Thokbirim | logo

৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

কেগিজা (অসবর্ণ) বিয়ে রীতির কারণেই কি সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে?।। জাজ্রিং মারাক

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০, ২৩:৫৪

কেগিজা (অসবর্ণ) বিয়ে রীতির কারণেই কি সামাজিক অবক্ষয় বাড়ছে?।। জাজ্রিং মারাক

এই আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে গারো সমাজের বর্তমান বিয়ে রীতি নিয়ে। প্রথমে আলোচনা করতে চাই গারো সমাজের বিয়ে রীতি কিংবা বিয়ের নিয়ম কানুন নিয়ে। গারো সমাজের বিয়ে সম্পর্কিত আইন কী বলে। সুভাষ জেংচাম (সাংমা) সম্পাদিত ও ভাষান্তরিত ‘গারো আইন’ গ্রন্থের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদের ‘বিবাহ আইন’-এ বলা হয়েছে-

‘গারো বিবাহ সম্পূর্ণ অসবর্ণ বিবাহ এবং আখিম্ প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। প্রথমোক্ত বিধি অনুযায়ী কেউ তার নিজ মাহারীতে (উপগোত্র) বিয়ে করতে পারে না। যেমন- কোন চিসিম ছেলে কোন চিসিম মেয়েকে বিয়ে করতে পারে না। কোন মানখিন মেয়ে কোন মানখিন ছেলেকে বিয়ে করতে পারে না। কেউ যদি এর কোন ব্যতিক্রম করে অর্থাৎ নিজ মাহারীর মধ্যে বিয়ে করে তবে উহা অবৈধ সম্পর্কের মধ্যে যৌনসংসর্গের পর্যায়ে পড়বে। কারণ গারো সংস্কার অনুযায়ী একই মাহারীর সদস্যরা আত্মীয় অনাত্মীয় যাই হোক না কেন পরস্পর পরস্পরকে ভাই বোন হিসেবে গণ্য করে। ফলে একই মাহারীতে বিবাহ অজাচার তুল্য। দ্বিতীয়তঃ কিম্ বা আখিম্ প্রথানুসারে কোন মেয়ে অথবা ছেলে একবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলে কিংবা বিবাহ বন্ধনের চুক্তিতে আবদ্ধ হলে সে আর স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারে না এবং নিজের ইচ্ছানুযায়ী অন্য কারোও সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। এই বিধি নিষেধ বিয়ের চুক্তিবদ্ধ পাত্রপাত্রী কিংবা বিবাহিত স্বামী স্ত্রীর কোন পক্ষ মারা গিয়ে থাকলে অথবা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলেও প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রী অথবা স্বামীর মাহারী হতে অন্য মেয়ে অথবা অন্য ছেলেকে প্রদান করা হবে এবং দ্বিতীয় পক্ষের উহা গ্রহণ করা কর্তব্য। প্রকৃত পক্ষে মাহারীই এসব আইনের নিয়ন্ত্রক। নক্ন অর্থাৎ উত্তরাধিকারিণী নির্বাচন, দত্তক মেয়ে (দেরাগাত্তা) গ্রহণে সাহায্য, নক্রম নির্বাচন করা প্রভৃতি যাবতীয় বিবাহ সংক্রান্ত ক্ষমতা প্রকৃতপক্ষে মাহারীর উপরেই ন্যস্ত থাকে।’

বর্তমান সময়ে এই রীতিগুলো কতটা মানা হচ্ছে?

একটা সময় পর্যন্ত ছিলো বিয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ কয়েকটি বিষয় খুবই গুরুত্বসহকারে দেখা হতো যেমন-

১. মাহারি : বিয়ের ক্ষেত্রে প্রধান প্রশ্নই ছিলো ছেলে বা মেয়ে কোন মাহারির। ছেলে কিংবা মেয়েকে অবশ্যই ভিন্ন ভিন্ন মাহারির হতে হবে। ছেলে কোন মাহারির কিংবা মেয়ে কোন মাহারির পরে তার পরিবারের মাহারি নিয়েও আলোচনা হতো। তবে পরিবারের মাহারি মুখ্য ছিলো না।

২. জানাশোনা : একটা সময় ছিলো পাত্রপাত্রী উভয়কে পছন্দ করলেও মেয়ে পক্ষের লোকজনের ছেলেপক্ষের লোকজনকে বা ছেলেপক্ষের লোকজনকে মেয়ে পক্ষের লোকজনকে পছন্দ হতে হবে। আর তার জন্য উভয় পক্ষের দেখাশোনা আলাপ আলোচনার একটা বিষয় ছিলো। লোকবিশ্বাস বলে- এই জানাশোনাটা আসলে সামবল মান্না কিংবা স্খাল মান্না বিষয়ক জানাশোনাটা ছিলো জরুরি। এটি একটি বিশেষ প্রশ্নও ছিলো দুটি পরিবারের জন্য। বিশেষ করে দূরের পাত্র/পাত্রীর ক্ষেত্রে। একটা সময় পর্যন্ত ছিলো বিয়ে ভেঙে যেতো এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে। ভেতরে ভেতরে নানা প্রশ্ন চলতো এমনি কি লোক মারফতে খোঁজ খবর নিতেও দেখা যেত।  অবশ্য প্রকাশ্যে আলোচনা সমালোচনা হতে দেখা যেতো না।

৩. এলাকা বা দূরত্ব : কোনো কোনো বিয়ের ক্ষেত্রে এলাকা বা গ্রামও পছন্দ অপছন্দের তালিকায় ছিলো। ছিলো দূরত্ব নিয়েও ইচ্ছা অনিচ্ছা। এখানে দূরত্বটা আসলে ছেলে বা মেয়ের ভালো মন্দ কিংবা বিপদে আপদে দেখভাল খবরাখবর নেয়ার বিষয় গুরুত্ব পেতো।

৪ রক্ত সম্পর্ক : বিয়ের ক্ষেত্রে রক্তের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পেতে। বিশেষ করে মায়ের দিক থেকে। এটাও মাহারিবাদেরই একটি অংশ বলা যায়।

এছাড়াও আরো অনেক বিষয় মানা হতো যেমন- পরিবারের অর্থনৈতিক বিষয় কিংবা  গুরুত্ব পেতো সামাজিক মর্যাদাও।

ফলাফল : ফলাফলে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় হতো। আত্মীয়তা বৃদ্ধি পেতো। সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হতো, সামাজিক সাম্যতা পরিলক্ষিত হতো। এতে করে অনেক গ্রামে চিরান কিংবা ম্রং মাহারির আধিক্য দেখা যেতো। কোথাও কোথাও সাংমা পাড়া কিংবা মারাক পাড়া দেখা যেতো।

বর্তমান সময়ে কী হচ্ছে?

বর্তমান সময়ে উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো শিথিল হতে দেখা যাচ্ছে প্রকট আকারে। বিশেষ করে মাহারিবাদ। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কেগিজা খি্ম্আ অর্থাৎ অসবর্ণ  বিয়ের প্রবণতা বেশি। কেগিজা খিম্আ মানে অসবর্ণ বিয়ে সম্পর্কে গারো আইনে লেখা আছে- ‘গারো সমাজে বিবাহ সম্পূর্ণরূপে অসবর্ণ বিবাহ নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিশ্বের অন্যান্য সমাজের নিকট বিবাহের এই কঠোর নিয়ম আশ্চর্যের মনে হতে পারে কিন্তু গারো বিবাহ সর্বতোভাবে অসবর্ণ বিবাহ প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। গারো সমাজে এই নিয়মানুযায়ী পরস্পর একই মাহারীভুক্ত (উপগোত্র) ছেলে মেয়ে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। যেমন কোন রিছিল ছেলে কোন রিছিল মেয়েকে বিয়ে করতে পারে না, কোন মানখিন মেয়ে কোন মানখিন ছেলেকে বিয়ে করতে পারে না, তাদের মধ্যে রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয়তার বন্ধন থাকুক বা নাই থাকুক। যদি কেউ এর ব্যতিক্রম করে তবে সমাজ তাদেরকে পরিত্যাগ করবে এবং বাধ্য হয়ে তাদেরকে একঘরে অবস্থায় বসবাস করতে হবে। এভাবে তারা পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারীত্বও হারাবে। অবশ্য তাদের পরিবর্তে তাদের ছেলে মেয়ের উপর সম্পত্তির উত্তরাধিকারীত্ব বর্তাবে। আগেকার দিনে এরকম দোষী ব্যক্তিদ্বয়কে তাদের আত্মীয়স্বজনেরা হত্যা করে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করতো না।’( গারো আইন-সম্পাদনা ও ভাষান্তর সুভাষ জেংচাম (সাংমা)

বর্তমান সময়ে সাংমা সাংমা কিংবা মারাক মারাক মাহারির বিয়ে সম্পর্কে তেমন বিধিনিষেধ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ‘গারো বিবাহ সর্বতোভাবে অসবর্ণ বিবাহ প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত’ এই প্রথা ধীরে ধীরে এতোই শিথিল হচ্ছে যে চিরান চিরান কিংবা চিসিম চিসিম কিংবা নকরেক নকরেক নিজ মাহারির বিয়ে হতে দেখা যাচ্ছে অহরহ।

ফলাফল : অসবর্ণ বিয়ের ফলে পারিবারিক হীনমন্যতা, সম্পর্কের অবনতি, সামাজিক মর্যাদাহানি, জাতিগত বিয়ে রীতির আইন লঙ্ঘন হতে দেখা যায়। বিশেষ করে গারো সম্প্রদায়ের মধ্যে যে পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ কিংবা ভাতৃত্ববোধ ছিলো সেটি এই অসবর্ণ বিয়ের ফলে অনেকটাই শিথিল হতে দেখা যাচ্ছে এবং সামাজিকভাবে নীতিনৈতিকতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরফলে সামাজিক অবক্ষয় দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বর্তমান সময়ের ছেলেমেয়েদের ভেতর ডোন্টকেয়ারভাব সামাজিক অবক্ষয়েরই লক্ষণ বলে বিবেচনা করা যায়। কারণ প্রকৃত শিক্ষার আলো সামাজিক রীতিনীতিকে অসম্মান নয় সম্মান করতেই শেখায় কিন্তু নিজস্ব জাতিসত্তার রীতিনীতি সম্পর্কে না জানা কিংবা জানার অনাগ্রহ থেকেই তৈরি হয় ডোন্টকেয়ারভাব।ফলে নিজস্ব মতামতকে কিংবা ভালো লাগাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বর্তমান সময়ে অসবর্ণ বিয়ে হতে দেখা যায়। যা গারো আইনে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং সামাজিকভাবেও অগ্রহণযোগ্য।

লেখক পরিচিতি : জাজ্রিং মারাক তরুণ লেখক

আরো লেখা

৯৬৪ সালের রায়ত ।। ৭০০ জন আদিবাসীর দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত।।  সরোজ ম্রং

গারো জাতির সন্তান জন্ম ও নামকরণ, একটি সংস্কৃতির ধারা ।।  বেনেডিক্ট এম. সাংমা

https://www.facebook.com/IndependentTVNews/videos/1211504035676807

আদিবাসী সাহিত্য নিয়ে বইমেলায় 'থকবিরিম'

একুশে বইমেলায় আদিবাসীদের সাহিত্য চর্চা নিয়ে হাজির হয়েছে #থকবিরিম প্রকাশনী। দেশসেরা প্রকাশনীগুলোর পাশাপাশি সমানতালে এগিয়ে এটি। এক নজরে দেখে নিন……….

Gepostet von independent24.tv am Freitag, 22. Februar 2019




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost