Thokbirim | logo

২৫শে অগ্রহায়ণ, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ১০ই ডিসেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

১৯৬৪ সালের রায়ত ।। শুধু আদিবাসী হত্যা নয় একটি ইতিহাস-সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকেও হত্যা করা বটে ।।  সরোজ ম্রং

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২০, ১১:২১

১৯৬৪ সালের রায়ত ।। শুধু আদিবাসী হত্যা নয় একটি ইতিহাস-সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকেও হত্যা করা বটে ।।  সরোজ ম্রং

সীমান্ত লাগুয়া সাবেক ৬টি থানা শ্রীবর্দী নালিতাবাড়ি হালুয়াঘাট দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার আদিবাসীদের  জাতীয় জীবনে ১৯৬৪ সাল ৬ই ফেব্রুয়ারি আদিবাসী গণহত্যার ঘটনা আলোয় উজ্জ্বল হয়ে জেগে আছে এক ভয়ঙ্কর কালো দিবস হিসেবে। ১৯৬৪ সালের সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা ও আদিবসীদের বিতাড়নের ঘটনাবহুল দামাল দিনগুলো সময়ের আলোয় রাঙা সজীব স্মৃতির ক্যানভাস যা দীর্ঘ সময়েও ধূসর হয়নি, মুছে যায়নি জাতীয় স্মৃতি থেকে। অথচ দিনটির গুরুত্ব তাৎপর্য ও মর্যাদা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচিত হওয়ার, জাতীয় শোক দিবস বা কালোদিবস হিসেবে  শহিদদের  প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের, আদিবাসী বিতাড়ন ও হত্যার নীলনকশা হিসেবে বিবেচনার আওতায় আনার প্রয়োজন অনুভূত হয়নি আজো। আগামী প্রজন্ম ভুলে যাবে রাষ্ট্রের এই ঘৃণ্য নীলনকশা অমানবিক মর্মস্পশী, জাতীয় ট্র্যাজিডির সেই ঘটনা। অজানা থেকে যাবে এ  দেশে আদিবাসীদের সংখ্যালঘু করণের অশুভ প্রেক্ষাপট। তাই আগামী প্রজন্মের শক্তভিত রচনার স্বার্থে শোকাবহ এই দিনটি অমর অম্লান, চিরজীবি ও আলোকিত করে রাখার স্বার্থে, আজকের সচেতনতার পতাকাবাহী ও আদিবাসী সুশীল সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে শুভ ও মহৎ উদ্যোগ নিয়ে। অতএব ৬ই ফেব্রুয়ারি আদিবাসীদের জাতীয় শোকদিবস ও আদিবাসী হত্যা দিবস  হিসেবে রুপায়নের প্রস্তাবনার নিরিখেই এই লেখার অবতারনা।

তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের এই অঞ্চলের আদিবাসীদের  উচ্ছেদ ও বিতাড়নের লক্ষ্যে গৃহীত প্রথম টার্গেট হচ্ছে ১৯৫০ সাল। এই সময় কম্যুনিস্ট হাজংদের দমনের নামে হাজংদের  এদেশ থেকে সমূলে উৎখাদ ও বিতাড়নের সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান সরকার। হাজার হাজার হাজংরা পালাতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিকের মতে, এ সময় ৭০ হাজার হাজং ও ৭৫ হাজার গারো দেশ ত্যাগ করেছিলেন। সরকারের এমন নগ্ন ও বিমাতাসুলভ আচরণে এই সময় শিক্ষিত গারোদের এক বিশাল অংশ প্রথম দেশ ত্যাগ করেছিল।

এরপর দ্বিতীয় টার্গেটটি ছিল আরো নির্মম আরো পাশবিক, সালটা ১৯৬৪ সাল। এই সময়েই এ অঞ্চলের আদিবাসীদের জাতীয় অস্তিত্বের স্তম্ভ ভেঙে গুড়িয়ে তছনছ করে দেয় পাকিস্তান সরকার। কেঁপে উঠে আদিবাসী অঞ্চল । রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক শক্তির মদদপুষ্ট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নগ্ন থাবায় ক্ষত বিক্ষত ও রক্তাক্ত হয়ে পড়ে হাজার বছরের আদিবাসীদের এই স্বপ্নভূমি। রাষ্ট্র নামক দানব থেকে প্রাণ বাঁচাতে নিরীহ আদিবাসীরা জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী ছেড়ে ভিন্ন রাষ্ট্র ভারতের সীমান্ত পথে পা বাড়ালে সীমান্ত রক্ষী ইপিআর বাহিনীরা অসংখ্য আদিবাসীদের নির্বিচারে  গুলি করে হত্যা করেছিল।

এর মধ্যে শুধু ৬ই ফেব্রুয়ারিতেই শিশু নারীসহ ২০ জনকে আধিক আদিবাসীদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। আদিবাসী সংহারের এসব স্মৃতি রোমন্থনে প্রত্যক্ষদর্শীরা ভয়ে আতংকে শিউরে  উঠে আজো। এই শ্বাসরুদ্ধকর সাস্প্রদায়িক দাঙ্গা ও সন্ত্রাসের কালপর্বেও জীবন্ত চিত্রের কাহিনি মানুষকে হতবাক ও বিস্ষিত করে  তোলে। অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এর আগে আদিবাসীরা কখনই এ ধরনের মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখী হয়নি।

কাজেই ৬ই ফেব্রুয়ারির এই দিনটি শ্রদ্ধায় চিরভাস্বর, চিরস্মরণীয় ও বরণীয় করে  রাখার স্বার্থে সচেতন যুব ছাত্র সমাজ সুশীল সমাজ ও নীতিনির্ধারক সমাজের দৃষ্টি আর্কষণ করছি। আর এই স্বর্ণদ্বার উন্মোচনের শুভ ও মহৎ সিদ্ধান্তকে গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী দেশের বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, লেখক গবেষক সাংবাদিকসহ অগ্রসর অংশের সব প্রগতিশীল নাগরিক সমাজের কমিটমেন্ট।

একই সাথে গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব ও কর্তব্য একে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দান করা এবং পৃষ্ঠপোষকতার জন্য স্বেচ্ছায় উদারভাবে হাত বাড়ানো। কেননা বিষয়টি শুধু আদিবাসী হত্যা নয়, দেশের ভেতর একটি জনপদের নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের শিকড় উৎখাত নয়, এটি একটি ইতিহাসকে, একটি সভ্যতাকে, সংস্কৃতির বৈচিত্রকে হত্যা করাও বটে।

চলবে…

আরো লেখা..

গারোরণ কিংবা ওয়াদ্দা (ছেড়ে দেয়া) দিঘির খোঁজে এক শুক্রবার

“অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা- ২০১৯”-  প্রাপ্ত প্রয়াত প্রতিভা সাংমা এবং এফ মাইনরকে অভিনন্দন




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost