Thokbirim | logo

৮ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-৪ ।। বর্ণমালা সংক্রান্ত কিছু তথ্য ।। বাঁধন আরেং

প্রকাশিত : অক্টোবর ১২, ২০২০, ১৪:১১

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-৪ ।। বর্ণমালা সংক্রান্ত কিছু তথ্য ।। বাঁধন আরেং

বর্ণমালা সংক্রান্ত কিছু তথ্য

গারো ভাষায় বর্ণমালাকে “থকবিরিম” বলে। “থক্” অর্থ ফোটা বা চিহ্ন, “বিরিম” অর্থ দানা, আকৃতি, চেহারা বা অবয়ব। অর্থাৎ “থকবিরিম” বিশ্লেষণ করলে যার অর্থ দাঁড়ায় ধ্বনি বা আওয়াজের রূপ, আকৃতি, চেহারা বা অবয়ব। আসামের একটি কাহিনি অনুযায়ী হাজার বছর আগে আরুরংদি নামের একটি পাহাড়ি নদীর তীরবর্তী বিস্তির্ণ তিবতগিরি এলাকায় গারো জনগোষ্ঠির একটি অংশ বাস করত। সেসময় শক্তিশালী বিশাল এক বহিরাগত শত্রুর দ্বারা গারোরা আক্রান্ত হয়। ভয়াবহ যুদ্ধে পশুর চামড়ায় গারো ভাষার বর্ণমালায় লেখা তাদের ইতিহাস, আইন, সামাজিক বিধিবিধান ও সাহিত্যের অনেক মূল্যবান দলিল ধ্বংস হয়ে যায়। আরো একটি পৌরাণিক গল্প অনুযায়ী কলাপাতায় লেখা গারো ভাষার “থকবিরিম” একদিন একটি গরু সাধারণ কলাপাতা মনে করে খেয়ে ফেলে। সংক্ষিপ্ত দুটি কাহিনি অনুযায়ী সভ্যতা বিকাশের সূচনা লগ্ন থেকেই গারোদের মধ্যে “থকবিরিম” বা বর্ণমালা সম্পর্কে ধারণা ছিল বলে ধরে নেয়া যায়।

কাহিনি বা গল্প যাই থাক না কেন গারো ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা বা “থকবিরিম” আবিস্কার প্রয়াসে বাংলাদেশের বিশিষ্ট্য ৩ জন মি: মার্টিন রেমা (৮১), প্রয়াত ডানিয়েল রুরাম ও প্রয়াত জন থুসিন রিছিল-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা উপজেলাধীন সন্নাসীপাড়া গ্রামের মি: মার্টিন রেমা পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক (হাইস্কুল) ছিলেন। ১৯৬০-১৯৬৮ তিনি একজন মহুকুমা জনস্ংযোগ কর্মকর্তা হিসাবে সরকারি চাকুরিতে যোগ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে সরকারি চাকুরি ছেড়ে প্রধান শিক্ষক হিসাবে একটি বেসরকারি হাইস্কুলে যোগদান করেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন। শিক্ষকতা পেশায় এসে তিনি গারো ভাষার নিজস্ব বর্ণমালার প্রয়োজীয়তা গভীরভাবে উপলদ্ধি করেন। তিনি নিজ ভাষার শব্দ, উচ্চারণ, বাচন ভঙ্গি, ধ্বনির স্বকীয়তা বিশেষভাবে অনুধাবন করেন। অন্যকোনো ভাষার বর্ণমালা দিয়ে গারো ভাষার পরিপূর্ণ একটি শব্দ গঠন করা সহজ হয় না তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তীব্রভাবে অভাববোধ করতেন গারো ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা না থাকার বিষয়। এই অভাব বোধ থেকেই তিনি গারো ভাষার “থকবিরিম” বা বর্ণমালা আবিস্কারের প্রতি মনোযোগ দেন এবং আবিস্কার করে তা জনসমাজে তুলে ধরেছিলেন।

নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলাধীন খামারকালী গ্রামের প্রয়াত ডানিয়েল রুরাম পেশায় স্কুল শিক্ষক (প্রাথমিক), সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং একজন গীতিকার ও সুরকারও ছিলেন। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে তিনি গারো ছাত্র-ছাত্রী ও যুবক-যুবতীদের গারো গান শেখাতেন। তাঁর উদ্ভাবিত গারো ভাষার বর্ণমালা ব্যবহার করে অনেকেই পড়তে ও লিখতে পারতেন। বাংলাদেশে গারো ভাষা সংরক্ষণ, উন্নয়, প্রসার ও সাহিত্য রচনার প্রয়াসে ডানিয়েল রুরামের অবদান গুরুত্বপূর্ণ।

গারো ভাষার “থকবিরিম” বা বর্ণমালা উদ্ভাবক আর একজনের নাম প্রয়াত জন থুসিন রিছিল। তিনি টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলাধীন ইদিলপুর গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তিনিও পেশায় একজন প্রাথমিক স্কুল শিক্ষক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ বেতারে গারোদের জন্য প্রোগ্রাম “সালগিত্তাল”-এর একজন নিয়মিত শিল্পী ছিলেন। “সালগিত্তাল”  প্রোগ্রামে তিনি অনেক মজার এবং সুন্দর সুন্দর গল্প বলতেন। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জন থুসিন গারো ভাষার বর্ণমালা আবিস্কার করে সকলের সামনে তুলে ধরেছিলেন।

৩ জন গারো ভাষার “থকবিরিম” বা বর্ণমালা আবিস্কারকের কাজ আজ থেকে প্রায় ৩২ বছর আগে প্রকাশ পেয়েছিল। থকবিরিমগুলো তৎকালীন উপজাতীয় কালচারাল একডেমি, বিরিশিরি, উপজাতীয় গবেষণা সাহিত্য সাময়িকী, “জানিরা”-এর ৬ষ্ঠ সংখ্যা, ১৯৮৪ ইং সন, পৃষ্ঠা: ১৫১-১৬৪ প্রকাশিত হয়েছিল। উদ্ভাবিত বর্ণমালাগুলো নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলেও কার্যকর কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি যে কারণে বর্ণমালা ব্যবহারের প্রশ্নে পরবর্তী করণীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। তাছাড়াও পৃষ্ঠপোষকতার অভাব ছিল যা কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় ছিল না। প্রায় শতবছর আগে থেকে রোমান হরফ গ্রহণ ও ব্যবহার করে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে গারো ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, শিক্ষা গ্রহণ, সাহিত্য রচনা, সঙ্গীত চর্চা ইত্যাদি ক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার কারণেও হয়ত নতুন আবিস্কৃত বর্ণমালাগুলো গৃহীত হয়নি। কারণ একটি বিষয়ে সবারই অভিন্ন মত যে, একই ভাষার একাধিক বর্ণমালা থাকতে পারে না। বাংলাদেশের গারোরা নিজস্ব ভাষায় পড়ালেখা শেখার সুযোগ না থাকায় নিজেদের ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে জানার সুযোগ খুব বেশি পায় না। পরিবারে ও সমাজ থেকে মৌখিকভাবে যাটুকু শোনা এবং জানা বৃহত্তর পরিসরে অন্য ভাষা ও সংস্কৃতির প্রবলতায় সেটুকুও হারিয়ে যায়। এভাবে নতুন প্রজন্মের গারোরা নিজস্ব ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়না। ফলশ্রুতিতে চর্চার অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে ভাষা ও সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

গারো ভাষার “থকবিরিম” বা বর্ণমালা হিসাবে রোমান হরফ গ্রহণ করা হলেও হুবহু এবং সবটুকু নেয়া হয়নি। ২৬টি বর্ণমালার মধ্যে ঋ ছ ঠ ঢ ণ ত বর্ণগুলো বাদ দিয়ে বাকি ২০টি গারো ভাষার লেখ্যরূপ প্রকাশের জন্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। গারো উচ্চারণের নিজস্বতাকে পুরোপুরিভাবে রূপায়নের প্রয়াসে (·) Raka to·ta (Glottal stop) যা দু বর্ণ বা বর্ণসমূহের মাঝখানে বসিয়ে ব্যবহার করা হয়। উচ্চারণের ক্ষেত্রেও কিছু কিছু বর্ণ বা থকবিরিম-এর বেলায় নিজস্বতাকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যেমন অ–এর উচ্চারণ “আ” ঊ-এর উচ্চারণ দুধরনের হয় যেমন “আই” ও “এ”। বৃটিশ আমলের অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি দিক থেকে নানান চড়াই উৎড়াই ও পরীক্ষা নিরীক্ষার এর মধ্য দিয়ে “রোমান হরফ মূল ল্যাতিন ভাষার হরফ” আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সকলে যেটি “ইংরেজি বর্ণমাল” হিসাবে জানে সেটি গারো ভাষার লেখ্যরূপ হিসাবে গ্রহণ ও ব্যবহার করে। এই বর্ণমালা দিয়েই ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারোরা প্রাথমিক থেকে ইদানিং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করে থাকে।

ভাষা ব্যবহার ও জনসংখ্যা:

বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী মেঘালয় রাজ্যসহ আসাম, ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গের কিছু এলাকা এবং প্রতিবেশি আরো কয়েকটি রাজ্যে গারোরা সবমিলিয়ে ভারতে ১৮ লক্ষ্য ৬ হাজার এবং বাংলাদেশে ২ লাখ রয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায় (২০০১)। সংখ্যা যাই হোক না কেন বাংলাদেশে গারো ভাষা হুমকির মধ্যে রয়েছে। শহরে বসবাসরত ১০ ভাগ গারো  নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের জন্য নিজ ভাষা ব্যবহার করে কিনা সন্দেহ আছে। শিশুরা নিজ ভাষায় কথা বলতেই পারে না। নিজস্ব কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও ঢাকায় বসবাসরত গারোরা পারস্পাকির ভাববিনিময় ও অনুষ্ঠান উপস্থাপন সাধারণত বাংলায় করে থাকে। ইদানিং গ্রামাঞ্চলেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

চলবে..

আরো পড়ুন



সাংসারেক গারো নাচ ।। পাকমা ও-ওয়া বা ওয়াল তৈরি নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

লড়াই চলছেই! মধুপুর থেকে বিরিশিরি, বিরিশিরি থেকে সিলেট ।। জাডিল মৃ

https://www.facebook.com/thokbirim/videos/782974379102661

লেখক ও মানবাধিকারকর্মী সঞ্জীব দ্রং

ব্রাদার গিউমের বাংলাদেশে বসবাসের সময় ৪০ বছর পূর্ণ হলো এই বছর। দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে ব্রাদার বাংলাদেশের মানুষজনদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। সেই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এই প্রথম বাংলাদেশে অবস্থানরত নেদারল্যান্ডবাসী ব্রাদার গিউম নেদারল্যান্ড রাজার বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার অ্যাওয়া্র্ড অব দ্যা কিং’ পেলেন। সেই সম্মাননা প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলছেন বিশিষ্ট লেখক ও মানবাধিকারকর্মী সঞ্জীব দ্রং

Gepostet von Thokbirimnews.com am Freitag, 9. Oktober 2020




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost