Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ডিজিটাল যুগের কথকথা ।। নীলু রুরাম

প্রকাশিত : আগস্ট ২৪, ২০২০, ১২:২৫

ডিজিটাল যুগের কথকথা ।। নীলু রুরাম

আশির দশকে যখন সাদা কালো টিভির যুগ, তখন ডিসের কারিগরি হয়নি সে সময়ে পারিবারিক বন্ধন ক্রমশ আলগা হচ্ছিল। সান্ধ্যকালিন পারিবারিক প্রার্থনা ব্যাহত হয়েছে। নাটক দেখার পর তাগিদ দিলে খবর দেখে নিই এই অজুহাত। আজকাল ডিজিটাল যুগে আমরা বলি পৃথিবী ছোট হয়ে আসছে, বিমানের আগেকার শ্লোগান, ইন্টারনেট আমাদের দোর গোড়ায়। তথ্য ভাণ্ডার হাতের কাছে, আমরা যা চাই গুগলে সার্চ করে কাঙ্খিত তথ্য মিলছে।

সবার হাতে হাতে মোবাইল, এন্ড্রয়েড মোবাইল, আই ফোন, স্মার্ট ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ইত্যাদি মাধ্যমে প্রতি নিয়ত ইন্টারনেট থেকে তথ্য নিচ্ছি। বিশ্বায়নে এমন অযাচিত যোগাযোগ মাধ্যম আমাদেরকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক সামাজিক ও বিভিন্ন দিক দিয়ে এক আমূল পরিবর্তন সাধন করেছে। আজ পোস্ট অফিসে যেতে হয় না ই-মেইল রয়েছে, শপিং মল, সুপার মার্কেট থাকা সত্ত্বেও ই-কমার্স রয়েছে, অনলাইন ব্যবসা। প্রিন্টেড বইয়ের দরকার নেই, ইন্টারনেট সরবরাহ করছে। শুধু ইতিবাচক দিক নয়, নেতিবাচক দিকটাও উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আজকাল পরিবারের সবার কাছেই মোবাইল, টাচ স্ক্রিন মোবাইল, স্মার্ট ফোন।

আকাশ

একটা সময় পেলেই মেতে গেল ফেবু, ইমু. হোয়াটসঅ্যাপ এমন ধরনের মিডিয়াতে। আপনার ছেলে মেয়েরা কী দেখছে আমরা কি তা খেয়াল করি! গতকালের আগের দিন ভাংতি বাজারে সিরিয়াল ভরতে গিয়েছিলাম। এক ছেলে, এখনো শিশু পর্যায়ে, বলছে, আমারে নেকেড মুভি দিও, পাকিস্তানগুলো বেশি দিও। পাকিস্তানি মুজরা ডান্স, টপ হট মুজরা আজকাল অনেক রগড় টাইপের নাচ অহরহ আপলোড হচ্ছে। আবার অনেকে নিজেই হট মডেল সেজে নানাবিধ নাচ দেখিয়ে সারা অঙ্গে প্রচণ্ড সাগরের তরঙ্গ তুলছে। আবার কিছু কিছু রমণীকুল অনলাইনে পর্ন টাইপের বেশাতি মেলে ধরে রাতে ডলার কামাচ্ছে। লাভের অঙ্ক বাড়াতে রাতে ডলার কামাচ্ছে। লাভের অঙ্ক বাড়াতে টার্গেট বিদেশি/প্রবাসীদের। অনেকে লিখছে প্রবাসী ছাড়া রিকুয়েস্ট করবেন না।

গ্রামেও এর ছোঁয়া লেগেছে। উঠতে বসতে মোবাইল, সিরিয়াল পাগল। খালি নিত্য নতুন সিরিয়ালের জন্যে ভিড় জমায টেলিকম দোকানে। রান্নাবান্না করতে গিয়েও মোবাইলে সিরিয়াল দেখছে। ছোট্ট অপরিণত শিশুরা ছাড়াও যুবক-যুবতী, বৃদ্ধবৃদ্ধা সবাই গ্রামীণ পরিবেশে ইন্ডিয়ান সিরিয়ালে পাগল। কিছু জনপ্রিয় সিরিয়াল কাদম্বিনী, ফিরকি, বেদের মেয়ে জোসনা, আলিফ লায়লা, মহাভারত, মনসা ইত্যাদি। বাচ্চারা হানি-বানি, নিক্স, বাটুল দি গ্রেট, নন্টে ফন্টে, নাট বল্টু ইত্যাদি কমিক দারুণভাবে পছন্দ করেছে। সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। হোক শহুরে বা গেরামে। যে যার মত মোবাইল ঘাটছে। যেন, আমাকে বিরক্ত করোনা বা ডোন্ট ডিসটার্ব মি ভাব। স্বামী এক প্রান্তে স্ত্রী ডিসটার্ব মি ভাব। স্বামী এক প্রান্তে স্ত্রী আরেক প্রান্তে।

সেই আগেকার সুখ-দু:খের সহভাগিতা বা আলাপ নেই। কেউ কারো হস্তক্ষেপ করছে । সীমানা রামকুণ্ডলীর ন্যায় চিহ্নিত, সীমারেখা লংঘন করবে না এই। এখন পারিবারিক আলাপ বলে কিছু নেই।শহরে যে যার মতো কিংবা নিজ নিজ রুমে মোবাইলের নেশায় ব্যস্ত। কাকে কী বলবেন। সেই পারিবারিক বন্ধন, একত্রে পারিবারিক সহভাগিতা আর নেই। কাছে থেকেও যোজন মাইল দূর। সান্ধ্যকালিন বিধাতাকে ডাকা, একত্রে প্রার্থনা করা আজকাল প্রায়ই উঠে গেছে। সন্ধ্যায় শুরু কৃষ্ণকলি, ফিরকি, কাদম্বিনী সবাই বয়স্করা দেখার পাগল। আমি তাগিদ দিয়েও সাড়া পাইনে। ইহলোকের মজা সিরিয়াল উপভোগ করাটা ইহলোকের মজা সিরিয়াল উপভোগ করাটা সান্ধ্যকালিন প্রার্থনার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে দানব প্রবাসী মনে হয়।

নিজেকে দারুণ অপরাধী মনে হয়। এতদিন একত্রে সান্ধ্যকালিন করেছি। ততদিনে টিভি ছিল না, ছিল না গ্রামীণ পর্যায়ের ‘আকাশ ডিস! এখন টিভি, আকাশ ডিস এসেছে। এখন মোবাইলে সিরিয়াল, কার্টুন নয় বড় ওয়াইড স্ক্রিনে সুন্দর করে টিভিতে দেখা যায়। সুন্দর ও স্বচ্ছ ছবি, বিটিভি, বিটিভি ওয়ার্ল্ড, বিটিভি সংসদ, বিটিভি চট্টগ্রাম ছাড়াও আরো অনেক ইন্ডিয়ান টিভি চ্যানেল। গ্রামগঞ্জে যেখানে নেট পাওয়া যায় সীমান্ত এলাকায় সবাই নেট ঘাটছে।

মাঝে মাঝে দেখি এক নিরালা জায়গায় সমগোত্রের শিশুরা একত্রে চার পাঁচজন অর্ধবৃত্তাকারে মোবাইল দেখছে। তারা মুভি দেখছে, কার্টুন দেখছে না পর্ন মুভি দেখছে!

মোবাইলের ইন্টারনেট সংযোগে নানাবিধ উপাচার থরে থরে সাজানো। কোনটা ব্যবহার করব, কোন গ্রহণ করব সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। ডিজিটাল যুগ আমাদের জীবনটাকে উৎকর্ষে যেমন নিতে সক্ষম, তেমনি জীবনটাকে দুর্বিসহও করে তুলতে পারে যদি নীতি বহির্ভূত মিডিয়াগুলো বেশি পরিমাণে আকড়ে ধরি।

প্রশ্নটা হল আমরা কি জীবনে সাফল্য চাই ইন্টারনেটের মাধ্যমগুলো সঠিক ব্যবহার করে, না নেতিবাচক দিকগুলো প্রাধান্য দিয়ে চরিত্র হনন করব। ইন্টারনেট মাধ্যম খারাপ নয়, নির্ভর করবে আমরা ডিজিটাল মাধ্যমটা কীভাবে ব্যবহার করি!

জর্জ রুরাম গারো সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট কবি, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক।

আরো লেখা…

http://কামারখালি গ্রামবাসীদের আহাজারি থামছেই না।। জর্জ রুরাম

পাস্টর শৈলেন্দ্র আরেং আপনি স্বর্গবাসী হোন ।। জর্জ রুরাম

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost