Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

রাকসান  ।। সালগ্রা সেকমাক মারাক

প্রকাশিত : আগস্ট ২৯, ২০২০, ১০:৩৩

রাকসান  ।। সালগ্রা সেকমাক মারাক

রাকসানের গালে জোরে চড় বসিয়ে দেয় সিমচি।

কষে থাপ্পড় দিয়েই সিমচির দায়িত্ব যেন শেষ। দ্বিতীয় কোন বাক্য উচ্চারণ না করেই সে সামনের দিকে হনহন হেঁটে যেতে থাকে। সিমচির হেঁটে যাওয়ার দিকে মূর্তির মত ফ্যালফ্যাল চেয়ে থাকা ছাড়া রাকসান আর সব কর্তব্যকর্মে যেন খেই হারিয়ে ফেলে।

ঘটনার আকস্মিকতায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে রাকসান। ভাগ্যিস রাস্তা ছিল ফাঁকা। কড়া ফোস্কা পড়া রোদে মাথা ভনভন করে ঘুরছে রাকসানের। সকাল থেকে রাকসানের পেটে কোন দানাপানি জুটেনি। এর মধ্যে দুপুরে ডেকে এনে পথের মধ্যে সিমচির এমন অদ্ভূত কা-। পঞ্চাশ টাকার মতোই আছে রাকসানের পকেটে। উজ্জ্বলদার বিসিএফ ক্যাফেও বন্ধ। ক্ষুধায় গা কাঁপতে কাঁপতে নাসরিন মিন্টু সড়কের দিকে হাঁটা দেয় সে। সামনে ছোট টি-স্টল পেয়ে সেখানেই ঢুকে পড়ে। আট টাকার রুটি হাতে নিয়ে বেশি করে আদা দিয়ে কড়া লিকারের চা অর্ডার দেয়। করোন-টরোনা সে আর পাত্তা দেয় না। রাগে গা জ¦লে উঠছে। বলা নেই কওয়া নেই সিমচির হঠাৎ উদ্ভটসব পাগলামি, খামখেয়ালিপনা। কে কী বলল ফিরতিতে সত্যমিথ্যা ভালো করে জানার কোন চেষ্টা না করেই সোজা রিয়্যাক্ট!

“ভালো করেই শিক্ষা দিতে হবে। এসব পাগলামির কোনো মানে হয় না। এভাবে লাই পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে অনেক বড় অঘটন ঘটিয়ে ফেলবে। পরিবার থেকে না জানি আচার-সংস্কার কোন শিক্ষাই পায়নি মেয়েটা। উড়নচণ্ডী! কীভাবেই কপালে জুটিয়ে নিলাম।” চা খেতে খেতে নিজের মনে বলতে থাকে রাকসান।

চা খাওয়ার পর যেন দুর্বল শরীরে কিছুটা প্রাণ ফিরে এল। যদিও উসখুস করছে মনটা। তাকে জানতেই হবে সিমচির স্পর্ধামূলক আচরণের হেতু। রাকসানেরও হিতাহিত জ্ঞান আর থাকে না। পকেট ফাঁকা-ছেঁড়া হলেও হাতে বেনসন লাইট ধরাল। সিগারেটের ধোঁয়া উপরের দিকে ছেড়ে দিতে দিতে মনটাকে শান্ত করার ব্যর্থ প্রয়াস চালায়। মনটাকে অনেকটা স্থির করে নিয়ে সে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে সিমচির নাম্বারে কল দিল। প্রত্যেকবার ব্যস্ত পেলেও থেমে থেমে নয় দশ বারের মত চেষ্টা করল। রাকসান বুঝতে পারে আর কল দিয়ে কোন লাভ নেই। দোকানদারকে বিল পরিশোধ করেই সে নদ্দার দিকে হাঁটতে থাকে।

সিমচির বাসার সামনে গিয়ে কয়েকবারই পায়চারি করল। বারবার তিনতলার বারান্দার দিকে মুখ উঁচিয়ে তাকায়। ফিরে গিয়ে সামনের দোকানপাটগুলিতে ঘুরঘুর করতে থাকে। আবার ফিরে এসে সেই একই কাজ। কিন্তু যত চেষ্টাই করুক বারান্দায় কারোর দেখা নেই। অন্য দিন তার ছোট ভাই কি ছোট বোন একবারের জন্য হলেও বারান্দায় এসে উঁকিঝুঁকি মারত কিন্তু আজকে কারোর দেখা নেই। করোনাকালে বহিরাগতের ভিতরে ঢোকাও নিষেধ নয়তো এতক্ষণে পটাপট ভিতরে চলে যেত। পাক্কা একঘন্টা ব্যর্থ চেষ্টার পর রাকসান সরকারবাড়ি চলে গেল তার এক বন্ধু বালসেঙের মেসে। এক মেসে দুই তিনজন থাকে ওরা। সবাই কর্মজীবী।

হতাশায় মুষড়ে পড়ে রাকসান। এই তো তিনবছর আগে কলেজের পাট চুকিয়ে ঢাকায় প্রথম এসেই তার বড় বোনের বাসায় উঠে, কয়েকমাস বড়বোনের বাসায় কাটিয়ে মেসে থাকা শুরু করে। আরো বড় দুই বোন এবং বড় এক ভাই ঢাকাতেই পরিবারসহ থাকলেও কারোর বাসায় না উঠে মেসে বন্ধুবান্ধবদের সাথে থাকতেই সে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এক প্রাইভেট ভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিল। অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ঢাকায় সিভি নিয়ে ঘোরাঘুরি করেছে অনেক। তিন বছরে শখানেক সিভি বিভিন্ন জায়গায় এপ্লাই করেও ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। ভাইবোনেরা তাকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণে উৎসাহিত করলেও সবসময় বাগড়া বাঁধায় গ্রামের কিছু লোক, অন্যান্য এলাকার নিজ মাহারির কতিপয় ব্যক্তি এবং খোদ বন্ধুবান্ধবদেরও কতকজন। প্রতিবার চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে কোনদিন সুসংবাদ নিয়ে ফিরতে পারেনি। অগত্যা টিউশনির উপরই নির্ভর করতে হয়েছে তাকে।

এর মধ্যে বহু আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশীদের জ¦ালাতন, ত্যক্তি-বিরক্তি। বিয়ের পীড়াপীড়ি। কতশত মেয়ের ছবি তাকে দেখান হল। বাসায় ডেকে নিয়ে নিয়ে কত জনের আদর, খেদমত, মেহমানদারি। কিন্তু কিছুদিন গড়াতে না গড়াতেই সেই চিরচেনা রূপ বেরিয়ে পড়ত। এক প্রকার জোর করেই তাদের কোন এক আত্মীয়ের মেয়ের জন্য পাত্র হিসেবে তাকে ঠিক করা হয়েছে। বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে এক সময় রাকসানকে বাধ্য হয়েই ‘না’ শব্দটা ঔদ্ধত্যভঙ্গিতে বলতে হত কারণ বিবাহ প্রস্তাবকারী আত্মীয়েরা বিনয়কে বুঝে না। পাত্রী হিসেবে বাছাই করা সেই সব মেয়েদের ছবি দেখলে রাকসান বিতৃষ্ণায়, ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিত। মুখগুলোয় একধরনের অস্বাভাবিকতা দেখতে পেত।

এই যে ফিরিয়ে দেওয়া পরবর্তীতে তার জ¦ালা সহ্য করতে হত নানা রকমের অপবাদের বোঝা মাথায় নিয়ে। মদারু, গাঁজারু, নেশাখোর, অলস, লোভী, চরিত্রহীন কত ধরনের অপবাদ, কত গঞ্জনা নীরবে সয়ে যেতে হয়েছে তাকে। সবকিছুর প্রভাব পড়ত তার চাকরির ইন্টারভিউতে। রাকসান এতকিছুর মধ্যেও সিমচির স্নিগ্ধ মুখে একমুঠো শান্তি খুঁজে নিত।

এক কি দেড় মাস গড়িয়ে গেছে প্রায়। নানা কসরত করেও সিমচির সাথে দেখাটুকু করতে পারল না। বন্ধু বালসেং মারফত বলে পাঠিয়েছে রাকসান যেন তার সাথে যোগাযোগের কোন চেষ্টা না করে। এর মধ্যে পার্লার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাসাবাড়ি ছেড়ে দিয়ে বড় বোনেরা সবাই যার যার পরিবার নিয়ে চলে গেছে। বড় ভাইও চাকরিতে ছাঁটাই হয়ে গিয়ে সপরিবারে দেশের বাড়িতে চলে যায়। চারিদিকে এক নীরব দুর্ভিক্ষ। ঢাকায় রয়ে যায় শুধু সে একা। বড় ভাইবোনেরা তাদের সাথে যেতে বললেও সে যায়নি। থেকে গিয়েছিল সিমচির জন্য। এই তো সেদিন সিমচির জন্মদিনে সে ভেবেছিল এবার হয়তো সিমচির রাগ ভেঙে যাবে। সিমচির ফোনের অপেক্ষায় কাটিয়ে দেয় পুরো দিনটা। এই বুঝি সিমচি ফোন দিল। মূহুর্তে মূহুর্তে মুঠোফোনের দিকে তার নজর কিন্তু অপেক্ষা অপেক্ষাই রয়ে যায়।

তীব্র অভাব হানা দিয়েছে সবখানে। সিদ্ধ, লবণ ভাত এসবের ওপরেই বেঁচে আছে মানুষজন। কেউ কেউ তো সপ্তাহ জুড়ে ভাতের মুখই দেখেনি, চিড়া-মুড়ি খেয়েই কাটাচ্ছে। ব্যাচেলররা কেউ কেউ দিন গুজার করছে এক বেলা এর বাসায় তো আরেক বেলা ওর বাসায়। তাও লকডাউনে বেশি দূরে যেতে পারে না, রোডে পুলিশের কড়া প্রহরা। মেস ভাড়া আটকে দুই মাসের। প্রতিদিন মালিকের জারিজুরি, প্যানপ্যানানি ভালো লাগে না। এ মাসেই মেস ছাড়তে বলে দিল। খাবার নেই। দুএক বার অন্যান্যদের মত সেও ত্রাণ পেয়েছে। থকবিরিম প্রকাশনী ও নিজউপোর্টাল, এবং ঢাকা ওয়ানগালা  থেকে রিলিফ দিলে সে¦চ্ছাসেবক দুএকজন বড় দাদা তার নামও লিখে নিয়ে গিয়েছিল। নাম লিখে নিয়ে যাবার সময় দাদাদের নামটা পর্যন্ত জানা হল না। রিলিফের খাবারগুলোও ফুরিয়ে এসেছে।  বালসেং ফোন করে ওকে বলল,

“আঙা আম্বিন নকছা রিয়াংজক। আঙমিং রি∙ওদে রি∙বো। (আমি কাল বাড়ি চলে যাচ্ছি। তুই গেলে আমার সাথে যেতে পারিস্।)”

“ম∙ও রিয়াংনো, বাদিকিহা রিয়াংনো। বাস্রাংখোদে রংখাতনা রনখোজাদে। (কিসে যাবি তুই? গণপরিবহন তো এখন চালু হয়নি।)”

“ইয়ারাংখো রা∙ই দা চানচিআ। আম্বিন চেত বাজিনা স্খাংস্নি বাজি থংসাও থারিআসি দংসুবো। সাকসা জং সামবিজাক-বলবিজাক রাএ সালারিক্কিত রিবাঙা। ফিল্লাঙানি সময়োদে ট্রাক আরারান রিয়াঙআ। আনচিংনি বিশ্বরোডচা স্নি বাজিওদে দংনা নাংনোন। খ্নাবো, দা ইয়া মিচিকমামাংনা আনথাংনা সিমসাকগিজা দাকগি আনথাংখো বন্নাংনা রন্না। দা∙সিয়াবো। গুয়ালজক গুয়ালজক। না∙বা গুয়ালবো। নাংখো খাসাগিপ্পা গুয়ালনা আম্মোদে না∙বা বিখো গুয়ালিন নাংনি খাসানি রংথালাখো খাক্কেতবিবি ইন্নি ফ্নিকনা নাঙা। হাহাহা।”

(আরে চিন্তা করিস ক্যান? কালকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় রেডি থাকিস। এক ছোট ভাই প্রতিদিন সবজি নিয়ে আসে। ফেরার পথে তার ট্রাক খালিই যাবে। আমাদের বিশ^রোডে থাকতে হবে রাত ৮টার মধ্যে। আর শুন্, একটা মেয়ের জন্য এভাবে জীবনটা ধ্বংস করিস না। যে তোরে ভুলে গ্যাছে, গ্যাছেই। তুইও ভুলে যা। ভালোবাসা যদি তোরে ভুলতে চায় তাহলে তোর উচিত হবে ভুলে গিয়েই তোর ভালোবাসার খাঁটিত্ব প্রমাণ করা, বুঝছিস্? হাহাহা।)

বালসেং যেন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে যদিও বালসেং তার অভাগা বন্ধুর জন্য সত্যিকারে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে।

পরদিন সকালে রাকসান খুব তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে। দিন কি রাতভর অসহ্য গরম হলেও ভোরের দিকে খুব ঠান্ডা। সকাল পর্যন্ত থাকে হিমশীতল আমেজ। বালসেঙের সাথে বাড়ি ফিরে যাবে নাকি ঢাকাতেই থেকে যাবে দোলাচালে ভুগতে থাকে। এখনও ঢাকায় তার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় আছে। থাকে কালাচাঁদপুরে। সকাল সকাল তাদের বাসায় রওনা দিল। কারণ বালসেং চলে গেলে তাদের উপরেই নির্ভর করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল ঐ বিল্ডিংটাতেও তো ঢুকতে দেয় না। যাক, তবু কল করে জেনে নেওয়া যাবে কী করা যায়। আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে দেখে বাসার সামনে কয়েকজন মান্দি মহিলার জটলা। অনুমান করে নেওয়া যায় কিছু একটা অঘটন তো অবশ্যই ঘটেছে। মহিলাদের সাথে কথা বলে জানতে পারে তার আত্মীয়রা এ বাসায় আর নেই। আগের দিন এক মাসের ভাড়া না দেওয়ায় পরিবারের মেয়েসদস্যদের সবাইকে বাসা মালিক ও তার ছেলে রাস্তায় মারধরসহ শ্লীলতাহানি করেছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ঘটনাটি সয়লাব। চারদিকে গুমোট পরিবেশ। মোবাইলে এমবি না থাকার কারণে আন্তর্জালেও ঢুঁ মারা হচ্ছে না দুএক সপ্তাহ। গতকালের ঘটনায় নেটিজেনরা নাকি ভীষণ সরব। কাছেই বাজারের সবজি বিক্রেতাদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে চোখেমুখে এক আতঙ্ক। হতদরিদ্র মানুষ! কার ভাগ্যে কখন কী জোটে কে জানে। এক অসহায়ত্ব গ্রাস করছে সবাইকে। আতঙ্ক জাতিধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে এখন পর্যন্ত প্রশাসন মারফত খবর পাওয়া গেছে। ভিক্টিমদের কোথায় রেখেছে কেউ জানে না। রাকসান পরিচিত নাম্বারে কয়েকবার ফোন দিয়েও সংযোগ বিচ্ছিন্ন পেল। উপায়ন্তর নেই দেখে অগত্যা রাকসানকে সরকারবাড়িতে ফিরে আসতেই হল। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কপালে আর যাই থাক রাতেই বালসেঙের সাথে ঢাকা ছাড়বে।

গ্রামে ফিরে দুই মাস কেটে গেল। দিন দিন সিমচির স্মৃতি তীব্র হয়ে উঠে, হারানোর দগদগে ক্ষত আরও বাড়তে থাকে। এদিকে বাড়িতে প্রায় কুড়ি জনের মত সদস্য। এভাবে কোনদিন বোঝা যায়নি এ পরিবারে এতজন সদস্য। বড়দিন ছুটিতে দুই দিদির পরিবার আসলেও দাদার পরিবার ঢাকাতেই থেকে যেত অথবা কোন বছরে দাদার পরিবার আসলে দিদিদের পরিবার ঢাকাতেই বড়দিন পালন করত। এর বড় কারণ ছিল ছুটি না পাওয়া। পরিবারে প্রচ- অভাব লেগে গেছে। প্রায় কুড়ি জন সদস্যের খানা যোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে সবাইকে। এদিকে কোন গ্রামে কোন কর্ম নেই। কিছুদিন দাদা-বৌদি, দিদি-দাদাবাবুরা মাঠে মজুরি দিলেও এখন সে অবস্থাও নেই। করোনাক্রান্তিশেষে ঢাকায় ফিরতেও সমস্যা। হাতে টাকা নেই। গিয়ে অন্তত এক মাসের ঘরভাড়া, এক মাসের খোরাক। ঢাকায় গিয়েই চাকরি পাবে তাও তো না। কতদিন যে চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে হয় কেউ জানে না। প্রবল দুশ্চিন্তায় মড়ার ওপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে পাহাড়ি নদীতে ঢল। খরস্রোতা নদীর এবারের বান প্রতিবছর থেকে ব্যতিক্রম। শুরু থেকেই বিরাট নদীভাঙনের সম্মুখীন হচ্ছে। ফুঁসে উঠছে সে। রাস্তাঘাট, বাজারঘাট, ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে একের পর এক। পদ্মার থেকে কোন অংশেই কম যাচ্ছে না সে। জনপদটি মহাআতঙ্কে দিনানিপাত করে যাচ্ছে। প্রশাসনকে অবহিত করলেও এখন পর্যন্ত কোন সাড়া মেলেনি।

রাকসানের মাবাবা, ভাইবোন সবাই বিশেষভাবে চিন্তিত রাকসানের থাকার কাছারি নিয়ে। কাছারিটা যেন একদম নদীপাড় ঘেঁষে। মাঝখানে মানুষের হাঁটাচলার জন্য সরু একটা রাস্তামাত্র। রাকসানকে অন্য ঘরে এসে থাকতে বললেও রাকসান তার নিজের কাছারিতেই থাকবে। কারণ এখানে সে নির্জনে আপনমনে সিমচিকে নিয়ে থাকতে পারে। সিমচি যদিও স্বশরীরে নেই কিন্তু তার হৃদয়-মনে তো আছে।

যুবক ছেলেরা নদীভাঙন রোধে নিজেরাই হাত লাগিয়েছে। অশান্ত মনে রাকসানও কাজ করে যাচ্ছে ওদের সাথে। মুখে হাসি নেই, সেই স্ফূর্তি নেই। কাষ্ঠহাসি। বালসেং বুঝতে পারে রাকসানের মানসিক অবস্থা। অনেক ভাবনার পর রাকসানের চাকরি না হওয়া, সিমচির হঠাৎ রূঢ় আচরণ সব জলের মত অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায় বালসেঙের কাছে। সবকিছু সে তাদের ছোটবেলার বন্ধু আরিফকে জানায়। আরিফের বুঝতে বাকী থাকে না কোনকিছু। একদিন বালসেং ও আরিফ রাকসানকে নদীতীরে ডেকে নিয়ে গেল।

বালসেং রাকসানের কাছে জানতে চায় গ্রামের বন্ধুদের মধ্যে কিংবা তার মেসে সে কার ওপর সব থেকে বেশি নির্ভর করত। বিশেষভাবে চাকরির ইন্টারভিউ বা বিশেষ কোন কাজের আগাম খবরটা বন্ধুদের মধ্যে কে সবার আগে পেত। রাকসান তার গ্রামের বন্ধু এবং মেসের রুমমেট আঙ্খির কথা বলল। যে মেয়েদেরকে তার আত্মীয়-স্বজন বা অন্যান্য পরিচিতজনেরা দেখাত তারা দেখতে কেমন ছিল বালসেং সেটাও জেনে নিল। খুঁটিনাটি সবকিছু জেনে নিয়ে বালসেং অবশেষে এক সারাংশে পৌঁছায় এবং সবিস্তারে রাকসানের জীবনে ঘটে যাওয়া নানান অন্যায্যতা, নোংরা রাজনীতি সবটাই সবিস্তারে বর্ণনা করল। আরিফও বলল,

“ওরা জানত তোর ভাইবোনেরা তাদের অল্পবেতন দিয়ে নিজেদের পরিবার-সংসারের পাশাপাশি তোর দেখভাল করতে পারবে না। তোর দরকার কাজ। একারণেই একের পর এক তোর চাকরি আটকে দেওয়া হয়েছিল। একের পর এক সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছিল । সবধরনের রাস্তা বন্ধ করে দেয় যাতে তুই তথাকথিত আত্মীয়স্বজন-বন্ধুবান্ধবদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়িস। যখন বাঁচার জন্য আকুলিবিকুলি করবি তখন তারা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবে এবং পাত্রী হবে অনেক টাকার মালিক যেন সেই টাকা দেখে তুই প্রলোভনে পা দিস।

কিন্তু ওরা সেই মেয়েকেই পাত্রী হিসেবে দেখাত যাদের বিয়ে হয় না কিংবা আর কোনোদিন হবেও না। কারণ, সেই মেয়েরা হল খানকি, বেশ্যামাগি। বেশ্যাগিরির ফলে কিম্ভূতকিমাকার রূপ ধারণ যেমন করেছে তেমনি পরিত্যক্তাও। এরা এতোদিন এই পথে অর্থ উপার্জন করে এসেছে অভাবে পড়ে না লোভের বশবর্তী হয়ে। কুপ্রবৃত্তির বশবর্তী এসব পরিত্যক্তাদের তোর ঘাড়ে ঘষিয়ে দেওয়াই ছিল তোর সেইসব তথাকথিত হিতাকাক্সক্ষীদের মূল লক্ষ্য। দোষটা সেইসব মেয়েদের বা পাত্রীদের ছিল না, দোষ ছিল সেইসব মুখোশধারী বন্ধুদের।

আর তোর বন্ধু আঙ্খি ছিল এই সবার সেতু যে সবকিছুর হেতু। সে ছিল আর সবার নেটওয়ার্ক বা তাকেই আর সবাই নেটওয়ার্ক করত। সে তক্কে তক্কে থাকত তোর খবর নেওয়ার জন্য। বিনিময়ে সে নিশ্চয় লাভ করেছে তার কাক্সিক্ষত কোনকিছু।

তবে প্রলোভনে পা দেওয়ার ক্ষেত্রে সিমচির প্রতি তোর পবিত্র প্রেম তোকে সবসময়ই রক্ষা করে এসেছে। সাবাস্ বন্ধু! তবে এখন তোর উচিত সিমচিকে ভুলে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করা।”

রাতে রাকসান ঘুমাতে পারে না। বিছানায় ছটফট করতে থাকে। জীবন্ত হয়ে ভাসে সিমচির প্রত্যেকটি স্মৃতি। রাকসান এপাশ ওপাশ গড়াগড়ি খেতে থাকে। তিন বছরের সম্পর্ক ওরা দুজনই গোপন রেখেছিল। এই তিন বছর ভালোও ছিল। কোন ঝুটঝামেলা ছিল না। কিন্তু রাকসান ভেবে পায় না আঙ্খি কীভাবে সব বুঝে গিয়েছিল। সিমচিকে জিজ্ঞাসা করাতে উল্টো সিমচির ঝাড়ি খেতে হয়েছিল। আঙ্খি কি কোনভাবে আমার মোবাইল পাসওয়ার্ড জেনে গিয়েছিল। রাকসান কোনকিছু বুঝতে পারে না। তবে সিমচি কি আঙ্খির প্রেমে মশগুল? না না এ হতে পারে না। নিজেকে বরং ধিক্কার দেয় রাকসান। এ কেমন চিন্তা তোমার? শেষ পর্যন্ত নিজের ভালোবাসাকেই সন্দেহ?

প্রথম বছরের ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে সিমচির সাথে সম্পর্ক শুরু। আর কি হবে সিমচির হাত ধরে প্রকৃতির অমল স্পর্শ নেওয়া? বাসন্তী উৎসবে হলুদ রাঙা কি বৈশাখীর শুভ্র শাড়িতে সিমচির স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াতে থাকে ওকে। রাকসানের স্মৃতি বারবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে চিত্রের মত। সিমচির সাথে ওয়ান্না পালন, ঘটা করে বন্ধু দিবস উদযাপন। বিশ^ আদিবাসী দিবসে দকমান্দা পড়ে মাথায় দ∙মি, গলায় রিপ্পক-রিকমাৎচু, কোমরে সেংখি, পায়ে জাস্রাং পড়ে সিমচি যখন পায়ে হেঁটে হেঁটে টিএসসি মোড় থেকে শহীদ মিনারে যেত রাকসানের হাত জড়িয়ে ধরে। ক্রিস্টমাসের আমেজ গায়ে মাখিয়ে রাতে সিমচিদের গ্রামে চলে যাওয়া। সিমচি অপেক্ষায় থাকত। রাকসান না এলে সে সঙ্কীর্তনে বের হবে না। জাগরণী কীর্তনের জন্য রাকসানকে থাকতেই হবে। কিন্তু সিমচি কি আবার সেই অপেক্ষায় থাকবে? সেদিন চলে যাবার পর কি সে অপেক্ষায় ছিল?

সেই পুষ্পাগন্ধা নাকে এসে যেন লাগছে। ওখানে কে ঐ তরুণী? সিমচি কি দাঁড়িয়ে আছে? রাকসানের ঠোঁটে যেন গোলাপ পাঁপড়ি ঠোঁটের স্পর্শ। ওরা ক্রমশ ভিজিয়ে দিচ্ছে একে অপরকে। এক প্রবল উন্মত্ত বৈশাখী ঝড়ের মাতম যেন টের পাচ্ছে রাকসান। বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে পুরো শরীরে। পাগলামির রসনায় রাকসান ছুটে যেতে চায় কিন্তু কোমল দুটি হাত যেন ওকে বাঁধা দিয়ে রাখে। টগবগিয়ে ফুটতে থাকে, তরঙ্গ উছলে উঠতে থাকে, আজ যেন সুপ্তোত্থিত আগ্নেয়গিরির দিন। গলিত লার্ভা পাক খেয়ে খেয়ে উথলে উঠে, উল্টে যায়। হঠাৎ বজ্রনিনাদ। প্রবল ঝড়ের ঝাপটানি অনবরত। বজ্রে-তরঙ্গে, বিদ্যুৎ ঝমকে ঝমকে ঝামটায়-ঝাপটায় ভূকম্পনে সুনামির জলকম্পনে আগ্নেয়গিরির প্রবল বিস্ফোরণে তপ্ত গলিত লার্ভা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে। সবকিছু শান্ত হবার আগে সুনামি জলদানব এসে মুছে দিয়ে যায় সব।

অন্ধকার তখনো কেটে যায়নি। এর মধ্যেই দরজায় মায়ের ডাকাডাকিতে বালসেঙের ঘুম ভেঙে গেল। এক অজানা আতঙ্কে লাফ দিয়ে বালসেং উঠল। দরজা খুলেই,

“ম অংজক আমা? (কী হয়েছে মা?)”

“নি∙নি রাকসানোংছা ইয়াঙি নি। বিফ্রাকাঙজোকনা বিসংনি নকদে। গাঙচি মানাংজকনা। (রাকসানদের বাড়িতে এখনই যাও, গিয়ে দেখ, ওদের ঘরবাড়ি নাকি সব বানের জলে তলিয়ে গেছে)”

বারান্দায় বসা বালসেঙের দিদিমা বলে উঠেন, “নামসিনামাকা ফিবোপবোপ ফান্থিদিসাখোদে বুগারাণীহা সালাংজকখোন। (সুন্দর তরতাজা যুবককে মৎসরানিই মনে হয় নিয়ে গেল।”

বালসেং দূর থেকেই কান্নাকাটি, হাহাকার, হৈচৈ-হট্টগোল শুনতে পায়। রাকসানদের বাড়ি গিয়ে দেখতে পায় নদীর পাড় ভেঙে রাকসানের কাছারি নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। রাকসানকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না।

গ্রামের তরুণরা সবাই মিলে খরস্রোতা নদীর তীর বরাবর হাঁটতে থাকে। সারাটাদিন প্রচেষ্টার পরও কোথাও জলে ডুবে যাওয়া কোন মানবদেহের খোঁজ মিলল না। শেষতক সন্ধ্যানাগাদ ব্যর্থ মনোরথে সবাইকে ফিরে আসতে হল।

বন্ধুশোকে তিনবন্ধু বিষণ্ণতায়, অবসাদে নদীতীরে সন্ধ্যার পুবাকাশে নিস্তব্ধতায় নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে। বালসেং ও আরিফের মাঝখানে অতল শূন্যতা ভেঙে অনুপ হাজং বলে উঠে, “রাকসান পুনর্জন্ম লাভের জন্যই চলে গেছে খুব তাড়াতাড়ি যেন নতুন জীবন শুরু করতে পারে যে জীবনে সিমচির কোন ঠাঁই নেই।”

পিছনে কোন শব্দে তিনজনই চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকালে ওরা দেখতে পায় ঢাকা থেকে ফিরছে আঙ্খি এক তরুণীকে সাথে করে। মেয়েটা চিৎকার করে বলছে, “আমি কাদায় পিছলে পড়ে যাব ত।” আঙ্খি মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে কাদারাস্তা পার হয়।

আরিফ ও অনুপ দুজনেই সমস্বরে, “মেয়েটা কে? এর আগে তো গ্রামে কখনো দেখিনি?”

বালসেংকে বলতে শোনা গেল, “সিমচি।”

কভার প্রচ্ছদ শিল্পী তিতাস চাকমা

সালগ্রা সেকমাক মারাক :  তরুণ গল্পকার

 

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost