Thokbirim | logo

১লা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

করোনাক্রান্তিকালে রবার্ট মানখিনের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প

প্রকাশিত : আগস্ট ২৩, ২০২০, ১১:২৮

করোনাক্রান্তিকালে রবার্ট মানখিনের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প

কোভিড-১৯ মানে করোনা ভাইরাস পুরো পৃথিবীকেই পাল্টে দিয়েছে। কতজনকে কতভাবে নিঃশ্ব করেছে আর কতজনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে তার ইয়ত্যা নেই। বিশেষ করে অর্থনৈতিক বিপযয় গুরুত্বেরসহিত দেখতে হচ্ছে। বাংলাদেশে বসবাসরত আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউ ব্যবসায় লস খেয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিছেন, কেউবা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে গেছেন। এই সময় শহরে পড়ুয়া বিশেষ করে যারা টিউশনি করে পড়ালেখা করতেন, সংসারেও খরচ যোগাতেন তারা পড়েছে বিপাকে। বাড়ি গিয়েও অর্থনৈতি সমস্যার কারণে কিছু করতে পারছে না। পড়তে হচ্ছে উভয় সংকটে। ফলে অনেককেই চিন্তা করতে হচ্ছে বিকল্প পন্থা।

ধোবাউড়া থানার মান্দারতলি গ্রামের ছেলে রবার্ট মানখিন। পড়ালেখা করছে ধানমন্ডির নিউ মডেল কলেজে। একাউনটিং সাবজেক্ট তৃতীয় বর্ষে। মা বাবা থাকে গ্রামে। দুই বোন। ভাই বলতে সে একাই। ঢাকা শহরে থাকে নতুন বাজার এলাকার ভোটঘাটে।

করোনাক্রান্তিকালে টিউশনি বন্ধ, আবার বাড়ির অবস্থাও ভালো না। মা অসুস্থ সবমিলে পড়তে হয়েছে আর্থিক সংকটে। ফলে অনেক ভেবে চিন্তে নেট গেটে শুরু করেছে অনলাইন ব্যবসা। কিন্তু তার ব্যবসা হচ্ছে গারো সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী কাচামালের ব্যবসা। যেমন- নাখাম, কুচিয়া, কচিয়াগ্রান, মিয়া, সিপ্রু ইত্যাদি। তার ব্যবসার বয়স মাত্র দুইমাস। কিন্তু এই দুই মাসেই মানুষজনের আস্থা অর্জন করতে শুরু করেছে রবার্ট। প্রথম মাসেই প্রচুর বেচাবিক্রি হয়েছে তার। তার দেখাদেখি বর্তমানে অনেকেই চলে এসেছে অনলাইন ব্যবসাতে।

রবার্ট জানায়, আমার হাতে টাকা ছিলো না। আমি মাত্র ২৫০০ টাকা দিয়ে শুরু করি। কিন্তু মানুষজনের প্রচুর সাড়া পেয়েছি। প্রথম মাসে বেশ ভালোই বিক্রি করেছি। আমি কাজটা শুরু করি জুলাই মাসের ৮/৯ তারিখ থেকে। আমি আগে অনলাইনে দেখেছি, চিন্তা করেছি তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি চিন্তা করেছি, জামাকাপড় বিক্রি করলে তো আমার চলবে না। জামাকাপড় দুইমাস কিংবা ছয়মাস পরপর মানুষজন কিনবে কিন্তু সেটা দিয়ে তো আমার খাওয়া, ভাড়া চলবে না। তাই আমি চিন্তা করেছি মানুষজন ডেইলি ব্যবহার করে এমন জিনিস। এরপর আমি আমাদের নিজেদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন, নাখাম, কুচিয়া, মিয়া, হাংখি, সিপ্প্রু বেচার সিদ্ধান্ত নেই এবং গ্রাম থেকে আনা শুরু করি।

নাখাম

নাখাম

রবার্ট ইতোমধ্যে ঢাকা শহরের সব জায়গায় ডেলিভারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। শুধু ঢাকার ভেতরই তার কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। সে ঢাকার বাইরেও যেমন- পাবনা, বরিশাল, খুলনা, চাতক, নারায়নগঞ্জ ইত্যাদি শহরগুলোতে ডেলিভারি দিয়েছে।

অনলাইনে আরো কেউ বিক্রি করে কিনা জানতে চাইলে রবার্ট জানায়, শুরুতে আমি একাই অনলাইনে নাখাম দিতাম। এখন আমার দেখাদেখি বেশ কয়েকজন এসেছে। অনেকে বলে, আমি কম দামে বিক্রি করি কিন্তু অন্যরা আমার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করে। আমি আসলে সব বিবেচনা করে দামটা রাখি। কিন্তু কেউ যদি আমার কাছ থেকে কিনে নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে তাহলে আমার বলার কিছু নাই। বিশেষ করে কেউ কেউ শামুকের দাম নিয়ে কথা বলে।

পণ্যের মান সম্পর্কে রবার্ট বলেন, আমি সব সময় মান নিয়ে চিন্তা করি। তাই কিছু বিষয় নিশ্চিত না হয়ে অর্ডার নিই না। আবার গ্রাম থেকে এমন জিনিস আসবে যা নষ্ট হয়ে যাবে, সেটা নিয়েও চিন্তা করি। আমি এমন নাখাম দিবো দুদিন পর আর খাবে না, এমন নাখাম দিতে চাই না। কারণ মান খারাপ দিয়ে নিজের ইমেজ নষ্ট করতে চাই না। যতদিন কাজ করবো মান নিয়েই কাজ করতে চাই।

সারাদিন কেমন ডাক আসে জানতে চাইলে বলেন, সারা দিনিই মেসেজ আসে। কেউ নেয়, কেউ দাম জিগায়। আবার অনেকে বারবার নক করে শুধু দাম জানার জন্য আর কমানোর জন্য। যেমন আজকেও অনেক মেসেজে এসেছে!

গারো ছাড়াও ক্রেতা আছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, গারো ছাড়াও আছে। বিশেষ করে বাঙালি ক্রেতা। তারা নাখাম নেয়, কুচিয়া নেয়। একবার মিরপুর পল্লবীতে একজন বাঙালি আপু কুচিয়া নিয়েছে। আপু একটু একটু গারো ভাষাও জানে। মনে হয় তার গারোদের সাথে চলাফেরা আছে।

কুচিয়া

কুচিয়া

বিপত্তির কথা বলতে গিয়ে বলেন, ঠিক মত ডিরেকসন না দিলে হয়। যেমন- একজনকে কুচিয়া দিয়েছি। তারা ফোনে বলেছে ঠিকমত পরিস্কার করি নাই। মাথা লেজ ফেলি নাই। এখন তারা যদি না বলে আমি তো নিজে থেকে করতে পারি না। একেকজনের একেক অভিরুচি। আবার একজন শামুক ১ কেজি নিবে বলে অর্ডার করেছে। পরে কেরিং খরচ শুনে নেয়নি। এখন ১ কেজি শামুক নিয়ে অপরিচিত জায়গায় যাবো, সেখানে যেতে আসতে যে খরচ সেটা তো দিতে হবে। আর অপরিচিত জায়গা হলে রিক্সাও লাগতে পারে তখন তো খরচ আরো বেড়ে যায়। কেউ কেউ কেরিং খরচ শুনে বাসায় এসে নিয়ে যায়। কিন্তু দেখা গেছে বাসায় আসতে যেতে যে খরচ আরো বেশি পড়েছে।

আবার অনেক ক্রেতা কিছু কিছু পণ্য চায় কিন্তু সেগুলো তো দিতে পারি না।

ক্রেতাদের ব্যবহার নিয়ে বলেন, বেশিরভাগই ভালো ব্যবহার করে। বাড়তি ভাড়া দিয়ে দেয়। কিছু কিছু আছে জানে না তারা একটু অন্যরকম আচরণ করে।

কেউ সহযোগিতা করেছে কিনা জানতে চাইলে বলেন, শুরুতে কেউ করেনি। নিজের সামান্য টাকা দিয়ে শুরু করেছি। আমার কাজ দেখে আমেরিকা প্রবাসী বাবুল ডি. নকরেক নক করেছেন। তার সাথে কথা হবার পর তিনি জানান, তিনি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশ হাজার করে টাকা দিয়ে সহযোগিতা করে থাকেন। পরে তিনি আমাকে বিনাসুদে বিশ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন। আমি এক সময় সেটা শোধ করে দিবো। উনি প্রতিদিনই আমার খবর নেন, মেসেঞ্জারে নক করেন। কথা হয় তাঁর সাথে।

হাংখি

হাংখি

রবার্ট তার স্বপ্ন নিয়ে বলেন, আমি পড়ার পাশাপাশি এই কাজটি চালিয়ে যেতে চাই। আমার কলেজের টিচারও আমাকে নক করে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তিনিও নাকি আমার কাছ থেকে জিনিস কিনবেন। আমি চাই গ্রামে যারা আমাকে সহযোগিতা করছে তাদেরকে সহযোগিতা করা। কারণ তারা তো বেশিদিন সহযোগিতা করবে না। আর যারা পড়ছে কিন্তু টাকার সমস্যা আমি চাই তাদের সহযোগিতা করতে আর তারাও আমাকে সহযোগিতা করবে।

।। থকবিরিমের বিশেষ প্রতিনিধি

আরো লেখা

রবার্টের পেইজ লিঙ্ক

https://www.facebook.com/Roberts-E-Mart-101845778288983

মিখাইল আরেং জনির সাক্ষাৎকার…

https://thokbirim.com/2020/08/21/%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8b%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%ae%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%a4%e0%a7%8b-%e0%a6%b8%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%87-%e0%a6%9b%e0%a6%ac/

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x