Thokbirim | logo

১৪ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

মায়া ।। তারা সাংমা

প্রকাশিত : আগস্ট ১৪, ২০২০, ১৩:২৭

মায়া ।। তারা সাংমা

সকাল সকাল সবজির ঠেলা নিয়ে বের হয় রহিমুদ্দিন। বেলা বাড়লেই পুলিশে তাড়া করে। শহরের গলি গলি ঘুরে তার প্রিয় গলিতে ঢুকতেই গলার জোর যেন বেড়ে গেল। জোরে জোরে হাঁক ডাক শুরু করে সে। এই সবজি… সবজি…

সেই বারান্দার দিকে তাকিয়ে বার কয়েক আবার হাঁক ছাড়ে সে। না, কেউ বের হচ্ছে না। আরো খানিক অপেক্ষা করে আবার হাঁক মারে। না, এত সময় এক জায়গায় থাকলে পেট চলবে না। হতাশ হয়ে অন্য গলিতে ঠেলা ঘুরিয়ে চলে যায়।

পরের দিন সকাল সকাল আবার ঠেলা নিয়ে বের হয় রহিমুদ্দিন। প্রায় প্রতিটা গলিতেই বাঁশ দিয়ে বেড়িকেট দিয়ে দিয়েছে। কাল থেকে আর ঠেলা নিয়ে বের হওয়া যাবে না। টুকরি করে অল্প স্বল্প নিয়ে বের হতে হবে। বেলা এগারটা পর্যন্ত ঘুরাঘুরি করে মাত্র ২৫০ টাকা বিক্রি। অথচ বউ আসার সময় একগাদা জিনিসপত্র নিতে বলেছে। মহাজনরে বুঝাইয়া আজকের টাকা মাফ করাতে পারলে তবুও কিছু কিনতে পারবে ভেবে ভেবে পথ চলে সে।

রহিম্মুদিনের রাগ হয়। এই মুর্খ মাইয়া মানুষ খালি খাইতে আর ঘুমাইতে পারে। কোনো কামের না। কত তদবির কইরা সবজির আড়তে মহাজনেরে ধইরা এক বাসা বাড়িতে কাম নিয়া দিলাম, কাম চোর খালি ঘুমায়, দিসে কামেত্যে বাদ দিয়া। পাঁচটা মুখ, ক্যামনে যে সব কিছু খালি শেষ অইয়া যায়! আল্লায় একটা পোলাও দেয় নায়, যে কাম শিখায়া নিজের লগে নিয়া ঘুরতাম। মাইয়াগুলা ডাঙ্গর ডাঙ্গর, কামে লাগাইতে ডর লাগে। যে দিনকাল পড়সে! নিজের শরীরটাও কিছুদিন হয় কেমন যেন লাগে। কোনোভাবে তিনবেলা নাপা খেয়ে খেয়ে নিজেকে ঠিক রাখছে সে। মাঝে মাঝে কাঁশি আসে। আশে পাশে মানুষজন থাকলে খুব কষ্ট করে চেপে রাখে। মনে মনে ভাবে, কী যে রোগ দেশে আইলো, শেষে না খাইয়া মরতে অইবো।

ভোরের আযান পড়ছে। হুড়মুড় করে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে টের পায় রহিমুদ্দিন মাথা ঘুরছে। শরীর ভিষণ দুর্বল। সারা শরীর ব্যথা। বুকেও কেমন ভার ভার লাগে। বুকের ভেতর ধক করে ওঠে! তার কিছু হলোনাত! তবুও অজু শেষ করে নামাজটা শেষ করে সে। মোনাজাতে বসে দর দর করে কেঁদে ফেলে সে। আল্লাহ, মাবুদ গো, ক্যান এত গরিব কইরা তোমার নিষ্ঠুর দুনিয়াত পাডায়লা! আর পাডায়লায় যহন এমন কঠিন অসুখ ক্যান গরিবেরে দেও! আমার কিসু অইলে মাইয়া তিনডারে লইয়া আমেনার কী অইবো! এযে দুনিয়ার আও বাও কিস্যু বুঝে না।

ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর শুকনা মরিচের আলু ভর্তা সামনে ধরে আমেনা। মুখে কেমন যেন একটা বিস্বাদ ভাব। জিভ ভারি হয়ে আছে। তবুও কষ্ট করে অর্ধেকখানি ভাত খেয়ে টুকরি নিয়ে সবজি আড়তের দিকে পা বাড়ায় রহিমুদ্দিন। আজ প্রথমেই সেই বাড়িটার বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক মারে সে। না, কোনো সারা নেই। ফিরে যাবার আগে আরো দু’বার হাঁক ছাড়ে। হতাশ হয়ে অন্য গলিতে পা বাড়ায়।

বুঝতে পারে না রহিমুদ্দিন, কী হয়েছে! মেয়েটা কি বাড়ি গেছে! এমনতো কোনোসময় অয় না। সবজি না লাগলেও বারান্দার দরজা খুইল্যা মিষ্টি কইরা কয়, আজ লাগবে না কাকা। সবজি আছে। আপনি কাল আসার সময় কিছু ডিম নিয়ে আসবেন। তাকে কেউ কখনও এমন সম্মান দিয়ে কাকা ডাকে না। যেন ভেতর থেকে ডাকে। বুকটা ভরে ওঠে রহিমুদ্দিনের। এমন মায়ার শরীর আর কি মিষ্টি কথা। কোনোদিন কয়নায় বেশি দাম, দশ টাকা কমান। কোনো কোনো সময় ভাংতি দিতে না পারলে কইতো, রেখে দেন। অথচ কত বড় লোকের বউ বেটিরে দেখলাম, দশ টেহা কমানোর লাইগ্যা কত তর্ক! রোজার ঈদের আগে ৫০০ টেহার দুইডা নোট দিয়া কয়, আপনার মেয়েদের জন্য।

বিষন্ন মনে শঙ্কা আর দুর্বল শরীর নিয়ে বাসায় ফিরেই না খেয়ে ঘুমিয়ে যায় রহিমুদ্দিন। রাতে জ্বরের তীব্রতা আরো বাড়ে। আমেনা তার বিশাল শরীরটা উদাম করে নাক ডেকে পাশে ঘুমাচ্ছে। ঘুমালে তার কাপড় ঠিক থাকে না। পাশে কাউকে খুন করে রেখে গেলেও কিছুই টের পাবে না। বউটা কিছুই যেন বোঝে না। এমন সময় কেউ মমতার হাত কপালে রাখলেও বুকের সাহসটা বেড়ে যায়। কষ্ট কম লাগে। রহিমুদ্দিন তার মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করে। সেই কোন ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। মা মরলে বাপ নাকি তালই হয়ে যায়। হারামি বাপটা এক মাস সময় নিলো না। আবার বিয়ে করলো।

পরেরদিন আবার সেই গলিতেই রহিমুদ্দিন প্রথম ঢুকে। আজ সেই বাড়ির নিচে অনেক মানুষের ভিড়। পুলিশের গাড়ি দেখে থমকে দূরেই দাঁড়িয়ে পড়ে সে। মনের ভেতর উসখুস করে জানতে, কী হয়েছে! ওদিক থেকে একটা ছেলেকে ফিরতে দেখে প্রশ্ন করে, ওইহানে কী অইসে বাজান! আর কইয়েন না, ওইযে নিচ তলায় একটা মাইয়া থাকতো না একলা, নিজেত মরসে আমগর এলাকাডা…, কিযে অইবো! আল্লাহ মাবুদ। হন হন করে পাশ কাটিয়ে চলে যায় ছেলেটা।

রহিমুদ্দিনের দুর্বল শরীরটা মুহূর্তে টলে ওঠে। হায় আল্লাহ, এইডা কী করলা! এত ভালো মাইয়াডারে, কেমনে পারলা! মেয়েটার মায়াভরা মুখটা মনে ভেসে ওঠে রহিমুদ্দিনের। বুকে চিন চিন ব্যথা করে ওঠে তার। কেউ জানলো না, আত্মীয়তা কিংবা রক্তের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও জগতের এক কোণে বসে এক অসহায় পিতার প্রাণ ঠিক মেয়ে হারানোর বেদনা আর চোখের কোণে ছল ছল জল নিয়ে ফিরে গেছে আজ।

১৩ জুন, ২০২০

তারা সাংমা : উপন্যাসিক ও গল্পকার

আরো লেখা

দূরত্বের শেষ সীমানা ।। তারা সাংমা

 




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost