Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

মান্দি সমাজে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে গবেষণা জরুরি । আলবার্ট মানখিন

প্রকাশিত : আগস্ট ২১, ২০২০, ১৭:৩৮

মান্দি সমাজে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে গবেষণা জরুরি । আলবার্ট মানখিন

আলবার্ট মানখিন। গারো সম্প্রদায়ের একজন গবেষক, চিন্তক এবং এনজিও ব্যক্তিত্ব। জন্ম ১৯৫০ সালে মধুপুর গড়াঞ্চলের গারো অধ্যুষিত  সাধুপাড়া গ্রামে। বাবা রমেশ দফো মাতা ক্যাট্রিন মানখিন। দুজনই টিচার ছিলেন। আলবার্ট মানখিনের পড়ালেখা প্রথমে বান্দুরাতে তারপর নটরডেম কলেজ এরপর কলকাতা তারপর বার্থ ইউনিভাসিটি লন্ডন থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মক্ষেত্রে  কারিতাস বাংলাদেশের এডমিন্সিট্রেটিভ ডিরেক্টর ছিলেন। পরে ২০০৩ সালে নিজেই সিপ্রাড নামে এনজিও খুলে গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেন। এখনও গবেষণা কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন দেশিয় এনজিওগুলোতে কনসালটেন্সির কাজ করছেন। পরিবারিক জীবনে দুই মেয়ে এক ছেলের পিতা তিনি। স্ত্রী মিলন চিসিম গারো নারী উদ্যোক্তা ১৯৯৯ থেকে ট্রাইবালক্রাফ্ট নামে দোকান পরিচালনা করে আসছেন। আলবার্ট মানখিনের সাথে তাঁর বাসায় লেখক সুমনা চিসিমসহ থকবিরিম সম্পাদকের আলাপ হয়। সেই আলাপে আলবার্ট মানখিন বর্তমান সময়ে আলোচিত আদিবাসী শিশুদের নিজ ভাষায় পড়ালেখা, NCTB- পাঠ্যসূচি, তাদের কার্যক্রম নিয়ে বিস্তর আলাপ করেছেন। সেই আলাপের বিশেষ অংশ থকবিরিম পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো- সম্পাদক।  

থকবিরিম : NCTB  নিয়ে বলেন…

আলবার্ট মানখিন : NCTB- হচ্ছে ন্যাশনাল কারিকুলাম। তারা প্রি-প্রাইমারি থেকে শুরু করে ক্লাশ টেন পর্যন্ত পাঠ্যবই প্রকাশ করে। এটার দায়িত্বে NCTB. ২০১০ সালে বর্তমান সরকার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয় সেটা হচ্ছে শিক্ষা পলিশি ২০১০।দেশের সমস্ত শিশু শিক্ষা পাবে। সেই পলিশিতে একটা নিয়ম আছে। এখন আদিবাসী শিশুরা কীভাবে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত? সেখানে ব্যাখ্যা আছে এভাবে- আদিবাসী শিশুরা তাদের পরিবারে, তাদের পরিবেশে, তাদের গ্রামে তারা থাকে। বাঙালা ভাষা তারা শিখে না। তার জন্য যখন তারা পাঁচ বছর পরে স্কুলে যায় তখন বিরাট ধাক্কার সম্মুখীন হয়। কারণ ভাষা তো বাংলা, তারা বুঝতে পারে না। এবং টিচার যদি বাঙালি হয় তাহলে আরেকটি মাইনাস পয়েন্ট। সেক্ষেত্রে  কী করা যায়? পলিসিতে আসছে.. সেটা হচ্ছে আদিবাসী শিশুদের জন্য সরকার তাদের ভাষায় বই ছাপাবে। প্রি-প্রাইমারি থেকে ক্লাশ থ্রি পর্যন্ত। সেই সুবাদেই আমরা ধপে ধাপে প্রথমে প্রি প্রাইমারি অর্থাৎ যারা নাকি  মাত্র স্কুলে যায়, লিখতে পড়তে শুরু করেছে সেটা ২০১৬ সালে শুরু করেছি সেটা ২০১৭ সালে প্রকাশ হয়েছে। ২০১৯ সালে ক্লাশ থ্রি। তবে ক্লাশ ওয়ান, টু, থ্রি এই তিনটা ধাপে সরকার অনুমোদন করেছে যাতে আমরা প্রাইমারি লেবেলে কাজ করি। NCTB-তে যে মেইন পাঠ্যসূচি কারিকুলাম আছে সেই অনুযায়ী আমরাও কাজটি করছি।

এইখানে যে সুন্দর একটা সুযোগ আছে সেখানে কিছু কবিতা প্রবন্ধ ছাড়া আমরা আমাদের মতো আমাদের প্রেক্ষাপট মতে আমদের শিশুদের উপযোগী করে লিখতে পারি। রচনা করতে পারি।

যেমন-‘জার্নি’ এটা আমরা আামাদের মতো করে রচনা করতে পারি বা একটি গারো গ্রামে বর্ষাকাল কীভাবে আসে,  শীত কীভাবে আসে কিংবা কীভাবে উৎসব আসে বা হয় সেটা আমরা আামদের মতো করে আমদের শিশুদের জন্য উপযোগী করে রচনা করতে পারি। যেন শিশুরা বলতে পারে এটা আমাদেরই কথা, আমদেরই বিষয়। NCTB-র কাজে সেই সুযোগটা আছে। আমি সেখনে টিম লিডার হিসেবে কাজ করছি। আমারা ৬/৭জন আছি সবাই গারো।

 লেখক ও গবেষখ আলবার্ট মানখিন

লেখক ও গবেষক আলবার্ট মানখিন

থকবিরিম : যারা পাঠ্যসূচি তৈরিতে কাজ করছে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা…

আলবার্ট মানখিন : যারা পাঠ্যসূচি তৈরিতে কাজ করছে তাদের অনেক বছর যেমন ৭/৮ বছর গারো সংস্কৃতি- ভাষা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। যেমন তর্পন ঘাগ্রা, সে ১৫/২০ বছর ধরে কাজ করছে। তারপর বাঁধন আরেং সেও ৮/১০ বছর কাজ করছে। তারপর বাসর দাংগো অনেকদিন থেকে এনজিও চালাচ্ছে সেখানে আমাদের গারো ভাষা নিয়ে কাজ করছে। সুমনা চিসিম সেও দীর্ঘদিন ধরে গারো ভাষা সাহিত্য নিয়ে কাজ করছে, লিখছে। সৃজন রাংসা সে গারো ভাষা সম্পর্কে ভাল জানে। আর একজন জনি ওয়ারি নকরেক। সেও কয়েকবছর ধরে কাজ করছে। আমদের মান্দিদের আদল চেহারা, তারা কোন পরিবেশে থাকে খেলে এইসব সে ভাল আঁকতে পারে। সে আর্টস্টি।

থকবিরিম : ভবিষ্যৎ কী দেখছেন…

আলবার্ট মানখিন : প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ১. নিচের লেবেলে যখন শুরু হয় বাচ্চারা যেন ধীরে ধীরে তারা পড়তে লিখতে এবং বলতে পারে আর বুঝতে পারে। এটাই.. লেখা পড়ার উদ্দেশ্য। টিচার নিজের ভাষার হলে তারা যেহেতু নিজের ভাষায় পড়ায় সেহেতু আমাদের প্রথম যারা শিখতে আসছে তারা সহজেই বুঝতে পারবে শিখতে পাবে যেটা বাংলা হলে দোভাষী হয়ে যায় যেটা তাদের শিক্ষাকে প্রতিহত করে, ব্যহত হয়। সেটা যখন নিজের ভাষায় শিখানো হয় তখন সহজেই তারা বুঝতে পারে। নিজের ভাষায় নিজের পরিবেশে সেখাটা আসল শেখা…

ক্লাশ ওয়ানে তারা কিছুটা শিখে ক্লাশ টুতে মোটামুটি থ্রিতে নিজ ভাষা। প্রি প্রাইমারি থেকে। ক্লাশ ফোরে তারা বাংলা ভাষায় চলে যাবে। ক্লাশ টু/থ্রি থেকে একটা ব্রিজিং আছে যাতে তারা ক্লাশ ফোর বা ফাইভে গিয়ে বাঁধার সমস্যা না হয়। হঠাৎ করে সমস্যায় না পড়ে।

থকবিরিম : মাঠ পর্যায়ে স্কুলে টিচার আছে?

আলবার্ট মানখিন : পলিশি লেভেলে তো ঠিক আছে। সরকার ফ্রি করছে কিন্তু গ্রামে যেখানে এটা টিচাররা শিক্ষা দেবে এটা বড় একটা ঘাটটি আছে। এখনও যারা টিচার তারা ট্রেনিং পায়নি, তারা কীভাবে শিশুদের শিখাবে সেটা ট্রেনিং দিতে পারেনি। নিজস্ব ভাষার টিচার নিতে হবে। যাতে তারা পড়াতে পারে। কিন্তু সেটা সাথে সাথে আমরা ডিমান্ড করেছি যাতে টিচারদের রিক্রুট করে । তাদের ট্রেনিং দেয়্ আমাদের দাবি সরকারের ক্ষমতা আছে ৪/৫শ টিচার নিয়ে তাদের ট্রেনিং দিয়ে তারপর পড়াতে। যতদিন হবে না এটা ততদিন বাস্তবায় হবে না। তবে এখানে লেকিং আছে। কিছু জায়গায় টিচারা বই পেয়ে আগ্রহ নিয়ে শেখায়। কিন্তু তাদের লেকিং হচ্চে কীভাবে সেটা পড়াতে হবে সেটার ট্রেনিং নেই।

বড় সমস্যা হচ্ছে গ্রামের স্কুলগুলোতে যে সমস্যা হচ্ছে অনেক টিচার সরকাররি টিচার হবার যে ক্রাইটেরিয়া সেটার যোগ্যতা নাই। চার্চ যেহেতু পরিচালনা করে তারা চায় তারাই শিক্ষা দেবে। কিন্তু এই ক্রাইটেরিয়া নিয়ে যেমন নন মেট্রিক ট্রেনিং তেমন নেই তাহলে তো সরকারি টিচার হিসেবে যেতে পারবে না। আর নিলে তো অধিকাংশ টিচার বাদ পড়ে যাবে। আমার মতে, ভবিষৎ চিন্তা করে নতুন টিচার নিতে হবে যারা ডিগ্রি পাশ ইন্টার পাশ যারা অন্তত প্রশিক্ষিত তাদের দিয়ে সরকারি বেতন স্কেল স্কুলগুলো রিপ্লেজ করা।

থকবিরিম : পিটিআই ছিলো.. এখন তো নাই..

আলবার্ট মানখিন : আমাদের সমতলে ট্রেনিংয়ের জন্য সেটাপ নাই। পার্বত্য চট্টগ্রামের সরকারিভাবেই তিন জেলাতেই নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টার আছে। আমার চিন্তা মতে, আমাদের এখানে বিভিন্ন জায়গায় যে টিচার্স ট্রেনিং সেন্টার আছে সেখানেই কারিকুলাম করে আমরা /অনায়াসে করতে পারি। এতে কোনো সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। আমি যেভাবে বলেছি প্রথমেই আমাদের টিচার রিক্রুটমেন্ট দরকার টিচারদের ট্রেনিং দরকার এবং কারিকুলাম ঠিক করে ট্রেনিংয়ে যেতে হবে এটা না হলে এই কাযক্রমটা সাফল্যের মুখ দেখবে না। এখানে আমি যেটা জোর দেবো- আমাদের যারা লিডার আছে তাদের এগিয়ে আসা উচিত। সরকারের সাথে এগিয়ে আসতে হবে। ভাষা সংরক্ষণে।

থকবিরিম : আপনাদের ওয়ার্কসব কি যথেস্ট?

আলবার্ট মানখিন : না এটা যথেস্ট না।  যেমন ক্লাশ থ্রি, এটা অনেকগুলো ১২০ পৃষ্ঠার একটা  সাধারন বই। এখানে আমরা ৫দিন ৫ দিন করে ৩/৪টা ওয়ার্কসব করেছি। মানে একবার ৫দিনের এটাই শেষ এমন না। অর্থাৎ একই জিনিস ডেভেলপমেন্ট করতে ৪বার বসতে হয়। বা তিন বার বিষয় বস্তর উপর। কারণ আমদেরকেও চিন্তা করতে হয়,  যে কবিতা দিবো সেটা মান্দিদের বিষয় ঠিক রিফ্লেক্ট করবে কিনা, বাচ্চরা কতটুকু বুঝতে পার আর শব্দ চয়ন যাতে সংক্ষিপ্ত হয়  এটার উপর আমরা গুরুত্ব দেই। বাক্য যেন ছোট হয়।

লেখক ও গবেষক আলবার্ট মানখিন লিখিত বই

থকবিরিম : যাদের এনজিও আছে একাডেমির কর্মকর্তা তাদের যুক্ত করেছেন। কবি সাহিত্যিকদের যুক্ত করোর চিন্তা করেছেন কি?

আলবার্ট মানখিন : এই রকম চিন্তা ছিলো না। কারণ কবিতা লিখলেই তাকে যুক্ত করতে হবে এই রকম সরকারিভাবে নিয়ম নাই। সরকার সবসময় বায়োডাটা নেয় তারপর তাকে রিক্রুট নিতে বলে। মাল্টিলেংগুয়াল ফোরাম আছে  অরগানাইজাসেন আছে ৮/১০টি এনজিও জড়িত… তাদের সাথে যারা জড়িত এই ফোরারের সাথে, অনেকটা সরকার চিন্তা করে তারা ভাষা নিয়ে কাজ করছে। আমরা সেই জিনিসটাই গুরুত্ব দিয়েছি। যারা ভাষা নিয়ে কাজ করছে আর এই ফোরামের সাথে জড়িত থেকে কাজ করছে..

আবার সংখ্যাও আছে যেমন ৬জনের বেশি নেয়া যাবে না। এবং কবিতা লিখলেই খুব অবদান রাখবে এটাও না।

থকবিরিম : মাঠ পর্যায়ে গবেষণা আছে?

আলবার্ট মানখিন : এখানে কোনো রিসার্চ বেজ নাই।বাংলার আছে।কিন্তু গারোদের কোনো গবেষণা নাই।

থকবিরিম : পাঠ্যসূচিতে কী ভাষা? আবেং না আচিক?

আলবার্ট মানখিন : আচিক। মেঘালয়, আবেংও আছে কিছু কিছু মিশানো অনেকটা। যাতে শিশুদের বোধগম্য হয়। আচিক যেমন আছে আবেংও আছে।

থকবিরিম : বর্তমানে কী করছেন আপনি?

আলবার্ট মানখিন : বর্তমানে আমি বিভিন্ন এনজিওর কনসালটেন্সি দিচ্ছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গবেষণার কাজও করছি। কারণ গবেষণা হচ্ছে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ধারা। এটা আমি সব সময় কনটিনিউ করতে থাকি। যদিও টাকা লাগে আমার টাকা নাই । আমাদের মান্দি সমাজে নতুন নতুন জ্ঞান সৃষ্টির কাজে গবেষণার কাজে নিয়েজিত করা উচিত। গবেষণা না করলে যৌক্তি পর্যয়ে যাওয়া যায় না। আমাদের সিরিয়াস গবেষক নাই। সবচে সমস্য হচ্ছে একজনের লেখা কোট করা। কিন্তু আমরা এটা করি, লেখাও নিচ্ছি কিন্তু প্রাপ্তি স্বীকার করছি না। আমাদের মধ্যেও গবেষক আছে যেমন থিওফিল নকরেক, গ্রেনার মারাক আরো কয়েকজন আছে যারা এমফিল করেছে… তারা গবেষণা পদ্ধতি জানে। প্রকৃত অর্থে গবেষণার পদ্ধতি আছে।

থকবিরিম : আপনাকে ধন্যবাদ!

আলবার্ট মানখিন : তোমাকেও ধন্যবাদ!

গারো ভাষা ও সাহিত্যের স্বরোপ-১ ।। বাঁধন আরেং

https://www.facebook.com/thokbirim/videos/1163701897348748

সামাজিক বনায়নের নামে আদিবাসীদের নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ।

Gepostet von Thokbirimnews.com am Mittwoch, 16. September 2020




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost