Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দিঘলবাগ গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ।। অরন্য ই. চিরান

প্রকাশিত : অক্টোবর ১৪, ২০২০, ২৩:০৫

ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দিঘলবাগ গ্রামের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ।। অরন্য ই. চিরান

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একাত্তর প্রজন্মের এমন কোন ব্যক্তিকে খোঁজে পাওয়া যাবে না, যার স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াল স্মৃতি নেই। সেই যুদ্ধে সাড়ে সাত কোটি মানুষের জীবনে চরম দুর্গতি নেমে এসেছিল। সেদিন মানুষের যানমালের কোন নিরাপত্তা ছিল না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে, অনেক মানুষ নিজের জীবন বাজি রেখে, দেশ-মাতৃকা রক্ষায় ঝাপিয়ে পড়েছিল। প্রচন্ড অনুভুতি তৈরি হয়েছিল প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে। মহান মুক্তিযুদ্ধে যার যার পরিমন্ডল থেকে বিশেষ অবদান রাখার চেষ্টা করেছিল সেদিন। অবদানগুলির মধ্যে রয়েছে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ, জনগণকে সংগঠিত করা, তথ্য প্রদান, গুলি বহন, আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দেয়া, খাবার পানি সরবাহ করা, বিপদাপন্ন যোদ্ধাদের লুকিয়ে রেখে জীবন বাঁচানো ইত্যাদি। আবার অনেকে কবিতা ও গানের মধ্য দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন অবিরত।

এমন অনেক স্থান আছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সত্যেও সেই ইতিহাস কালো অন্ধকারে আড়াল রয়েছে আজোও। তাঁদের স্মৃতিময় অবদান আর লেখা হবে না মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে। বড় বড় ঘটনা বড় বড় মানুষের ভীরে সত্যিই হারিয়ে যাবে তাঁদের স্মৃতি। শুধু একটি পরিবার আর প্রজন্ম তাদের কান্না ভরা স্মৃতিটুকু ধরে রাখবে কয়েক যুগ কিন্তু আর কতদিন এ স্মৃতি থাকবে তাদের এক হৃদয়ে, যদি ইতিহাসের পাতায় লেখা না হয় সেই ঘটনা বা স্মৃতিময় অবদান। কালের আর্বতে হারিয়ে যাওয়া এ এলাকার মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা লিখতে গিয়ে বিশিষ্ট গীতিকার খান আতাউর রহমানের লেখা মহান মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত সেই গানের একটি কথা বার বার মনে পড়ে “হয়ত বা ইতিহাসে তোমাদের নাম লেখা রবে না, বড় বড় মানুষের ভিড়ে…..।”

বড় অভিমান করে বলতে হয় মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত এ গানের মতই বড় বড় মানুষের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার দিঘলবাগ গ্রামের মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই স্মৃতি। দিঘলবাগ মহান মুক্তিযুদ্ধের একটি ঐতিহাসিক ও স্মৃতি বিজড়িত গ্রাম। আমার মায়ের (ফিলোমিনা চিরান) কাছে শুনেছি এ গ্রামের মানুষ দূরদুরান্ত থেকে আসা অসহায় শরণার্থীদের সীমান্ত পার হতে নানানভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, অনেক রণক্লান্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নাস্তা-পানির ব্যবস্থা করে আবার রণাঙ্গনে ফিরিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের অবদানের কথা তিনি প্রায়ই বলতেন ছোটকালে। সেই কথাগুলি আজোও আমার হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে। এখানে দু’জন শহিদের কবর আর হাজার হাজার লোকের গণকবর রয়েছে। যাদের স্মৃতি যুগ যুগ ধরে আগলে রেখেছে এ গ্রামের প্রতিটি মানুষ। তবে তাঁরা বলতে পারেন না তাঁদের ঠিকানা কোথায়? কিইবা তাঁদের পরিচয়? এ বিষয়ে দিঘলবাগ গ্রামের একজন মুক্তিযোদ্ধা পা: ফ্লোরেন্স শিরিল রংদীর (৬২) কাছ থেকে জানা যায়, শহিদ মুক্তিযোদ্ধা দুজনেরই বাড়ি পূর্বধলা এলাকায়। তিনিও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারেননি দুজন শহিদ কোন গ্রাম বা এলাকার? তাই এবিষয়ে আরো জানার চেষ্টা করা হলো। তাঁর কাছে আংশিক তথ্য নিয়ে আরো গভীরে অনুসন্ধান করা হয়। শেষে বেড়িয়ে এলো, এই মহান ব্যক্তিদ্বয় কে? কিইবা তাঁদের পরিচয়? শহিদ মুক্তিযোদ্ধার ভাতিজী (প্রথম নিম্ন বর্ণিত শহিদ) জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীমা সুলতানা (৪২) ও নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা উপজেলার হোগলা ইউনিয়নে অবস্থিত সাধুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আফসারী বেগম পান্না (৪৮) তথ্য দিয়ে জানালেন এই দুজন শহিদের নাম ও পরিচয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যে দুই শহিদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণী পাওয়া যায়।

চির নিদ্রায় শায়িত একজন হলেন শহিদ আমিরুল ইসলাম ফেরদৌস, তিনি হলেন পূর্বধলা উপজেলার ধলাযাত্রাবাড়ি গ্রামের মৃত. আমিরুদ্দিন তালুকদার ও মৃত. মরিয়মে নেসার সন্তান। চার ভাইবোনের মধ্যে শহিদ আমিরুল ইসলাম ফেরদৌস ছিলেন সবার ছোট। তখন তিনি ছিলেন পূর্বধলা জগৎমনি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের পূর্বে বাড়ির লোকেরা তাঁর কাপড় ইস্ত্রি করা দেখে সন্দেহ করেছিলেন যে, ফেরদৌস মনে হয় মুক্তি বাহিনীতে যাবে। কম বয়সী ছেলে বলে বাড়ির লোকেরা কেউ তাঁকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর পক্ষ্যে ছিলেন না। তাই তাঁকে সবাই চোখে চোখে রেখেছিল। কিন্তু তাঁর ছিল অদম্য ইচ্ছা। যেদিন সে মুক্তিযুদ্ধে যায়, সেদিন সারারাত ধরে বাতি জ্বলছিল তাঁর কাছাড়ি ঘরে। বাড়ির লোকজন জানতেন ছেলেটা মনে হয় পড়াশুনা করছে। সেদিন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য তিনি বাড়িতে না বলে রাতের অন্ধকারে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিববাড়ি ইয়ুথ ক্যাম্পে এসে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যোগদান করেন।

অপর একজন শহিদের নাম হলো গকুল চন্দ্র দেবনাথ। তাঁর বাড়ি পূর্বধলা উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের শাহাবাজপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম শ্রী সচিন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ। তবে শহিদ গকুল চন্দ্র দেবনাথের বিষয়ে তেমন কোন কাহিনি জানা যায়নি। জানা যায় তাদের দুজনেরই বয়স তখন ১৬-২০ বছর ছিল। ইয়ুথ ক্যাম্পে কিছুদিন থাকার পর ভারতের শিববাড়ি বিএসএফ (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) এর হাবিলদার মি. রামদিং মারাক (নাফাক) ওরফে আর.এন মারাক-এর নেতৃত্বে ঘোষগাঁও এলাকার জিগাতলা (কামাখ্যাবাড়ি সংলগ্ন) যুদ্ধে অংশ নেয়। সেই সময় জিগাতলা এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বড় একটা ঘাঁটি ছিল। সেই পাক ঘাঁটিতে আক্রমন করার সময় তাঁদেরকে বিএসএফ হাবিলদার রামদিং মারাক (নাফাক) দুজনকেই অস্ত্রসহ এ্যাম্বুসে রেখেছিলেন। সেদিনের সেই প্রচন্ড যুদ্ধে তাঁরা দুজনই প্রাণপণ লড়াই করেন। তখনও অস্ত্র চালনা সম্পর্কে তাঁরা তেমন অবগত ছিলেন না। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে উপায়ান্তর না দেখে তাঁরা দু’জনই একটি বাড়িতে লুকিয়ে পড়েছিলেন। তখন পাক সেনারা তাঁদেরকে বেইনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে রেখে যায়।

সেদিন ছিল ১৭ জুলাই ১৯৭১ সাল। উক্ত তারিখে দুজনই শহিদ হন। পাক সেনারা চলে গেলে তাঁদের দুজনকেই জিগাতলা গ্রামের একটি বাড়ি থেকে তুলে এনে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রাম দিঘলবাগে নিতাই নদীর তীরে দাফন করা হয়। দাফন কাজ সম্পন্ন করার সময় বীর মুক্তিযোদ্ধা পা: ফ্লোরেন্স শিরিল রংদী, আশীষ চিসিম, সেলিম হাজং ও শাহীন হাজংসহ অনেকে গার্ডে ছিলেন।

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিববাড়ি এলাকায় একটি শরণার্থী শিবির ছিল। সেখানে প্রায় পঞ্চাশ হাজার বাংলাদেশি শরণার্থী বাস করতেন। সেই ক্যাম্পে থাকা লোকজন প্রায় সময় ডায়রিয়া-কলেরা-আমাশয়সহ নানান রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যেতেন। দিঘলবাগ গ্রামের শেষ প্রান্তে নিতাই নদীর তীরে সেই মৃত ব্যক্তিদেরকে কবর দেওয়া হতো। এখানে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার মৃত মানুষকে গণকবর দিয়েছিল।

আমাদের মহান স্বাধীনতার জন্য যারা অকাতরে নিজের জীবন দিয়ে গেছেন, তাঁদের সেই স্মৃতি চিহ্ন আজ বিলীন প্রায়। প্রতি বছর প্রমত্তা পাহাড়ী নদী নিতাইয়ের ভাঙনের ফলে অর্ধেকের বেশি নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেই গণকবরটা রক্ষার জন্য অতি শীঘ্রই এখানে বাঁধ নির্মাণ করা জরুরি। এছাড়াও শহিদ দুই মুক্তিযোদ্ধার অমর স্মৃতিকে রক্ষা জন্য একটি স্মৃতি স্তম্ভ তৈরি করা দরকার। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে অত্র গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ও শহিদ পরিবারের সদস্যরা গণকবর রক্ষা করার জন্য বাঁধ নির্মাণ ও শহিদ স্মৃতি স্তম্ভ তৈরির জোর দাবি জানিয়েছেন। এ এলাকা অতি দুর্গম বলে এখানে একটি পাকা রাস্তাও তৈরি করা দরকার। এতদিন এই দুই শহিদের পরিচয় জানত না এই অঞ্চলের মানুষেরা। আশা করি এ কলাম বের হওয়ার পর শহিদদের প্রকৃত পরিচয় জানা হবে। পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের লোকজনও কবরটি চিহ্নিত করতে পারবে।

অনতীবিলম্বে বাংলাদেশ সরকার এর যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে, অচিরেই হারিয়ে যাবে শহিদদের অবদান। বিলীন হয়ে যাবে ইতিহাস। দিঘলবাগ গ্রাম তথা বাংলাদেশের গর্বের স্থান আর থাকবে না, মানুষের হৃদয়ে।

 

লেখক পরিচিতি: পিএইচডি গবেষক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও দিঘলবাগ গ্রামের সন্তান।

অরন্য ই. চিরান

অরন্য ই. চিরান

 



ব্রাদার গিউম পেলেন নেদারল্যান্ড রাজার বিশেষ সম্মাননা ‘অ্যাওয়ার্ড অব দ্যা কিং

ইউটিউবটাই আমার ভালোবাসা ।। নীল নন্দিতা রিছিল

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-৪ ।। বর্ণমালা সংক্রান্ত কিছু তথ্য ।। বাঁধন আরেং

https://www.facebook.com/thokbirim/videos/782974379102661

লেখক ও মানবাধিকারকর্মী সঞ্জীব দ্রং

ব্রাদার গিউমের বাংলাদেশে বসবাসের সময় ৪০ বছর পূর্ণ হলো এই বছর। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে ব্রাদার বাংলাদেশের মানুষজনদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সেই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এই প্রথম বাংলাদেশে অবস্থানরত নেদারল্যান্ডবাসী ব্রাদার গিউম নেদারল্যান্ড রাজার বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার অ্যাওয়া্র্ড অব দ্যা কিং’ পেলেন। সেই সম্মাননা প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলছেন বিশিষ্ট লেখক ও মানবাধিকারকর্মী সঞ্জীব দ্রং

Gepostet von Thokbirimnews.com am Freitag, 9. Oktober 2020




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost