Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বহুমাত্রিকতা, উদযাপনের রকমফেরে কোভিড-১৯ এর প্রভাব ও কিছু স্মৃতিচারণ ।।  মিঠুন কুমার কোচ

প্রকাশিত : আগস্ট ১৭, ২০২০, ২৩:৪৯

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বহুমাত্রিকতা, উদযাপনের রকমফেরে কোভিড-১৯ এর প্রভাব ও কিছু স্মৃতিচারণ ।।  মিঠুন কুমার কোচ

এবার ৯ই আগস্ট, ২০২০, আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস চলে গেলো, সেটা আজ নিয়ে ৮দিন হতে চলল, কিন্তু এই দিবসকে ঘিরে এখনো অনেক ভাবনা মাথায় ঘুরছে, অনেক স্মৃতি মনের কোণে বারবার উঁকি দিচ্ছে, যদিও এবারের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস অনেকটা নীরবে-নিভৃতে চলে গেছে। আদিবাসীদের অনেকেই এবারের আদিবাসী দিবস পালনের বিষয়টা লক্ষ্য করে থাকবে। তবে বাঙালি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই হয়তো এই দিবসটার আগমন টের পায়নি একটা অংশ ব্যতীত। কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে আরো অনেক কিছুর মত এবার অনলাইনে ভার্চুয়াল আদিবাসী দিবস পালন করতে হয়েছে, যা আসলে একেবারেই ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা। দিবসটির থিমেও করোনার সর্বব্যাপী প্রভাবের প্রতিফলন ঘটেছে, যে থিম মনের মধ্যে একটা ব্যথাতুর ভাবান্তর ঘটায়- “কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম।”

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস অন্যান্য দিবসের মত নিছক কোনো সাধারণ দিবস নয়, অন্তত আদিবাসীদের কাছে তো নয়ই। পহেলা বৈশাখ যেমন সমস্ত বাংলাদেশি, বাংলাভাষী, বাঙালি ও আদিবাসীদের সর্বজনীন উৎসব ও মিলনমেলা, তেমনি আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস বাংলাদেশের সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের একটি মিলনমেলা, ভৌগোলিক দূরত্বকে পাশ কাটিয়ে মানসিক দূরত্ব লাঘবের একটি দিন, একটি উৎসবের উপলক্ষ্য, অনেক দাবি, অনেক অপ্রাপ্তির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানান দেওয়ার একটি দিন। খুব সম্ভবত, বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখের মতই ৯ই আগস্ট আদিবাসীদের জন্য বিশেষ কিছু মুহূর্তের সমষ্টি, পাহাড়-সমতলের আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় মিলনোৎসব।

আর এ কারণেই প্রতিবছর শহিদ মিনারে দিনটিতে উপস্থিত থাকতে মুখিয়ে থাকতাম, যে দিনটি পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের বৈচিত্র্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে একই মঞ্চে উপস্থাপনের একটা মোক্ষম উপলক্ষ এনে দিত।

পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীদের বর্ণিল সংস্কৃতি উপস্থাপন, নিজ নিজ বিচিত্র ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে আদিবাসী তরুণ-তরুণীদের শহিদ মিনার ও এর আশেপাশে মুখর পদচারণা, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও ন্যায্য অধিকার প্রদানের দাবি সংবলিত ব্যানার, পোস্টার হাতে বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠনের শহিদ মিনার প্রাঙ্গণে অবস্থান আর মঞ্চে আদিবাসীদের স্বীকৃতি ও অধিকারের দাবি, শোষণ-বঞ্চনার প্রতিবাদে আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনদের অগ্নিঝরা ভাষণের স্ফুলিঙ্গ যেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলসহ নিকটবর্তী এলাকাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তো।

মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আমেজ মোহাবিষ্ট করতো আদিবাসী-বাঙালি নির্বিশেষে সকলকে। ফটোসাংবাদিকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের ক্যামেরাগুলো শশব্যস্ত হয়ে উঠতো আদিবাসীদের মোহনীয় সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মুহূর্তগুলোকে ধারণ করতে। শহিদ মিনারে আদিবাসী দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে জগন্নাথ হলে গিয়ে দলবেঁধে দুপুরের খাবার খাওয়া, অতঃপর হলের মাঠে, উপাসনালয়ে একটু বিশ্রাম গ্রহণ। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে পাহাড় বনাম সমতলের আদিবাসীদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ আর নারীদের রশি টানাটানি দিবসটিতে যোগ করতো বাড়তি মাত্রা।

ভৌগোলিক কারণে সবাই নিজ নিজ এলাকার দলকে সমর্থন করলেও তা হত খেলার স্বাভাবিক টানেই, তবে দর্শকসারিতে পাহাড় ও সমতলের ভৌগোলিক দূরত্ব একাকার হয়ে যেত পাহাড়-সমতল নির্বিশেষে একসাথে বসে খেলা দেখার কারণে। এই পাহাড় বনাম সমতলের প্রীতি ফুটবল ম্যাচে, রশি টানাটানিতে জয়-পরাজয় নয়, বরং খেলাটা উপভোগের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে ভাতৃত্ব ও সৌহার্দ্য বাড়ানোই থাকতো মূল লক্ষ্য। তাই খেলার ফলাফল যাই হোক না কেন, উপভোগ করতো সবাই, আর তাতে যেন প্রতিবারই জয় হতো খেলাধুলার চেতনার, খেলার ফলাফলে তারতম্য হলেও দৃশ্যত হারতো না পাহাড় কিংবা সমতলের কোনো দলই, ঘটতো না খেলাকে কেন্দ্র করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা, কেননা সবাই খেলার ফলাফল  ছাপিয়ে খেলার মুহূর্তগুলোকেই চূড়ান্তভাবে উপভোগ করতো। ক্ষণিকের জন্যে হলেও এই দিনটিতে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের দুঃখ কষ্টগুলো ভুলে থাকার কিছু রসদ পেতো। খেলার ফাঁকে, খেলাশেষে ফলাফল ভুলে সবাই  নিজেদের সুখ-দুঃখ, শোষণ-বঞ্চনা, সমস্যা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে বিক্ষিপ্ত আলোচনায় মেতে উঠতো।

পাহাড়-সমতলের মধ্যে ভৌগোলিক, জাতিগত, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক ও খাদ্যাভ্যাসজনিত শত বৈচিত্র্য ও পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও এই একটি দিনে সবাই যেন একই ছাতার নিচে, এক চেতনায় একাকার হয়ে যেত, সেই চেতনা হল- “আমরা সবাই আদিবাসী।” পাহাড়- সমতলের আদিবাসীদের এমন মিলনমেলা তাই স্বভাবতই ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বিশেষ কিছু হিসেবে আবির্ভূত হতো।

আদিবাসী দিবসকে কেন্দ্র করে এই যে এত এত স্মৃতিরোমন্থন করছি, মনে হচ্ছে এসব যেন কত আগের কথা। অথচ, করোনা ভাইরাসের কারণে শুধু এবারই সম্মিলিতভাবে শহিদ মিনারে বর্ণাঢ্যভাবে আদিবাসী দিবসটা পালন করা হয়নি। কিন্তু এই দিবসটার বৈচিত্র্য ও হৃদয়ের জোরালো আবেদনের কারণে এবার খুবই মিস করেছি দিনটা।

করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার বিভিন্ন আদিবাসী সংগঠন, নেতৃবৃন্দ ও সংস্কৃতি কর্মীরা ওয়েবিনার, জুম ক্লাউড মিটিং, ফেইসবুক লাইভে আলোচনা, সেমিনার, নাচ-গান উপস্থাপনের মাধ্যমে সর্বাত্মক চেষ্টা করেছেন দিবসটি অর্থবহভাবে উদযাপন করতে। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রেখে এর চেয়ে ভালোভাবে দিবসটি পালন করা বাস্তবিক কঠিনই বটে। নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলঙ্কার পরে সশরীরে উপস্থিত হয়ে সবাই নির্দিষ্ট কোন স্থানে একত্রিত হতে না পারলেও অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে নিজেদের সংস্কৃতির ধারক ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে, অনলাইন ভিডিওর মাধ্যমে গান ও নৃত্য পরিবেশন করে দিবসটিতে একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন।

আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও এক্টিভিস্টগণ কোভিড-১৯ মহামারীতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও জীবিকার সংগ্রাম, সরকারি সহায়তা থেকে আদিবাসীদের বঞ্চিত হওয়া, নামমাত্র কিছু ত্রাণ ও সহায়তা প্রাপ্তি, লকডাউন বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আদিবাসীদের ভূমি দখল, নির্যাতন চলমান থাকা প্রভৃতি বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ মোকাবেলায় বিভিন্ন আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী লকডাউন প্রথা ও এর কার্যকারিতার বিষয়গুলো বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে ও বিভিন্ন মহলে তা ব্যাপকভাবে প্রশংসিতও হয়েছে, পরবর্তীতে মূলধারার জনগোষ্ঠীর অনেককেই তা অনুসরণ করতে দেখা গেছে, এই বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। অনেক আদিবাসী তরুণ কোভিড-১৯ এর কারণে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যার্থে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন- আদিবাসীদের মধ্যে ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতাগুলো তাদের বর্ণনায় সঞ্চালক ও নেতৃবৃন্দ তুলে এনেছেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্যে জরুরি অর্থ ও ত্রাণ সহায়তা প্রদান, আদিবাসীদের ভূমি দখল, তাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ করতে সবাইকে আহ্বান জানিয়েছেন, সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

হতে পারে এবারের ভার্চুয়াল আদিবাসী দিবস পালন আদিবাসীদের একই মঞ্চে উপস্থিত করতে পারেনি, কিন্তু মানসিকভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে সহায়তা করেছে ঠিকই। কিছু কিছু গণমাধ্যমে এবারের আদিবাসী দিবসে ঘোষিত দাবি-দাওয়াগুলো ফলাও করে প্রকাশ করেছে। অনলাইনে ভার্চুয়াল আদিবাসী দিবস আয়োজনের কারণে দিবসটি পালনে সরকারি অনুমতি ও নিরাপত্তার ঝামেলা পোহাতে হয়নি এবার, এটা মন্দের ভালো একটা দিক ছিল, তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু কিছু স্থানে দিবসটি পালনে সেনাবাহিনীর বাঁধা দেওয়ার কথা জানা গেছে।

নিজ নিজ অবস্থান থেকে অনলাইন প্লাটফর্ম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ভিত্তি করে আদিবাসী অধিকারকর্মী ও অধিকারভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আদিবাসীদের দাবি-দাওয়া, অধিকার, শোষণ-বঞ্চনার কথাগুলো তুলে ধরেছেন, সরকার, সুশীল সমাজের কাছে সেগুলো পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। অনেক বাঙালি শুভাকাঙ্ক্ষী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গও বরাবরের মত এবারের আদিবাসী দিবসের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন, সংহতি জানিয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, যা আদিবাসীদের সামনে পথচলায় সাহস ও অনুপ্রেরণা যোগাবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে শারীরিকভাবে একে অপরের থেকে দূরে থেকেও কীভাবে পরস্পর সংযুক্ত থাকা যায়, পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়ে, আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কীভাবে করণীয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখা যায়, তারই নিদর্শন দেখা গেছে এবার, যা এককথায় অভূতপূর্ব। করোনা ভাইরাস আমাদের পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়ে অভিনব ও সৃজনশীল কিছু করতেও শিক্ষা দিচ্ছে।

এবারের আদিবাসী দিবস উদযাপনটা একক স্থানভিত্তিক ছিল না, ছিল নিজ নিজ অবস্থানভিত্তিক, আর এটাই পূর্বেকার আদিবাসী দিবস উদযাপন আর এবারের আদিবাসী দিবস উদযাপনের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হিসেবে থেকেছে। উদযাপনে ভিন্নতা ও নতুনত্ব থাকলেও পাশাপাশি উপস্থিত থেকে এবার পাহাড়-সমতলের পরস্পরের সান্নিধ্য উপভোগ করা হয়নি, একসাথে বসে প্রাণের কথা বলা হয়নি বলে একটা অতৃপ্তিবোধ ও অপূর্ণতা তো রয়েই গেছে। আসছে বছর সেই অতৃপ্তি ও শূন্যতা পূরণ হবে এই প্রত্যাশার মাঝেই তাই সান্ত্বনা খুঁজি আপাতত।

ততদিনে করোনা ভাইরাসের প্রস্থান ঘটুক, করোনার সাথে সাথে আদিবাসীদের ভূমি দখল, শোষণ-নির্যাতন, অবহেলারও অবসান ঘটুক, রচিত হোক সাম্যবাদী, মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না, সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘু শব্দদ্বয় স্রেফ গাণিতিক হিসেবে সংখ্যাগত পার্থক্য হয়ে থাকবে, ধর্ম ও জাতি বিবেচনায় বৈষম্য, বিভাজন বিরচিত হবে না, তবেই না আদিবাসী দিবস উদযাপনে চূড়ান্ত সার্থকতা অর্জিত হবে।

প্রচ্ছদ তিতাস চাকমা

লেখক পরিচিতি

কোচ সম্প্রদায়ের তরুণ লেখক মিঠুন কুমার কোচ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন।

আরো লেখা

আদিবাসী বিষয়ক বিবিধ তথ্যের প্রমাণ্য দলিল “আদিবাসীদের অধিকার ও আত্মপরিচয় গ্রন্থ” ।।  মিঠুন কুমার কোচ




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost