Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

একান্ত আলাপ।। গারো বাঁশিওয়ালা সায়ন মাংসাং-এর আত্মকাহিনি

প্রকাশিত : আগস্ট ২৯, ২০২০, ১৩:৩৭

একান্ত আলাপ।। গারো বাঁশিওয়ালা সায়ন মাংসাং-এর আত্মকাহিনি

সায়ন মাংসাং একজন বংশি বাদক, গায়ক এবং সুরকার। বর্তমানে সে মিউজিক প্রডিউসার। গেলো ইদে মিউজি করেছেন, প্রডিউস করেছেন আবার গানও গেয়েছেন। ছিলেন মাদল ব্যান্ড দলের সাথে। বর্তমানে পুরো মিউজিক ইন্ডাসট্রিতে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন ব্যস্ত সময় পার করছেন। সায়ন মাংসাংয়ের গ্রামে বাড়ি মধুপুর থানার জলছত্র গ্রামে। বাবা যুগীন্দ্র নকরেক, মা সুষমা মাংসাং। দুই ভাই চার বোনের মাঝে সায়ন চতুর্থজন। মিউজিক পাগল সায়ন পড়ালেখা তেমন করেননি। কিন্তু মিউজিকে নিয়েছেন তালিম। থকবিরিম পাঠকেদের জন্য সায়ন মাংসাংয়ের মিউজিশিয়ান হয়ে ওঠার কাহিনি প্রকাশ করা হলো-বি. স।

করোনকালে সময় কীভাবে কাটছে…

সায়ন মাংসাং : করোনার সময় আমি স্টুডিওতে ছিলাম চারমাস। প্রথমে আমি স্টুডিওর কাজগুলো পারতাম না । কীভাবে অপারেটিং করতে হয়, সফটওয়ারগুলো চালাতে হয়, রেকর্ডিং করতে পারতাম না। এই চার মাসের মধ্যে অদিত রহমান দাদা উনাকে তো বাংলাদেশের সবাই চেনে, উনার কাছ থেকেই শিখলাম। আমার কাছে করোনাকালটা একটা কোর্সের মতো মনে হতে পারে!

বাঁশির চর্চা কেমন চলছে?

চর্চা চলছেই! বাঁশি, সেক্সোফোন আমার সাথেই থাকে।আমি যখনই ফ্রি টাইম পাই তখনই বাজাই। ফিক্সড টাইম নাই যে এই টাইমেই বাজাতে হবে।

বাঁশির হাতে খড়ি…

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন থেকেই বাঁশি বাজাই। যখন বাঁশি ধরতে পারছি তখন থেকেই বাজাতে শুরু করি। এরপর আমি যখন ফুলপুর গেলাম বাবা সেখানে কাজ করতো। সেখানে ওস্তাদ প্রেজেন্ট চিছাম আমাকে সারগাম মানে বাঁশির বেসিক জিনিসটা শেখান। উনার কাছে প্রায় দুই তিনমাসের মতো বাঁশির বেসিক জিনিস শিখেছি! এরপর আমরা ময়মনসিংহ চলে আসি। কিন্তু তখন আমার বাঁশি বাজানোয় বিশাল গ্যাপ পড়ে। তারপর আমি গিটার বাজাতাম ড্রাম বাজাতাম। ময়মনসিংহে ব্যপ্টিস্ট চার্চে যেতাম। সেখানে কয়ার টিম ছিলো সেই টিমের সাথে আমি বাঁশি বাজাতাম! তারপর আবার গ্রামে চলে গেলাম। গ্রামে মাঝে মাঝে বাঁশি বাজাতাম।

হাওদা বিলে একা একা গিয়ে বাজাতাম। হাওদা বিল খোলা জায়গা সেখানে বাঁশি বাজালে রিভাইভ হয় এই মজার জন্য আমি বিলে গিয়ে বাঁশি বাজাতাম। বিশেষ করে রাতে যখন চাঁদ উঠতো তখন চাঁদের আলোয় পানি দেখা যেতো, কী অদ্ভুত মনে হতো… তখন মনের সুখে বাঁশি বাজাতাম… এই আর কি!

মঞ্চে প্রথম বাঁশি বাজানো…

একদিন আমি বাগাছাসের অনুষ্ঠানে বাঁশি বাজাই। সবাই  আমাকে এপ্রিসিয়েট করলো। ঢাকাতে আমার প্রথম মঞ্চে বাঁশি বাজানো। তবে আমি মঞ্চে প্রথম উঠি ময়মনসিংহে। গাসুর অনুষ্ঠানে, বাগাছাসের অনুষ্ঠানে এমনি নানা সংগঠনের অনুষ্ঠানে বাঁশি বাজাই।

বাঁশি  বাজানোয় প্রেরণা..

আমি যখন ছোট ছিলাম গ্রামে তখন একদম বাচ্চা, পিচ্চি আমি। আমাদের বাড়ির পাশেই আমার ফাজং(জ্যাঠা) বাড়ি। ফাজং অনেক গরু পালত। চড়াতও। ওখানে একজন ছেলে ছিলো। তার নাম শুটিং দা। উনি আমাকে প্রথম বাঁশি বাজানো শিখায়। আসলে উনিও জানেন যে উনি আমাকে বাঁশি বাজানো শিখিয়েছেন। উনি বাঁশি বাজান, উনাকে দেখে আমি বললাম আমাকেও একটা বাঁশি বানিয়ে দাও। পরে সে একটা বাঁশি বানিয়ে দিলো।এরপর থেকে আমি ঔ বাঁশি নিয়া প্রায় সময়ই বাজাতাম। এক সময় বাঁশি ভেঙে যায়। কিন্তু আমাদের গ্রামে বিরাট কৃষ্ণমেলা হতো। আমি সেই মেলা থেকে বাঁশি কিনি। আমি প্রতিবছরই বাঁশি কিনতাম, অনেকের মতো কোনো খেলনা কিনতাম না।

মনে পড়ে যে ঘটনা…

আমি যখন ৫ম শ্রেনিতে পড়ি তখন আমি দুইটা সাবজেক্টে ফেল করি। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের স্কুলের প্যারেডে যাই এবং বাঁশি বাজাই। আমাদের স্কুল চ্যাম্পিয়ান হয়। তখন স্কুলের স্যাররা আমাক দুই সাবজেক্ট পাশ করে দেয়।

মাদলের সাথে সম্পর্ক…

আমি তো মাদল ব্যান্ডে ছিলাম। মাদলের মাধ্যমে আমি অনেক শো করেছি। মাদলের মাধ্যমেই আমাকে অনেকে চিনেছে। আসতে আসতে আমি মাদলের বাইরেও শো করতে শুরু করলাম! পরে আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আর মাদলে যাওয়া হয় নাই, আর মাদলও একটু ব্রেক দিছে, এখন পর্যন্ত!। এই ব্রেকের পরে আমাদের আর একত্র হওয়া হয় নাই। তবে মাদলের সবার সাথেই আমার ভালো সম্পর্ক, ফোনে কথা হয়।মাঝে মাঝে আড্ডা দেই।

সায়ন মাংসাং একজন বংশি বাদক, গায়ক এবং সুরকার।

সায়ন মাংসাং একজন বংশি বাদক, গায়ক এবং সুরকার।

বাঁশি ছাড়াও  যে ইন্সট্রুমেন্টগুলো বাজানো হয়…

Saxophone, duduke বাজাই।  Saxophone যখন থেকে শুনি তখন থেকেই আমার বাজানোর ইচ্ছা ছিলো।তবে Saxophone কেনার দুই বছর আগে থেকে আমি ইউটিউব থেকে লেসন নিতে থাকি। Saxophone কিনবো কিনবো করে কেনা হয় নাই। পরে আফজাল ভাই কিনে দেন। আসলে আমাকে অনেক মানুষ হেল্প করেছে। তারা আমাকে সাপোর্ট করেছে।

যাদের কথা না বললেই নয়…

পিন্টু ঘোষ এবং উনার স্ত্রী সুকন্যা মজুমদার উনারা আমার গুরু। উনাদের সাথে আমি অনেক stage performance করেছি। আশা করি সামনেও করবো। তারপর অদিত রহমান, উনিও আমার গুরু। বর্তমানে উনার সাথেই বেশিরভাগ সময় থাকা হয়। উনার সাথেই মিউজিক প্রডিউস করছে। বাবুল ডি. নকরেক বাবুল দা অনেক সাপোর্ট দিয়েছে। ঢাকায় একবছর থাকার সুবিধা দিয়েছে। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ!

বাঁশিতে/ মিউজিকে ভাল করতে হলে…

আমি তো নিজে নিজেই শিখেছি। তবে অনেক দেখতে হবে, শুনতে হবে। বাংলাদেশে অনেক বিখ্যাত বাঁশি বাদক আছেন যেমন বারী সিদ্দিকী, জামাল ভাই, কামরুল ভাই মানে যত বাঁশি বাদক আছে আমি মোটামুটি সবারটাই শুনতাম। এখনও শুনি। শোনার আগ্রহ থাকতে হবে। ভাল মিউজিক করতে হলে ভালো মিউজিক শুনতে হবে অবশ্যই!

সায়নের যত কাজ…

২০১৬ থেকে আমি পুরোপুরি বাংলাদেশ মিউজিক ইন্ডাসট্রিতে যুক্ত হয়ে গেছি। এর মধ্যে আমি বেশ কয়েকটি সিনেমায় বাঁশি বাজিয়েছি। নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজিয়েছি।টিভিসিতে বাজিয়েছি।

তবে নিজে প্রডিউসার হিসেবে আমি এই বছর থেকে শুরু করেছি। যেমন করোনার সময় আমরা সবাইকে আশার আলো দেখানোর জন্য গান বানিয়েছি যেমন- দেবো পাড়ি এই আকাশ। এই গানের সুর হচ্ছে আমার আর অভিক দার দুজনের মিলে করা। মোটামুটি করোনর সময়ও কাজ করেছি। অভিক দার সাথে এসিস্ট করেছি। এই ইদের অনেক নাটকেও আমার কাজ ছিলো।  ইদে আমি দুটা গান কমপ্লিটলি করেছি।

মিউজিক নিয়ে চিন্তা….

আমি চিন্তা করছি মিউজিক আসলে সাগরের মতো। এখানে একদিক ঢুকলে আরেক প্রান্ত খোঁজে পাওয়া যায় না। এটা সম্ভব না। পুরোপুরি শিক্ষিত মিউজিশিয়ান না হলে সম্ভব না। মিউজিক তো সবই হয়ে গেছে। আমি আসলে নতুন কিছু করতে চাই, গান গাইতে চাই, প্রডিউস করতে চাই। বাঁশির ইন্সট্রুমেন্ট বানাবো সামনে। আমি যে বাঁশিগুলো বাজাই সেই বাঁশির সবগুলো ইন্সট্রুমেন্ট আমি বানাবো।

 

 

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost