Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সাহিত্যপ্রেমিদের রসজগতের স্বপ্নলোকে প্রবেশের সোপান “জাতথাংনি জুমাং” ।। প্রণব নকরেক

প্রকাশিত : অক্টোবর ২৩, ২০২০, ১৮:০৮

সাহিত্যপ্রেমিদের রসজগতের স্বপ্নলোকে প্রবেশের সোপান “জাতথাংনি জুমাং” ।। প্রণব নকরেক

“যে সমাজে সাহিত্যের কোনো কদর নাই, তাহা সাধারণত বর্বর সমাজ।… দেশকে বা জাতিকে উন্নত করতে ইচ্ছা করলে, সাহিত্যের সাহায্যেই তা করতে হবে। মানবমঙ্গলের জন্য যত অনুষ্ঠান আছে, তার মধ্যে এইটিই প্রধান ও সম্পূর্ণ। ” লেখার প্রারম্ভে ডা.লুৎফর রহমানের বক্তব্যটি জুড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য সাহিত্যের অন্তর্লোকে প্রবেশ করে আমাদের অন্তর্জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা ও প্রয়োজনাতীত রসবস্তুর সন্ধান করা। আর এই সন্ধানের উপলক্ষ গারো জাতিসত্তার কবি মতেন্দ্র মানখিনের (১৯৫২- বর্তমান ) ২০২০ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ-  “জাতথাংনি জুমাং ( জাতিসত্তার স্বপ্ন )”।

বহির্জীবনের কত কিছুরই প্রয়োজন হয়। কিন্তু অন্তর্জীবনেরও যে কিছু প্রয়োজন সেটা আমরা ভুলে যাই। অথচ ‘বহির্জীবনের চেয়ে অন্তর্জীবন বড় ‘। হয়তো অনেকে বলবেন পেটে যদি না থাকে ভাত, সাহিত্যে কাটবে না রাত। কিন্তু জীবনের সাথে যদি প্রাণ না থাকে তাহলে সে জীবন সফল হলেও সার্থক হয়ে উঠে না। জীবন ও প্রাণের সম্মিলনেই সার্থকতা।

গারো সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট কবি মতেন্দ্র মানখিন

কবি মতেন্দ্র মানখিন

“জাতথাংনি জুমাং” কবি মততেন্দ্র মানখিনের অসাধারণ সৃষ্টিকর্ম। নামকরণেই গ্রন্থটির অবয়ব প্রতিফলিত। গারো সাহিত্য প্রেমিদের রসজগতের স্বপ্নলোকে প্রবেশের সোপান “জাতথাংনি জুমাং”। লেখকের লেখার নানা উদ্দেশ্য থাকে। কেউ খ্যাতির আশায়, কেউ মনের আনন্দে হৃদয়ানুভূতির প্রকাশ করতে, আবার কেউবা সমাজের কল্যাণ চিন্তা করে লেখনি ধারণ করেন। তবে যে উদ্দেশ্য নিয়েই লেখা হোক সেখানে লেখকের নিজস্ব দর্শন থাকা চাই। কবি এই গ্রন্থটিতে গারো জাতিকে স্বপ্ন বুনতে বলেছেন। সমাজকে জাগাতে চেয়েছেন। অর্থাৎ সমাজের হিতসাধন তাঁর উদ্দেশ্য। সে হিসেবে গ্রন্থটি উপযোগবাদী সাহিত্যকর্ম। কবিতায় দেখি –

“জুমাং নিকনা নাংগেন মিখাংচিনি ফ্রিংগিত্তালখো

নাম্মা সিল্লা আরও বিবিখো আনচিং রাক্ষিনা নাংগেন “

তবে অনেকে বলবেন ” জাতি যখন দৃষ্টিসম্পন্ন ও জ্ঞানী হয়, তখন জাগবার জন্য সে কারো আহ্বানের অপেক্ষা করে না, কারণ, জাগরণই তার স্বভাব। ” কিন্তু দৃষ্টিসম্পন্ন হতে হলে এসব গ্রন্থ পাঠ আবশ্যক। সমকালের প্রভাবে আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ থেকে বিচ্চুতি, ভিন্ন সংস্কৃতির ছায়ায় নিজস্বতা হারানো জীবনযাত্রা কবিকে ব্যথিত করে। তাইতো আক্ষেপের সুরে ধ্বনিত হয় –

“আনচিনি খা, সায় থমথমে দংআচাআনি বিদিংরাং

দিংথাংফিল্লেংজক। দাকবেয়াল দাকমেশকা

মা! মান্থি চলরাং দিংথাং ফিল্লেংজক। “

এছাড়াও –

“গিপিনরাংনি দাকমেশকারাং ব্লংয়েংয়া

আনচিংনিদে জামানচিসা স্রাপফাজা”

ক্রমশ যেন অন্ধকারের দিকে ধাবিত আমরা –

“আন্দালানি মাইদোষ? উইগিপা মান্দি

উইগিজাদাকে আন্দালাও নাপে খাত্তোদে।”

কিন্তু কবি এতে নিরাশ হয়ে শ্রান্ত নন। তাইতো বলেন –

“খুরাং বিবাল আরও গীতরাংখো

নাম্মে রাক্ষিনা নাংগেন জাতথাংনি জুমাংখো।”

আর এখানেই কবির সার্থকতা। জাতির কল্যাণ সাধনে নিমগ্ন কবি সংকীর্ণতার জালে আবদ্ধ হলেও তিনি এই সংকীর্ণতা থেকে নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন। কবিতায় –

“নৈরাজ্যের মধ্যেও আঁকড়ে থাকতে হবে সত্য – সুন্দরকে হাতে – হাত মিলে সাজাতে হবে সুন্দর মানবতার বাগান।”

গারো জনজীবনের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা, নদী, নারী, বর্তমান জীবনের চালচিত্র সবকিছুই কবিতায় ধরা দিয়েছে অসাধারণ ব্যঞ্জনায়। কবিতায় –

“আং গিসিক নিংও সিকদিকদিক সেরেজিং গ্রাপেংয়া

মিকচি রুরারুরা কংশ -নিতাই -সোমেশ্বরী

বালস্রাতা মান্দিরাংনি খুরাং আজিয়া দারুয়া রে-রে।”

ভাষা কোন জাতিসত্তার আত্মপরিচয়ের প্রধান উপকরণ। ভাষা হারিয়ে যাওয়ার অর্থ আত্মপরিচয় বিলীন হওয়া। তাইতো কবির আক্ষেপ –

“…বিমিং বিচং গিমারুরায়

ব’নাংয়েংজকসা আনথাংথাংনি খুরাং।

নাম্মেন দুক আরও গিসিক সা’নি অংবেয়া আংয়াদে

দাওরিসাল থেকথেক উয়া বাগানখো থারিখোজা।”

ইতিহাসের সুরে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধরে না রাখার অনুতাপ কবির কণ্ঠে ধ্বনিত –

“চীন, তিব্বত বার্মা ইন্দোপাকনি থিংনাপগিপা বুরুং আরও

আবৃ – আখলও স্খাং চেংওনি থারিগিপা চাসংনিচাসং

খা’থা খুরাংখো রাক্ষিনা মানজাজক।”

গারো সমাজে নারীর অবস্থান সবসময় উর্ধ্বে। কবির দৃষ্টিতেও তাই। নারী যেন মায়ের মতোই আমাদের সমাজ ব্যবস্থাকে আগলে রেখেছে। কারণ নারীতেই আমাদের আত্মপরিচয়। কবিতায় –

“মান্দে মেচিক মাংমাং অংজা

মেচিক মিংদে আবা – সংবা জাত মাহারী নাংচাপা

মিচিক আগিসাক বিয়া নিথুরিসা

মান্দে – সমাজও নকদাং ফাথিনি নকগিপা।”

তবে কবির দৃষ্টির বৈপরীত্যও পরিলক্ষিত –

“… মান্দি মিচিক মিখাংও রেরোওয়াটা

গিপিন জাতমিং নাংরি’মে উয়া জাতথাংখো গুয়ালজক

ফ্লাকন ইন্না রুরি দেব্রিং মাগিপা দংফানা সাকসা রুরিমিং

ইয়া আদোকও মাই যন্ত্র গ্নাং?  মারাংখো দিংথাং ফিলাতানি।”

কবি মাত্রই আবেগের পূজারি। রোম্যান্টিকতা তার কবিতার হাতিয়ার। কবির হৃদয়ে প্রণয়ের লহর খেলবেনা সেটা ভাবা ভুল। অন্তরে অনুভূতির উচ্ছ্বাস থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কবিতায় –

“নমুল মেচিকনি খাবাক মজিমা

নিকমানাও আন্দাল আন্দাল আনথাম

সিকদিক চি, নদিকদিক দাকা।”

কবিতায় ছন্দের বালাই রক্ষিত হয়নি। তবে শব্দের গতিময়তা লক্ষ করা যায়। কবিতায় দেখি –

“আইয়াও সিম্মুলা, নিথুয়া আনসেংআ আগিলসাক।”

মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্ত অন্ত্যমিল পরিলক্ষিত হয় –

“মিক্কা চাক্কি দো, রিম্মিট খাসায় মিকগুয়া

গানদিং চিনদিংখো নিকে উইনা মাফাআ”

অলংকার ব্যবহারে কবি গারো লোকজ জীবনকেই অবলম্বন করেছেন। যা গ্রন্থটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। গারো নারীকে তিনি গারো পাহাড়ের বুক চিড়ে বয়ে চলা কংস, নিতাই, সোমেশ্বরীর সাথেই উপমায়িত করেছেন।  কবিতায় –

“সোনা – রূপাগ্রে মামুংবা গানজা

জা! আওবা মামুং গানজা কাংখারেওবা

কংশ – নিতাই – সিমসাং গিত্তা খাতনামান্না।”

চিত্রকল্প ব্যবহারেও তিনি নদী আর গারো লোকজীবনকে একীভূত করেছেন। কবিতায় –

“নিতাই দারেং খুরাং বিবালখো বান্নাংআ

চিও বান্নাংআ মান্দিরাংনি খাতাখুরাং

মিংমানগিজা খা, সা আরও গীতমালা

নমুল মেচিকনি খাবাক মজিমা

নিকমানাও আন্দাল আন্দাল আনথাম

সিকদিক চি, নদিকদিক দাকা।”

প্রতীক ব্যবহারে কবি সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন। কবিতায় মেঘ যেন বখাটে লোকের প্রতীক হয়ে উঠেছে।

কাগজের চিল হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনে চেপে বসা  অপশক্তিরই প্রতীক।

“লেকখানি দোরেং বিলা

গিচ্চাক, রিম্মিট গিব্বক, থাংসিম রকমারি ।”

এবং

“খা’মগ্রি – আগ্রি আরাথগিপা মিক্ষা ফাংনান

দেংগুদাকা স্কুল – কলেজচি রেগিপা মেচিকরাংমিং।”

মোতাহের হোসেন চৌধুরীর কথাতেই শেষে বলতে হয়, “সভ্যতা সৃষ্টি করে ব্যক্তি – সুন্দর চিত্ত মানুষের প্রভাবেই সভ্যতা সৃষ্টি হয়।” “জাতথাংনি জুমাং” যত রচিত হবে আমরা ততো বিকশিত ও সমৃদ্ধ হব। কারণ ” নিজের চিন্তা, নিজের ভাবনা, নিজের কল্পনার বিকাশ না হলে কালচার্ড হওয়া যায় না।”

বইটি প্রকাশ করেছে থকবিরিম প্রকাশনী, প্রচ্ছদ করেছে নির্ঝর নৈঃশব্দ্য মূল্য ১৫০টাকা।



সামনে আরো ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় গান নিয়ে আসতে পারবো আশা করছি ।। পিংকি চিরান (এফ মাইনর)

গানের শিক্ষক পল্লব স্নাল স্মরণে ।। মতেন্দ্র মানখিন

রাঙামাটিতে চলন্ত সিনজিতে আদিবাসী কলেজ ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা, আটক ২

জংজংআ রওয়া  কিংবা জা-চকগা রওয়া  নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

বহেরাতুলি গ্রামকেও গ্রাস করছে সোমেশ্বরী ।। জর্জ রুরাম

ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দিঘলবাগ গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ।। অরন্য ই. চিরান

মেথ্রা জাজং নিয়া বা যুবতীদের চাঁদ দেখা নাচ: জিংজিংগ্রিকগা রওয়া বা প্রিয়জনকে ধরে নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

ব্রাদার গিউম পেলেন নেদারল্যান্ড রাজার বিশেষ সম্মাননা ‘অ্যাওয়ার্ড অব দ্যা কিং

ইউটিউবটাই আমার ভালোবাসা ।। নীল নন্দিতা রিছিল

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-৪ ।। বর্ণমালা সংক্রান্ত কিছু তথ্য ।। বাঁধন আরেং




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost