Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

হাজং ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম কবে চালু হবে ।।  সোহেল হাজং

প্রকাশিত : সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২০, ১৯:০৪

হাজং ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম কবে চালু হবে ।।  সোহেল হাজং

মাতৃভাষার গুরুত্ব সবার কাছেই অনেক সম্মানের ও অনেক বেশি আপন। এ ভাষার মাধ্যমে নিজেকে বিকশিত করার যে মূল আবেগ ও অনুভূতি কাজ করে তা অন্য কোন ভাষার মাধ্যমে সেভাবে হয়ে ওঠে না। বাংলাদেশে ৫০টির অধিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০-এ তাদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এ আইনের তফসিলে যে ৫০ টি জাতির কথা বলা হয়েছে, ‘হাজং’ তাদের মধ্যে একটি। ১৯৫০ সালের পূর্ববঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী হিসেবে ‘হাজং’ জাতির কথা উল্লেখ রয়েছে।

হাজংসহ অন্যান্য আদিবাসীরা দেশে ভিন্ন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ধারণ করে চলে। আর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নৃভাষা বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মাধ্যমে বাংলাদেশে ৪১টি ভাষার সন্ধান পেয়েছে। তারা বলেছে, সমীক্ষায় পাওয়া ভাষাগুলোর মধ্যে ১৪টি ভাষা বিপন্ন। যদিও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের মতে, বাংলাদেশে আদিবাসীদের বিপন্ন ভাষার সংখ্যা আরও বেশি।

মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের অভাবে এদেশে অনেক আদিবাসী ছেলেমেয়েরা প্রাথমিক পর্যায়েই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ে। কাপেং ফাউন্ডেশনের ‘আদিবাসী নেভিগেটর’ প্রকল্পের তথ্য সংগ্রহে দেখা গেছে, এদেশে ৪০% হাজং শিশুরা প্রাথমিক পর্যায়ের ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা ভালভাবে সমাপ্ত করতে পারে না এবং শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। যার অন্যতম কারণ হিসেবে রয়েছে দারিদ্র্য, অসচেতনতা, দূরবর্তী স্কুল, অনিরাপত্তা এবং হাজংদের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ না থাকা।

মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ আদিবাসীদের অধিকার। আন্তর্জাতিক আইনগুলোতে ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০-এ আদিবাসীদের মাতৃভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র ২০০৭’-এ মাতৃভাষা সম্পর্কে ১৪ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর তাদের নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা প্রদানের জন্য তাদের সাংস্কৃতিক রীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ পাঠদান ও শিক্ষণ পদ্ধতি অনুসারে শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে।’ আরো বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র, আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সাথে যৌথভাবে, যারা তাদের সম্প্রদায়ের বাইরে বসবাস করছে তাদেরসহ আদিবাসী মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের জন্য, সম্ভব ক্ষেত্রে, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টির কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

এছাড়া আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত আইএলও কনভেনশন-১৯৫৭ (নং ১০৭)-এর ২৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আদিবাসী ছেলেমেয়েদেরকে তাদের মাতৃভাষা পড়তে ও লিখতে শিক্ষাদান করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে এ সনদ অনুস্বাক্ষর করেছে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ এসব আদিবাসী ছেলেমেয়েদের তাদের নিজস্ব মাতৃভাষা শিক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ রয়েছে। সে পথ ধরেই, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৫টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার সরকারিভাবে ঘোষণা আসে। অবশেষে, সরকার প্রথম ধাপে পাঁচটি আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সে পাঁচটি ভাষা হলো- (১) চাকমা, (২) মারমা, (৩) ককবরক (ত্রিপুরা), (৪) সাদরি (ওঁরাও) ও (৫) গারো। সরকারের এ উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কিন্তু সকল আদিবাসী শিশুদের হাতে মাতৃভাষার বই ঠিকমতো না পৌঁছানো, মাতৃভাষায় শিক্ষাদানে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, স্ব স্ব ভাষায় শিক্ষা দেওয়ার জন্য ঐ জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষাজ্ঞান থাকা শিক্ষকের অভাবের কারণে এখনও মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের কার্যক্রমটি শতভাগ সফল হয়ে ওঠেনি। আর মাত্র ৫টি আদিবাসী জাতিসত্তার মাতৃভাষা ছাড়াও হাজংসহ অন্যান্য যে ভাষাগুলো রয়েছে তাদের জন্যও মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে আদিবাসীদের জন্য কমপক্ষে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর পর্যন্ত আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম হাতে নেয়া উচিত বলে মনে করি। কিন্তু হাজংসহ অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষাকার্যক্রম কবে চালু হবে এটাই এখন প্রশ্ন। ধাপে ধাপে এ উদ্যোগটি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও এ ব্যাপারে আর তেমন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এভাবেই কি প্রান্তিক ও আদিবাসীদের মধ্যে অধিকরতর পিছিয়েপড়া জাতিগুলো আরো বেশি অবহেলার শিকার হতে থাকবে! যদিও করোনাকালে এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকলেও নীতি নির্ধারণে কাজ এগিয়ে রাখতে তো কোন বাধা নেই।

বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজারের মতো হাজং জনসংখ্যা রয়েছে। তারা স্মরণাতীত কাল থেকেই বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, ধোবাউড়া, নালিতাবাড়ি, ঝিনাইগাতী উপজেলা এবং সুনামগঞ্জ জেলার তাহেরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও দোয়ারা বাজার উপজেলায় বসবাস করে আসছে। তাদের নিজস্ব  ভাষা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি কালচার এখনো বিদ্যমান। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন, টংক আন্দোলন, হাতিবেগার আন্দোলন ও দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে হাজংদের প্রশংসনীয় ভুমিকা রয়েছে যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। কালের পরিক্রমায় হাজংদের অথনৈতিক-সামাজিক অবস্থা ক্রমশ বিলীন হওয়ার পথে। সেসাথে জনগণের অসচেতনতা এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি দিনদিন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

ভাষা বেঁচে থাকে অনুশীলন ও চর্চার মাধ্যমে। যে জাতির ভাষা নেই বা নিজের ভাষায় কথা বলতে পারেনা সে জাতি আত্মপরিচয়হীন জাতিতে পরিণত হয়। মাতৃভাষা একবার হারিয়ে গেলে শত চেষ্টার পরেও আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়না। ইউনেস্কোর মতে, পৃথিবীতে আনুমানিক ৭০০০ ভাষা এবং  আদিবাসীদের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি সংখ্যা ৫০০০। তার মধ্যে ২৬৮০ টি ভাষা বিলুপ্ত হওয়ার আশংকার মধ্যে রয়েছে। এই বিপন্ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভাষাগুলোই আদিবাসীদের ভাষা। বাংলাদেশেও ৫০টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে এবং অনেক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এখন এই ঝুঁকিপূর্ণ ভাষার মধ্যে ‘হাজং’ ভাষা একটি।

এমতাবস্থায় ‘বাংলাদেশ জাতীয় হাজং সংগঠন’ হাজং ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষা ও বিকাশে অত্যন্ত দায়িত্বের সাথে কাজ করার চেষ্টা করছে। সংগঠনের এ মহৎ উদ্যোগের সাথে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগকেও পাশে পেতে অনুরোধ জানানো হচ্ছে । আমরা অতি আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং কাপেং ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়  ‘বাংলাদেশ জাতীয় হাজং সংগঠন’ আদিবাসী নেভিগেটর প্রকল্পের আওতায় হাজং ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় একটি পাইলট প্রকল্প নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুরের ৫টি হাজং গ্রামে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ প্রকল্পের আওতায় দুর্গাপুর উপজেলার গোপালপুর, ভবানীপুর, লক্ষীপুর, মেনকী, ডাহাপাড়া এ ৫টি হাজং গ্রামে হাজং ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র চালু এবং নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যপুস্তক তৈরি ও শিক্ষাদানের ফলে ঐ গ্রামের প্রায় ৫০ জন হাজং শিশুরা মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষালাভের সুযোগ পায় এবং তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও ভালভাবে অংশ নিতে সক্ষম হয়। যার ফলে, এই কোমলমতি হাজং শিশুরা এখন নিজের ভাষায় গান, কবিতা, ছড়া ও গল্প বলতে পারে এবং তাদের পরিবার ও সমাজে এসব নিয়মিত চর্চা করে।

এছাড়াও ২০১৫-২০১৬ সালে বেসরকারি সংস্থা, ‘পপি’ এবং তারও আগে ‘অক্সফাম’ ও হাজংমাতা রাশিমণি কল্যাণ পরিষদের উদ্যোগে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলায় ১০টির বেশি হাজং ভাষার শিক্ষা স্কুল চালু করা হয়েছিল। যেখানে শতাধিক হাজং ছেলেমেয়ে নিজেদের মাতৃভাষায় পড়া লেখার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু এই সংস্থাগুলোর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার ফলে এখন এই মহৎ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। যার ফলে, অনেক হাজং শিশু নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ হতে বঞ্চিত হচ্ছে এবং নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে যেতে বসেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে হাজং ভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা না থাকার ফলে সহজে পাঠদান বুঝতে না পারা এবং হাজং ছেলেমেয়েদের মাঝে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ার হারও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশ মাতৃভাষাপ্রিয় একটি দেশ। এ দেশ শুধু রাষ্ট্রভাষা বাংলা নয় সকল মাতৃভাষার গুরুত্বদানের কথা বলে। ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি অর্জন এই চেতনা প্রমাণ করে! আর এভাবেই এদেশে গড়ে ওঠেছে সকল মাতৃভাষা উন্নয়ন ও সংরক্ষণে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট’। কিন্তু এদেশের বাংলা ছাড়া অন্যান্য মাতৃভাষা নিয়ে আরো বেশি কাজ হওয়া উচিত। আদিবাসীরা যেমন মূলস্রোতধারার ভাষার প্রভাবে নিজস্ব মাতৃভাষার গুরুত্ব ও চর্চা হারিয়ে ফেলছে ঠিক তেমনি এসব ভাষা টিকিয়ে রাখার জন্য সরকারিভাবেও জোরালো কোন পদক্ষেপ নেই। এমতাবস্থায়, নিম্নোক্ত দাবিসমূহ সরকারকে বিবেচনার করা উচিত (১) অবিলম্বে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে দেশের হাজংসহ অন্যান্য মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্ত করতে হবে, (২) আদিবাসী ভাষায় শিক্ষা দানে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে এবং শিক্ষকদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, (৩) আদিবাসী সংস্কৃতি ও ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও আদিবাসী বান্ধব শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলতে হবে।

 

লেখক পরিচিতি

সোহেল হাজং – হাজং সম্প্রদায়ের লেখক এবং  সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয় হাজং সংগঠন ও আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রিয় সদস্য।

সোহেল হাজং লেখক

লেখক সোহেল হাজং

 

আরো লেখা

গারো সম্প্রদায়ের তরুণ সুরের জাদুকর জাদু রিছিলের আজ জন্মদিন

১৯৬৪ সালের রায়ত ।। শুধু আদিবাসী হত্যা নয় একটি ইতিহাস-সংস্কৃতির বৈচিত্র্যকেও হত্যা করা বটে ।।  সরোজ ম্রং




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost