ফাতিগিপ্পাখো , অংআংগিপ্পাখো

বাং আংগিপ্পাখো, জাল্লেৎগিপ্পাখো, থম্মি দনগিপ্পাখো, রাক্ষিগিপ্পানা

সালাম দাকেং জক, সালাম অননেংজক।

ফয় সা: অ:

চিংআদে নাং মান্দেদে, ইয়া নাগিপা উমুক আসংনি

উমুক চিগানি, মিকি বায়জক ওলাখিয়াংজক।

ওয়ানগালার দিনে সবার বাড়িতেই মাংস রান্না করে ভুরি ভোজন করা হয়। যাদের অবস্থা ভাল নয় তারাও চাঁদা তোলে একত্রে শুকর বা গরু কিনে ঐ দিন মেরে মাংস ভাগ করে নেয়। আবার যাদের অবস্থা ভাল তারা শুকর বা গরু তার মাংস গ্রামবাসীদের বিলিয়ে দেয়া হয় । ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে যদি কোনো অতিথি আগমন হয় তাকেও যথাযোগ্য মর্যাদায় আপ্যায়ন করা হয় মাংস ও চু দিয়ে। ওয়ানগালায় বিভিন্ন ধরনের নাচ-গান আয়োজন করে। যথা- গ্রং দক্আ (শিং বাজানো), দক্র সু-আ (ঘুঘু পাখির লড়াই), মাং মানা জেং অননা (মহিষকে ঘাস দেওয়া), নমুল পান্থে ফলি দিংআ ( তরুণ-তরুণীরা পরস্পর পরস্পরকে আকর্ষণ করে), সালাম কা-আ ( সালাম দেয়া), বারা ওয়াগংও বামআ ( বাঁশে কাপড় শুকানো), মেমাং মি সুআ (ভুত-পেত্নী কর্তৃক ধান ভানা), চাম্বিল মেসা (চাম্বল ফলের নাচ) জিক সেকা (স্ত্রী হরণ), চামে চাংআ ( প্রেমিকাকে অনুসরণ), মাকবিল রোআ ( ভাল্লুকের নৃত্য), চাওয়ারী সিকা (জামাই ধরা) ইত্যাদি। বিভিন্ন অতিহ্যবাহী লোক গীতিদের মধ্যে আজিয়া, দরুয়া, রে-রে। ওয়ানগাল উৎসবের জন্য তিন ধরনের দামা বা ঢোল ব্যবহার করা হয়। যথা- দাদামবাক দামা, ক্রাম ও নাতিক। এছাড়াও আদুরী, সিঙ্গা ও বিশেষ ধাতুর তৈরি কমপক্ষে ৫টি রাং প্রয়োজন হয়।

জল আননা

গারো সম্প্রদায় মিসি সালজং এর জন্য জল আননা উৎসর্গ করে থাকে ওয়ানগালার দ্বিতীয় দিনে। জল আননা অনুষ্ঠানে দেবতার উদ্দেশ্যে সাসাৎ সো-আ বা ধূপ প্রজ্বালন অনুষ্ঠান করা হয়। সাসাৎ সো-অ বা ধূপ প্রজ্বালন কালে খামাল বা পুরোহিত সবার সম্মুখে দেবতার নিকট  আর্শীবাদ যাচনা করে মন্ত্র উচ্চারণ করেন। কামাল দেবতার কাছে ভবিষ্যদ্বাণী জেনে নেন যে আগামী বছর মানব জাতির জীবনকাল কেমন যাবে। এখানে উল্লেখ্য যে যখন ধূপ বা সাসাৎ জালানো হয় তখন যদি ধূপ করে আগুন জলে উঠে তখন ধরে নেয়া হয় যে এবছর ভাল যাচ্ছে না । আবার ধূপ জালানোর সময় যদি আগুন না জ্বলে ধোয়া নির্গত হয় তখন ধরে নেয়া হবে যে আগামী বছর ভাল যাবে। সমবেত সকলে তখন কৃতজ্ঞতা ভরে আনন্দ উল্লাস করে।

ওয়ান্থি থক্আ

নতুন ধানের চালের গুড়া পানিতে ভিজিয়ে মানুষের শরীররে ও ঘরের বিশেষ বিশেষ জায়গায় লাগানোকে বলে “পুরা ওয়ান্থি থক্আ”। যুবক-যুবতী ও শিশুসহ সবাই সানন্দে স্ব:স্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে।

গুরে ওয়াতা

ঘরের আঙ্গিনায় নৃত্যগীতরত একদল নারী পুরুষের মাঝখানে কৃতিম ঘোড়ায় চড়ে রাজকীয় বেশে ‘নকমা’ ও খামালের (পুরোহিত) নৃত্য করাকে বলে ‘গুরে রুদিলা’। মেজর এ. প্লেফয়ার একে তাঁর “দি গারোস” বইয়ে এই অনুষ্ঠানকে গুরে ওয়াতা নামে উল্লেখ করেছেন।

দামা গগাতা

তৃতীয় দিনে দেবতা মিসি আপিলপা সালজং গালাপা ও দেবী রক্ষিমেমা দামিমাসহ সকল দেবদেবীকে বিদায় জানিয়ে যে অনুষ্ঠান হয়ে তাকে দামা গগাতা বা জলওয়াতা বা রু¯্রাতা বলে। গ্রামের বাড়িতে ওয়ানগালা কার্যক্রম শেষ হয়ে গেলে ব্যবহ্নত বাদ্য যন্ত্র নকমার বাড়ীতে এনে জমা দেয় । এ উপলক্ষ্যে সকল দেবদেীর উদ্দেশ্যে নকমার বাড়িতে পয় নৈবেদ্য এবং এসবের সাথে সবার বাড়ীতে শস্য দেবতা মিসি আপিলপা সালজং গালাপা এবং ভান্ডার ও গৃহ দেবী রক্ষিমেমা দামিমার উদ্দেশ্যে ধূপ ও পয় নৈবেদ্য উৎসর্গ করে শেষ প্রার্থনা জানিয়ে দেবদেবীদের বিদায় জানানো হয়।

একালের ওয়ানগালা

আজকাল গারোরা প্রতি বছরই সমষ্টিগতভাবে খুব ঘটা করে ওয়ানগালা উৎসব পালন করে থাকে। যেখানেই গারোরা দলগতভাবে বসবাস করে সেখানেই তারা নিজেদের ঐতিহ্যগত কৃষ্টি-সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য ওয়ানগাল উৎসব করে। যা গারো জাতিদের জন্য খুবই ভাল দিক ওয়ানগালাকে গারো এখন এত আপন করে নিয়েছে যে ঢাকা শহরে তিনতিনটি জায়গায় ওয়ানগালা উৎসবের আয়োজন করা হলেও সবখানেই হাজারো গারোদের বিড় চোখে পড়ে। ঢাকা শহর বাদেও বিভিন্ন এলাকায় ওয়ানগালা উৎসব করা হয়। তাদের মধ্যে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুরের জলছত্র, ফিরগাছা, সাইনামারী গ্রাম; ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাটের বিড়ইডাকুনী ধর্মপল্লি, ধোবাউড়ার ভালুকাপাড়া ধর্মপল্লি, নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলা রাণীখং ধর্মপল্লি, কলমাকন্দা উপজেলার বালুচড়া ও বরুয়াকোণা ধর্মপল্লি এবং শেবপুর জেলার ঝিনাইগাতীর মরিম নগর ধর্মপল্লি, ছোট গাজনী। এগুলো ছাড়াও সিলেটের মুগাইপাড়া ও শ্রীমঙ্গল ধর্মপল্লি ও চটÍগ্রামের পাথর গাথা ধর্মপল্লিতেও ওয়ানগালার আয়োজন হয়। আজকাল দেখা যায় গারোরা ওয়ানগালা দুইভাবে করে থাকে। একটি হচ্ছে সাংসারেক পদ্ধতিতে ওয়ানগালা এবং অন্যটি হচ্ছে খ্রিস্টনাইাজদ ওয়ানগালা। অর্থাৎ ওয়ানগালায় মান্দি সংস্কৃতিতে খ্রিস্টরাজার পর্ব পালন। রোমান কাথলিকরা এপদ্ধতিতে ওয়ানগালা করে থাকে। তবে লক্ষ্য করা যায় ওয়ানগালায় সব মান্দিরাই আসে। যারা সাংসারেক রীতিতে ওয়ানগালা করে তারাও কিন্তু খ্রিস্টান। এদিক দিয়ে দেখি ওয়ানগালা আসলে তারা আগে যেমন করতো তেমনি হয়ে উঠে না। কারণ বর্তমানে ওয়ানগালা পরিচালনার জন্য যে কামাল হন, তিনি ঠিক মতো/আগে যেমন কামাল মন্ত্র পড়তো তেমনি পড়তে পারে না। টুটা পাখির মতো মন্ত্রগুলো তারা পড়ে থাকে। মন্ত্রগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখবেন মন্ত্রগুলোর মধ্যে বেশি আধ্যাত্মিক বা ঐশতত্বের ভিত্তি নেই । অন্যদিকে রোমান কাথলিকরা ওয়ানগালাকে আরো মডিফাই করেছে বা খ্রিস্টনাইজ করেছে। তাদের ওয়ানগালা অনুষ্ঠানের প্রার্থনাগুলো অনেক আধ্যাত্মিক ও ঐশতত্ত্ব নির্ভর। আগে যেভাবে ওয়ানগালা করতো সেগুলো তারা অনেকটাই ধরে রেখেছে  শুধুমাত্র সালজং এর পরির্বতে যিশু খ্রিস্টকে বিশ্বাস করে এনেছে। রোমান কাথলিকরা যেভাবে ওয়ানগালা উৎসব করে তার কাঠামো নিন্মে দেয়া হলো। উল্লেখ্য যে এই কাঠামোটি রেভ: ফাদার পিটার রেমার তৈরি করেন।

ওয়ানগালা অনুষ্ঠানের খ্রিষ্টযাগের কাঠামো

(১)       প্রারম্ভিক প্রস্তুতি

ক. গীর্জা ঘরে স্থান সংকুলান না হলে, গীর্জাঘরের সামনে কোন একস্থানে ওয়ানগালার ক্রুশ স্থাপনের জন্য তিন সিঁড়ির চক্রাকারে একটি মাটির মন্ডপ তৈরী করবেন। মন্ডপের কেন্দ্রে বিশ্বের প্রতীক একটি গোলক থাকবে। তাঁর উপর ছয় থেকে সাড়ে ছয় ফুটের একটি ক্রুশ থাকবে।

খ. অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য পূর্ব প্রস্তুতির প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু

-থক্কা দানের জন্য পানিতে গুলিয়ে চালের গুড়ি (মান্দিতে ফোরা) প্রস্তুত রাখাবেন।

-জন সিঞ্চনের জন্য একটি পাত্রে জল  ও স্প্রিংকার রাখবেন।

-উৎসর্গের জন্য: বারো রকমের দ্রব্য সামগ্রী ও বারো জনের একটি বাহক দল প্রস্তুত বাখবেন।

-হাত ধোয়ার জন্য: একটি পাত্রে জল, সাবান ও টাওয়াল প্রস্তুত রাখবেন।

-আরতির জন্য: ধূপদানি ও ধূপ।

-ওয়ানগালার ক্রুশের মাথায় পরাবার জন্য খুথিপ (পাগড়ি) এবং গলায় পরাবার জন্য ফুলের একটি মালা প্রস্তুত রাখবেন।

(গ) শোভাযাত্রা জন্য: তিন থেকে চার জনের একটি সেবক দল ও বারো জনের একটি নাচের দল প্রস্তুত রাখবেন।

(ঘ) শোভাযাত্রা: একটি নির্ধারিত স্থান থেকে উপাসনার মঞ্চের দিকে শোভাযাত্রার দল অগ্রসর হবে পর্যায়ক্রমে নিম্নরূপ

-আরতির মেয়ের দল,

-ক্রুশ নিয়ে সেবকদল,

-নাচের দল,

-দ্রব্যসামগ্রীর বাহকদল,

-মালা ও খুথিপ বাহক দল ও

– যাজকগণ।

(২) প্রারম্ভিক অনুষ্ঠান

-গীত

-শোভাযাত্রার শেষে প্রধান যাজক বেদীতে গিয়ে বেদী চুম্বন করবেন তারপর ওয়ানগালা মন্ডপে গিয়ে ক্রুশে খুথিপ অর্থাৎ পাগড়ী ও মালা পরাবেন এবং ক্রুশের তলায়  তিনটি মুসি বাতি জ্বালাবেন।

– এরপর ক্রুশের উদ্দেশ্যে ধূপারতি দেবেন।

-ক্রুশে ধূপারতি দেয়ার পর বেদীতে ধূপারতি দেবেন।

-শোভা যাত্রার শেষে দ্রব্য বস্তুগুলোকে ওয়ানগালা ক্রুশের সামনে অথবা তার চারিদিকে বসিয়ে রাখবেন।

(যথারীতিতে খ্রিস্টযাগ চলবে) ক্ষমানুষ্টান, জয়পরমেশ্বর গানের সময় আরতি, উদ্বোধন প্রার্থনা, ঐশ্ববাণী অনুষ্ঠান, পূজন বর্ষ অনুযায়ী শাস্ত্রপাঠগুলো নেয়া হবে, উপদেশ।

(৩)      ওয়ানগালা অনুষ্ঠান

উপদেশের পর পর্যায়ক্রমে নিম্নরূপে ওয়ানগালার অনুষ্ঠানগুলো অনুষ্ঠিত হবে।

ক) থক্কা অনুষ্ঠান: কামাল যিনি পৌরহিত্য করেন তিনি প্রার্থনা করবেন: হে পরম করুণাময় পিতা তোমার সম্মুখে উপস্থিত ভূমির ও মানুষের শ্রমের এই দ্রব্যবস্তুগলোকে তোমার পবিত্র ত্রিত্ত্বে চিহ্নিত করার জন্য আমরা তোমার কাছে থক্কা দানের প্রস্তুত করা উপকরণ, চালের গুড়ি নিয়ে এসেছি। অনুনয় করি, তুমি ইহা আর্শীবাদ করে পুণ্যম-িত কর যেন এর দ্বারা পবিত্র ত্রিত্বের দ্রব্য বস্তুগুলোকে চিহ্নত করার মধ্য দিয়ে এ বিশ্বব্রহ্মা-ের সকল সৃষ্টির উপর পবিত্রাত্মার শক্তিতে রাজাধিরাজ খ্রিস্টের মধ্যস্থতায় তোমার রাজত্ব ক্রমান্বয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠে।

+ পিতা ও পুত্র ও পবিত্রাত্মার নামে। আমেন।

খ) থক্কা দান: যাজক দ্রব্য বস্তুগুলোকে পবিত্র ত্রিত্বের নামে চিহ্নিত করে থক্কা প্রদান করবেন।

যাজকের প্রার্থনা: হে পরমেশ্বর, তোমার পবিত্র ত্রিত্বের নামে এ দ্রব্য বস্তুগুলোকে চিহ্নিত করে থক্কা প্রদান করছি। এর ফলে সমস্ত সৃষ্টির উপর পবিত্রত্মার শক্তিতে রাজাধিরাজ খ্রিস্টের মধ্যস্থতায় তোমার রাজত্ব ক্রমে সুপ্রতিষ্ঠত হোক।

গ) পবিত্র জল সিঞ্চল: চরুগালা ।

১.        জল আর্শীবাদ: কামাল (যাজক) জল আর্শীবাদ করবেন: হে পরম করুণাময় পিতা, মিনতি করি এই জল আর্শীবাদ করে পুণ্যমণ্ডিত কর যেন এর দ্বারা এই দ্রব্য বস্তুগলোকে সিঞ্চিত করণের মধ্য দিয়ে সকল সৃষ্টি পাপজনিত ধবংসাত্মক সর্বপ্রকার মন্দতার দংশনে ক্ষত-বিক্ষত ও বিপথে গ্রস্ত হওয়া থেকে নিরাময় লাভ করতে পারে এবয় তোমর শক্তিতে সঞ্জীবিত হয়ে উঠে।

+ পিতা ও পুত্র ও পবিত্রাত্মার নামে। আমেন।

২.         (জল সিঞ্চন) যাজক দ্রব্য বস্তুগলোর উপর পবিত্র জল সিঞ্চন করবেন: হে পরম পিতা, তোমার পবিত্র ত্রিত্বের নামে এ দ্রব্য বস্তুগুলো উপর পবিত্র জল সিঞ্চন করছি। অনুনয় করি, এই সিঞ্চনের ফলে সকল সৃষ্টি পরিত্রাত্মার শক্তিমে রাজাধিরাজ খ্রিস্টের মধ্যস্থতায় পাপজনিত ধবংসাত্মক সর্বপ্রকার মন্দতা ও অনন্ত মৃত্যু থেকে ক্রমান্বয়ে নিরাময় লাভ করে তোমাকেই লাভ করুক। আমেন।

ঘ. দ্রব্য বস্তুগুলো উৎসর্গ: নির্ধারিত লোকেরা উপস্থিত ক্রুশের চারিদিকে দাঁড়িয়ে দ্রব্যগুলোকে হাতে উঁচু করে ধরবে যখন যাজক উৎসর্গের প্রার্থনাটি করবেন।

উৎসর্গ প্রার্থনা: হে পরম করুণাময় পিতা, সকল জাতির মানুষ এবং এ বিশ্বের সমস্ত কিছুকে তোমার কাছে উৎসর্গ করতে আমরা এ দ্রব্য বস্তুগুলোকে তোমার কাছে নিবেদন করছি যেন এ ফলে পবিত্রাত্মার শক্তিতে এবং প্রভু যিশুর মধ্যস্থতায় সকল জাতির মানুষ এবয় বিশ্বের সমস্ত কিছু ক্রমান্বয়ে তোমার দিকেই ধাবিত হয়। এ মিনতি করি, তোমার কাছে আমাদের বিশ্বরাজ খ্রিস্টের নামে। আমেন।

ঙ. সাসাৎ সআ : ধূপারতি দান।

-যাজক ক্রুশ ও দ্রব্যগুলোর প্রতি ধূপারতি দেবেন।

-ধূপারতি দানের শেষে দ্রব্যবস্তুগুলোকে যথাস্থানে রাখবেন।

-ধূপারতি দানের আগে যাজকের প্রার্থনা: – হে পরম পিতা, তোমার মহিমা ঘোষণা করতে বিশ্বরাজ খ্রিস্টের নামে আমরা তোমার কাছে এই ধূপারতি নিবেদন করছি। মিনতি করি এর ফলে পবিত্রাত্মার শক্তিতে রাজাধিরাজ খ্রিস্টের মধ্যস্থতায় সারা বিশ্বে ক্রমান্বয়ে তোমমর মহিমার রাজন্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হোক। আমেন।

গারো সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব ওয়ানগালার নাচ

একালের গারো সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব ওয়ানগালার নাচ

(খ্রিস্টযাগ যথারীতিতে চলবে) শ্রদ্ধামন্ত্র, সার্বজনীন প্রার্থনা, অর্ঘ্য প্রস্তুতি, ধন্যবাদিকা স্তুতি, যজ্ঞানুষ্ঠান, সমাপন প্রার্থনা, সমাপনী আর্শীবাদ যাচনা মাধ্যমে ওয়ানগালার খ্রিস্টযাগ শেষ হবে। তারপর সারাদিন ব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে।

ওয়ানগালাও বিষয়ে দু’একটি কথা বলে শেষ করতে চাই। অনেকেই বলে থাকেন রোমান কাথলিকরা যেভাবে ওয়ানগালা উৎযাপন করে তারা গারোদের অনেক ঐতিহ্য সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে ওয়ানগালা করা হয়। এ ধারণাটি আসলে ভুল। কারণ রোমান কাথলিকরা ওয়ানগালায় মান্দি সংস্কৃতিতে খ্রিস্টরাজার পাবর্ণ উৎযাপন করার সময় শুধুমাত্র সালজং এর জায়গায় যিশু খ্রিস্টকে রাজার রাজা করে ওয়ানগালা উৎসব করে; বাকি গারোদের অন্যান্য ঐতিহ্য কৃষ্টি সংস্কৃতিগুলো ব্যবহার করে। যাতে এগুলো হারিয়ে না যায়। তাই খ্রিস্টান হয়ে খ্রিস্টকে জানার পর কেন আমরা অচেনা অজানা কোন দেবতাকে পূজা করবো? খ্রিস্টান হয়ে আসল রাজাধিরাজকে জানার পর সালজং দেবতাকে মানার কোন প্রশ্নই আসেনা। কারণ যিশুই তো আমাদের জন্ম-মৃত্যুর দারাকবাহক। তিনি নিজেই তো বলেছেন, “আমি-ই পথ, আমি-ই সত্য, আমি-ই জীবন। আমার মধ্য দিয়ে না গেলে কেউ-ই স্বর্গ পিতার কাছে যেতে পারে ন।” আজকাল ঢাকা শহরে অনুষ্ঠিত ওয়ানগালায় অনেক কিছু ভাল দিক উঠে আসতেছে। যা মান্দি জাতির জন্য একটা শুভ লক্ষণ। প্রতি বছরই দেখা যায় হাজার হাজার মানুষ ওয়ানগালায় জমাত হয়। অনেকেই মান্দি ভাষায় গান লিখে সুর দিয়ে কেসেট বের করছে এবং ওয়ানগালায় গাওয়া হয়। তাছাড়া মান্দি ভাষায় বই, ডিকশনারী, ম্যাগাজিন বের করছে। গারোদের কৃষ্টি সংস্কৃতির অনেক ধরনের জিনিস দোকানে বিক্রি করা হয়। প্রতিবছরই সরকারী বড় কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ করা হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মান্দিদের অতিহ্যগত সংস্কৃতিগুলো তুলে ধরছে। শুধু ভাল দিকই ফোটে উঠছে তা নয়। কিছু কিছু খারাপ দিকগুলোও ওয়ানালায় লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় ওয়ানগালায় গেলে মনে হয় ওয়ানগাল করার জন্য শুধু করা হচ্ছে। ওয়ানগালার আসল কাজটাই হরা হচ্ছে না। যিনি আমাদেরকে ফসল দিয়েছেন, সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা করেছেন, আর্শীবাদ করেছেন তাঁকে কৃতজ্ঞ চিত্তে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি না। ‘চু’ খেয়ে অনেকেই মাতলামি করে ওয়ানগালার আনন্দঘন মুহূর্তকে দুলিসাৎ করে দেয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মান্দি সংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে অন্যান্য সংস্কৃতি বাঙ্গালী, হিন্দী, ইংরেজি গানে নৃত্য করে। যা অন্য যেকোনো অনুষ্ঠানে করা যেতে পারে কিন্তু এই ওয়ানগালানুষ্ঠানে নয়।

কভার ছবি সাংসারেক শীতল স্নালের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

তথ্যসূত্র :

১.        নকরেক, থিওফিল, গারো সংস্কৃতির জীবনবাদ পর্যালোচনা; নন্দিতা প্রকাশ,৩৬, বাংলাবাজার, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ।

২.         রহমান, বাবু ও রেমা, প্রতিভা (সম্পাদনায়), গতিধারা, ৩৮/২ক বাংলাবজার, ঢাকা-১১০০,২০০৯ খ্রিষ্টাব্দ।

৩.        ওয়ানগালা স্বরণিকা ২০০১ খ্রিষ্টাব্দ ।

৪.        Aloysius, Sr. Remita, SSMI, Wangala celebration in the best of Christ the king: A step towards in culturation of Garo Culture in Christianity; Holy Spirit Major Seminary, ২০০৮.

৫.        মঙ্গলবার্তা।

৬.       দ্বিতীয় ভাটিকান মহাসভার দলিলসমূহের ১৩নং এর অনুচ্ছেদ, ধর্মীয় খ্রিষ্টমণ্ডলীর ধর্মীয় স্বাধীনতা; পৃষ্টা, ৪১২-৪১৩।



দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিতামূলক নিউজপোর্টালের উপর মানুষ নির্ভর করবে।। নিখিল মানখিন

আবিমা গারো ইয়ুথ এসোসিয়েশন (আজিয়া)’র আহ্বায়ক কমিটি গঠন

আত্মকথা ।। জীবনের বাঁকে নোঙ্গর ।। ফাদার শিমন হাচ্ছা

আত্মকথা ।। আমার বাইপাস অপারেশন ।। ফাদার ‍শিমন হাচ্ছা

আমার প্রিয় মানুষ সুভাষ জেংচাম ।। ফা. শিমন হাচ্ছা

বাসন্তী রেমার নতুন জীবনের সূচনা, তৈরি হচ্ছে দোকান ও পাঠাগার

শুভ বিজয়া দশমী ।। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হল দুর্গাপূজা

নভেম্বরে নতুন গান ‘সালনি থেং’সুয়ে’ নিয়ে আসছে গারো ব্যান্ড দল-ব্লিডিং ফর সার্ভাইভাল

ওয়ানগালার তাৎপর্য ও গুরুত্ব || রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক

সোমেশ্বরী(সিমসাং)নদীর অবৈধ বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে মানববন্ধন

আত্মকথা ।। আমার বাইপাস অপারেশন ।। ফাদার ‍শিমন হাচ্ছা

https://www.youtube.com/watch?v=OUjpZh56QXk




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost