Thokbirim | logo

১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

মুক্তিযুদ্ধে আমরা জোর করেই একপ্রকার চোরের মতো ভাইগা গেসি ।। বীরেন্দ্র সাংমা

প্রকাশিত : আগস্ট ২৪, ২০২০, ১৬:১৪

মুক্তিযুদ্ধে আমরা জোর করেই একপ্রকার চোরের মতো ভাইগা গেসি ।। বীরেন্দ্র সাংমা

বীরেন্দ্র সাংমার জন্ম ১৯৪৮ সালের ১ নভেম্বর বারমারি গ্রামে। সংসার জীবনে তিন ছেলে এক মেয়ের বাবা। বীরেন্দ্র সাংমা মুক্তিযুদ্ধের সময় শেরপুর সরকারি কলেজের ইন্টার ফাইনালের ছাত্র ছিলেন। তিনি মা-বাবার বারণ না শুনে চোরের মতো যুদ্ধে পালিয়ে গিয়েছিলেন। বীরেন্দ্র সাংমা যুদ্ধ করেছেন ১১ নম্বর সেক্টরে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল তাহের। মুক্তিযোদ্ধা বীরেন্দ্র (বীরেন) সাংমার সাক্ষাৎকারটি ২০১৬ সালের। সাক্ষাৎকারটি  বীরেন্দ্র সাংমার গ্রামের বাড়ি মল্লিকবাড়িতে গিয়ে নেয়া। তখন থকবিরিম সম্পাদকের সাথে ছিলেন  বিকাশ চিরান।এই দীর্ঘ সময়কালে অনেক কিছু্ই পরিবর্তন হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা বীরেন্দ্র সাংমার শারীরিক ও মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু যুদ্ধের কথা, সেই সময়কার ইতিহাস জাজ্বল্যমান। সেই ইতিহাস, সেই যুদ্ধের কথা  থকবিরিম পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো-বি. স।

থকবিরিম : যুদ্ধের সময় আপনি কোন সেক্টরে ছিলেন?

বীরেন্দ্র সাংমা: ১১ নম্বর।

থকবিরিম : সেক্টর কমান্ডার কে ছিলেন?

বীরে্দ্র সাংমা: কর্নেল তাহের। আমাদের প্রথম কম্পানি কমান্ডার নাজমুল হক। ময়মনসিংহে শহিদ নাজমুল হক নামে যার হল আছে।

থকবিরিম : নালিতা বাড়িতেও তো নাজমূল হকের নামে কলেজ আছে।

বীরেন্দ্র সাংমা শুনেছি…প্রথম আমাদের কম্পানি কমান্ডার ছিল নালিতাবাড়ি কৃষি ইউনিভারসিটির ছাত্র নাজমুল হক এবং সে যে শেরপুরে কাটাকালি ব্রিজ ভাঙতে এসে সে কিন্তু মারা যায়। শহিদ হয় সে। এবং সে মারা যাবার পর আমাদের উইলিয়াম ম্রং আছে না ডাক্তার উইলিয়াম ম্রং তখন সে কম্পানি কমান্ডার দায়িত্ব নেয় ঠিক আছে? আমি হলাম প্লাটুন কমান্ডার ছিলাম। প্লাটুন কমান্ডার হলেও টুয়াইসি হিসেবে কোম্পানি আমাকে চালাতে হতে।

থকবিরিম : আপনার সাথে সহযোগি কে কে ছিল? মান্দিদের মধ্যে?

বীরেন্দ্র সাংমা: মান্দিদের মধ্যে আসিল আলবার্ট ম্রং নর্বাট ম্রং তারপর আমাদের সুনিল আমার ভাগনা।

থকবিরিম : সুনিল চিরান?

বীরেন্দ্র সাংমা : হ্যা সুনিল চিরান। আর ঐ যে,..

থকবিরিম :  ভাটপাড়ার নকান্ত চিরান?

বীরেন্দ্র সাংমাঃ হ্যাঁ নকান্ত চিরান,..

থকবিরিম :  আপনি যে মুক্তিযুদ্ধে এসেছেন আপনার বাড়ির মানুষ মানে মা বাবা কিছু বলে নাই?

বীরেন্দ্র সাংমা : না । আমি যখন নাকি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য মা বাবা আমাদেরকে বাধা দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে আমরা জোর করেই একপ্রকার চোরের মতো ভাইগা গেসি…

থকবিরিম : কীসের জন্যে…?

বীরেন্দ্র সাংমা : দেশকে স্বাধীন করতে হবে। দেশ মুক্ত করতে হবে। এভাবে বসে থাকলে তো হবে না।

থকবিরিম : এমন কোনো স্মৃতি আছে যা মনে করলে বা মনে পড়লে গা শিওড়ে ওঠে?

বীরেন্দ্র সাংমা : স্মৃতি মানে কি আমাদের একটা অপারেশনে পাটায় ছিলো। ওই যে বান্দরকাটা ক্যাম্প আছে না প্রমুদ বাবুর ক্যাম্পের উত্তরমুড়া যে ক্যাম্প ওদার পুবমুড়া একটা ক্যাম্প আসিল। বান্দরকাটা ক্যাম্প এটাক করার জন্য জয়নাল নামে এক ছেলেকে আমাদের গাইডম্যান হিসেবে দেয়া হয়সে। বাউদি সিং বলছি- তুমি বান্দরকাটা ক্যাম্প চিনো? আমি বললাম- আমার ধারনা নাই। কে জানে? তখন জয়নাল বলল-আমি জানি। তারপর জয়নাল আমাদেরকে গাইডম্যান হিসেবে নিতে নিতে ক্যাম্পের কাছে নিয়ে গেল। আমরা অন্ধকারে গিয়ে দেখি অজপাড়া গায়ে দালান আইল কোত্থেকে? তখন আমরা ব্যাক করলাম। ব্যাক করার পর এইকান থেকে মল্লিক বাড়ি আমরা একটা পজিশন নিয়া ফায়ার করি পরীক্ষা স্বরূপ ।

তখন ওই ক্যাম্প থেকে কোনো রিপ্লাই আসে না। আমরা ৫০০ রাউন গুলি করার পর তারা রিপ্লাই দিল টাকডুম কইরা। ঠিক আসে…? তার কিছুক্ষণ পরে আমাদের আর্টিলারি যে গ্রুপ ক্যাপটেন ভারতী সিং-এর বিএসাইব গ্রুপ তারাও টুইন্স মর্টার ছাড়া আরম্ভ করে তারপর যুদ্ধ আরম্ভ হইল। তখন আমরা উচ্চা বাদরে(উঁচু আলে) পজিশন নিয়া যার তার মত পজিসন নিয়া বইয়া রইসি বৃষ্টির পানির মতো টপটপ করে পড়তাসে খালি…। তখন আমরা রাত্র পোহায়ে গেসি আমাদেরকে গেরিলা পদ্ধতিতে ট্রেনিং দেয়া হয়সে যদি পারো হঠাৎ করে তোমরা আক্রমন করো আবার বাইগা পড়ো এতে তোমাদের কোনো ক্যফিয়ত দিতে হয়বো না কিন্তু ফেসটু ফেস মানে… ফ্রন্ট যুদ্ধ করার জন্য তোমাদেরকে ট্রেনিং দেয়া হয় নাই তোমাদেরকে ট্রেনিং দেয়া হয়সে গেরিলা পদ্ধতিতে, তাই না?

থকবিরিম : সম্মুখ যুদ্ধের জন্য না…

বীরেন্দ্র সাংমা : সম্মুখ যুদ্ধের জন্য না। এই যুদ্ধকে জিইয়ে রাখো। এখন যেহেতু  সে গাইডম্যান আমরা ব্যাক করলাম ক্যাম্পে। তখন ভারতী সিং জিজ্ঞাস করতাসে, জয়নালকে জয়নাল কিয়া বাত হে? জনাল- আচ্ছা বাত হে… -ক্যাসা আচ্ছা হে? ছে পাজ্ঞাবি মার দেয়া ৬য়জন পাঞ্জিাবি মেরেছি। সাবাশ! সাচ্ছা যুদ্ধ করেগা তো কিউ বাংলাদেশ আজাদ নেগিহ হোগা! জরুর হোগা-এই বলে তারে খুব প্রশংসা করতাসে। তখন ভারতী সিংহ জিজ্ঞেস করতাসে-ডেড বডি কিধার হে? তখন জয়নাল বলতাসে- ডেড বডি কে ভাগ গেয়া স্যার! হেই মাদারচুদ ডেডবডি ক্যাসা ভাগগেয়া? ম্যারাসাত তু জুট বলতাহে- এইকথা বলে রিভলবার বের করে জয়নালকে গুলি করতে চাচ্ছে। তখন আমি মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। ও স্যার ও তো হিন্দি জানে না তাই সে উল্টাবালটা বলছে এ নিয়ে আপনি তার সাথে কথা বলেন না।…এই গল্পটা আমি প্রমুদ স্যারের মুখোমুখি বলসি..

থকবিরিম : মুক্তি যুদ্ধের সময় আপনি যেহেতু শেরপুর জেলায় ছিলেন সেই সময় গারো কোচ হাজং অদি অর্থাৎ আদিবাসীদের অবস্থা কী ছিল?

বীরেন্দ্র সাংমা : তখন তোমার সবাই তো ইন্ডিয়া চলে গেছে গা, কেউ তো ছিল না এই দেশে। সবাই ইন্ডিয়া আশ্রয় নিসে। তখন বাড়ি ঘর কোনো…আমার নিজের বাড়িই তো বুঝতে পারি নাই! ভেঙেচুড়ে সব শেষ হয়ে গেছে! এই যে রনিন ম্রং তার পরে তোমার প্রমুদ চিরান তারপর নবেনের চোট ভাই কী যেন নাম ছিল…এই যে ম্রং

থকবিরিম : যমুনা?

বীরেন্দ্র সাংমা: নানা ও মারা গেসে..আচ্চা.. আমারা মোট ৪৫জন ছিলাম শুধু গারো মুক্তিযোদ্ধা!

থকবিরিম : মান্দিরা ৪৫জন ছিল?

বীরেন্দ্র সাংমা: হ্যা শুধু মান্দিই ৪৫জন ছিল মধুপুরের ওয়াল্টার ব্রিটিশ তারপর তোমার এখন জলছত্রের মিশনের ম্যানেজার…

থকবিরিম : ঐসময়কার আমাদের এলাকা মানে শেরপুর এলাকার রাজাকারদের সম্পর্কে আপনার ধারনা কী বা মতামতটা ছিল? তাদের অবস্থা কী ছিল?

বীরেন্দ্র সাংমা: রাজাকার তা…আমরা যখন যাইতেসিলাম ১লা এপ্রিল আমরা যাইতাসি তিনটা গ্রাম জারুমতলা বারোয়ামারি বাটপাড়া একত্রে কিন্তু মানে বের হইসি তখন তাদেরকে পার কইয়া দিয়া আমরা আবার ব্যাক করলাম।

থকবিরিম : তার সমানে এই তিনটি গ্রামের মান্দিদেরকে ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দিয়ে?

বীরেন্দ্র সাংমা : হুম ইন্ডিয়া পাড়ায় দিয়া আমরা আবার ব্যাক করছি তখন ব্যাক করার সময় আমাদেকে রাজাকাররা আটকায় আমরা রাজাকারদের বললাম, সাহস থাকলে সামনে আসো নইলে আমরা গুলি করবো। যাই হোক এভাবে আমরা সামনে গেলাম আমাদের সাথে ছিল আলবার্ট নর্বাট তারপর আমাদের লরেন্স নকরেক । মধুপুরের। এখন তার ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট।

থকবিরিম : মামা লব কী তোমার সাথে ছিল?

বীরেন্দ্র সাংমা: লব! লব লব লব… আমার সাথে ছিল না। সে অন্যদের সাথে ছিল। তবে হালুয়াঘাট কি যেন নাম….

থকবিরিম : তো দাদা স্বাধীনতার ৪০/৪৫ বছর পর আপনার অনুভূতি কী? এই আপনি দেশের জন্য যুদ্ধ করলেন আপনার কি শান্তি আসতাসে যে আপনি দেশের জন্য যুদ্ধ করেছেন?

বীরেন্দ্র সাংমা: এখন দেশের যে রাজনীতি ३ প্রেক্ষাপট আমি যে একজন মুক্তিযোদ্ধা আমাকে কেউ মূল্যায়ন করে নাই বিএনপির আমলে ।

থকবিরিম : বিএনপি সময়ে করে নাই কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার এসে করছে!

বীরেন্দ্র সাংমা: এখন আওয়ামী লীগ সরকর এসে আমাদেরকে যে মনে করছে এতে মনে যে হ্যাঁ আমি দেশের জন্য যুদ্ধ করে ঠিক করেছি।

থকবিরিম : আচ্চা আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা কোনো সংসদ আছে? তাদের সংগঠিক হওয়ার বা কোনো দরকার আছে?

বীরেন্দ্র সাংমা: দরকার আছে। কিন্তু লোক তো নাই।

থকবিরিম : আপনারা নিবেন কিনা?

বীরেন্দ্র সাংমা: নেয়ার মতো আমার তো সেই বয়স নাই।

বিকাশ চিরান: পরিকল্পনা আছে কিনা?

বীরেন্দ্র সাংমা: পরিকল্পনা আছে। যদি কেউ উৎসাহী হয়ে পরিচালনা করতে চায় তাহলে তাদের সাহায্য সহযোগিতা করতে পারবো।

থকবিরিম :  আপনাকে অনেক ধন্যবাদ!

বীরেন্দ্র সাংমা :  তোমাদেরকেও!




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost