Thokbirim | logo

৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

কর্ম ও জীবনী।। বিশপ ফ্রান্সিস এ. গমেজ ছিলেন সত্যিই একজন প্রবক্তা

প্রকাশিত : অক্টোবর ১৩, ২০২০, ১২:৪৫

কর্ম ও জীবনী।। বিশপ ফ্রান্সিস এ. গমেজ ছিলেন সত্যিই একজন প্রবক্তা

ঈশ্বর প্রত্যেক মানুষকে সৃষ্টি করার সময় এক একটি পরিকল্পনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। যাতে তার দ্বারা জগতের মঙ্গল হয়। ঈশ্বর বিশপ ফ্রান্সিস গমেজকেও মহান দায়িত্ব দিয়ে এজগতে প্রেরণ করেছিলেন। ঈশ্বরের এই মহাদানের প্রতিদানে বিশপও মানুষের মঙ্গলের জন্য নিজেকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জলাঞ্জলি দিয়েছেন। মানুষ হিসেবে বিশপ ফ্রান্সিস ছিলেন একজন সাধাসিধে। ছোটোখাটো মানুষটি খুবিই শক্ত ও কর্মঠ ছিলেন। তাঁর হাসির মধ্যেও একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রার্থনা ও কাজের প্রতি তিনি শতভাগ নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীল ছিলেন। মাতৃমণ্ডলীর প্রতি আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। ফাদার হিসেবে লোকেরা তাঁকে দাড়িওয়ালা ফাদার বলে ডাকতো। কারণ তিনি লম্বা দাড়ি রেখেছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিযুদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন; বিশেষ করে আশ্রয়দান, সমর্থন ও প্রার্থনা দিয়ে তিনি অনেক অবদান রেখেছেন। ব্যক্তি হিসেবে তিনি ছিলেন অমায়িক, জনদরদী, প্রার্থনাশীলও পিতৃতুল্য। বিশপ মহোদয়ের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় বালুচড়া ধর্মপল্লিতে। আমি যখন হোস্টেলে ছিলাম তখন তিনি ওয়ানগালা অনুষ্ঠানের ‘কামাল’ প্রধান পৌরহিতকারী হতে গিয়েছিলেন। এরপর সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার ইন্টারমিডিয়েট সেমিনারিতে থাকার সময় তাঁকে আরো কাছে পেয়েছি। কেননা সেই সময় সেখানে তিনি বিশপীয় অবসর যাপন করছিলেন। সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ার ইন্টারমিডিয়েট সেমিনারিতে তাঁর সাথে র্দীঘ ২ বছর থেকে অভিজ্ঞতা করে আমরা মনে হয়েছে সে আসলে একজন প্রবক্তা। নিম্নে পর্যায়ক্রমে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং প্রাবক্তিক হিসেবে যে তাঁর মধ্যে গুনাবলী ছিলো সেই আঙ্গিকে আলোকপাত করার প্রয়াস করছি।

বিশপ ফ্রান্সিস এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

রাঙ্গামাটিয়া ধর্মপল্লির অন্তগর্ত রাঙ্গামাটি গ্রামে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিলে, গোলাপ জন গমেজ ও মতি মারীয়া দেশাই এর কোলে জন্মগ্রহণ করেন বিশপ ফ্রান্সিস এ. গমেজ। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত তিনি রাঙ্গামাটি ধর্মপল্লির প্রাইমারি স্কুলে পড়াশুনা করেন। তাঁর মামা ফা: যাকোব দেশাইকে দেখে অনুপ্রাণীত হয়ে এবং রাঙ্গামাটি ধর্মপল্লিতে রানচীর সেমিনারিয়ানদের দ্বারা পরিচালিত “ক্ষুদ্র পুষ্প সাধ্বী তেরেজার” নাটক দেখে মুগ্ধ হয়ে যাজক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দেতিনি বান্দুরা সেমিনারিতে প্রবেশ করে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে এস. এস. সি পাশ করে ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে সেন্ট গ্রেগরি কলেজে এইচ. এস. সি পড়েন। ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে এইচ.এস. সি পাশ করার পর রোম নগরে পড়াশুনার জন্য চলে যান।

রোম নগরে পড়াশুনা শেষ করে তিনি রোমেই ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে যাজক পদে অভিষিক্ত লাভ করেন। যাজক হওয়ার পর বিশপ মহোদয় প্রথম পালকীয় কাজ করেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বারমারী ধর্মপল্লিতে।এরপর পর্যায়ক্রমে বিড়ইডাকুনী ধর্মপল্লি, বান্দুরা ক্ষুদ্রপুষ্প সেমিনারি, মুগাইপার কাথিলিক মিশন, ভবরপাড়া কাথলিক মিশন, রমনা উচ্চ মাধ্যমিক সেমিনারিও বনানী মেজর সেমিনারিতে সেবা দিয়েছেন। ১৯৮৭ খ্রিস্টাব্দের ৮ সেপ্টেম্বর বিশপ পদে অভিষিক্ত হন। দীর্ঘ ১৯ বছর ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশে সেবা দিয়ে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দের ৩১ আগস্ট অবসর গ্রহণ করেন এবং ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

১. স্বপ্ন দেখতেন, স্বপ্ন দেখাতেন

প্রবক্তারা অতীতকে অবলোকন করে বর্তমানের আলোকে ভবিষ্যতে কি হতে পারে সে সম্পর্কে বলে দিতে পারতেন। বিশপ মহোদয় ভবিষ্যত সম্পর্কেবলতে পারতেন কি-না জানি না, তবে তিনি নিজে স্বপ্ন দেখতেন এবং অন্যদেরকে স্বপ্ন দেখাতেন। তাই তো আমরা দেখি বিশপের স্বপ্ন ছিল ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশকে একটি স্থানীয় মন্ডলী হিসেবে গড়ে তুলা। মান্দি জাতির মধ্যে যে জমিজমা নিয়ে সমস্যা ছিল সেসমস্যাগুলো সমাধানের জন্য স্বপ্ন দেখতেন। যুবক-যুবকতীদেরকে নিয়ে তিনি স্বপ্ন দেখতেন। তিনি মনে করতেন আজকের যুবারাই আগামীর কর্ণধার। তাই তো তিনি তাদের উন্নয়নের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন। এথেকে আমরা বুঝতে পারি তিনি শুধু স্বপ্ন দেখতেন না সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়নের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি স্থানীয় ম-লী গঠনে জোর দিয়েছেন, তৈরী করেছেন গির্জা, সেমিনারী, স্কুল, ডিসপেনসারী, সমবায় সমিতি।

২. ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল

পবিত্র বাইবেলে উল্লেখ্য আছে যে, প্রবক্তাগণ ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। বিশপ ফ্রান্সিস গমেজও তাঁর জীবিতকালে সবসময়ই ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। আর ঈশ্বরের উপর নির্ভরশীল ও প্রার্থনাশীল ছিলেন বলেই তিনি বিভিন্ন সময় অনেক মারাত্মক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। একবার তিনি রাজশাহীর বোর্ণী ধর্মপল্লীতে যাচ্ছিলেন। নিজ বাড়িতে মাকে দেখে আসবেন ও সেই সাথে মাণ্ডলিক অন্যান্য কাজ করার জন্য। যাবার পথে ঢাকার আমিন বাজারে মালবাহী একটি ট্রাক হঠাৎ পেছন থেকে এসে তাদের গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে দুমড়ে মুষড়ে ফেলে। গাড়ির কাঁচ ভেঙে বিশপ মহোদয়ের পেট কেটে যায়। কিছুতেই রক্তপাত বন্ধ হচ্ছে না। এক পর্যায়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। রিকশায় এবং পিকআপ ভ্যানে করে হাসপাতালে আনা হলো। একটা জিনিস লক্ষ্য করুন তিনি গ্রামে যাচ্ছিলেন মাকে দেখার জন্য; দুঃসংবাদ পেয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর মাকেই ছেলেকে দেখতে শহরে ছুটে আসতে হলো।

৩. নেতৃত্বে তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ ও দূরদর্শীতা

প্রবক্তাদের মধ্যে যেমন ছিলেন একজন সুদক্ষ ও দূরদর্শীতার মানুষ। বিশপ ফ্রান্সিসও  ছিলেন তেমনিভাবে সুনেতৃতের¡ একজন সুদক্ষ ও দূরদর্শী মানুষ। তাই তো তিনি সুদক্ষ নেতা ম-লীতে গড়ার জন্য অনেক কাজ করেছেন। অন্যদিকে একজন দূরদর্শী মানুষ হিসেবে তিনি ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশ দেশ উন্নয়নের দিকে ধাবিত করার জন্য আজীবন আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। ইতিহাস বলে সুদক্ষ নেতা ও শিক্ষিত খ্রিস্টভক্ত করে গড়ে তুলার জন্য প্রত্যেকটি ধর্মপল্লীতে অসংখ্য স্কুল নির্মাণ করেছেন। তাছাড়া আমরা দেখি আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য তারই চিন্তায় ও পরিশ্রমে বারমারী ফাতেমা রাণীর স্থানটি এখন অনেক জনপ্রিয় তীর্থস্থানে পরিনত হয়েছে।

৪. একজন আদর্শ শিক্ষক

বিশপমহোদয় ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। তিনি নিজেই যেহেতু শিক্ষা গ্রহণের কাঙ্গাল ছিলেন তেমনিভাবে শিক্ষাদানের প্রতিও তিনি ছিলেন অনেক অমায়িক, আগ্রহশীল ও বন্ধু সুলভ। আমার ভাগ্য হয়েছিল এই মহান ব্যক্তির কাছ থেকে কিছু শিক্ষা নেওয়ার। ইন্টারমিডিয়েট সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ারের সেমিনারীতে অধ্যয়নরত থাকার সয়ম তিনি আমাদেরকে ইংরেজী শিক্ষা দিতেন। পড়ানোর সময় তিনি প্রায়ই বলতেন, “এড়ড়ফ নবঃঃবৎ নবংঃ, ষবঃ রঃ ৎবংঃ, ঃৎু ুড়ঁৎ ষবাবষ নবংঃ”। গারোদের মধ্যে শিক্ষা উন্নয়নের জন্য তাঁর কাছ থেকে সুপারিশ চাইতে গেলে তিনি বলেছিলেন, “শিক্ষাই উন্নয়নের চাবিকাঠি; তার সাথে যোগ দিতে হয় সুশিক্ষা ও খ্রিস্টিয় শিক্ষা। একমাত্র খ্রিস্টশিক্ষাই শিক্ষিত হয়ে আমরা আত্মত্যাগ করার সুযোগ পাই। যেমন খ্রিস্ট নিজের জন্য আসেননি, এসেছেন আমাদে জন্য, পাপীদের জন্য। তেমনিভাবে আমরা যদি সুশিক্ষা লাভ করি তাহলেই প্রকৃত উন্নয়ন ঘটবে।”

৫. বাণী প্রচারে আর্দশ প্রতিপালক

প্রবক্তা মানেই বাণী প্রচারক। ঈশ্বরের বাণী প্রচার করার জন্য তাঁরা তাদের জীবনকে উৎসর্গ করে থাকেন। বিশপ ফ্রান্সিসও এর ব্যতিক্রম নন, তিনি সারাজীবনই প্রভুর মঙ্গলবাণী প্রচার করে গেছেন মান্দি আদিবাসী ভাই-বোনদের কাছে। কেননা এই মান্দি ভাই-বোনেরা আগে ছিল সাংসারেক ধর্মাবলাম্ভী। খ্রিস্টকে জানার পর মান্দিরা যখন খ্রিস্টান হয়েছেন তখন তারা খ্রিস্টকে তেমন জানতো না বুঝতো না; এপরিস্থিতিতে তিনি বিশপ হয়ে তাদের মাঝে খ্রিস্টকে তাদের কাছে পরিচিত করেছেন। বাণীপ্রচারে তিনি কখনই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি অকতোভয়ে গভীর অরুণ্য বনে বসবাসরত মান্দিদের মাঝে গিয়ে আধ্যাত্মিক খাদ্য বিলিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি খ্রিস্টভক্তরা যাতে সুন্দর পরিবেশে ও সুন্দর স্থানে উপাসনা করতে পারেন এর জন্য বেশ কয়েকটি ধর্মপল্লীতে র্গীজাঘর ও ক্যাথিড্রাল নির্মাণ করেছেন। উদ্যোগী যুবকেরা যাতে গঠন জীবনে এসে ‘অপর খ্রিস্ট’ হয়ে মঙ্গলবাণী প্রচারে অংশগ্রহণ করতে পারেন এর জন্য তিনি দু’টি সেমিনারী সাধু পলের সেমিনারী ও সাধু ফ্রান্সিস জেভিয়ারের সেমিনারী প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তাই নয় খ্রিস্টবাণী প্রচারকে আরো বিস্তৃত করার জন্য ফাদার, ব্রাদার, সিস্টার ও ক্যাটিকিষ্ট মাষ্টারদের নতুন নতুন গ্রামে বাণী প্রচার করার জন্য উৎসাহিত করতেন। বিশপের এই অসাধারণ অবদানের জন্য এখন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের মান্দি ভাই-বোনেরা এখন শতকরা ৯৯ ভাই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্ভী।

৬.  কর্তব্য পালনে তিনি ছিলেন খুবই সাহসিক

ঈশ্বরের দেওয়া দায়িত্ব পালনে প্রবক্তারা যেমন খুবই দৃঢ় ও সাহসিক ছিলেন বিশপ মহোদয়ও তেমনি ব্যক্তি ছিলেন। কর্তব্য পালনে তাঁর মধ্যে ছিলো না কোনো অকতোভয়। তাঁকে যেকাজই দিতো না কেন সব কাজই তিন নিজের মতো করে করতেন। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে রোম নগরে ডক্টরেট করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়ার সময় যখন তাকে ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের জন্য পোপ মহোদয় তাঁকে বিশপ পদে অভিষিক্ত হওয়ার জন্য আহবান জানানো হয়েছিল তখন সাহসিকতার সাথে সবিনয়ে দায়িত্ব পালন করার জন্য প্রত্বয় নিয়েন। তাঁর দায়িত্বপালনে সাহসিকতার প্রমাণ আমরা পায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনায়। যুদ্ধচলাকালীন সময়ে তিনি ভবরপাড়া ধর্মপল্লীতে কর্মরত ছিলেন। জাতির এই দুর্দিনে তিনি শরণার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বৈষয়িক সেবার পাশাপাশি তিনি আত্মিকভাবেও মানুষের সেবা করেছেন। দুঃস্থ মানুষদের শুনিয়েছেন সান্তনার বাণী। জনতাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে। যোদ্ধাসহ শরণীর্থীদের সেবা করেছেন। খ্রিস্টভক্তদের দীক্ষা¯œান ও অন্তিলেপন দিয়ে মুমূর্ষদের জন্য সাক্রামেন্ত প্রদান করেছেন।

৭. দরিদ্র ও অসহায় শিক্ষার্থীদের প্রতি স্নেহ-মমতা

যারা অর্থের অভাবে পড়াশুনা করতে পারে না বিশপ তাদের অধ্যয়নের জন্যসাহায্য করতেন। বিশেষ করে মাতৃতান্ত্রিক মান্দি পরিবারের যে মেয়েরা অর্থের অভাবে এস.এস.সি পাশ করার পর আর পড়াশুনা করতো না তাদের পাশে তিনি দাঁড়িয়েছেন। দরিদ্র অসহায় ছেলেমেয়েরা যাতে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করতে পারে এর জন্য তিনি প্রত্যেকটি ধর্মপল্লীতে হোস্টেলের ব্যবস্থা করেছেন। পড়াশুনা করে তারা যাতে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এজন্য তিনি তাদেরকে নানাভাবে উৎসাহ অনুপ্রেরণা ও সাহস যুগিয়েছেন। এছাড়ায় প্রাকৃতিক দৃর্যোগের কারণে যারা দুর্বিসহ জীবনযাপন করেছেন; অনেক দুর্গম গ্রামে প্রচন্দ শীতে যারা অনেক কষ্টে বসবাস করতো তিনি তাদেরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। এথেকে বুঝা যায় বিশপ ছিলেন এক মানব দরদী মানুষ। তিনি মানুষের কষ্টকে চোখে দেখতে পেতেন না।

৮. তিনি ছিলেন ঈশ্বরে বিনম্র সেবক

প্রবক্তা ইসাইয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে, মানুষের এমন কোন শক্তি, ক্ষমতা বা সৌন্দর্য্য নেই যা পরমেশ^রের সাথে তুলনা করা যায়। তাই তো তিনি প্রকাশ করেছেন, “সকল মানুষ ঘাসের মত ও তাদের যত গৌরব মাঠের ফুলের মতো” (ইসাইয়া ৪০ঃ৬-৭)। মানুষের মনের সৃষ্ট সকল দেবতা বা হাতের তৈরী সকল মূর্তিগুলোর কোন অস্তিত্ব নেই। ঐসব ভূয়া। পিতৃপুরুষদের ঈশ্বরই প্রকৃত ঈশ্বর: তিনি জীবন্ত, তিনি অনন্ত, তিনিই সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। বিশপ মহোদয়ও ঈশ্বরের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত থেকে বুঝতে পেরেছিলেন যে, ঈশ্বর ছাড়া এজগতের সব কিছুই অসার। তাই তো তিনিও বাণী প্রচারের সময় অনেক বাধাবিপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিন¤্রতার সহিত সবকিছু সহ্য করে ঈশ্বরের সেবা করে গেছেন। বিশেষ করে যে মান্দিরা অজ্ঞাত দেবতার পূজা অর্চনা করতো তাদের মাঝে খ্রিস্টকে পরিচয় করে দিয়েছেন।

৯. প্রার্থনা ও ঈশ্বর প্রেমের প্রতি আহ্বান

প্রবক্তা আমোস শুধু সমাজে অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে কথা বলেন নি তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করার ও তার প্রেম উপলদ্ধি করার জন্য ইস্রায়েল জাতিকে আহ্বান করেন। বিশপ ফ্রান্সিস গমেজও মানুষদেরকে আরও বেশি প্রাথর্নাশীল মানুষ হবার জন্য আহবান করেছেন। বিশেষ করে সেইসময় যারা অন্যায় ও অনৈতিক জীবন যাপন করছিলেন তাদের মন পরির্বতনের জন্য তিনি প্রার্থনা করেন । তিনি নিজেই একজন প্রার্থনাশীল ও ঈশ্বর অনুরাগী মানুষ হয়ে অন্যদেরকে ঈশ্বরপ্রেমী হওয়ার জন্য দৃষ্টান্ত দিয়েছেন । বিশপ ফ্রান্সিস এর প্রার্থনা জীবন সম্পর্কে জানতে চাইলে ফাদার প্রশান্ত রিবেরু বলেছেন, “বিশপ যখন রোমে অধ্যয়নরত তখন তিনি অনেক প্রার্থনা করতেন, তাঁর এই প্রার্থনার গভীর আগ্রহ ও বাহ্যিক জীবনে প্রার্থনাময় আধ্যাত্মিকতা দেখে পোপ মহোদয় তাঁকে বিশপীয় দায়িত্ব দেন।”

১০. শোষক ও নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে

পবিত্র বাইবেলে আমরা দেখি যে অনেক তৎকালীন সমাজের রাজারা গরীব ও অবহেলিত মানুষদের শোষণ ও নির্যাতন করতেন। বর্তমানে আমাদের সমাজগুলোতেও ঠিক একই চিত্র দেখতে পাই। সমাজের এই শোষক ও নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে বর্তমান যুগের এই প্রবক্তা প্রতিবাদ করেছেন। ঈশ্বরের অনুপ্রেরণায় তিনি সেই ভন্ড নেতাদের বিরুদ্ধে সতর্কবানী উচ্চারণ করেন। তিনি মূলত সমাজে অবহেলিত ও নির্যাতিত মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায্যতার পক্ষে কথা বলেন। বিশেষ করে মধুপুর অরণ্য বনে যুগযুগ ধরে বসবাসরত মান্দি ও মান্দায় আদিবাসীদের জমি যখন নিষ্ঠুর শোষকের জোড় করে নিচ্ছিলেন তখন তিনি তাদের সাহসিকতার সাথে প্রতিবাদ করেছিলে। এথেকে আমরা বুঝতে পারলাম যে সত্যিই  তিনি  বর্তমান যুগের একজন প্রবক্তা হিসেবে বিশেষ প্রাবক্তিক ভূমিকা রেখেছিলেন।

১১. মিলন সেতুর কারিগরি

মানুষে-মানুষে যাতে মিলন হয় এর জন্য তিনি অনেক শ্রম দিয়েছেন। প্রবক্তা যেমন মানুষের মঙ্গলের জন্য শান্তির দূত হিসেবে কাজ করে; ঠিক তেমনি বিশপ গমেজও শান্তির দূত হিসেবে কাজ করে গেছেন। বিশেষ করে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের অন্তর্গত সকল সম্প্রদায় অর্থাৎ হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও খ্রিস্ট সমাজের সকল শ্রেণীর মধ্যে যেন শান্তি, সম্পৃতি ও মিলনের জন্য খুবই আনন্দের সাথে কাজ করে গেছেন। তাছাড়া দেখা গেছে তাঁর কর্মজীবনে তিনি সবার সাথেই সুন্দর সম্পর্ক রাখতেন। বিশেষ করে সরকারী পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দের সাথে সুমসম্পর্ক রেখে চলতেন। তারই এ কর্ম প্রচেষ্টাকে সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি বিভিন্ন জায়াগায় আঃন্তধর্মীয় সংলাপের আয়োজন করেছেন। হ্যাঁ, সত্যিই যার ফল আমরা আমদের ধর্মপ্রদেশে এখন পাচ্ছি।

১২. বিশপ ছিলেন একজন পথ প্রদর্শক

বিভিন্ন প্রবক্তাগণ পথ প্রদর্শক হিসেবে মহামূল্যবান কাজ করে গেছেন; যাতে মানব জাতি একদিন মুক্তি পেতে পারে। সেই প্রবক্তাদের মধ্যে প্রবক্তা দীক্ষাগুরু যোহন, ইসাইয়া ও  এলিজা এদের কথা উল্লেখ্য না করলেই নয়। যেমন প্রবক্তা ইসাইয়া হাজার বছর আগে যীশু খ্রিস্টের আগমনের কথা ঘোষণা করে গেছেন, “ইম্মানুয়েল বলে দাউদের এমনই একজন বংশধরের জন্ম হবে, সকলের কাছে যিনি হবেন ঐশ নিদর্শন স্বরুপ……..।”(ইসাইয়া ৭: ১০-১৭)। এছাড়া আমরা দেখি প্রবক্তা এলিজাও তাঁর সারা জীবন ইস্রায়েল জাতির মন পরিবর্তনের জন্য কাজ করে, বিশেষ করে ইস্রায়েল জাতি যেন দেব দেবীর পূজা-অর্চনা, আরাধনা ও ভক্তি থেকে বিরত থাকে, আর একমাত্র ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন বিশ্বস্ত থাকেন। এমনিভাবে কাজ করতে করতে জীবন যখন শেষ পর্যায়ে তখন ঈশ্বর তাঁকে নির্দেশ দিলেন- যেন তিনি শিষ্য প্রস্তুত করেন এবং মনোসীত করেন। ঈশ্বরের নির্দেশ মোতাবেক প্রবক্তা এলিজা প্রবক্তা এলিশাকে মানোনয়ন করে মনোনীত ও আশীর্বাদ করেন। হ্যাঁ সত্যিই বিশপ মহোদয়ও এই প্রবক্তার মতো নিরলস পরিশ্রম করে তিলে তিলে নিজের রক্তকে পানি করে বিশপ  ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশকে একটি সমৃদ্ধশালী ধর্মপ্রদেশ রূপে  গড়ে তুলেছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিশপ পনেন কুবিকে অভিষিক্ত করে এর দায়িত্ব দিয়ে অবসরে চলে যান।

১৩. কৃষ্টি-সংস্কৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগী

তিনি বাঙালী বিশপ হয়েও আদিবাসীদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি ভালবাসতেন। আর ভালবাসতেন বলেই তিনি তাঁদের সংস্কৃতি যাতে হাড়িয়ে না যা এর জন্য সংরক্ষণের জন্য ধর্মপ্রদেশের সকল ফাদার, সিস্টার, ব্রাদার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উৎসাহিত করেন। বিশেষ করে উপাসনায় আদিবাসীরা যাতে তাদের সংস্কৃতি ব্যবহার করার জন্য অনুপ্রাণিত করেন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে উপস্থাপনের জন্য আহবান করতেন।

শেষ কথা

পরিশেষে উপরিউক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় বিশপ মহোদয় আসলেই একজন খাটি প্রবক্তা ছিলেন। কেননা মানব মুক্তির ইতিহাসে দেখা যায় প্রবক্তারা যেভাবে ঈশ^রের মনোনীত ই¯্রায়েল জাতিদেরকে সত্য সুন্দর পথে চালিত করেছিলেন তেমনিভাবে বিশপ মহোদয়ও ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের সকল খ্রিস্টভক্তদেরকে সুন্দর পথে চালিত করেছেন। প্রবক্তাদের মতোলাঞ্ছিত-বঞ্চিত, নিপীড়িত-পীড়িত, গরিব-দুঃখীদের সান্ত¡নার বাণী শুনিয়েছেন। নির্ভিকভাবে ঈশ্বরের মঙ্গলবাণী প্রচার করেছেন। বিশ্বস্থতার সহিত সম্পন্ন করেছেন তাঁর কর্মভার। তাঁর প্রাবক্তিক জীবন থেকে আমি অনেক কিছু শিখতে পারলাম। ঈশ্বরও আমাকে তাঁর মতো আহবান করছেন মানবের কল্যাণে কাজ করতে। আমি যাতে নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে পরের তরে বিলীয়ে দিতে পারি, সাহসিকতার সাথে মঙ্গলসমাচার প্রচার করি।



সহায়ক উৎস

          পেরেরা, সুনীল; “জীবনালেখ্য:প্রয়াত বিশপ ফ্রান্সিস আন্তনী গমেজ”, সাপ্তাহিক প্রতিবেশী, বর্ষ ৭১, সংখ্যা ৮, লক্ষীবাজার, ঢাকা ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।

          হাচ্ছা, ফাদার শিমন, চিসিম, ফাদার নিকোলাস, কস্তা মি: সুক্লেশ জি, চিরান, মি: ধীরেশ (সাক্ষাৎকার); “বিশপ ফ্রান্সিস এ. গমেজ ডিডি’র পালকীয় অভিজ্ঞতা সহভাগিতা”, বিশপীয় অধিষ্ঠান ও কৃতজ্ঞতা স্মরণিকা, ময়মনসিংহ, ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ।

          রোজারিও, ফাদার আলবার্ট টমাস, “সবাইকে কাঁদিয়ে নিরবে চলে গেলেন মানবসেবক বিশপ ফ্রান্সিস এ. গমেজ”,  সাপ্তাহিক প্রতিবেশী, বর্ষ ৭১, সংখ্যা ৮, লক্ষীবাজার, ঢাকা ২০১১ খ্রিস্টাব্দ।

          পবিত্র জুবিলী বাইবেল, বাংলাদেশ কাথলিক বিশপ সম্মিলনী, ঢাকা, ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দ।


।। লেখক : মানুয়েল চাম্বুগং, ঢাকা



ব্রাদার গিউম পেলেন নেদারল্যান্ড রাজার বিশেষ সম্মাননা ‘অ্যাওয়ার্ড অব দ্যা কিং

ইউটিউবটাই আমার ভালোবাসা ।। নীল নন্দিতা রিছিল

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-৪ ।। বর্ণমালা সংক্রান্ত কিছু তথ্য ।। বাঁধন আরেং

https://www.facebook.com/thokbirim/videos/782974379102661

লেখক ও মানবাধিকারকর্মী সঞ্জীব দ্রং

ব্রাদার গিউমের বাংলাদেশে বসবাসের সময় ৪০ বছর পূর্ণ হলো এই বছর। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে ব্রাদার বাংলাদেশের মানুষজনদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সেই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এই প্রথম বাংলাদেশে অবস্থানরত নেদারল্যান্ডবাসী ব্রাদার গিউম নেদারল্যান্ড রাজার বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার অ্যাওয়া্র্ড অব দ্যা কিং’ পেলেন। সেই সম্মাননা প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলছেন বিশিষ্ট লেখক ও মানবাধিকারকর্মী সঞ্জীব দ্রং

Gepostet von Thokbirimnews.com am Freitag, 9. Oktober 2020




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost