Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

মাতৃনীড় ।। সালগ্রা সেকমাক মারাক

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০, ১০:৫৩

মাতৃনীড় ।। সালগ্রা সেকমাক মারাক

এক জায়গায় জেগে উঠেছে কিছু পারা ঘাস। লতিয়ে উঠতে শুরু করেছে কিছু আসামিলতা বা জার্মানলতা। এখানে ওখানে ছিঁড়েছুটে বেড়ে উঠেছে এক দুই করে বনমটমটিয়া বা শিয়ালমুতি। দোতলা সাদা চুনকাম করা বাড়ির পিছনের অংশের এই লম্বা অল্প জায়গাটুকুয় সবুজ ঘাস বিছানো। বাড়িটার চারিদিকে ইটের দেয়াল। বিষন্ন আকাশে কালো মেঘের রাজত্ব। এক থমথমে নীরবতায় শুয়ে আছে নতুন সমাধি।

আদিত্য শহরতলীর মাঠ থেকে খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরছিল। পথে প্রাণের বন্ধু শুভর সাথে দেখা। শুভ হন্তদন্ত হয়ে অফিসের দিকে ছুটছে। নতুন প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছে সে। কেবল শুরু করেছে। এর মধ্যে সব গুছিয়ে না রাখলে দেশের যা পরিস্থিতি পরবর্তীতে ভেস্তে যাবে সব। আদিত্য ডাক দিয়ে ওকে থামাল।

“আরে, আরে, এত তাড়া কিসের দোস্ত? রিল্যাক্স! এত এত কামাই কে খাবে বল্?”

“আরে না রে দোস্ত! নতুন প্রজেক্ট। তুই ত জানিস। আমাদের দেশেও কোয়ারেন্টাইন চলে আসছে। আর কদিন পরে সব বন্ধ হয়ে যাবে। ঘর থেকেই বেরোতে পারব না। তাই সব কাজ এখনই গুছিয়ে রাখছি। এমনিতেই লকডাউন হয়ে গেলে শুরু হতে না হতেই থেমে যাবে সব বুঝিস তো।”

“হুম, তা না হয় বুঝলাম। তাই বলে খোঁজ নেই খবর নেই। কতদিন পরে সাক্ষাৎ বল তো? একটা ফোনকল তো দিতে পারিস নাকি?”

“অ্যাঁ? এমনভাবে বলছিস যেন বছর কি বছর দেখাসাক্ষাৎ নেই? মাত্র তো এক সপ্তাহ। আর তারপর জমপেশ এক আড্ডা হবে আর তোর বিয়ের সব প্রস্তুতিও সেরে ফেলব বুঝছিস?”

“আমার এখন বন্ধুবরকে জিগাইতে হয়, ‘মনা রে মনা, কই যাস?’ নিজেরটা সামলা বাপু আমার ঘটকালি করতে হবে না।”

শুভ অট্টহাসিতে আদিত্যের গায়ে জোরে চাপড় মারে। তারপর একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যার যার গন্তব্যে ফেরা।

আদিত্য আজ অনেকগুলো খেলনা নিয়ে এসেছে। কুড়িজনের মত অনাথ শিশুর ভার নিয়েছে সে। আগে ওদের নাম ছিল পথকলি। মাবাপহারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত। ওদের ঠাঁই হত কখনো ফুটপাতে, কখনো ট্রামের পরিত্যক্ত বগিতে, কখনো বা কোন বস্তির স্যাতস্যাতে জলা জায়গার ওপর আড্ডা দেওয়ার কোন মাচাঙে কিংবা আর কোথাও না পেলে ফুটওভারব্রিজ কি রিঙের ভিতর কোনরকম রাতটুকু গুঁজার করা। সাহেবদের গাড়ির পিছন পিছন দৌঁড়াত চারপাঁচজন মিলে অথবা বসে পড়ত কোন সুবিধাজনক জায়গায় যেখানে মানুষের যাতায়াত বেশি বিশেষ করে বড়লোক বাবুদের। শুক্রবার হলে কথা নেই জুম্মার নামাজের সময় হলে ভো দৌঁড় সোজা মসজিদের দিকে। না, না, নামাজ আদায় নয় সেখানে গিয়ে সিরিয়ালে জায়গা নিবে। মসজিদের বাইরে ফকির-মিসকিন ভিক্ষুকদের সিরিয়ালে। মসজিদ ছেড়ে নামাজীরা বের হলেই শুরু হত সবার দুহাত বাড়িয়ে দেয়া। ভিক্ষাবৃত্তি না হলে টোকাইগিরি কিংবা ফুল হাতে ছোটাছুটি ভার্সিটির সুন্দরী আপদের পিছু পিছু। ওরা কম নয় জোড়া কপোতকপোতী দেখলে এক টাকা দুই টাকা এমনিতেই বাড়িয়ে দিবে। ধূলা-ময়লা, ছেঁড়া জামায় ঘুরে বেড়ানো ওরা কখনো ধমক খায়, কখনো মার খায়। মাঝে মাঝে চড়-থাপ্পড় গালে এসে পড়লে চোখ ছলছল করে ওঠে ওদের। অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকে শাস্তিপ্রদানকারীর দিকে। বুঝে উঠতে পারে না অবহেলিত, ভালবাসা হতে বঞ্চিত, সমাজের পরিত্যক্ত নোংরা-আবর্জনাখ্যাত পথশিশুরা যে ওদের কী দোষ?

আজ ওদের নতুন ঠিকানা হয়েছে। শুভর সাথে পার্টনারশিপে কোন এক প্রজেক্ট গড়ার জন্যই বাড়ির কাছে একটি নতুন প্লট কিনে ওখানেই অফিসের জন্য তিনতলা বিল্ডিং নির্মাণ করেছিল আদিত্য। তবে প্রজেক্ট চালু করা হয়ে ওঠেনি। তা না হলেও নতুন এক প্রজেক্টে পরিণত হয় যেখানে নতুন নীড় রচিত হয় কুড়ি শিশুর। সযত্ন-ভালোবাসায় গড়া এক নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে ওরা ভীষণ খুশি। ওদের দেখভালের জন্য আরও লোক নিয়োগ করা হয়। মায়ের মমতা নিয়ে ওদের আগলে রাখে বড়দি জ্যোতি যিনি প্রজেক্ট-ইনচার্জ। আরও দিদি এবং ভাইয়ারাও আছেন ওদের দেখভালের জন্য। আদিত্য নিজের বড় ব্যবসা সামলানোর পাশাপাশি এই নতুন প্রজেক্ট হাতে নিলে তার অনেক প্রবাসী বন্ধু হাত বাড়িয়ে দেয়। বেশ ভালোসংখ্যক দেশীয় দাতাগোষ্ঠী পাওয়ায় আদিত্যর নতুন প্রজেক্টের কাজ মসৃণ গতিতেই এগিয়ে চলে। এরমধ্যে শিশুদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যের দিকটায় তার নজর বেশি এবং সেভাবেই জোর দেয় তার অধীনস্থ কর্মকর্তা এবং কর্মীদের। সংখ্যা কুড়ি থেকে আরও বাড়িয়ে নেওয়া তার স্বপ্ন। এই আশ্রমের নাম সে রেখেছে মাতৃনীড়।

খেলনা নিয়ে আসার পর বাচ্চারা আদিত্যকে জেঁকে ধরে। ছেলেরা দুএকজন তার দুই কাঁধে ঝুলে পড়ে। কেউ জড়িয়ে ধরে, উল্লাস প্রদর্শন করে কেউ কেউ নাচতে থাকে, কয়েক জন আবার ব্যাগ থেকে খেলনা দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আদিত্য আর এগিয়ে যেতেই পারছে না। ব্যাগ থেকে খেলনাগুলো নামাতেও আর পারে না। অনেক কষ্টে ওদের সামলে নিয়ে তারপর খেলনাগুলো সবাইকে বন্টণ করে দিল।

কড়া লকডাউন শুরু হয়ে গেছে। বাইরে বের হলেই পুলিশের ডান্ডাবাড়ি খেতে হচ্ছে সবাইকে। মাস্ক না পরলে তো আরো রক্ষা নেই। সেদিন বাজার করতে গিয়ে মাতৃনীড়ের বাবুর্চিও নাকি বেধড়ক মার খেয়েছে পুলিশের হাতে। শরীরের কোথাও কোথাও ফুলে গেছে, কেটে গেছে, ছড়ে গেছে, রক্ত জমাট বেঁধেছে এমন এক অবস্থা। আদিত্য নির্দেশ পাঠিয়েছে মাতৃনীড়ের শিশুদেরকে যেন কোনভাবেই বাইরে বেরোতে না দেয় কিংবা বাইরের কারোর সংস্পর্শে না যায় সে দিকেও সতর্ক থাকতে বলে দিয়েছে। লকডাউনের পর আদিত্যর আর যাওয়া হয়নি নিজের হাতে গড়া মাতৃনীড়ে। মার্চের পঁচিশ তারিখ রেখে এসেছে যথেষ্ট পরিমাণ সাবান, জীবাণুনাশক স্প্রে। কিছুদিন আগেও পাঠিয়ে দিয়েছে যথেষ্ট পরিমাণ চা পাতা, লবঙ্গ, আদা, এলাচ, হলুদ, লেবু, চিনি ইত্যাদি।

আদিত্য নিজে আশ্রমে যায়নি কারণ তাকে ত্রাণকার্যে বাইরে কাটাতে হচ্ছে বেশি। মানুষের দুর্ভোগ-দুর্দশা দেখে সে বেশিদিন আর স্থির থাকতে পারেনি। তার সত্তা যে তাকে বারবার জাগিয়ে বলেছে, “Do Not Fear! Be Strong For Your Nation !” লকডাউন শুরু হতে না হতেই নেটিজেনরা নেটপাড়ায় শুরু করে দিয়েছে আন্দোলন, বইয়ে দিয়েছে কঠোর সমালোচনার প্রবল ঝড়। সরকারের নানা ব্যর্থতার অভিযোগে তীব্র ক্ষোভ-অসন্তোষ, ব্যাপক নিন্দা বিরাজ করছে নেটপাড়ায়। খেটেখাওয়া মেহনতি মানুষ, দিনমজুর, শ্রমিক যাদের দিন আনোন দিন খাওন তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে এই লকডাউনে অথচ যথেষ্ট পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা নেই, চোখে পড়া কোন উদ্যোগ নেই, চাকুরী হারানো লোকদের জন্য কোন সংস্থান নেই, ঘরভাড়া দিতে পারছে না অনেকে অথচ বাসামালিকদের অত্যাচার-হয়রান সমানভাবে অব্যাহত রয়েই গেছে, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি। এই করোনা মহামারীতে প্রয়োজনীয় নানা উপকরণ স্যাভলন, সার্জিক্যাল মাস্ক, ডেটল, হ্যান্ডরাব, হ্যান্ডস্যানিটাইজার, এমনকি ব্লিচিং পাউডার পর্যন্ত বাজার থেকে হঠাৎ উধাও, যারা সেবা দিবেন সেই নার্স-ডাক্তারদের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পিপিই নেই, অরক্ষিত হওয়ার ফলে ডাক্তার-নার্সরা যেমন সহজেই আক্রান্ত হবেন তেমনি তাদের মাধ্যমে গুণন প্রক্রিয়ায় এই মারী খুব সহজেই সারাদেশে পৌঁছে যাবে কিন্তু প্রশাসনের এসবে কোন নজর নেই এমন হাজারো অভিযোগে মুখর নেটিজেনরা। অবশ্য লকডাউন মেনে নেওয়ার আলামত খুবই কম। যার কারণেই রাজপথে পুলিশের কড়া প্রহরা এবং পিটুনি।

আদিত্য মানুষের কাছে পৌঁছায় বিভিন্ন ত্রাণ সহায়তা নিয়ে। কখনো বন্ধুদের নিয়ে কখনো কোন সংস্থার সাথে যৌথ উদ্যোগে কখনো বা সামাজিকভাবে। তার নিজের ব্যবসাতেও লাল বাতি জ¦লবে এমন অবস্থা যেন। তবু থেমে থাকে না তার আর্তমানবতার কাজে এগিয়ে যাওয়া। কত মা-বোনেরা চোখ ছলছল করে উঠে তাদেরকে পাশে পেয়ে। তাদের আশা এবং নিস্তারের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠে সমস্ত ত্রাণবাহিনী। বেশি বেশি মানুষের সংসর্গে যাবার কারণেই সতর্কতাবশত আদিত্য মাতৃনীড়ে তার সন্তানদের কাছে যায় না।

আজ অনেকদিন হয়ে গেল শুভর সাথে কোন যোগাযোগ নেই। জীবনের প্রতিটি বাঁকে আনন্দে, দুঃখ-কান্নায় যে বন্ধুই সর্বদা পাশে থাকে, কখনো পরামর্শক হিসেবে, কখনো সহযোদ্ধা হিসেবে, কখনো ভাই হয়ে, কখনো স্রেফে বন্ধুরূপেই। ওকে ফোনের পর ফোন দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইল স্যুইচ্ড অফ, সংযোগ বিচ্ছিন্ন। অনলাইনেও নেই অনেকদিন ধরে। মাঝে কে যেন বলেছিল শুভ নাকি অনেক অসুস্থ। “করোনায় আক্রান্ত হয়নি তো আবার?” আদিত্য এক শঙ্কা নিয়ে নিজের মনে প্রশ্ন করে চলে।

আদিত্য বড়দি জ্যোতিকে ফোন দিয়ে মাতৃনীড়ের ভালোমন্দ জেনে নেয়। এই সুযোগে একগাদা পরামর্শও যেন দিয়ে দিল। গরম জল দিয়ে গার্গল করবে আবার অতিরিক্ত গরম যেন না হয়, আদা-লবঙ্গ দিয়ে বানানো চা খাবে কিংবা হলুদ চা- ও খেতে পার। একান্ত প্রয়োজনে বাইরে গেলে বাইরে থেকে এসে গরম জলে পরিধেয় কাপড় ধোবে, নিজেও হাল্কা গরম জলে স্নান করে নিবে আগেই অথবা সাবান দিয়ে হাত ধোবে। বিশেষভাবে বাবুর্চিকে যেহেতু বাইরে যেতে হয়, বাজার-ঘাট করতে হয় তাই তার জন্য জীবাণুনাশক স্প্রে আলাদা গেইটের কাছে রেখে দিবে, তাকে বলবে এসেই যেন পরনের কাপড়-চোপড় ধুয়ে দেয়। বাইরে রাখা আছে সাবান এবং বালতিভর্তি জল। বাইরে থেকে এসেই যেন হাত ধুয়ে নেয়, সব থেকে ভালো হয় স্নান সেরে নেওয়া। সবজি যেন ভালো করে ধুয়ে নেয়, মাছ-মাংস যেন ভালো করে সিদ্ধ হয়, এবং বাবুর্চি সবসময় যেন কম্পাউন্ডের আর সবার সাথে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলে ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফোনটা কেটে দেওয়ার পর আদিত্যর শরীরটায় কেমন যেন অনুভূত হয়। গলাটা ব্যথা করছে মনে হচ্ছে কিন্তু এরকম অস্বস্তিকর ব্যথা তো কোনদিন হয়নি। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারে তার গায়ে তীব্র জ¦র। জল খেতে গিয়ে কেমন বেকায়দায় গলায় জলও যেন হঠাৎ আটকে গেল অমনি শুরু কাশি। নাক দিয়ে বেরোচ্ছে যা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বারবার টিস্যু ব্যবহার করতে হচ্ছে। এক অদ্ভূত অস্বস্তিকর যেন জলে ডুব দিয়ে আছে এমনভাবে দম বন্ধ হয়ে আসছে মাঝে মাঝে। আদিত্য আর পেরে উঠে না।এক সময় আদিত্য বুঝতে পারে আর সময় নেই যা কথা বলার অ্যাডভোকেট মাইকেলের সাথে কথা বলে নিতে হবে। অমনি উকিল সাহেবকে আদিত্যের ফোন।

কদিন ধরে দিনগুলো কেমন যেন বিষন্ন। মেঘলা দিন বলেই হয়তো। আকাশটাও ডিসম্যাল ডিসম্যাল ভাব। দেড় সপ্তাহের মতো প্রচন্ড জ্বরে ভুগতে হয়েছে শুভকে। ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছে শুধু। তবে টেস্ট রেজাল্ট শেষ পর্যন্ত ভালো ছিল, পিসিআর টেস্টে তার কোভিড-১৯ নেগেটিভ এসেছে। রেজাল্ট পেয়েই যেন অর্ধেক ভালো হয়ে গিয়েছিল সে। ফুরফুরে লেগেছিল সেদিন, ঘাড় থেকে যেন অর্ধেক বোঝা নেমে গিয়েছিল। এখন পুরোপুরি সুস্থ হলেও তার মন অজানা কারণে ভালো নেই। কিছুক্ষণ আগে কালো বিড়াল কোত্থেকে এসে জানালার রেলিঙ ধরে মেঝেতে লাফ দিয়ে দৌড়ে গেল। এদিকটায় বিড়াল-টিড়াল খুব একটা আসে না। আজ কোত্থেকে আসল কে জানে। ভাবল আদিত্যকে ফোন দিবে। কিন্তু মন সায় দিল না। শুভ জানে তার প্রিয় বন্ধু এতোদিনে অনেকবার চেষ্টা করেছে নিশ্চয় তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। কিন্তু শুভ অজানা আশঙ্কায় তার অসুস্থতার কথা কাওকে জানাবে না বলে ফোন বন্ধ করেই রেখেছিল। যদিও রাজধানীর এক স্বনামধন্য অত্যাধুনিক বেসরকারী হাসপাতালে গিয়ে শেষতক টেস্ট করিয়ে তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ভালো মানের সেবা পাওয়া যায় এই বিশ্বাসেই সে এই স্বনামধন্য হাসপাতালে যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে এই টেস্ট করানোর জন্যও পোহাতে হল বিড়ম্বনা-হয়রানি। পিসিআর টেস্টের জন্য সে অনলাইনে আবেদন করেনি। তাই গিয়ে সিকিউরিটি গার্ডদের বলে পিসিআর টেস্টের জন্য এসেছে। কিন্তু গার্ডরা তাকে তাকে সাফ সাফ জানিয়ে দেয় অনলাইনে আবেদন না করলে হবে না। এতোদূর এতো আশা নিয়ে এসে আবার ফিরে যাওয়া, আবার অন্য কোন নিরাপদ হাসপাতালের খোঁজ। এই দুশ্চিন্তার সময়ে এক সিকিউরিটি গার্ড দয়াপরবশ হয়ে এগিয়ে এসে বলেন, “স্যার, আপনি সরাসরি কাস্টম কেয়ারে যাবেন, সেখানে গিয়ে বললেই হবে। কোন অনলাইন এপ্লিকেশন না হলেও চলবে।”

নির্ধারিত সময় ছাড়া সিরিয়াল দেওয়া হবে না। তাই আধা ঘন্টা অপেক্ষার পর সিরিয়াল দেওয়া শুরু করল। তার সামনে পাঁচ-ছয়জন রয়েছে। সিরিয়াল পেতে আরও কিছু সময় লাগবে। পনের মিনিট পরেই সিরিয়াল পেয়ে গেল সে। সিরিয়াল দীর্ঘ। তার সিরিয়াল পঁয়ষট্টি। সিরিয়াল দেখিয়ে নির্ধারিত স্থানে গিয়ে ফরম পূরণ করে পরিশোধ করতে হল চার হাজার টাকা। অনেকক্ষণ লেগে গেল তার সিরিয়াল চলে আসতে। পরীক্ষার জন্য আলামত নিয়ে তাকে বলা হল দুইদিন পর বিকাল ঠিক ৫টায় এসে যেন তার রিপোর্ট নিয়ে যায়। শুভ অবাক হয়, শুভ ভেবেছিল আলামত মানে অনেক কিছু। আলামত কিছুই না শুধু নাসিকায় কটন ঢুকিয়ে হাল্কা ঘুরানো-প্যাঁচানো। আর এর জন্য এতো সময় নিচ্ছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ? ও, গড! অবশেষে রেজাল্ট পাওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়ে গিয়ে প্রায় ১ঘন্টা অপেক্ষার পর তাকে জানানো হল আপনার রিপোর্ট তৈরি হয়নি। আপনি আগামীকাল আসুন। অথচ তার রিপোর্ট তৈরি হয়নি সেটা ই-মেইলে বা এসএমএসে জানিয়ে দিতে পারত। শুভর গায়ে জ্বালা ধরে। প্রায় অর্ধেক সংখ্যক রোগিদের জন্য একই ধরনের রিপোর্ট অথচ যারা পরিচিত এক পাবলিক হাসপাতালে করিয়েছে তাদের জন্য সময় নিয়েছে মাত্র ২৪ ঘন্টা, ফি নিয়েছে দুই হাজার টাকা। আর এরা? সেখানে থাকা এক রোগীদের মধ্যে এক প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের মালিকসহ সাংবাদিক, স্কলারশিপধারী ছাত্র বিভিন্ন পেশার সবাই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। প্রতিবাদের মুখে ল্যাবরেটরি তার ভুল স্বীকার করে প্রতিশ্রুতি দিল যে তারা ইমেইলে বা ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে পরবর্তীতে জানিয়ে দিবে। অবশ্য শুভ সেই কথামতো ই-মেইলও পায় এবং আনন্দে জ্বর নিয়েও তার নেগেটিভ রিপোর্ট নিতে যায়।

আজকে শুভ সন্ধ্যায় তাড়াতাড়িই খেয়ে নেয়। কালো বিড়ালটা দেখার পর মনের ভিতরটা কেন যেন উসখুস উসখুস করছে। আগামীকাল সকালে উঠেই আদিত্যর সাথে দেখা করতে চলে যাবে।

ঢং! ঢং! ঢং!

গির্জার ঘন্টা শুনে শুভ জেগে উঠে। আজকে আবার কিসের ঘন্টা? আজকে তো বুধবার। কলিং বেল বেজে উঠে। এত সাতসকালে আবার কে এল? শুভ বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে অ্যাডভোকেট মাইকেল। ফ্যাকাশে, ভয়ার্ত মুখখানা।

শুভ দুহাতে মুখ ঢেকে ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠে। তাদের কাওকেই আদিত্যর কাছে যেতে দেওয়া হয়নি। শুধু দূর থেকেই দেখার সুযোগ হল তাদের। এক মহাশূন্যতা গ্রাস করছে শুভকে। অসহায় হয়ে পড়েছে যেন। বলা-হাঁটার মতো সমস্ত শক্তি হারিয়ে অচল হয়ে পড়েছে শুভ। আর সেই সময়গুলো ফিরবে না। শুধু শুনে তো নয়ই দেখেও বিশ্বাস হচ্ছে না তার। মেনে নিতে পারে না জীবনের অমোঘ নিয়তি। পাশের আশ্রম হতে শুভ শুনতে পায় কান্নার রোল আর হাহাকার।

কয়েকজন পিপিই পরা হাসপাতালের কর্মীরা ঘিরে রয়েছে আদিত্যকে। আগাগোড়া পলিথিনে মোড়া সে। তার গায়ে জড়ানো সাদা কাপড়ের ওপর পলিথিনের প্রলেপ। তার শোয়ানো পবিত্র মুখখানা দেখার, একটুকু ছুঁয়ে দেয়ার কোন সুযোগ নেই।

অমোঘ পরিণতি আসন্ন জেনে সমস্ত বাস্তবতা বুঝতে পেরে আদিত্য অ্যাডভোকেট মাইকেল, বড়দি জ্যোতি, এবং তার প্রবাসী বন্ধুদের জানিয়ে দেয়। শুধু জানানো হয়নি শুভকে। উত্তরসূরিতাক্রমে মাতৃনীড়ের মালিকানা ন্যস্ত হয় শুভর হাতে। আসলে আদিত্য নিজেও ছিল অনাথ। এ দুনিয়ায় তার আর কেউ বেঁচে ছিল না। আদিত্য নিজেও যে পথে পাড়ি জমাল।

মাতৃনীড় শিশু সদস্য এখন বিশ থেকে চল্লিশজনে উন্নীত হয়েছে। শুভর কাঁধ শক্ত করে ধরে মিতা। শুভর বাকী জীবনে তার সহযাত্রী। মিতা শুভকে বাচ্চাদের খেলনা নিয়ে আসতে বলায় শুভ নিয়ে আসে। সে কি আনন্দ শিশুদের। শুভর কাঁধে ঝুলে পড়া, খেলনার ব্যাগ টানা-হেঁচড়া, নাচানাচি।

নীরব শ্বাসে আদিত্যের বাসভবন আদিনিকুঞ্জ…

 

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost