Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

বিরিশিরি বালিকা বিদ্যালয়ের ইতিহাস ।। পর্ব-১ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

প্রকাশিত : আগস্ট ২৭, ২০২০, ১৩:০৬

বিরিশিরি বালিকা বিদ্যালয়ের ইতিহাস ।। পর্ব-১ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

গারোরা অনার্য বলিয়া চিরকাল অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠির দ্বারা ঘৃনিত ও নিপীড়িত হইয়া আসিতেছে। বর্তমানেও এই ঘৃণা ও নিপীড়নের পূর্ণ অবসান হয় নাই। ইহার কারণ গারোদের মধ্যে শিক্ষা ছিলো না। তাই গারো জাতি এতকাল অসভ্য ও বর্বর বলিয়াই বিবেচিত হইয়া আসিতেছে। সকল আদিবাসী জাতির জন্য ইহা সত্য। কারণ অস্পৃশ্য, অসত্য, বর্বর বলিয়া এই উপমহাদেশের যাহারা সভ্য বলিয়া বিবেচিত তাহাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাহাদের প্রবেশাধিকার ছিলো না। এই জন্য গারোদের শিক্ষা খ্রিষ্টান মিশনারিদের দান। ইহা ঐতিহাসিক এবং বাস্তব সত্য।

১৭৬৫ সনের ১২ই আগস্ট ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করিলে, মোগল রাজ্যের সমতলভূমির গারোরা কোম্পানির রাজ্যের অর্ন্তভুক্ত হয়। এই ব্রিটিশ রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে জমিদারদের সঙ্গে গারোদের দীর্ঘদিন ধরিয়া বিবাদ চলে। তাহা শেষ পর্যন্ত কোম্পানি সরকারের গোচরীভূত হয়। তাই বাধ্য হইয়া কোম্পানি সরকার মি. ডেভিড স্কটকে গারো অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির জন্য প্রশাসক নিযুক্ত করেন ১৮১৬ সনে।  তিনিই প্রথম গারোদের জন্য খ্রিষ্টান মিশনারি ও শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং চেষ্টা করেন। তাঁহার পরবর্তী প্রশাসক ক্যাপটিন জেং কিনস; তিনিও সেই প্রচেষ্টা চালাইয়া যান।

মি. ডেভিড স্কটের প্রচেষ্টায় কলিকাতার মাননীয় বিশপ হেবার ১৮২৭ সনে গারো এলাকা পরিদর্শন করেন। কিন্তু তাঁহার অকাল মৃত্যুতে গারোদের জন্য মিশনারি প্রেরণ হয় নাই। কথিত আছে শ্রীরামপুরের দীক্ষিত প্রথম বাঙালি খ্রিষ্টান কৃষ্ণ পাল ১৮২০ সনে গারো অঞ্চলে সুসমাচার প্রচার করিয়া যান।

অবশেষে আসামে ১৮৩৬ সনে আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির মিশনারিদের আগমন ঘটে। এই সোসাইটির মিশনারি ড: মাইলস্ ব্রনসন ১৮৬৩ সনের ৮ই ফেব্রুয়ারি গোহাটিতে ব্রহ্মপুত্র নদের সুখেশ্বর ঘাটে ওমেদ ওয়াট্রে মোমিন এবং রামখে ওয়াট্রে মোমিন, দুই মামা-ভাগ্নেকে খ্রিষ্টান ধর্মে দীক্ষা দান করেন। তাঁহারাই প্রথম গারো খ্রিষ্টান। তাঁহাদের খ্রিষ্টান হওয়ার পিছনেও ব্যাপ্টিস্ট মিশনের মিশনারি রেভা: আর. বিয়নের অবদান ছিলো।

তিনি ১৮৫৬ সনে আসামের গোয়ালপাড়া ও গোহাটিতে সুসমাচার প্রচার ও ধর্মীয় পুস্তিকা বিতরণ করিয়াছিলো। তাঁহার এই প্রচার ও ধর্মীয় পুস্তিকা ওমেদ ও রামখের অন্তরে খ্রিষ্ট ধর্মের প্রতি অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করিয়াছিলো। বঙ্গদেশের গারোদের মধ্যে রেভা: আর. বিয়নের প্রচারের রেকর্ড পাওয়া যায় ১৮৫৩ সন হইতে। ঐ সনে তিনি ঢাকা-ব্যাপ্টিস্ট মিশনের কর্মকর্তা মৃত্যু পথযাত্রী রেভা: উইলিয়াম রবিনসনকে বলেন যে, দুর্গাপুর এলাকার গারোরা সুসমাচার শুনিতেছে। ইহার উত্তরে তিনি বলিয়াছেন-“আমি এই সুখবর পরমদেশে নিয়া যাইব।” এই রেভা: আর. বিয়নই ১৮৭২ সনের ২২শে জানুয়ারি, মতান্তরে ১৮৭৫ সনে ধারারামপুরের নামান তজুকে (পরে নাম হয় রাধানাথ ভৌমিক, ভৌমিক জমিদারদের দেওয়া উপাধি) ময়মনসিংহ শহরের গোলপুকুরে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা দান করেন। তিনি বঙ্গদেশের প্রথম গারো খ্রিষ্টান।

এই রেভা: জন বিয়নই ১৮৮১ সনে পূর্ব উৎরাইলে মতান্তরে পূর্ব তেলুঞ্জিয়ায় সাব-মিশন স্টেশন স্থাপন করেন। রেভা: জন এলিসন ১৮৮৫ সনে পশ্চিম  উৎরাইলে বর্তমান সড়কের পশ্চিম পার্শ্বে ঐ মিশন স্থানান্তর করেন। রেভা: জয়নাথ চৌধুরী ১৮৯৪ সনে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ান ব্যাপ্টিস্ট ফরেন মিশনের নির্দেশে ঘোড়াইত মৌজায় ঐ মিশন স্থানান্তর করেন। ইহাই বর্তমান বিরিশিরি মিশন। মিশন বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হইলেও উৎরাইল ও তেলুঞ্জিয়া সর্বসাধারনের নিকট সাউথ বিরিশিরি নামে পরিচিত হয়।

জ্ঞতব্য বিষয় এই ১৮৮৩ সনে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ান ব্যাপ্টিস্ট ফরেন মিশন গারো অঞ্চলের দায়িত্বভার ইংল্যান্ডের ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি সোসাইটির নিকট হইতে গ্রহণ করে। উপরে উল্লেখিত তিনটি মিশনে প্রথম অবস্থায় যাহারা কর্মী ছিলেন তাঁহাদের নাম God and the Garo-Rev. C.D. Baldwin অনুসারে

১.        উৎরাইলে বা তেলুঞ্জিয়া-চন্দ্র নাথ, কামাল এবং গনিজি, চন্দ্র মোহন সাংমা, ও দীনবন্ধু।

২.         উরাইলে-রামাদয়াল দাস, অভয় কুমার দাস, চন্দ্র নাথ, শরৎ চন্দ্র ভট্টচার্য।

৩.       ঘোড়াইত (বিরিশিরি)-গোবিন্দ দারিং, বৃন্দাবন, কানাই সাংমা, রেভা. জয়নাথ চৌধুরী, ভারত সাংমা, বিহারী লাল বাউল ও মিস এম. ফুলার (তিনি ময়মনসিংহ মিশন হইতে আসিয়া প্রায় সময়ই বিরিশিরিতে থাকতেন)।

চলবে…

লেখক পরিচিতি

গারো সম্প্রদায়ের জ্ঞানতাপস, পণ্ডিতজন রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৭ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। বর্তমনে তিনি দুর্গাপুর থানা ধীন নিজ বাড়ি বিরিশিরির পশ্চিম উৎরাইল গ্রামে বসবাস করছেন।  দুই ছেলে  এক মেয়ে। স্ত্রী প্রতিভা দারিংও একজন শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে অবসরে আছেন। রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাকের অনেক লেখা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উনার ‘বিরিশিরি মিশিন এবং ব্যাপ্টিস্ট মণ্ডলীর ইতিহাস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বই।

পণ্ডিতব্যক্তি রেভা. মণীন্দ্রনাথ মারাক

লেখক মণীন্দ্রনাথ মারাক

গারো অঞ্চলে খ্রিষ্ট ধর্মের আগমন  ।।  শেষ পর্ব ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক

সংস্কৃতি সংরক্ষণে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানার প্রয়োজনীয়তা  ।। পর্ব-১ ।। মণীন্দ্রনাথ মারাক




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost