Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সাংসারেক গারো নাচ ।। জুম নাচ।। তর্পণ ঘাগ্রা

প্রকাশিত : অক্টোবর ০৬, ২০২০, ১৩:০০

সাংসারেক গারো নাচ ।।  জুম নাচ।। তর্পণ ঘাগ্রা

জুম নাচ

সাংসারেক গারোদের খেয়ে বেঁচে থাকার প্রধান ফসল হলো জুম ফসল। এই জুম জমি থেকে তারা সারা বছরের খাবার ধান, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, মরিচ-বেগুন আরো অন্যান্য সবজি পায়। পাহাড়ি জুম চাষের উপরই সাংসারেক গারোদের বেঁচে থাকা নির্ভর করে। খরায় অথবা অতি বৃষ্টিতে জুম জমিতে ফসল হলে জঙ্গলের বনআলুর উপর নির্ভর করে। বনআলু কেউ কেউ চাষ করে। বেশিরভাগ বনআলু এমনি পাগাড়-জঙ্গলে প্রচুর পাওয়া যায়। বিভিন্ন বনআলুর নাম সাংসারেক গারোরা ভিন্ন ভিন্ন নাম দিয়েছে। যেমন- থামা, থারিং, থাগিৎচাক, থাগিপবক, স্থেং, আমপেং আরো অনেক নাম। জংলি সবজিও অনেক যেমন- মিগং বিজাক, পালয় বিজাক, কচু বিজাক, আদুরাক, চংরো, চংগি এরকম আরো অনেক পাওয়া যায়। বন আলু পুষ্টিগুণে নাকি ভরপুর এই কথা তুরা শহরের ইটালিয়ান বিশপ মারেংগো আমাকে বলেছেন। যখন তাঁর সাথে দেখা হয় তখন বিশপের অনেক বয়স হয়েছে। বাংলাদেশের গারোকে দেখে সে খুবই খুশি। আমাকে কাছে টেনে শরীর লাগিয়ে বসে বলেন-‘আমি অনেক বছর গারো হিল্সে আছি, যতদিন আমি এখানে ছিলাম ততদিন ভাত রুটি বেশি খাইনি, বেশিরভাগ সময় জংলি বনআলু আর জংলি শাকসবজি খেয়েছি, তাই আমি এখনও বেঁচে আছি, আমার সমবয়সি আর নেই, সবাই মারা গেছে।’

জুম নাচ অনেক লম্বা নাচ, বিভিন্ন আইটেম আছে ধাপে ধাপে নাচতে হয়, এই নাচ যুবক যুবতীরা অনুষ্ঠানের সময় উপস্থিত দর্শকদের ঘরের উঠানে দেখায়। এই নাচ দেখানোর জন্য অনেকে মঞ্চ তৈরি করে অনেক সময় ধরে দেখায়, এটাকে সাংসারেক গারোরা দাকমে-সকগা বলে, অন্য নামও থাকতে পারে।

জুম চাষের নাচে বেশির ভাগ সময় বাদ্য বাজনার তালে তালে যুবক যুবতীরা নেচে যায়, মাঝে মাঝে কিছু কথাবার্তাও  শুনা যায়, এই নাচে বয়ষ্ক পুরুষ মহিলারা অংশগ্রহণ করে না। জুম নাচে যুবক যুবতীদের সাজতে হয়, যুবকরা মাথায় কথিপ বা পাগড়ি বাঁধে পাগড়ির সামনে কপালের উপর (দমি) অনেকগুলো মোরগের লেজের পালক একত্রে বেঁধে উচু করে বাঁধে। গলায় রিকমাচু, রিপবক বাংলায় মালা, হাতের ও পায়ের কবজিতে জাকসিল জা-সিল, এক ধরনের লোহার রিং পরে। মোট কথা নাচার জন্য গারো কায়দায় সাজিয়ে নেয়। ছেলেদের পাগড়িকে কত্তথিব বলে আর মেয়েদের পাগড়িকে কত্তপিং বলে।

অনুষ্ঠান ছাড়াও মেয়েদেরকে প্রায় সবসময় মোরগের পালক ছাড়া কত্তপিং বা পাগড়ি বাঁধতে দেখি। রান্না বান্নার সময় বা কাজ করার সময় কত্তপিং বা পাগড়ি বাঁধে, কাজ করার সময় লম্বা চুলের সমস্যার জন্যই মনে হয় মেয়েরা পাগড়ি বাঁধে। সাংসারেক পুরুষেরাও চুল কাটে না লম্বা রাখে তাই তারাও সব সময় মাথায় পাগড়ি বাঁধতে দেখি, আর পর্ব অনুষ্ঠানের সময় তো কথা নেই। মেয়ে-ছেলে সবাই সাদা কত্তপিং কত্তথিব বেঁধে পরে লম্বা মোরগের পালক উচু করে লাগিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়। এটার আবার অনেক নিয়ম কানুন আছে। জুম নাচের বিভিন্ন ধাপগুলো নিচে বর্ণনা করলাম।

১. আবা নিয়া নাচ বা জুম জমি নির্বচন করা নাচ:

একজন যুবক আর একজন যুবতী স্বামী স্ত্রী সেজে জুম চাষ করার জন্যে জমি দেখতে যাবে, ছেলের হাতে থাকবে একটি দা আর মেয়ে নিবে একটি থরা বা পাত্র। থরাটি দড়ি অথবা দড়ির মত অন্য জিনিস দিয়ে লাগিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে পিঠে ঝুলিয়ে দেবে, বাদ্য বাজনার তালে তালে নেচে নেচে ছেলে আগে যাবে আর মেয়েটিও নাচতে নাচতে ছেলের পিছনে পিছনে যাবে। অনেক সময় দেখি ছেলে হাতে দা নিয়ে মংরেং বা কুড়াল ব্যবহার করে। মংরেং কাঁধে তুলে সামনের দিকে তাকিয়ে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে পুরুষের মত যেতে থাকে জমি দেখে, স্ত্রীর মতামত নেয় কথাবার্তা বলে। জুম জমি দেখার পর পছন্দ হলে ঘুরে ঘুরে দেখে, ভালো দিক খারাপ দিক নিয়ে স্ত্রীর সাথে কথা বলে, কোথায় বোরাং ঠিক করবে তাও দেখে, স্ত্রীর পরামর্শ নেয়। বোরাং হলো জুম জমি পাহাড়া দেওয়ার জন্যে বড় গাছের উপরে ছোট ঘর তৈরি করা, সব কিছু দেখার পর আবার স্বামী-স্ত্রী বাজনার তালে নেচে ফিরে আসবে।

২. আবা ওয়া বা জুম জমি পরিস্কার করা নাচ :

এখানে চার পাঁচ বা তার উপরে ছেলেরা মংরেং কাঁধে নিবে আর সমান সংখ্যক মেয়েরাও পিঠে থরা বা পাত্র ঝুলিয়ে নেবে। ছেলেরা একজনের পিছনে আর একজন লাইন করবে তাদের বাম পাশে মেয়েরাও পিঠে থরা ঝুলিয়ে বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে জুম জমিতে যাবে। জুম জমিতে পৌছলে ছেলেরা মেয়েদের পিছনে পিঠে থাকা থরা বা পাত্রকে ধরে নামাতে সাহায্য করবে। সব থরা এক জায়গায় রাখবে। থরার ভিতরে থাকে দুপুরের খাবার। যাকে গারোরা মিসাল বলে। এই দুপুরের খাবার সব সময় বিলনি চাউলের সিদ্ধ ভাত হয়ে থাকে। এটা সব সময় কলা পাতায় মুড়ানো থাকে। এই ভাতকে গারোরা মি-মিল মিসাল বলে, সঙ্গে থাকে শুটকি মাছের ভর্তা বা সবজি। বাজনার তালে নেচে নেচে ছেলেরা মংরেং দিয়ে গাছ লতা পাতা কাটবে, আর মেয়েরা নেচে নেচে সেই কাঁটা গাছ লতা পাতা অন্য জায়গায় জমা করবে।

৩. জাবল রাম্মা বা কাটা গাছ লতাপাতা  শুকানো নাচ:

আবার আগের কায়দায় বাজনার তালে তালে ছেলে মেয়ে নেচে নেচে জুম জমিতে যাবে। ছেলেরা মেয়েদের পিঠের থরা ধরে নামাতে সাহায্য করবে। এক কোণায় থরা মংরেং রেখে ছেলে মেয়ে মিলে বাজনার তালে নাচতে নাচতে কাটা ঝুপ রোদ্রে  শুকাবে। প্রত্যেক পর্বে কিছু কথাবার্তা থাকবে, এখানেও থাকবে। বলবে এদিক দিয়ে সূর্য বেশি পড়বে না ওদিক দিয়ে রাখলে তাড়াতাড়ি শুকাবে, অথবা এক জায়গায় রাখলে শুকাতে দেড়ি হবে পাতলা করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে। এভাবে ছেলে মেয়ে নাচতে নাচতে কথা বলতে বলতে কাজ করবে, দুপুরে মি-মিল মিসাল এক সাথে খাবে, কিছু বিশ্রাম, কথাবার্তা বলে, আবার কাজে নামবে। বিকেলে ছেলেরা মেয়েদের থরা ধরে পিঠে ঝুলাতে সাহায্য করবে, আর ছেলেরা নিজেদের মংরেং কাঁধে তুলে আগের মত নাচতে নাচতে বাড়িতে ফিরে আসবে।

৪. জাবলকো সওয়া বা  শুকানো লতা পাতা পুড়ানো নাচ:

আগের মত ছেলেমেয়েরা বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে জুম জমিতে যাবে, মেয়েদের থরা নামাতে সাহায্য করবে, এক কোণায় সব থরা ও মংরেং রাখবে। তারা নাচতে নাচতে  শুকানো গাছ লতাপাতা পুড়াবে, এখানেও কথাবার্তা হয়, বলে এদিক দিয়ে পুড়ালে তাড়াতাড়ি পুড়বে, ওদিক দিয়ে পুড়ালে বাতাসের বিপরীত হবে। এরকম নানা কথাবার্তা বলবে। দুপুর হলে দুপুরের খাবার বা মি-মিল মিসাল খাবে, সলা পরামর্শ করবে, কেউ কাজ ঠিকমত না করলে তাকে কাজ করতে উৎসাহ দেবে। খাওয়ার পর আবার কাজ করবে বিকেল পর্যন্ত, এমন সময় কেউ বলবে বিকেল হয়ে গেছে বাড়িতে ফিরতে হবে, সবাই কাজ রেখে দিবে মেয়েদের থরা পিঠে ঝুলাতে সাহায্য করবে। আর ছেলেরা নিজেদের মংরেং কাঁধে তুলে মেয়েদের পাশাপাশি লাইন করে বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে বাড়িতে ফিরবে, ফিরার সময়ও অনেককে কথা বলতে  শুনা যায়। বলে, হায়! ঘর বাড়ি এখনো অনেক দূরে, ক্লান্ত হয়ে গেছি হাঁটতে পারছি না… এরকম।

৫. দিমমাক বা ছাই খেলা নাচ:

আগের মত ছেলে মেয়ে বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে জুম জমিতে যাবে, মেয়েদের পিঠে জুলানো থরা হাতে ধরে ছেলেরা নামাতে সাহায্য করবে, একটি কোনায় থরা মংরেং রাখবে। তারা বাজনার তালে নেচে নেচে আগুনে পুড়ানো ছাইয়ের কাছে যাবে, দুই হাতে ছাই তুলে হাতে পাতায় ঘঁষে ছাই  গুড়ো করবে, তারপর ছেলেরা ছেলেদের গালে ছাই মাখাবে। আর মেয়েরাও একে অপরের গালে ছাই মাখাবে, হাসি তামাসা করবে বাজনার তালে তালে নাচবে, দৌড়া দৌড়ি করবে কিন্তু সব কিছুই বাজনার তাল লয় মেনে। দুপুরে দুপুরের খাবার খাবে মুখ গাল পানিতে পরিষ্কার করবে না, কলো মুখ গাল নিয়েই মি-মিল মিসাল খাবে, একজন অপরজনে কালো মুখ দেখে কালো বানরের মুখের সাথে তুলনা করবে। হাসাহাসি করবে, মি-মিল মিসাল খওয়ার পর আবার লাইন করে একত্রে নাচবে বাজনার তালে তালে এক ঘুরান দুই ঘুরান নাচার পর আবার নাচতে নাচতে ছাই মাখাবে। এক সময় উচুস্বরে বলবে  বিকেল হয়ে গেছে বাড়িতে ফিরতে হবে, আর কথা নয় আর খেলা নয়, ছেলেরা থরা ধরে পিঠে ঝুলাতে সাহায্য করবে, ছেলেরাও নিজেদের মংরেং কাঁধে তুলবে। তারপর কালো গাল কালো মুখ নিয়ে আগের মত বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে বাড়ির দিকে ফিরে যাবে। এই নাচগুলো আস্তে আস্তে করা যায় আবার দ্রুতও করা যায়। অতিরিক্ত আস্তে আস্তে দেখালে দেখতে ভাল দেখা যায় না, এই কারণে দেখার মত একটু দ্রুত লয়ে করাই ভালো। আবার বেশি কথা বললেও অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়। সব কিছুই প্রয়োজন মত  করা ভালো অতিরিক্ত সব কিছুই খারাপ দেখায়।

এই ছাই খেলা নাচের পর বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে। এক পশলা বৃষ্টি না হলে জুম জমিতে ধানের বীজ বুনা যায় না। তাই ছাই খেলা নাচের পর এক কি দুই সপ্তাহ বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করে। তারপর সাংসারেক গারোরা ধৈর্য্য হারিয়ে গ্রামের নকমার কাছে যায় পরামর্শের জন্যে। নকমাকে অতিষ্ঠ করে তুলে, গ্রামের লোকদের চাপে কামাল বা পূজারীকে ডাকতে বাধ্য হন নকমা। কামাল বা পূজারী সামবাসিয়া বা আসন তৈরি করে জুম জমির ঠিক মাঝখানে, কলাপাতায় ভোগ দেয়,  শূকর মেরে রক্ত ছিটিয়ে দেয় আসনের উপর। আর ঝড় বৃষ্টির দেবতা মিৎদে গয়েরাকে ডাকেন। সাংসারেক গরোদের বিশ্বাস এই মেঘ বৃষ্টির দেবতা গয়েরাকে পূজো দিলে কয়েক ঘন্টার মধ্যেই পশ্চিম-উত্তর কোণ থেকে ঝড় বৃষ্টি ধেয়ে আসে। ঝড় বৃষ্টি বাতাসের ভয়ে সব মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেও পূজারী আর সহকারি পূজারী পালাতে পারে না, নিয়ম নেই। ঝড়-বৃষ্টি-বাতাস-শীলের মধ্যেই আসনের সামনে বসে গয়েরার নাম জপতে হয়। শক্তিশালী এই কামাল বা পূজারী না হলে আসনের সামনেই ঝড়-বাতাস-বৃষ্টির মাঝে পূজারী ও তার সহকারি দুজনেই মারা যায় বলে, এই কারণে কামাল সহজে পূজো দিতে চায় না।

জুম নাচের প্রোগ্রামেও মাঝে মাঝে এই ঝড় বৃষ্টির দেবতা মিৎদে গয়েরাকে পূজারীর পূজো দেওয়ার কাহিনিকে দেখাতে দেখি, আবার কোন কোন জায়গায় দেখিনি। এই পর্বে কোন বাদ্য বাজনা বা তালে ছন্দে ছেলে মেয়েদের নাচ দেখিনি,  শুধু পূজারীর পূজো দেওয়ার অবস্থাকেই অভিনয় করে দর্শকদের দেখানো হয়।

৬. মি গিয়া বা ধানের বীজ বপন নাচ:

এই নাচও দলগত নাচ সব কিছুই প্রায় আগের মতই, তবে ছেলে মেয়ের হাতে বুক সমান বা তার চেয়ে একটু কম লাঠি থাকে। লাঠির একপাশে ধারালো চৌকা, আর প্রত্যেক জনের কোমরের বাম পাশে একটি ছোট বাঁশের তৈরি পাত্র বাঁধা থাকে। এই ছোট পাত্রের ভেতরে ধানের বীজ ভরা থাকে। আগের মত বাজনার তালে তাল মিলিয়ে নেচে নেচে জুম জমিতে যাবে, মেয়েদের পিঠের থরা ছেলেরা ধরে নামাতে সাহায্য করবে, সব থরা এক কোণায় রাখবে। তারপর কিছু কথা হবে কোন প্রান্ত থেকে ধানের বীজ বোনা শুরু করবে এই নিয়ে। আর সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে পাশাপাশি ছেলেদের লাইন মেয়েদের লাইন দাঁড়িয়ে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে ঘুরবে। আর লাঠির ধারালো মাথা দিয়ে ডান হাতে মাটি গর্ত করবে, আর বাম হাতে কোমরে বাঁধা পাত্রের ধানের বীজ এক কি দুইটি নিয়ে গর্তে ফেলবে, নাচতে নাচতে এই কাজ করবে। প্রথমে ডান পায়ের পাতা দিয়ে গর্তে রাখা বীজ মাটিতে ঢেকে দিবে, আর বাম পা দিয়ে উপরের মাটি সমান করে দিবে, একই পদ্ধতিতে ছেলেমেয়েরা নেচে নেচে এই ধানের বীজ বপন করার নাচ দেখাবে। দুপুরে কিছু সময় বিশ্রাম নিতে মি-মিল মিসাল খাবে, তারপর আবার ধানের বীজ বপন করবে, বিকেল হলে নাচতে নাচতে বাজনার তালে তালে বাড়িতে ফিরবে।

৭. সামসি বলসি থেৎদা বা আগাছা পরিষ্কার নাচ:

আগাছা পরিস্কার করার নাচ দেখানোর আগে আরেকটি নাচের পর্ব আছে, পর্বটির নাম বোরাং রিকগা নাচ। জুম জমিতে কাজ করার সময় বিশ্রাম নেওয়া, হিং¯্র বন্য জন্তুর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ঘর হচ্ছে বোরাং। এই ঘরটি বড় গাছের উপরে ডালের উপর ঘর তৈরি করে, বন্য হাতির নাগালের বাইরে, উঁচু ডালে ঘরটি তৈরি করে, বোরাং তৈরির নাচে মেয়েদের কোন ভূমিকা নেই, মেয়েরা অংশগ্রহণ করে না।  শুধু ছেলেরাই আৎতি মংরেং বা দা কুড়াল কাঁধে নিয়ে বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে যায়, নাচতে নাচতে গাছের উপর ওঠার অভিনয় করে। বোরাং ঘর তৈরির অভিনয় করে, ঘর তৈরি শেষ হলে লাইন করে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে বাড়ি ফিরে যায়, এই হল বোরাং তৈরির নাচ।

এরপর জুম জমির আগাছা লতাপাতা পরিস্কার করার জন্যে আগের মত ছেলে মেয়ে একসাথে লাইন করে বাজনার তালে তালে তাল রেখে নাচতে নাচতে জুম জমিতে যায়। মেয়েদের পিঠের থরা মাটিতে নামানোর জন্য ছেলেরা সাহায্য করে এক কোণায় সব থরা একসাথে রাখে, পরে ছেলেমেয়ে পাশাপাশি লাইন করে নাচতে থাকে।

এক সময় জুম জমির আগাছা তোলা ও লতাপাতা হাত দিয়ে টেনে ছিঁড়ে ফেলে পরিস্কার করার অভিনয় করে, সব কিছুই বাজনার তালে তালে নেচে নেচে করতে হয়। দুপুরে ছেলেরা নেচে নেচে ঝর্না থেকে পান করার পানি আনতে যাবে, মেয়েরা নাচতে নাচতে থরার ভিতরে কলাপাতায় মুড়িয়ে রাখা মি-মিল মিসাল বের করবে। মেয়ে-ছেলে একসাথে বসে দুপুরের খাবার খাবে, একেবারে নীরবে নয়, কিছু কথাবার্ত হবে, মেয়েরা হাত দিয়ে বলবে- ধরো এটা তোমার ভাত, ছেলেরা বলবে- আরেকটু বাড়িয়ে দাও। অথবা বলবে- তরকারিতে বেশি লবণ হয়ে গেছে বা  শুটকি ভর্তায় অনেক ঝাল, খাওয়া যায় না, আবার কেউ বলবে- ঝাল ভালো একটু কড়া না হলে খাওয়ার মজা নেই। দুপুরের খাবার শেষ হলে উঠে দাঁড়াবে। মেয়েরা কলাপাতা ও ময়লাগুলো সব তুলে থরা পাত্রে ঢুকাবে আর আগের মত বাজনার তালে তালে নেচে নেচে লতাপাতা ছিঁড়বে আগাছা পরিস্কার করবে।

একসময় হঠৎ একজন বলবে বিকেল হয়ে গেছে বাড়িতে ফিরতে হবে, মেয়েরা নেচে নেচে থরা পাত্রের দিকে যাবে, ছেলেরা থরা উঠিয়ে পিঠে ঝোলানোর জন্য সাহায্য করবে। পরে ছেলে মেয়ে পাশাপাশি দুই লাইন করে বাজনার তালে তালে নাচবে, দুই এক ঘোরান নেচে, তারা সবাই চলে যাবে, এটাই হলো সামসি বলসি থেৎদা বা আগাছা লতাপাতা পরিস্কার করার নাচ।

৮. মি আক্কা বা পাকা ধান তোলার নাচ:

পাকা ধান তোলা নাচে ছেলে ও মেয়ে সবাই পিঠে থরা বা পাত্র ঝুলাবে, নাচতে নাচতে জুম জমিতে যাবে, প্রস্তুতি নিবে কে কোন দিকে ধান তুলবে নির্দেশনা দিবে। পরে নেচে নেচে দুই হাতে ধানের শীষ টেনে নিয়ে পিছনে থরা পাত্রে রেখে দিবে, এটাই জুম জমি থেকে সাংসারেক গারোদের পাকা ধান তোলার পদ্ধতি। তাদের ধান মাড়াই নেই দুই হাতে ধানের শীষ ধরে  শুধু ধানের পাকা ফল পারে, আর পিছনে ঝুলিয়ে রাখা থরা পাত্রে রেখে দেয়, এই কাজটি বাজনার তালে তালে নেচে ধান তুলে। আগের মত দুপুরে মি-মিল মিসাল খায় বিশ্রাম নিয়ে, আবার বাজনার তালে তালে পাকা ধান তুলে, বিকেলে ধান ভর্তি পাত্র নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরবে।

৯. মি রামমা বা রৌদ্রে ধান  শুকানো:

সাংসারেক গারোরা সিদ্ধ চাউল খায় না তারা আতব চাউল খায়। তাই থরা বা পাত্রের ধান বাজনার তালে তালে নেচে নেচে আমপাটির উপর হাতে নাড়িয়ে চাড়িয়ে শুকাবে। ধান ঠিকমত  শুকিয়েছে কিনা হাতে তুলে এক দুইটি ধান দাঁতে কামড় দিয়ে দেখবে, কড়কড়া  শুকালে ধান দাঁতে কামড় দিলে ঠাশ শব্দে ধান ভাঙবে। আর ধান শুকালে তারা ধান একত্র করে। কিছু সময় ছায়ায় রাখবে অথবা পরের দিন ধান ভাঙবে বা ধান থেকে চাউল করবে। গারোদের অন্যরকমের ঢেঁকি আছে যাকে সাংসারেক গারোদের রিম-মল চা-সাম বলে।  এরকম রিম-মল চা-সাম ঢেঁকি পা দিয়ে ধান ভানা যায় না, হাত দিয়ে ভানতে হয়, মেয়েরাই এই ধান ভানার কাজ করে, চা-সাম এ  শুকনো ধান রেখে দুই পাশে দুই মেয়ে দুটি রিম-মল শক্ত করে ধরে, একজন প্রথমে জোরে চা-সামের ধান ঠেকায়, সে রিম-মল তুললে আরেকজন জোরে ঠেকায়। এবাবে একজনের পর আরেকজন ঠেকিয়ে ধান ভানে বা ধান থেকে চাউল করে, এই ভানাকেই ছেলে মেয়েরা বাজনার তালে তালে নেচে নেচে রিম-মল দিয়ে ধান ভানে বা ধান থেকে চাউল বের করে।

১০. আওয়া বা গোসল করার নাচ:

এই পর্বে কোনো ছেলে থাকবে না,  শুধু মেয়েরা বাজনার তালে তালে নেচে নেচে ঝর্নার পানিতে যাবে। তারপর তালে তালে নেচে নেচে গোসল করার অভিনয় করবে। নেচে নেচে গোসল করা শেষ হলে, নিজেদের কাপড় সাবান দিয়ে পরিস্কার করবে, সেটাও নাচের মাধ্যমে বাজনার তালে তালে তারপর নাচতে নাচতে বাড়ির দিকে ফিরবে।

১১. কিননি কেননা, জানিরা নিয়া বা চুল আছড়ানো ও আয়না দেখা নাচ:

এই পর্বে কোনো ছেলে থাকবে না। শুধু মেয়েরা অংশগ্রহণ করবে। লাইন করে নেচে নেচে মেয়েরা বাজনার তালে তালে উঠানে আসবে, এক কি দুইবার চারিদিকে নেচে নেচে ঘুরে। বেশি হলে অর্থাৎ ছয়জন হলে তিনজন করে দুইটি লাইন করে। প্রথমে নেচে নেচে একসাথে নিজের চুল খোঁপা থেকে খুলবে, কাপড়ে মুছবে চুলটি ঝরঝরা করবে। পরে একসাথে তাল মিলিয়ে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে চিরনী দিয়ে চুল আছড়াবে, কয়েকবার চিরনী দিয়ে আছড়ানোর পর, সবাই একসাথে চিরনী রেখে দেবে। পরে ছোট জানিরা (আয়না) বের করে একসাথে তাল মিলিয়ে নাচতে নাচতে বাজনার তালে তালে নিজের মুখ দেখবে, প্রথমে বামপাশে দেখবে তারপর ডানপাশে দেখবে। এভাবে কিছু সময় নাচার পর সকলে একসাথে নাচতে নাচতে আবার ফিরে যায়, অনেকে বলে গোসল করা নাচ আগে ছিল কিন্তু আয়না দেখা নাচ ছিল না বলে, পরে এই নাচ যুক্ত হয়েছে।

১২. জাজং নিয়া বা চাঁদ দেখা নাচ:

চাঁদ দেখা নাচের মধ্যেও ছেলেরা থাকে না। শুধু মেয়েরা বাজনার তালে তালে নেচে নেচে এক লাইন বা দুই লাইন করে আসে কিছু সময় ঘুরে ফিরে নাচে। পরে বাজনার তালে নাচতে নাচতে কপালে ডান হাত রেখে চাঁদ দেখে, আর একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসে, শব্দ না করে নিরবে হাসে যাকে গারো ভাষায় খাদিং সিমমিৎদা বলে। মাঝে মাঝে দল বা লাইন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যার যার মত চাঁদ দেখে, পরের লাইনে এসে, নাচতে নাচতে একে অপরকে দেখে খাদিং সিমমিৎদা বা মুচকি হাসবে। এরকম নাচকেই জাজং নিয়া বা চাঁদ দেখা নাচ বলে। চাঁদ দেখা হলে সবাই এক লাইন অথবা দুই লাইনে বাজনার তালে তালে নাচতে নাচতে চাঁদ দেখতে দেখতে চলে যায়।

১৩.  কামবি থ-ওয়া বা উচ্চতা মেপে দেখার নাচ:

এই কামবি থ-ওয়া নাচে ছেলে মেয়ে উভয়ই অংশগ্রহণ করে, ছেলেরা পাঁচ-সাতজন হলে মেয়েরাও পাঁচ-সাতজন থাকবে । আগের মত ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও বাজনার তালে তালে নেচে নেচে আসবে, এক বা দুই ঘুরান ঘুরবে, এই প্রথম তালে তালে বের হয়ে আসার ভিন্ন রকম অবস্থা দেখি। কোন কোন জায়গায় দেখি বাজনার তালে তালে নেচে নেচে আসার সময়, উপস্থিত দর্শক বা সম্মানিত ব্যক্তিদের সালাম জানাবে নাচতে নাচতে। ছেলে মেয়ে প্রত্যেকজন প্রত্যেকটি ধারাবাহিক নাচে ডান হাত কপাল পর্যন্ত উঠিয়ে নাচতে নাচতে বাজনার তালে তালে সালাম জানাবে, তারা এক কি দুই ঘুরান ঘুরে সবাইকে সালাম জানাবে। আবার অনেক জায়গায় দেখি ডান হাত কপাল পর্যন্ত উঠিয়ে সালাম জানায় না এমনি স্বাভাবিকভাবে নাচতে নাচতে এক কি দুই ঘুরান ঘুরে।

আবার প্রত্যেক বাজনার তালে তালে নেচে নেচে প্রত্যেক আইটেমের শেষে মাথা পর্যন্ত হাত উঠিয়ে হাতের পাতা একটু নাড়িয়ে এক কি দুই ঘুরান ঘুরে বিদায় জানায়। এভাবে মাথা পর্যন্ত সোজা হাত উঠিয়ে অল্প নাড়িয়ে বিদায় জানানোকে সাংসারেক গারোরা ‘জাকপা দারেং হল্লেংই’ বিদায় নেওয়া বলে। উচ্চতা মেপে দেখা নাচে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে ছেলেদের বাম দিকে নেচে নেচে পাশাপাশি দাঁড়াবে, নাচতে নাচতে ছেলে সোজা হয়ে থাকবে। আর মেয়ে নাচতে নাচতে নিজেকে নিচু করাবে, মেয়ে সোজা হলে ছেলে নিচু হবে এরকম সবাই দলগত একসাথে এই কামবি থ-ওয়া নাচ দেখাবে। কিছু সময় ধরে এরকম কামবি থ-ওয়া নাচ দেখানোর পর বাজনার তালে তালে নেচে নেচে সামনের দিকে এক দল অথবা ছেলে মেয়ে পাশাপাশি দুই দল হবে। মাথা পর্যন্ত হাত উঠাবে আর হাতের পাতা অল্প নাড়িয়ে বাজনার তালে তালে নেচে নেচে এক কি দুই ঘুরান ঘুরে উপস্থিত দর্শকদের বিদায় জানাবে আর ফিরে যাবে।

১৪. চামে মিককাং জানিয়া বা প্রিয় জনের মুখ দেখা নাচ:

এখানেও ছেলেমেয়ে একসাথে নাচে অংশগ্রহণ করে, প্রথমে বাজনা বাজাবে বাজনার তালে তাল রেখে নাচতে নাচতে আসবে উঠানে, এক কি দুই ঘুরান ঘুরবে মেয়ে ছেলে এক লাইনে আসতে পারে অথবা ছেলে আলাদা মেয়ে আলাদা পাশাপাশি নাচতে নাচতে আসতে পারে, আবার এমনি নেচেও আসতে পারে। কপাল পর্যন্ত ডান হাত উঠিয়ে উপস্থিত দর্শকদেরকে সালাম জানিয়ে নেচে নেচেও আসতে পারে, দুই ধরনের নাচতে দেখা যায়। এক কি দুই ঘুরান নাচার পর মেয়েরা ছেলেদের বাম দিকে পাশাপাশি লাইন করে দাঁড়াবে।

এই চামে মিককাং জানিয়া নাচের জন্য একটু ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়াতে হয়। বাজনার তালে তালে কিছু সময় নাচার পর হঠাৎ মেয়ে নেচে নেচে ছেলের বাম দিকে মাথা নুইয়ে ছেলের মুখ দেখবে, তারপর নেচে নেচে ছেলের পিছন দিকে গিয়ে ডান দিকে মাথা নুইয়ে মুখ দেখে। মেয়েরা একসাথে এরকম কয়েকবার নেচে নেচে ছেলেদের মুখ বা প্রিয়জনের মুখ দেখে, এই সময় ছেলেদের নাচও থামবে না, বাজনার তালে তালে নাচতে থাকবে। একসময় মেয়েরা নাচতে নাচতে একজনের পিছনে আরেকজন লাইন করে দাঁড়িয়ে নাচতে থাকবে, এভাবে প্রিয়জনের মুখ দেখা মেয়েদের পর্ব শেষ হয়।

পরে ছেলেরা নাচতে নাচতে প্রথমে মেয়েদের বাম দিকে মাথা নুইয়ে এক কি দুই বার মেয়েদের মুখ দেখবে, আবার নেচে নেচে মেয়েদের পিছন দিক দিয়ে যাবে। আর ডান দিকে ছেলেরা মাথা নুইয়ে দেখবে। এভাবে পর্যায়ক্রমে মেয়েরা দুইবার আর ছেলেরাও দুইবার প্রিয়জনের মুখ দেখবে, এই নাচকে বলা হয় গারো ভাষায় ‘চামে মিককাং নিয়া’ আর বাংলায় প্রিয়জনের মুখ দেখা।

এইরকম সাংসারেক গারোদের জুম চাষের নাচ দেখতে পাওয়া যায়। এই জুম চাষের নাচের আইটেম হয়তো আরো বেশিও থাকতে পারে, কম কোনমতেই হবে না। কারণ গারোদের প্রায় আঠরো ঊনিশটি গোত্র আছে এই প্রত্যেকটি গোত্রের ‘দাকবেওয়াল’ বা সংস্কৃতি ভিন্ন রকমের হয়ে অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তবুও আবেং গোত্রের যে কয়েকটি নাচ দেখা যায়, তা চিবক বা আত্তং গোত্রে দেখা যায় না, বা মিগাম গোত্রের আরো অন্যরকম। গারোদের সব গোত্রের সংস্কৃতি জানা খুবই কঠিন আর এই পর্ব অনুষ্ঠান সব সময় হয় না। অনুষ্ঠান করাতে গেলেও খরচের অনেক বেপার থাকে। প্রস্তুত করা কোন কিছুই নেই, কয়েকদিন চর্চা করতে হয়। ১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে দেখতাম কিছু কিছু গ্রামে সাংসারেক গারো দেখা যেত তারা কয়েক গ্রাম মিলে একত্র হতো। তাদের আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো পার্বণ করে। সে সময় সাংসারেক যুবক যুবতীরা এইসব অনুশীলন করতে দেখি, সেখান থেকেই কিছু নোট করেছি। আবার তেইজে ব্রাদার গিয়োম কিছু টাকা দিতেন সেই টাকা দিয়ে সাংসারেক গারোদের একত্রিত করে মোটামুটি বড় ধরনের অনুশীলন করেছি। সেই সময় সাংসারেক পরিবারে এতবেশি যুবক-যুবতী নেই। মেয়েদেরকে ছেলে বানিয়ে অনুশীলন করা হতো। যেভাবেই হোক নিয়মটি দেখতে পেয়েছি। ব্রাদার গিয়োম গারো ভাষায় শিক্ষা প্রোগ্রাম সে সময় চালু করেন, কলমাকান্দা উপজেলার বরুয়াকোনা থেকে পশ্চিমে নালিতাবাড়ি উপজেলার পশ্চিম বারমারী পর্যন্ত মোট ৭২টি স্কুল ছিল। প্রত্যেকটি স্কুলে একজন গারো শিক্ষক শিক্ষয়ত্রী ছিল, কিছু কিছু স্কুল ক্যাথলিক প্রাইমারি স্কুলের টিচারকে কিছু সম্মানী ভাতা দিয়ে গারো ভাষা শিক্ষা দেয়, আর এই প্রত্যেক স্কুলকে শিক্ষক শিক্ষিকাকে আমাকেই দেখতে হয়। তাই প্রতিটি গ্রামে এলাকায় যেতে মানুষের সাথে মিশতে সুযোগ পেয়েছি, সেই গারো ভাষার শিক্ষক শিক্ষিকারাই সাংসারেকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই কাজ  শুরু হয় ১৯৯০ থেকে। যেমন ধুমনিকূড়া গ্রামের মার্থা দিদি তার গ্রামের সাংসারেক কামাল বা পুরোহিত ভুইনডা কামালের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

এই কামাল বড় শক্ত মনের মানুষ, প্রথমে আমার সাথে আলাপ করেনি, কাজে যেতে দেয়নি। সে মনে করে আমি ফাদার তাকে খ্রিষ্টান করাতে চাই, তাই সে সোজা বলে দেয়- আমার কলসির পানি ভরা, কোনভাবেই নড়াচড়া করবে না। পরে তার সাথে বন্ধুর মত মিশতে পেরেছি।

গাজির ভিটা গ্রামের প্রভাত চাম্বুগং ক্যাথলিক শিক্ষক আর গারো ভাষা শিক্ষা দিত, সে আমাকে তাদের গ্রামের কামাল দরিশ আজিমের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

বালওয়াকান্দা গ্রামের প্রশিতা চিছাম গারো ভাষা শিক্ষক তার বাবা রমেশ মানখিন কামাল না হলেও কামালের সব নিয়ম কানুন জানেন, মাঝে মাঝে কামালের কাজও করেন।

পীরগাছা মিশনের কাছে চুনিয়া গ্রামের সহিন কামাল ভালো জানেন, সে মুখ দিয়েই দামা বা ঢোল বাজাতে পারেন, যেমন গারো ভাষায় দিং দাদি দিমমিৎদা, নমুল জাথেং রিমমিৎদা, তারপর জাংরো-রো জাং-পাক মি-মিল সংআকো চা-পাক, আনটি বাজালচি রেআংওদে নকগো জামমো নাবপাক। এরকম আদুরো বাঁশিও মুখে মুখে বাজাতে পারেন। যেমন- আদু-রো-রো আদু-রো-রো বা আদু-রো-রো-পেৎ, আদু-রো-রো-পেৎ, এবাবে নাগ্রা বাজানো শিঙ্গা বাজানো সব কিছুই মুখে মুখে বলে যেতে পারেন।

নলছাপ্রা গ্রামে একজন আত্তং কামাল ছিল, তার নাম আমার স্মরণ নেই, বিজয় রিছিল মাস্টার আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়, সে আত্তং গোত্রের কামাল হলেও সব গোত্রের সংস্কৃতি জানে। সে বেশি জানত গারোদের মাচং চাৎচি বা উপাধি কীভাবে এসেছে, তার কাহিনি ভালো জানে, তারপর দওদক দওসিয়া বা বিয়ের মন্ত্র আর ঘর উৎসর্গের মন্ত্র তার কাছ থেকে নেওয়া।

আরো অনেক কামালের সাথে কথা হয়েছে। আজ সেই কামালেরা একজনও নেই সবাই মারা গেছে। এই সাংসারেক কামালেরা সবাই গরিব, কিন্তু অর্থ সম্পদের লোভ নেই। কাহিনিগুলো বলার পর পারিশ্রমিক টাকা দিতে চাইলে টাকা নেয়নি, জোর করেও দিতে পারিনি, বলে এটা গারোদের বিশ্বাসের ব্যাপার, টাকা দিয়ে বিক্রি করা যায় না। মাঝে মাঝে বাজারে দেখা হলে বিড়ি খাওয়ার জন্য পঞ্চাশ টাকা দিলে নিবে, চা পান খাওয়ালে খাবে, কিন্তু সাংসারেক ধর্মের কাহিনি সংস্কৃতির বিনিময়ে একটি টাকাও নিবে না। কিন্তু অন্যভাবে টাকা দিয়েছি, হয়তো গোপনে তার স্ত্রীর কাছে নতুবা তার জামাই মেয়ে যে সংসার চালায় তার কাছে, পেটে ভাত না থাকলে আমাকে বসে বসে সারাদিন কাহিনি বলবে না।

চলবে..

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-২ ।। বাঁধন আরেং

https://www.youtube.com/watch?v=ofoFOstHm3c&feature=emb_title

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost