Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সাংসারেক গারো নাচ ।। ওয়ানগালা উৎসবের নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৮, ২০২০, ১০:৫৩

সাংসারেক গারো নাচ ।। ওয়ানগালা উৎসবের নাচ ।। তর্পণ ঘাগ্রা

ওয়ানগালা উৎসবের নাচ

সাংসারেক গারোদের সব চাইতে বড় উৎসব হল ওয়ানগালা বা নবান্ন উৎসব, এই উৎসবের নাচ কিছু ধারাবাহিকতা থাকে, এটা  শুধু প্রথম দিকে তারপর আর ধারাবাহিকতা নেই। যে যেভাবে পারে সে সেভাবেই নাচ দেখায়। কিছু কিছু নাচ একেবারে ওয়ানগালার সাথে কোন খাপ খায় না, বানর-হাতি-ঘুঘু পাখি ইত্যাদির নাচও দেখায়। তবে যেভাবে খুশি সেভাবে নয়, নিশ্চই বাড়িতে নাচ নিয়ে প্রচুর চর্চা করেছে, ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে বাদ্য বাজনার সাথে তাল মিলিয়ে নাচলে দেখার মত হয়।

ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে ছেলে মেয়েদের সুযোগ খুবই কম, যুবক যুবতী বেশির ভাগ বয়স্ক মহিলা পুরুষরাই বেশি নাচতে দেখা যায়, কামাল বা পূজারী নকমা বা গ্রাম প্রধান কেমং বাদ যায় না। পরিশ্রম হলে বসে বিশ্রাম নেয় তামাক খায়, আলাপ করে, এক বা দুই গ্লাস মদ খায় তারপর আবার নাচতে  শুরু করে। এই নাচের শেষ নেই, কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ চলে। এই সময়ে সবাই নতুন জামা কাপড় পরে, বয়স্ক সাংসারেক পুরুষ মহিলা তো সব সময় কত্তপিং-কত্তথিব বা বাদা পাগড়ি বাঁধে। অনুষ্ঠানের দিন বাড়তি মোরগের লেজের লম্বা পালক কয়েকটি একসাথে বেঁধে পাগড়ির উপরে খাড়াভাবে বেঁধে আসে। এই পালক বাঁধারো আবার নিয়ম আছে। পুরুষদের পাগড়ির ঠিক কপালের উপরে সোজা উঁচু করে বাঁধতে হয়, আবার মহিলাদের সামনে হবে না মাথা বা পাগড়ির পিছনের দিকে নাকি বাঁধতে হয়। পুরুষদের পাগড়ির বেলাতেও যেমন কামাল, নকমা এরকম সম্মানিত লোকদের পাগড়ির পেছনের লেজ লম্বা রাখতে হয়, এটাকে সাংসারেক গারোরা কত্তথিব বা পাগড়ি জলদিং বলে। আবার সাধারণ লোকদের পাগড়ির পিছনের দিক লম্বা হবে না খাটো হবে, এরকম পাগড়িকে তারা কত্তথিব চনদক বলে, ইচ্ছামত কোন কিছুই করা যায় না নিয়মের মধ্যেই করতে হয়। সাংসারেক গারোদের ওয়ানগালা সবসময় তিনটি ভাগে করে (১) রোগালা (২) সা-সাৎ সওয়া (৩) ক্লাম গাগাতা বা জল ওয়াতা, এটা এক দিনে হয় না। তিন দিন করতে হয়।

রুগালা অনুষ্ঠানের পর্বে বেশি নাচ দেখা যায় না। বয়স্ক লোকদের সাথে যুবক-যুবতীরাও সঙ্গে থাকবে। তারা প্রতিটি বাড়িতে সারা রাত আজিয়া, রে রে ওরকম গারো গান গেয়ে বাদ্য বাজনার তালে তালে নাচে। নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে নয়, যেহেতু সারারাত ঘুরে তাই অন্য নাচগুলোও করে ফেলে। যারা ওয়ানগালার জন্য নতুন গান নাচ নিয়ে এসেছে তারা দশজনকে দেখায়।

১. চা-চাৎ সওয়াও রওয়া বা ধূপ বা ধোয়া দেওয়ার সময় নাচ

নকমা তার ঘরের ভেতর ধূপের ধোয়া দেবে, মানুষ নাচের পোশাক পরে বাহিরে দেখবে, বাদকেরাও বাহিরে দেখবে। ধোয়া যতই বেশি ঘর থেকে বের হবে, সাংসারেক গারোরা ততই খুশি হবে, তারা মনে করে ধোঁয়া বেশি হলে বৃষ্টি মেঘের দেবতা এই কালো ধোঁয়ার মত মেঘ বৃষ্টি পাঠাবে, এই কালো ধোঁয়া মেঘ বৃষ্টির প্রতীক। কিছু সময় পর বাদকেরা যারা নাচবে তারা ঘরে ঢুকবে, এই ধূপ ধোঁয়ার মধ্যে পুরুষেরা বাদ্য বাজনা নেচে নেচে বাজাবে, আর মহিলারাও বাজনার তালে তালে নাচবে। এই নাচকে সাংসারেক গারোরা ধূপদানি নাচ বলে। এই নাচ আধা বা এক ঘন্টা নাচে তারপর নকমা ছাড়া সবাই ঘর থেকে বের হয়ে উঠানে আসে।

২. সা-রাও র-ওয়া বা উঠানে নাচ 

নকমার ঘর থেকে বের হয়ে, উঠানে নাচতে থাকে, পুরুষেরা কমসে কম বার বা পনেরোটি ঢোল দড়ি দিয়ে বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে সামনে পেটের উপর রেখে বার বা পনের জন পুরুষ নেচে নেচে লাইন করে ঢোল বাজায়। আর তার পাশেই বাম দিকে মহিলারা লাইন করে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে পুরুষের সমান তালে সামনে দিকে যেতে থাকে, এভাবে উঠানের চারদিকে ঘুরে। নকমার উঠান সবসময় বড় লম্বা হয়। প্রায় এক দেড় ঘন্টা ধরে এই উঠানে নাচ চলে। মহিলা পুরুষদের সাথে পিছনে যুবক যুবতীরাও অংশগ্রহণ করে। মাঝে মাঝে যুবক যুবতীদের সামনে বাজনা বাজাতে ও নাচতে দেখা যায়। পিছনে বয়স্ক পুরুষ মহিলারা আর তাদের ছোট ছেলেমেয়েরাও মা বাবার সাথে নাচতে চেষ্টা করে, না পারলে মা বাবারা শেখায়।

৩. মিরিমকো গায়ে রওয়া বা ভাতের উপর নাচা:

উঠানে নাচার সময় নকমা ধূপ দেওয়া শেষ করে ঘরের মেঝেতে মাটিতে এক প্লেট বা দুই প্লেট ভাত ছিটাবে, ছিটানোর পর মাটিতে প্রচুর সাদা ভাত পড়ে থাকে। সাংসারেক গারোদের বিশ্বাস, ধূপের ধোয়ার মত মেঘ এসে বৃষ্টির সাথে সাদা সাদা শিলা এই সাদা ভাতের মত পড়বে। এমনভাবে পড়বে যেন মাটি দেখা না যায়। সাংসারেক গারোরা এই পর্বকে মিরিম গওয়া বা সাৎদা বাংলায় বলে ভাত ছিটানো। ভাত ছিটানো শেষ হলে বাজনা বাদকেরা আবার ঘরে ঢুকে। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েরাও ঘরে ঢুকে। বাজনার তালে তালে ছিটানো ভাতের উপর পা মাড়িয়ে নাচতে থাকে। এই নাচ আগের নাচের মত দ্রুত নয়, বাজনাও দ্রুত বাজাবে না। কারণ ভাতের উপর পা মাড়ানোর পর জায়গার মাটি পিচ্ছিল হয়ে যায় তাই দ্রুত নেচে যাওয়া সম্ভব নয় তাই বাজনাও আস্তে বাজায় আর তার তালে মিল রেখে আস্তে নাচতে হয়। এই নাচটিকে ভাতের উপর নাচ বলে। তারা মনে করে এমনভাবে বৃষ্টির সাথে শিলা পড়বে, যেন সাংসারেক গারোরা ভাতকে যেভাবে পায়ে মাড়িয়ে নাচতে পেরেছে, সেভাবে যেন পায়ে মাড়াতে পারে।

চলবে…

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-২ ।। বাঁধন আরেং

সাংসারেক গারো নাচ ।। জুম নাচ।। তর্পণ ঘাগ্রা

https://www.youtube.com/watch?v=ofoFOstHm3c&feature=emb_title




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost