Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আত্মকথা ।। জীবনের বাঁকে নোঙ্গর ।। ফাদার শিমন হাচ্ছা

প্রকাশিত : অক্টোবর ২১, ২০২০, ১২:১৩

আত্মকথা ।। জীবনের বাঁকে নোঙ্গর ।। ফাদার শিমন হাচ্ছা

না হয় ষাট বছর আগের কথা বাদ দিলাম। এ একবিংশ শতাব্দীতেও যে ইউনিয়নে (রংছাতী) এক কিলোমিটার রাস্তাও পাকা হয়নি, ডিজিটাল যুগে উন্নয়নের ছোঁয়া  লাগেনি, সে এলাকার লোকজনের উচ্চ বিলাসী স্বপ্ন দেখা স্বভাবত অবাস্তব। আমার জন্ম এ ইউনিয়নেই। মেঘালয় রাজ্যের সীমানা ঘেঁষে রাংচকমাই টিলার পাদদেশে পাঁচগাঁও গ্রামে। জেলা শহর নেত্রকোনা থেকে প্রায় ৪০/৫০ মাইল, উপজেলা কলমাকান্দা থেকে ৮ মাইল উত্তরে এ গ্রামের অবস্থান। বর্তমান সময়ের, শুকনা মৌসুমে যানবাহন মোটর সাইকেল এবং ভরা বর্ষা মৌসুমে নৌকা ছাড়া উপজেলা শহর পর্যন্ত পৌঁছার কোন ব্যবস্থা নেই। অতীতে ৩০/৮০ মাইল পায়ে হেঁটে ঠাকুরকোনা রেলস্টেশনে এসে রেলগাড়ি ধরতে হতো, দুর্ভাগ্যক্রমে ঠাকুরকোনা রেলগাড়িটি মিস করলে আরো ১০/১৫ মাইল হেঁটে নেত্রকোনা থেকে গাড়ি ধরা ছাড়া কোন উপায় ছিলো না। এ ঠাকুরকোনা পর্যন্ত আসলেই মনে হতো আমি আর একটা জগতে প্রবেশ করছি। এখানে নতুন নতুন মানুষ,  ভিন্ন পরিবেশ। অদ্ভুত শিহরণ। এ পাচঁগ্রামে আমার ছোটবেলার সাথী কয়েকজন পাড়ার ছেলে-মেয়ে, বাড়ির কয়েকটি গরু-মহিষ, মেঘালয় পাহাড়ের গাছ-গাছালী। ছোট একটি গণ্ডি থেকে বেড় হওয়া আমার কল্পনার বাইরে, এটাই ছিল আমার জগত।

এ সীমাবদ্ধ জগতের থেকেও বিশাল পৃথিবীর জীবন দর্শন, ইতিহাস, কৃষ্টি-সংস্কৃতি দেখার স্বপ্ন দেখতাম। এ স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে যে ধাপগুলো ধরে যেতে হবে, সে ধাপগুলো পেরিয়ে আসতে তখন থেকে ছক আকঁতে থাকি। পাঁচগাঁও গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশ। এক সময় আমার মা বাবা আমাকে ভর্তি করিয়ে দেয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এ বিদ্যালয়ে পড়াশুনার সময়েই আমার মা মারা যান। মা মারা যাওয়াতে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম, পাশাপাশি অন্তরে হতাশা নিরাশা, মনে হয় যেন সবকিছু হারিয়েছি জীবন থেকে। কিন্তু এ কষ্ট দূর করতে এগিয়ে আসে আমার বড়দি, বড়দা-দাদাবাবু, তারা তাদের ভালবাসা যত্ন দিয়ে, সামনের দিকে চলার অনুপ্রেরণা যোগায়। শিক্ষিত হওয়ার জন্য, ভাল মানুষ হয়ে, মানুষ সেবার জন্য আমাকে তারা স্বপ্ন দেখায়। তাই তারা মা মারা যাওয়ার পরই বালুচড়া মিশন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয় আমাকে। রেখে দেয় যাজকদের পরিচালিত হোস্টেলে।

আমার নতুন জগত, নতুন পরিবেশ, নতুন অভিজ্ঞতা। ছেলেবেলার স্মৃতি, বন্ধুবান্ধব ছাড়তে কষ্ট হয়েছে আমার। এ হোস্টেলে আমিই ছিলাম সর্বকণিষ্ঠ সদস্য। বালুচড়া হাইস্কুলে পড়াশুনা করার সুবাদে অনেক বন্ধু-বান্ধব জীবনে জুটেছে। তাদের সাথে মেলা-মেশা করে অনেক অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। এ বালুচড়া হাইস্কুল থেকেই মেট্রিক পরীক্ষা দিয়ে পাশ করেছি। আমার জীবনের প্রথম ধাপ শেষ করতে পেরে সত্যিই আনন্দিত হয়েছি। এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার এবং জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের পালা। জীবনের এলোমেলো লক্ষ্যগুলো এক জায়গায় আনা খুবই কষ্ট হচ্ছিল। এমনি সময়ে আমার বড় ভায়ের মাধ্যমে ঢাকার বান্দুরা সেমিনারিতে যাওয়ার ডাক পড়ল। বলতে দ্বিধা নেই, সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় বান্দুরায় যাত্রা করলাম। বান্দুরা তিন মাস থাকাকালীন সময়ে ইংলিশ কোর্স, সেমিনারির আইন কানুন, যাজকীয় জীবনের প্রাথমিক গঠন সমূহ শিক্ষা লাভ করি।

তিন মাস বান্দুরাতে থাকার পর চলে এলাম ঢাকা রমনা ইন্টারমিডিয়েট সেমিনারিতে। ভর্তি হলাম ঢাকা নটরডেম কলেজে। এ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং বি.এ পাশ করলাম। দেশীয় প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে আমার শেষ সম্পর্ক। তারপর মূল যে যাজকীয় জীবনের শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য  চলে গেলাম ঢাকা বনানী হোলি স্পিরিট মেজর সেমিনারিতে। এ সেমিনারিতে প্রাচীন, মধ্যযুগীয় ও আধুনিক দর্শনশাস্ত্র, বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারণা, ঐশ^তত্ব, মা-লীক আইন, সিভিল আইন নানাবিধ শিক্ষা, এছাড়া মাঝে মাঝে পালকীয় কাজ, এভাবে দীর্ঘ ৬/৭ বছর পড়তে হয়েছে এ মেজর সেমিনারিতে। জীবনের  প্রয়োজনে লম্বা শিক্ষা জীবন। এ শিক্ষাযাত্রা বাস্তবতায় অনেক ঘাট প্রতিঘাট এসেছে। সময়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে জীবনের লক্ষ্য বিচ্ছুত হয়েছে। বার বার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়েছে। ছেলে বেলার সাথীদের সাথে খেলতে খেলতে একজন খেলোয়াড় হতে চেয়েছিলাম, পুলিশের কাজ কর্ম দেখে হতে চেয়েছিলাম পুলিশ কর্মকর্তা, বাড়িতে ছোট পরিবারে বাবা আর দাদাবাবুদের রাজনীতি আলাপ শুনে চেয়েছিলাম রাঝনীতিবিদ হতে, বেসরকারি  সংস্থার লোভনীয় পদ ও বেতনে চাকুরির অফারও পেয়েছিলাম। অনেক সময় বৈরাগ্য জীবন ছেড়ে সংসারী হতে চেয়েছিলাম। বিশ্বস্ততার সাথে লেখা পড়া শিখে অনেক জ্ঞান অর্জন করেছি, এ সমস্ত কাজ দক্ষতার সাথে করার সক্ষমতা আমার আছে, এটা আমি বিশ্বাস করি। হয়তোবা এ দক্ষতার সাথে কাজগুলো করে কাঙ্খিত প্রমোশনও পেতে পারতাম। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা সেই জীবনের বাঁকে আমাকে ধাবিত করেননি। আমার অন্তরে আলবার্ট আইনস্টাইনের এ কথাটি সবসময় আলোড়িত করেছে, তিনি বলেছিলেন “Try not to become a man of success but a man of value”. হতে পারতাম একজন সফল মানুষ, অর্থ প্রাচুর্য্যের পাহাড় গড়তে পারতাম, ছোট একটি সংসার করে শান্তিতে জীবন  যাপন করতে পারতাম।

বহুধা জীবন লক্ষ্যের মোহনায় নোঙ্গর ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। ঈশ্বরের ইচ্ছা তাঁর ভালবাসার যাজকীয় জীবন ব্রতের সচ্ছ নদীতে নোঙ্গর ফেলতে, আমাকে সাহস যুগিয়েছেন এবং দূর্গম জনপদ থেকে আমার মত একজন নগণ্য মানুষকে তাঁর যাজক হওয়ার জন্য আহবান করেছেন, তাঁকে হৃদয় থেকে ধন্যবাদ ।



জংজংআ রওয়া  কিংবা জা-চকগা রওয়া  নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

বহেরাতুলি গ্রামকেও গ্রাস করছে সোমেশ্বরী ।। জর্জ রুরাম

ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দিঘলবাগ গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ।। অরন্য ই. চিরান

মেথ্রা জাজং নিয়া বা যুবতীদের চাঁদ দেখা নাচ: জিংজিংগ্রিকগা রওয়া বা প্রিয়জনকে ধরে নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

ব্রাদার গিউম পেলেন নেদারল্যান্ড রাজার বিশেষ সম্মাননা ‘অ্যাওয়ার্ড অব দ্যা কিং

ইউটিউবটাই আমার ভালোবাসা ।। নীল নন্দিতা রিছিল

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-৪ ।। বর্ণমালা সংক্রান্ত কিছু তথ্য ।। বাঁধন আরেং




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost