Thokbirim | logo

৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ | ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা ।। শেষ পর্ব।। পাভেল পার্থ

প্রকাশিত : আগস্ট ১৩, ২০২০, ১১:১৪

কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা ।। শেষ পর্ব।। পাভেল পার্থ

প্রকৃতির নিয়ম, জীবনের দর্শন

অসুখ ও মহামারী সামালের ক্ষেত্রে প্রকৃতির প্রতি নতজানু আদিবাসী সমাজের আদি জীবনদর্শন এবং সাংস্কৃতিক বীক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি নয়, সামষ্টিক কায়দায় মহামারী সামালের ইতিহাস গড়ে ওঠেছিল এখানে। সমাজের সকলেই যেন একই বিধি ও বিধান মান্য করে এজন্য তৈরি হয়েছিল প্রকৃতিঘনিষ্ঠ নানা কৃত্যরীতি। মহামারী সামালের ক্ষেত্রে আদি মান্দি কৃত্যের নাম ‘দেনমারাংআ’। কোচদের ‘নকনিওয়াই-কামাক্ষ্যা-শীতলা-গেরাম পূজা’, খুমিদের ‘আপাই চিমিউ’, ম্রোদের ‘ডুব আং’, পাংখোয়াদের ‘ লুংতেরঙেট ইন তোয়ালে রিত’, চাকমাদের ‘থাম্মানা’, ত্রিপুরাদের ‘কেরপূজা’, সাঁওতালদের ‘ বাহা পরব এবং মৗঞ্জহিথানে দা: দুল’, খাসিদের ‘ কাইনিয়া ছোনং’, কড়াদের ‘শিবথান পূজা’, মুন্ডাদের ‘সারুল’, রবিদাসদের ‘ অঘনী, শাওনী, বাইশাখী এবং শীতলা’, লালেংদের ‘সিতলিসেবা’, বেদিয়া মাহাতোদের ‘গাওগাঞ্জারী’, খিয়াংদের ‘চোবই’, লুসাইদের ‘ রাম নুয়াই আহ আন ত্লান’, তঞ্চংগ্যাদের ‘সুমলাং ও ফকির পূজা’, জৈন্তিয়াদের ‘বেহেহ রিম’, ডালুদের ‘রক্ষাকালী’, ওঁরাওদের ‘ফাগুয়া পরব’, পাহাড়িয়াদের ‘পুন্ডাডি আরিয়ান’, মীতৈ মণিপুরীদের ‘ ফত্তবি লাই, লাইওয়া-লাইসোন, নহাইরোন’, মারমাদের ‘পুরি নারে’, কডাদের ‘টলা পূজা’, হাজংদের ‘ভাসান কালি পূজা’, কোলদের ‘মাতো পূজা’ এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরীদের ‘নগরকীর্তন’। এসব কৃত্য আরাধনা ও আয়োজনে প্রকৃতির ধারে নতজানু হওয়ার কায়দা আছে।

কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা

চলতি আলাপখানি শুরু করেছিলাম রাখাইনদের এক আদি চিকিৎসাশাস্ত্র গ্রন্থ পিজংয়ের স্মৃতি টেনে। আলাপখানি শেষ করছি আরেক আদি পবিত্রগ্রন্থ ‘পুয়ার’ স্মরণে। ‘সনামহি’ বা আদি মীতৈ মণিপুরী ধর্মের পবিত্রপুস্তক ‘পুয়াতে’ মহামারী বা দুর্যোগের বিবরণ আছে এবং উল্লেখ আছে এমন পরিস্থিতিতে ঘরের সীমানার ভেতর বসবাসের আর যদি নিতান্তই শক্তি নি:শেষ হয়ে যায় তবে গৃহদেবতা ‘লাইনিংথৌ সনামহির’ শরণাপন্ন হতে। মহামারী থেকে সামাল দেয়ার এই ‘সঙ্গনিরোধ ও বিচ্ছিন্নতার’ স্বাস্থ্যবিধি কোনো আদি পবিত্রগ্রন্থে খুঁজে পাওয়া এমনতর স্বাস্থ্যবিধি পালনের ঐতিহাসিকতা তুলে ধরে।

করোনার আগে আদিবাসী সমাজের সাথে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র কী বহুজাতিক কোম্পানি কে কী করেছে তার সকল খতিয়ান আর রক্তদাগ মাটি ও মগজে আছে। করোনা-উত্তর সময়ে দুম করে এই প্রান্তিকতার ময়দান ও ক্ষমতার গণিত বদলে যাবে কী? কেউ জানে না। আলাপখানি এ নিয়ে নয়। অধিপতি প্রতিষ্ঠান কী বিদ্যায়তনের গরিমা আর বিদ্যার দৌড় কিছুটা হলেও এই করোনাকাল আমাদের দেখিয়েছে। সেসব এখানে টানছি না। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, প্রান্তিকতা, বৈষম্য আর বঞ্চনা নিয়েই আদিবাসী সমাজ।

কিন্তু এমনসব বঞ্চনা সামাল দিয়েও আদিবাসী সমাজ করোনাকালে কীভাবে বৈশ্বিক মহামারী সংক্রমণ থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখলেন এর কী কোনো স্বীকৃতি ও বাহবা হবে না? কেবল ব্যক্তি নয়, পাড়াভিত্তিক সামাজিকভাবে আপ্রাণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার যে উদাহরণ এখনো আদিবাসী গ্রামগুলোতে বহাল আছে তার শিক্ষা ও কৌশল কী আমরা জাতীয় নীতিকৌশলে যুক্ত করবো না?

ফেব্রুয়ারি থেকেই আদিবাসী সমাজের মহামারী সামালের জ্ঞানভাষ্যকে মহামারী সামালের সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার জোর দাবি জানিয়ে লেখালেখি শুরু করেছিলাম। পাঁচ মাস পর জাতিসংঘ বিষয়টি ‘আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য’ করেছে। ‘কোভিড-১৯ মহামারী ও আদিবাসী সক্ষমতা’। বিশ্বাস করি, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মহামারী সামালের এমনতর নিম্নবর্গীয় জ্ঞানভাষ্য ও কায়দাকে মর্যাদা ও স্বীকৃতি দিবে। এই করোনাকালেই।

লেখক পরিচিতি

পাভেল পার্থ গবেষক ও লেখক। ই-মেইল: animistbangla@gmail.com

লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ

পাভেল পার্থ

লেখকের আরো লেখা

কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা ।। পর্ব-১।। পাভেল পার্থ

কোভিড-১৯ ও আদিবাসী সক্ষমতা ।। পর্ব-২।। পাভেল পার্থ




সম্পাদক : মিঠুন রাকসাম

উপদেষ্টা : মতেন্দ্র মানখিন, থিওফিল নকরেক

যোগাযোগ:  ১৯ মণিপুরিপাড়া, সংসদ এভিনিউ ফার্মগেট, ঢাকা-১২১৫। 01787161281, 01575090829

thokbirim281@gmail.com

 

থকবিরিমে প্রকাশিত কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। Copyright 2020 © Thokbirim.com.

Design by Raytahost