Thokbirim | logo

১লা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ১৫ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত : রে রে ।। পর্ব-২।। মতেন্দ্র মানখিন

প্রকাশিত : আগস্ট ১৮, ২০২০, ০৬:৪৪

গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীত : রে রে ।। পর্ব-২।। মতেন্দ্র মানখিন

রে-রে সাধারণত চার প্রকারের যথা- ১. রঙের খেলা, ২. পিরিতি, ৩. রামায়নী ও ৪. সিমাসা। তবে আরেক শ্রেণির রে-রে শোনা যায় তার নাম হতে পারে থাস্কি।

গবেষকদের মতে রে-রে আসলে দুয়ালগোত্রের মৌখিক এক লোক সঙ্গীত। যা তারা মুখে মুখে ছন্দ অলংকারে গেয়ে থাকে। তাদের সাংসারিক পরিবারিক, সামাজিক জীবন যাত্রা, পালা পার্বণ এবং নানা উৎসব অনুষ্ঠানে যুগ যুগ ধরে রে-রে একটি বৈচিত্র্যময রূপরেখা নিয়ে আসছে। অনুষ্ঠান ছাড়াও তারা গৃহেকাজে, মাঠের কাজে অথবা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মন ভুলানোর জন্য যে কোনো সময় রে-রে বানিয়ে শুনাতে পারে। গারোদের জীবন ধারার সাথে মিলিত বিভিন্ন স্রোতাম্বিনী যেমন- কংশ, নিতাই, সোমেশ্বরী, গনেশ্বরী, বুগাই, মহাডেউ আরও অনেক নদীর মতই ছন্দময়। বনের মর্মরে, ফুলের সৌরভে, পাখীর কূজনে চন্দ্রিমার হাসিতে নন্দিত গারোদের প্রাণ। আবহমানকাল ধরে গারো সংস্কৃতির এইযে অমৃত ধারা প্রকৃতির সাথে এক হয়ে প্রবাহিত হয়ে আসছে তা কেউ কাগজে কলমে ধরে রাখে নাই। এ কালজয়ী গারো লোক সাহিত্যের মূল্য কেউ মূল্যায়ন করে দেখেনি। তাৎক্ষনিকভাবে এই যে সুরে ছন্দে মিলে মনের ভাব ভাষা  প্রকাশ করতে পারা তখনকার সেই অশিক্ষিত, নিরক্ষত গারো সমাজের মত বর্তমান শিক্ষিত গারো সমাজে সেইরূপ কবি, সাহিত্যিক ও শিল্প কোথায়?

নিচে ক্রমান্বয়ে রে-রের বর্ণনা দেয়া হল-

১. রঙের খেলা

জীবনে প্রেম, বিরহ বিচ্ছেদ, আনন্দ, বেদনা, সুখ-দুখ, এসব চিরন্তন সত্য অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা মনের মাধুরী বা রং দিয়ে এই রে-রে বানানো হয় বলেই হয়তো এই রেরের নাম হয়েছে রঙের খেলা। তাছাড়া গারোদের মধ্যে “রং খাল্লা’ বা ঠাট্টা তামাসা করা বহুল প্রচলিত। এই রে-রে প্রধানত গারোদের দুয়াল গোত্র এলাকাতেই প্রচলন বেশি। রে-রে গাওয়াকে দুয়াল গোত্রের ভাষায় রেরে খাল¬া বলে। এখানে খাল¬া বলতে খেলা করা বুঝালেও রে-রে গীতের ক্ষেত্রে কেন খাল্লা বা খেলা শব্দটি  এলো? এ প্রশ্ন থাকা স্বাবাভাবিক।

বাংলায় অনেক সময় আমরা প্রেম লীলা, প্রেম-খেলা, এই সব শব্দ আমরা পাই। গভীর ভাবে ভাবতে গেলে প্রেম খেলার মতই এই  রে-রে সঙ্গীত’ও একটা খাল্লা বা খেলা। তবে এটা দৌড় ঝাপ খেলা নয়। এ্টা মনের খেলা। ভাব বিনিময়ের এর অদৃশ্য খেলা। যুবক যুবতীরা যখন একে অপরের সাথে ভাব বিনিময় করে রে-রের মাধ্যমে তখন তাদের মনের মধ্যে চলে অদৃশ্য এক খেলা। এই অর্থেই হয়তো রে-রে খাল্লা হয়েছে। এখানে শুধু মাত্র গারো ভাষায় অথবা গারো বাংলা সংমিশ্রনে রে-রে খেলা হয়। রে-রে শুরু করার বৈশিষ্ট হচ্ছে- ৩/৪জন যুবক যুবতী মুখোমুখী হয়ে যে কোন দল প্রথমে হো…শব্দ দিয়ে লম্বা টান দেয় এবং রূপকের সাহায্যে কথা এবং দু লাইন গাওয়ার পর ‘হা-রে-রে বা হা রা-রা বলে।  এর সাথে দোহার বা পালরাচাকগবারা এক সাথে উল্লাসব্যাঞ্জক ধূয়া তুলে। এতে রে-রে খালা অনুষ্ঠান আরও জমিয়ে ওঠে। দলে দলে যুবক যুবতী পাল্টা-পাল্টি রে-রে খাল্লা হয়ে হয়ে থাকে যেমন-

মহিলা- হো…. মসিনি গ্রংও (ফুল দিইয়া চইদ্য ফুল) ২

নাংনিং রেয়েংনা মাননাজা রামা চেল্ললা দূর্গাপুল। হা-রে-রে ।

বাংলা

মইষের শিঙ্গায় সাজাইয়া ফুল তুলছে চোদ্দ ফুল

তোমার লগে যাইতাম না অনেক দূরা দুর্গপুর।

ব্যাখ্যা: এখানে ‘মসি’ মানে মহিষ একটি রূপক। আসলে এটা তার প্রেমিক। অন্তরের প্রেম ফুলহারে-সে তার প্রেমিক সুজনকে সাজাতে চায় এবং তার সাথে যেতেও ইচ্ছে করে। কিন্তু মাতৃতান্ত্রিক গারো সমাজে কীভাবে মেয়ে হয়ে সে পুরুষের সঙ্গে যাবে। তাছাড়া প্রেমিকের বাড়ি দূর্গাপুর। সুতরাং এতদূর হেঁটে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। এই কথাটি এই রে-রেতে বলা হয়েছে।

পুরুষ : হো……….অতদূরা যাইতনা (রামা চেল্লা দুর্গাপুল) ২

নাংনা দকিই হনগাননি সোনা চান্দি কানের দুল। হা-রে-রে।

ব্যখ্যা : এখানে পুরুষ প্রেমিক বলছে। তুমি আমার সাথে দূর্গাপুর পর্যন্ত  আসতে চাওনা বা আসতে পারবে না ঠিকই কিন্তু তুমি আসলে আমি তোমার জন্য সোনা চান্দি অথবা রূপার কানের দুল বানাইয়া দিতাম।

মহিলা : হো…চেল¬ই চেলে¬ই দং জকও (বাদাকিইবা আগানগান) ২

কদম ডালে বসিয়া বাঁশি বাজায় কালাচান। হা-রে-রে।

ব্যাখ্যা : প্রেম ভালবাসার ক্ষেত্রে দূরত্ব রচনা শুভ নয়। কথায় বলে চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল। প্রেমিক প্রেমিকার মধ্যে যদি মাঝে মাঝে সংলাপ না হয় কিংবা যোগাযোগ না থাকে  তাহলে সেই প্রেম ভেঙ্গে যেতে পারে। এই কথাটিই এখানে বলা হচ্ছে। আর একটি বিশেষ লক্ষ্যণীয় বিষয়- রে-রেতে  মাঝে মধ্যেই শুনতে পাবেন প্রেম যমুনার কথা। কালাচানের কথা। এই খানে বাশিঁ বাজায় কালাচান আছে। কালাচান মানে কৃষ্ণ। কৃষ্ণ কদম গাছের ডালে বসে বাঁশি বাজায়। কালাচান বা কৃষ্ণ এখানে রূপক আসলে কালাচান তার প্রেমিক।

পুরুষ: হো…গিৎচাকগিবা বিবালখো (আকি খালনা সালগমা)

মন ধীরে ধীরে যায় রাইসংমানি নকওনা। হা-রে-রে।

মহিলা: হো…মন ধীরে ধীরে যায় ( রাইসংমানি নকওনা) ২

দংনা চাকনা মানজিখাম রাংখ্রামনি খিয়ানা। হা-রে-রে।

পুরুষ: হো ….দংনা চাকনা  মানজিখাম (রাংখ্রামনি খিয়ানা) ২

মানা করি তোমারে ( জলের ঘাটে যাইওনা। হা-রে-রে।

মহিলা: হো…মানা করছ আমারে ( জলের ঘাটে যাইতামনা। ২

চিসাতনা রেয়েংয়ি মাংসা মাননা লাওয়ানা।  হা-রে-রে।

পুরুষ: হো…চিসাত না রেয়েংয়ি ( মাংসা মাননা লাওয়ানা) ২

ওয়াল জাসেং গিজানিন জাংগী সারা কাওয়ানা । হা-রেরে।

মহিলা: হো….. ওয়াল জাসেংগিজানিন (জাংগী সারা কাওয়া না) ২

মিমিনাবা সিকজকসা রাইসংফানি কথানা। হা-রে-রে।

পুরুষ: হো…… মিমিনাবা সিকজকসা ( রাইসাংমানি কথানা)২

হাই আংনিং রেগাননো জানজালি মারিনা। হা-রে-রে।

মহিলা: হো…… হাই আংনিং রেগাননো ( জানজালি মারিনা) ২

গামছা বদিলিয়াখো পাড়ার লোকে জানেনা। হা-রে-রে।

পুরুষ: হো…পাড়ার লোকে জানেনা (গামছা বদিলিয়াখো) ২

মান কেউ না আগানা ওয়ালসা ওয়ালগিনিনিখো। হা-রে-রে।

মহিলা: হো…ওয়ালসা ওয়ালগিনিনিখো (কেউনাবা আগানজা) ২

খাল্লা বাজু সিককখোখো গিসিক রাগানিনো রানাজা। হ-রে-রে।

পুরুষ: হো…..পালমনি রংথিখো (পালেং পালেং গামানজক)২

রাইসংমনি কথাখো রিমমা রিমমা খিনাজক। হা-রে-রে।

মহিলা: হো…রাইসংফানি কথাখো (রিমমা রিমমা খিনাজক)২

নাংনিং রে-রে খালিনিং ওয়ালজাসেং বায়াজক। হা-রে-রে।

পুরুষ: হো…ওয়াল জাসেং বায়েইজক (গিৎচাক গিৎচাক দাকিনং)২

আংনি রেয়েং ফাআওদো নাম্মিদাকি নিকগাননিং। হা-রে-রে।

মহিলা: হো…নাম্মি দাকি নিকগাননিং (নাংনিং রেয়েংফাআওদো)২

গিসিক নাংমানচাআওদে হাই আংনি রেইগাননো । হা-রে-রে।

আরো লেখা

https://thokbirim.com/2020/07/30/%e0%a6%aa%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%b8%e0%a7%87%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%82-%e0%a5%a4%e0%a5%a4-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a7%a7/




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x