Thokbirim | logo

২০শে ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ৪ঠা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

একজন বীর উত্তমের মহাপ্রয়াণ ।। হারুন হাবীব

প্রকাশিত : আগস্ট ২৯, ২০২০, ১৯:৫৮

একজন বীর উত্তমের মহাপ্রয়াণ  ।। হারুন হাবীব

পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালির জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের যে সাহসী অধিনায়কেরা নিজ নিজ যুদ্ধ সেক্টরে  মুক্তি বাহিনীর এক একটি অঞ্চলে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের  অধিকাংশই এরই মধ্যে পরপারে  পাড়ি জমিয়েছেন। কেউ প্রাকৃতিক নিয়মে- কেউ বা আবার নানা অপঘাতে।  সর্বশেষ চলে গেলেন মেজর জেনারেল চিত্ত রঞ্জন  দত্ত, বীর উত্তম।

জেনারেল  দত্তের  বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর।  অতএব এই  চলে যাওয়াটা  অকালে  বলা যাবে না। তবে দুর্ভাগ্য এই  যে,  মুক্তিযুদ্ধের  অন্যতম সাহসী এই সেনাপতি আগামি বছরে  দেশের স্বাধীনতার সূবর্ণ জয়ন্তী দেখে যেতে পারলেন না। মাতৃভূমি  থেকে অনেক দূরে আমেরিকার ফ্লোরিডায়  দেশত্যাগ করলেন তিনি ২৪ অগাস্ট ২০২০ ( বাংলাদেশ সময়  ২৫ অগাস্ট সকাল ৯:৩০ মিনিট)।

মুক্তিযুদ্ধে আমার নিজের রণাঙ্গন ছিল সেদিনের বৃহত্তর ময়মনসিংহ, যে অঞ্চল  ঘিরে গড়ে উঠেছিল একাত্তরের ১১ নম্বর  যুদ্ধ সেক্টর। সে কারণে  জেনারেল দত্তের  নেতৃত্বে লড়াই করার সুযোগ ঘটেনি আমার। সেদিনকার কর্নেল সি আর  দত্ত নেতৃত্ব দিয়েছেন মেঘালয়ের পাদদেশে ৪ নম্বর  যুদ্ধ সেক্টরে, যা ছিল বৃহত্তর সিলেটের  সুবিশাল এলাকা।  যুদ্ধ পরবর্তিকালে, বিশেষ করে সেক্টর  কমান্ডারস ফোরামের গঠন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে নানা সামাজিক আন্দোলনে যুক্ত থাকার সুবাদে  তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ ঘটে আমার।

মনে পড়ে, ২০০১ সাল থেকে শুরু করে সেদিনকার বিএনপি-জামাতের জোট সরকার  পরিকল্পিত পন্থায়  মুক্তিযুদ্ধের  রক্তার্জিত মূল্যবোধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আঘাত করতে  শুরু করে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জর্জরিত হয় বাংলার জনপদ। সরকারের সহযোগী পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর দোসরেরা, অর্থাৎ   মুক্তিযুদ্ধের  ঘাতক-তস্করেরা,  এ সময়ে আস্ফালন সহকারে বলতে থাকে  দেশে কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয়নি, হয়েছে একটি ‘গৃহযুদ্ধ’ মাত্র, এবং সে কারণে  কোনো ‘যুদ্ধাপরাধী’থাকবারও সুযোগ নেই! স্বাধীনতা বিরোধীদের এইসব প্রকাশ্য আস্ফালন  বাংলাদেশকে নতুন  চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করে। এরই প্রতিরোধচিন্তায় কতিপয় মুক্তিযোদ্ধার  চেষ্টায়  মুক্তিযুদ্ধের  সেক্টর  কমান্ডারগণের সম্মিলিত নেতৃত্বকে সামনে আনা হয়।  ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় সে সময়কার সকল সেক্টর  কমান্ডারদের  এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন। এতে অবিলম্বে যুদ্ধাপরাধীদের  বিচারের দাবিকে জাতীয় দাবিতে পরিণত করার  উদ্যোগ ঘোষিত  হয়। দ্রুত গড়ে উঠে সেক্টর  কমান্ডারস ফোরাম -মুক্তিযুদ্ধ’৭১।

মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর  কমান্ডারগণ তখন  বহু দলমতে বিভক্ত। এই বিভক্তির সুযোগ সৃষ্টি করে ১৯৭৫ পরবর্তি সামরিক ও আধা সামরিক শাসন। কিন্তু সেই বিভাজন দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধকে দূরে  সরিয়ে রাখেননি একাত্তরের সমর অধিনায়কদের। সময়ের দাবিতে  বীর উত্তম সেই পূরনো অধিনায়কেরা  একে অপরের হাতে হাত মেলান।  এক মঞ্চে দাঁড়ান এয়ার ভাইস মার্শাল এ.কে. খন্দকার, মেজর জেনারেল কে.এম. সফিউল্লাহ, মেজর জেনারেল সি আর দত্ত, কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান, লে. জেনারেল মীর শওকত আলী, কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরী এবং  মেজর রফিকুল ইসলাম।  ফলে গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধে  ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনকারী সমর নায়কদের  ঐক্য।  সারা দেশে অভূতপূর্ব এক জাগরণ সৃষ্টি হয়। অল্প সময়ের মধ্যে সে ঐক্যের ফসল পেতে শুরু করে  বাংলাদেশ। তরুণ প্রজন্ম প্রকাশ্যে যুদ্ধাপরাধীদের  বিচারের দাবিতে মাঠে নামে। যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধীদের বিচারের দাবি দ্রুত জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়। এই জাগরণের ব্যাপক প্রভাব পড়ে ২০০৯ এর সাধারণ  নির্বাচনে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধপন্থি সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তি ব্যাপক ভাবে বিজয়ী হয়।

এই  আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার সুবাদে জেনারেল সি আর দত্তকে আমার  জানবার সুযোগ হয়।  প্রবল দেশপ্রেম,  অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিচিন্তা এবং সাহসী উচ্চারণের মানুষ তিনি ।  আমি দেখেছি, মুক্তিযুদ্ধের  লুণ্ঠিত চেতনা পুনরুদ্ধারে তাঁর  এবং  অন্যান্য শীর্ষ  সমর  অধিপতিদের উচ্চারণ একদিকে যেমন অগনিত  মানুষকে অনুপ্রাণীত করেছে,  অন্যদিকে   যে অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্বার বিকাশে  মহান মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছে, এবং যে শক্তিকে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর  থেকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা পরিকল্পিত উপায়ে আঘাত হেনে চলেছে,  সেই শক্তি আবারও নতুন প্রাণে সঞ্চারিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের  পর জেনারেল দত্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরই হাতে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্ বাংলাদেশ রাইফেলস এ পরিণত হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত হয়েছে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অন্যতম  বাঙালি অফিসার হিসেবে সি আর দত্ত দেশটির  রাষ্ট্র ও সেনা কাঠামোর যন্ত্রনা  দেখেছেন  প্রত্যক্ষদর্শি হিসেবে। তিনি দেখেছেন  কীভাবে পাকিস্তানি সেনা ও ধর্মীয় স্বৈরতন্ত্রের  হাতে দেশের  সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা  শোষিত হয়েছেন, বঞ্ছিত হয়েছেন  রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে। আরও দেখেছেন কীভাবে দেশটির ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন। সে অভিজ্ঞতার কথা  বলেছেনও বহুবার। অতএব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে বাঙালির যে মহাজাগরণ, সে জাগরণ ছিল তাঁর কাছে ভালোবাসার।  সে কারণে ছুটিতে থাকাকালে মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ড শুরু হলে তিনি কালবিলম্ব না করে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে।  কারণ এ যুদ্ধ তাঁর জাতীয় অহংকার।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অন্য ধর্মীয় মানুষের প্রবেশাধিকার ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। কিন্তু নিজ  যৌগ্যতায় হিন্দু ধর্মীয় সি আর  দত্ত সেই  সেনাবাহিনীর অফিসার হবার কৃতিত্ব লাভ করেন।  ১৯৪৭ এর পর একজন হিন্দু ধর্মালম্বি অফিসার হিসেবে তিনি ভারতের নাগরিকত্ব চাইতে  পারতেন অনায়াসে। কিন্তু শ্রী  দত্ত তাঁর জন্মভূমি এবং সিলেটকে ভালোবেসেছিলেন । অতএব  দেশান্তরিত হবার কথা ভাবেননি তিনি।  বরং  ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের  হয়ে তিনি লড়াই করেছেন। লড়াই করেছেন তাঁর জন্মভূমির  স্বাধীনতার যুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের  নির্বিচার গণহত্যা ও বাঙালি নিপীড়নের বিরুদ্ধে। যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে আবারও যখন অসাংবিধানিক শাসন আসে, আবারও যখন উগ্র সাম্প্রদায়িকতা আসে, আবারও রুখে দাঁড়ান মুক্তিযুদ্ধের  এই রণাঙ্গন সেনাপতি।

অসাংবিধানিক শাসনের বেড়াজালে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যখন প্রবলভাবে শংকিত হন,  জেনারেল সি আর দত্ত বসে থাকেননি তখনও।  তাঁরই নেতৃত্বে  গড়ে ওঠে  হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ।  এই পরিষদ থেকে দাবি তোলা হয় অমানবিক ও অসাংবিধানিক ‘শত্রু সম্পত্তি’ বা পরের ‘অর্পিত সম্পত্তি’ আইনটি বাতির করার।  ফলে  উগ্রপন্থিদের প্রবল আক্রমনের শিকার হতে হয় জেনারেল দত্তকে।   কিন্তু তাঁর  নতুন রণাঙ্গন থেকেও পিছিয়ে আসেননি তিনি, বরং  অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনাপুনরুদ্ধারের  লড়াইয়ে  জীবনভর সংগ্রাম  করে গেছেন। তাঁর প্রতি আমার অশেষ শ্রদ্ধা।

 

হারুন হাবীব : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক

হারুন হাবীব : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক

মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও গবেষক হারুন হাবীব

 

অন্য লেখা…

সি আর দত্ত  আমার শিক্ষক, আমার অভিভাবক ছিলেন ।।  রেমন্ড আরেং




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost