Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

একান্ত আলাপে বাসন্তী রেমা- ‘আমি জীবনেও এই জমিতে গাছ লাগাতে দিবো না’

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০, ১৩:৪৪

একান্ত আলাপে বাসন্তী রেমা- ‘আমি জীবনেও এই জমিতে গাছ লাগাতে দিবো না’

মধুপুর গড়াঞ্চলের শালবনবেষ্টিত পেগামারী গ্রামের আদিবাসিন্দা ফেরনী রেমা ও সুনীল মৃর মেয়ে বাসন্তী রেমা। বাসন্তী রেমারা পাঁচ বোন দুই ভাই। স্বামী গেতিস যেত্রা। দিন চলে দিন আনন দিন খাওন এই নীতিতে। বাসন্তী রেমার দুইজন ছেলে একজন মেয়ে। বড় ছেলে মান্দি রীতিতে জামাই চলে গেছে দূর গ্রামে। ঘরে আছে এক ছেলে এক মেয়ে। তারা পড়ছে। বড় ছেলের ঘরে নাতিন আছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর দোখলা রেঞ্জের বন কর্মকর্তা তার কর্মীদের নিয়ে বাসন্তী রেমার স্বত্বদখলী জমি যে জমি যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় চাষাবাদ করে আসছেন সেই ৪০ শতাংশ জমির ৫০০ কলাগাছ কেটে ফেলেছে বিনানোটিশে। একজন দিনমজুর আদিবাসী নারী তার শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে হয়ে পড়েছে দিশেহারা। বাগান তো গেছেই ক্ষতিপূরণও পাবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ তো আছেই সেই সাথে তিনি এখন জমি হারানোর চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। ঘটনার পর থেকে পাল্টে গেছে নিত্যদিনের রুটিন। বাসন্তী রেমা থকবিরিম বিশেষ প্রতিনিধির সাথে কথা বলেছেন তার চাওয়া, বর্তমান অবস্থা অর্থাৎ সামগ্রীক বিষয় নিয়ে। পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

 

 থকবিরিম : আপনি ভালো আছেন?

বাসন্তী রেমা : না আমরা ভালো নাই। এ কদিন ধরে খেয়েও সুখ নাই, ঘুমেও সুখ নাই।

থকবিরিম : আপনি বা আপনার স্বামী কী করছিলেন সেই সময়? যখন আপনার বাগান কাটা হচ্ছে?

বাসন্তী রেমা :  আমি আর আমার স্বামী আমরা দুজনেই অন্যের(বাঙালদের) বাগানে কামলা দিতে গেসিলাম। যেখানে কাজ করতে গেসি সেখানে একটু দূর আছে।

থকবিরিম : আপনার বাড়ি থেকে বাগান কি দূরে?

বাসন্তী রেমা :  হুম একটু দূর আছে বাড়ি থেকে।

থকবিরিম : কটার সময় এই ঘটনা ঘটে?

বাসন্তী রেমা : ৯টার সময় তারা হুটহাট এই কাজ করেছে।

থকবিরিম : আপনার বাগান কাটা হচ্ছে এটা আপনি জানলেন কীভাবে?

বাসন্তী রেমা : আমার এক দিদি রোগী দেখতে যাচ্ছিল। সে দেখে যে আমার বাগানে ভ্যানগাড়ি ভরা চারা গাছ নামাচ্ছে। তখন দিদি ড্রাইভারকে গাড়ি নষ্ট কিনা জানতে চাইলে ড্রাইভার জানায়, গাড়ি নষ্ট না এখানে চারা লাগানো হবে। এই কথা শুনে দিদি তাড়াহুড়ো করে আ্মার ছোটবোনকে জানায়। ছোট বোন আবার আমাকে ফোন করে জানায়, যে আমার বাগানে চারা লাগাতে চাচ্ছে তাড়াতাড়ি চলে আসো। বোনের ফোন পেয়ে আমি দ্রুত চলে আসি। আমার স্বামীও অন্যখানে কাজ করতে গেসিল। তাকেও জানাই। সেও চলে আসে। পরে আমরা যখন বাগানে যাই তখন দেখি সব কলাগাছ কেটে ফেলেছে এবং একটা সারি একাশিয়া গাছ লাগাচ্ছে। পরে আমি বন বিভাগের লোককে বললাম, স্যার আমি বহু কষ্ট করে, ঋন করে ধান দেনা করে গাছ লাগেয়েছি আপনি এটা কাটলেন কেন? পরে তিনি বলেন, এটা তো আপনাকেই ফলদ দেয়া হবে। আমি বললাম, আমাকে ফলদ দিবেন মানে? কেন আমাকে ফলদ দিবেন? এটা আমার জমি। আমি জীবনেও এখানে চারাগাছ লাগাতে দিবো না। এইভাবে আমি তাদের সাথে তর্ক করেছি।

বাসন্তী রেমা

কর্তনকৃত বাগানে বাসন্তী রেমা

থকবিরিম : তারা কতজন ছিলো?

বাসন্তী রেমা : তাদের লোকবল অনেক ছিলো ২৫/৩০জন লেবার নিয়ে আসছে। তারা দ্রুত কেটে ফেলেছে। তারা আমার কলাবাগান এমনভাবে কেটেছে যে, গুড়াসুদ্ধ উপড়ে ফেলেছে প্রায়। আর কোনোদিন এখান থেকে গাছ হবে না। আর আমার জমিও তো রাস্তার সাথেই।

থকবিরিম : কতটুকু জমিতে বাগান করেছিলেন?

বাসন্তী রেমা : মাত্র ৪০ শতাংশ। বনে এতো এতো জমি থাকতে কেন তারা আমার এই সামান্য জমির দিকে নজর দিলো? এই জমি আমাকে মা দিয়ে গেছেন। আমরা আদিম যুগ থেকে এই জমি খাচ্ছি! কত কতজন জমি দখল করে খাচ্ছে তাদের কিছু না করে কেন আমার জমির দিকে নজর দিলো?

থকবিরিম : এই জমি কতদিন ধরে আপনারা চাষাবাদ করে খাচ্ছেন?

বাসন্তী রেমা :  ওওও…. সেই অনেক দিন আগে থেকে। যুগ যুগ ধরে শুনেছি সত্যধর্ম থেকে। অনেক বড় বড় গাছ ছিলো। সেগুলো মরে গেছে। কিন্তু এখনও অনেক বড় আগাছি গাছ রয়ে গেছে। এই জমি আমাকে আমার মা দিয়ে গেছে।

থকবিরিম : আপনি কী জাতের কলার বাগান করেছিলেন?

বাসন্তী রেমা : শরবী কলা গাছ ছিলো।

থকবিরিম : বাগান করতে টাকা পেয়েছেন কোথায়?

বাসন্তী রেমা : সমিতি থেকে ঋন করেছি, মানুষের কাছে ধার-দেনা করেছি।

থকবিরিম : কত গাছ ছিলো?

বাসন্তী রেমা : ৫০০ কলা গাছ ছিলো।

বৃক্ষরোপনের জন্য আনিত চারাগাছ

বৃক্ষরোপনের জন্য আনিত চারাগাছ

থকবিরিম : এই জমিতে নাকি আগে রবি খান নামের একজন চাষাবাদ করতেন? বনজ ওষধির চাষ করতেন?

বাসন্তী রেমা : হুম করতেন। তার মেয়াদ শেষ হবার পর আমরা নিজেই ভাবলাম কেন অন্যকে দেবো এবার আমরা নিজেরাই কষ্ট করে হলেও বাগান করি। এইভাবেই নিজেরাই করেছিলাম।

থকবিরিম : দীর্ঘদিন রবিখান চাষাবাদ করেছে কিছু হলো না, আপনি বাগান করতে গেলেন তখনই তাদের নজরে পড়লো! এটা আপনি কী মনে করেন?

বাসন্তী রেমা : এটাই তো বুঝতে পারলাম না। কীভাবে কী হয়ে গেলো! সেই ফকরুদ্দিনের আমলে আমাদের পাশের অনকজনের গাছ কাটলেও এই জমির গাছ কাটে নাই, সাহস করে নাই। তারা নাকি শুধু আমার না আরো অনেক মান্দির জমিতেই নাকি চারা লাগাতো। তাই গাড়ি ভরতি গাছ এনেছিলো। তারা তো বলেছেই, সব মান্দিদের জমিতেই চারা গাছ লাগাবে।

বাঁশের খুঁটি

বাঁশের খুঁটি

থকবিরিম : আদিবাসী নেতারা কি আপনার সাথে যোগাযোগ করছে?

বাসন্তী রেমা : হুম। সবাই প্রতিদিনই আসছে, খবর নিচ্ছে, ফোনও করে। বাগাছাস গাসুসহ মান্দি-বাঙাল সব নেতারাই আসছে। আবার সাংবাদিকরাও অনেক আসছে।

থকবিরিম : আচ্ছা। ২৪ তারিখ তারা বসবে নাকি আপনার বিষয় নিয়ে?

বাসন্তী রেমা : হুম। সেদিনই বসার কথা ছিলো। কিন্তু বসে নাই। তারা সময় বাড়াচ্ছে আর বাড়াচ্ছে!

থকবিরিম : তারা কি আরো বাড়াতে পারে?

বাসন্তী রেমা : এখন বাড়ালে আমরা মানবো না। সেদিনই বলে আসছি। যেদিন সমাবেশ মানববন্ধন করেছি। মান্দিন্দরা কেউ মানবে না।

থকবিরিম : বনবিভাগ থেকে কি আপনার সাথে কোনো যোগাযোগ করা হচ্ছে বা করেছে?

বাসন্তী রেমা : না করে নাই। তবে অনেক সাংবাদিকরা আসছে এটা তাদের লোক কিনা কে জানে।

থকবিরিম : আপনি এখন কী চান? এই যে তারা আপনার ক্ষতি করে গেলো, আপনার সম্বলটুকু ধ্বংস করে গেলো?

বাসন্তী রেমা : আমি যে এতো ঋন করে, ধার দেনা করে, কষ্ট করে বাগান করেছি সেই বাগান তারা কেটে ফেলেছে তার ক্ষতিপূরণ চাই। আর আমি আমার জমি আবাদ করে খেতে চাই। আমার একটাই কথা, আমি জীবনেও এই জমিতে গাছ লাগাতে দিবো না। আমার মতো অন্য কোনো মান্দির বাগান যেন না কাটে। এর বিচার হোক এটাই চাই!

থকবিরিম : আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি ভালো থাকবেন।

বাসন্তী রেমা : হুম।

আরো লেখা...

মধুপুরে গারোদের বসবাস তিন থেকে সাড়ে তিনশ বছর আগে ।। সুভাষ জেংচাম

করোনাকালে মধুপুর শালবনে কলাগাছের লাশ ।। পাভেল পার্থ

অশুভ অশনিসংকেত ।। মতেন্দ্র মানখিন

https://www.facebook.com/thokbirim/videos/1163701897348748

সামাজিক বনায়নের নামে আদিবাসীদের নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ।

Gepostet von Thokbirimnews.com am Mittwoch, 16. September 2020




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost