Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সাংসারেক গারো নাচ ।। আজেমা রওয়া বা আজেমা নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৯, ২০২০, ১৪:০৪

সাংসারেক গারো নাচ ।। আজেমা রওয়া বা আজেমা নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

আজেমা রওয়া বা আজেমা নাচ

সাংসারেক গারোদের বিশ্বাস আজেমা দওসিমা একজন দেবী, সমুদ্রের পানির নিচে পাতালে থাকে। সাংসারেকদের ওয়ানগালা বা নবান্ন অনুষ্ঠানে সেও সবসময় উপস্থিত থাকে। এক সময় দেবী আজেমা ভাত মাড়িয়ে নাচের পর সবাই উঠানে আসলে, উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কোমর দুলিয়ে নেচে দেখায় এই নাচকেই সাংসারেক গারোরা শিখে। তারপর প্রতি বছর ঠিক এই সময় নকমার ঘরের উঠানে দেবী আজেমা দওসিমার মত নাচতে থাকে, এটাই পরবর্তীতে আজেমার নাচ হয়। প্রতি বছর নবান্নে তার সম্মানার্থে এই নাচ হয়। সাংসারেক গারোরা গারো ভাষায় এইভাবে বলে,‘মিৎদে আজেমা দওসিমা কাংকারি কিথিং নংনেং নংনেংচেংজক, গা-গাজেন-জেপজক, চ্রোক মেসকচেংজক’ বলে।
আজেমা নাচে মহিলা অথবা যুবতীরা অংশগ্রহণ করে, নাচে কোন পুরুষ অংশগ্রহণ করে না। প্রথমে এক লাইনে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে আসে। সেই চির পরিচিত গারো নাচ বাজনার তালে তালে নেচে নেচে কপালের কাছে ডান হাত উঠিয়ে উপস্থিত দর্শককে সালাম জানানো এক কি দুই ঘুরান চারিদিকে ঘুরার পর নাচতে নাচতে দুই লাইন হয়। তারপরে হয় আসল দেবী আজেমা দওসিমার নাচ। বাজনার তালে তালে পা তুলে কমর দোলানো নাচ, এই নাচ অনেক্ষণ দেখানো হয়। একজন মেয়ে আর একজনের জায়গায় যাবে, অন্যজন তার জায়গায় আসবে, এভাবে ঘুরে ফিরে বাদ্য বাজনার তালে তালে নাচতে থাকে, বাজনা দ্রুত হলে নাচও দ্রুত হয়।

২. 
মূলত এই নাচ বৃদ্ধা-বন মানুষের নাচ বলে, মাঝে মাঝে সাংসারেক মহিলাকে একা পেলে বৃদ্ধা মহিলা বন মানুষ জংগল থেকে হঠাৎ নেমে এসে সাংসারেক গারো মহিলার সামনে এসে দাঁড়ায়। আর বলে আমার সাথে নাচতে হবে, নাচা শুরু করে দেয়, বন্য মহিলার সাথে নাচা গারো মহিলার পক্ষে সম্ভব নয়, কারণ এই নাচ এক-তিন ঘন্টায় শেষ হবে না। বন্য মহিলা নাচতেই থাকবে, সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতে হবে। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হলেও বিশ্রাম নেওয়া যাবে না, বসতে পারবে না, যদি হেরে যায় তবে বন্য মহিলা তাকে হত্যা করবে। আর যদি গারো মহিলা জিতে যায় তাহলে তাকে প্রণাম করে ওস্তাদ মেনে জংগলে চলে যাবে, এটা সাংসারেক গারো বয়স্ক লোকেরা গল্পের মত বলে। তবে আজেমার সাথে নেচে জিতে যাওয়া মহিলা খুবই কম বলে বেশির ভাগ মহিলাই হেরে গিয়ে আজেমার হাতে মরতে হয়েছে, সঙ্গে না নাচলে সঙ্গে সঙ্গেই মেরে ফেলে। এই বন্য মহিলার দাদির নাম নাকি খরিমা। এই আজেমা খারিমার কবিতার মত লম্বা গান আছে। এই গান গেয়ে নাচলে নাকি আজেমা আর কাছে থাকবে না, দৌড়ে জংগলে পালিয়ে যাবে। আজেমার হাত থেকে বাঁচার জন্যে অনেক সাংসারেক মহিলারা কবিতার সুরে ছন্দে মুখস্ত করে রাখে। আমারও স্মরণ নেই তবে সামনের কয়েকটি লাইন লিখলাম।
গারো ভাষায়: আজেমাদে আজেমানা,
আম্বিগিপাদে খরিমানা।
আকগলগ্রী দাকগি আম্বিগিপামিং
র-ওয়ে জাননে দংপানা।
বাংলায়: আজেমাতো আজেমা
তার দাদির নাম খরিমা।
লজ্জাহীনভাবে দাদির সাথে
নেচে গেয়ে খেলে।
নেচে নেচে এই গান গাওয়ার সাথে সাথে, বন্য মহিলা আজেমা আর নাচবে না, গারো ভাষায় নাংমিংদে আংআদে অংজাজক, বাংলায়- তোমার সাথে আমি আর নেই বলে পালাবে।
এই নাচ মাত্র দুইজন মেয়ে নাচে, প্রথমে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে একজনের পিছনে একজন আসবে, আর দুইজনে পাশাপাশি অনেক দূরে থাকবে। সামনে যে নেচে যায় সে হবে সাংসারেক গারো মহিলা, আর পিছনে যে নেচে আসবে সে বন্য মহিলা বা জংলি মহিলা। জংলি মহিলার পরনের পোশাক পরিচ্ছদও অন্যরকমের হবে আর চুল এলো মেলো জংলির মতো সাজাতে হবে, দুজন স্বাভাবিক দূরে থেকে বাজনার তালে নাচবে। উঠোনে এক কি দুই ঘুরান নেচে জংলি মহিলা গলা লম্বা করে সামনে নেচে যাওয়া মেয়েকে দেখবে, বার বার একই কায়দায় দেখবে, মাঝে মাঝে বাজনার সাথে তাল মিলিয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে। একসময় দৌড়ে এসে জংলি মেয়ে সামনের মেয়ের মুখোমুখি দাঁড়াবে আর সামনের মেয়ে ভয় পাবে, জংলি মেয়ে আকার ইঙ্গিতে তার সাথে নাচতে বলবে, না নাচলে হত্যা করার হুমকি দিবে। প্রথম মেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জংলি মেয়ের সাথে সামনা সামনি নাচবে, মাঝে মাঝে সামনা সামনি নাচবে আর মাঝে মাঝে একজনের পিছে আরেকজন নাচবে। জংলি মেয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য মেয়েটি নাচতে নাচতে মাঝে মাঝে গালে আঙুল রেখে চিন্তা করবে, এক সময় সেই গান বা কবিতার কথা স্মরণ হবে। আর সামনা সামনি নাচার সময় হেসে হেসে হঠাৎ সুরে সুরে সেই গান গাইবে।
আজেমাদে আজেমানা,
আম্বিগিপাদে খরিমানা।
আকগলগ্রী দাকগি আম্বিগিপামিং
র-ওয়ে জাননে দংপানা।
এই গান শেষ হওয়ার সাথে সাথে আমি আর তোমার সাথে নেই বলে জংলি মেয়ে তারাতারি দৌড়ে পালিয়ে জংগলে যাবে, আর একবারের জন্যেও পিছন ফিরে তাকাবে না।
প্রথম মেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছু সময় মাটিতে বসবে তারপর দাঁড়িয়ে মনের আনন্দে নেচে নেচে বাজনার তালে তালে উঠোন ঘুরবে, আর বিদায় সালাম জানিয়ে নেচে নেচে চলে যাবে। এই হলো দ্বিতীয় আজেমার নাচ। সাংসারেক গারোদের মাঝেও এই নাচ বেশি প্রচলিত নয়, আমি মাত্র একবার দেখেছি, হয়তো আগে দরকার ছিল, বন জংগল ছিল, জংলি মেয়ে ছিল। জংলি মেয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্যে দর্শকদের মাঝে সুরে সুরে গান গেয়ে নেচে দেখাত, এভাবে সাংসারেক গারো মেয়েরাও এই গান কবিতা শিখে নিত। এই সাংসারেক গারোরা জেনে হোক আবার না জেনেও হোক এভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে শিখালে ছেলে মেয়েরা খুব তারাতারি শিখে নেয়, মুখস্থ করে।

চলবে….


আরো লেখা…


সেবার মান নিয়ে আমাদের মান্দি নার্সদের একটা সুনাম আছে ।। প্রপার্টি রংদী

সাংসারেক গারো নাচ ।। ওয়ানগালা উৎসবের নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

https://www.youtube.com/watch?v=ofoFOstHm3c&feature=emb_title

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost